মাধ্যমিকের সমস্যা: শিক্ষা ও গবেষণা

মুহাম্মদ মিজানুর রহমান
 | প্রকাশিত : ২৪ অক্টোবর ২০২০, ১৮:৫৭

মাধ্যমিক শিক্ষার বেশ কিছু সমস্যা ইদানীং গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। বর্তমান সময়ে একটি বিষয় সর্বাধিক আলোচিত হচ্ছে, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে। জানা যায়, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে প্রথম শ্রেণি করার দাবি জানিয়ে আসছে। এই দাবি বাস্তবায়নের লক্ষেই বর্তমান সরকার ২০১২ সালের ১৫ মে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন স্কেল অপরিবর্তিত রেখে দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড পদমর্যাদায় উন্নীত করে। পরবর্তী সময়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে বলা হয়েছিল, তাদের যোগদানের আট বছর পূর্ণ হলে শূন্যপদ সাপেক্ষে শতকরা ৫০% প্রথম শ্রেণি করা হবে। পরবর্তী ধাপে তারা প্রথম শ্রেণি যা বর্তমানে নবম গ্রেডে উন্নীত হলেও তারা আর্থিক কোনো সুবিধা পাবে না।

কিন্তু সাধারণ শিক্ষকদের দাবি, এই প্রমোশনের পাশাপাশি তারা যেন আর্থিক সুবিধাও পান। এই ঘোষণার পর বেশ কিছুটা সময় কেটে গেলেও তারা এখনো প্রমোশন পাননি। আইন জটিলতা আর দীর্ঘসূত্রিতার কারণে বিষয়টি এখনো ঝুলে আছে। সাধারণ শিক্ষকরা মনে করেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা যদি বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে ভাবেন, তাহলে অতি দ্রুত এই জটিলতা নিরসন করা সম্ভব।

বকেয়া টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের বিষয়টিও দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে। নানা জটিলতার মার-প্যাচের চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এখনো তা আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। হয়তো আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তারা একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাবেন বলে আশা করছেন। শিক্ষকরা মনে করছেন এর প্রাপ্যতা তাদের ন্যায় সঙ্গত দাবি। যেহেতু বর্তমান সরকার শিক্ষার মান ও শিক্ষকদের মর্যাদা সমুন্নত করতে বদ্ধ পরিকর। তাই শিক্ষকরা আশা প্রকাশ করেন, শিগগির এ সমস্যার উত্তোরণ হবে। তাদের চাওয়াও বাস্তবায়িত হবে।

শিক্ষকদের পদমর্যাদা বৃদ্ধিকরণে মাধ্যমিকে পদসোপান সৃষ্টি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে প্রমোশন বঞ্চনার যে ক্ষোভ তাদের মধ্যে রয়েছে তার অনেকটাই লাঘব করা সম্ভব হবে। এন্ট্রি পদ নবম গ্রেড ধরে সরকারি চাকরিতে পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি বা বৃদ্ধি করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ১৭.১০.২০১৫ তারিখের অনুশাসন অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ২৫.১০.২০১৫ তারিখের সুপারিশসমূহের মধ্যে ৪৬ নম্বর সুপারিশ অনুযায়ী ‘নতুন বেতন স্কেল’ সম্পর্কে বিভ্রান্তি ও সংশয় কাটানোর জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন পদ সৃষ্টি, পদের মান উন্নয়ন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করার কথা বলা হয়েছে। স্ব স্ব মন্ত্রণালয় বা বিভাগের চাহিদা নির্ধারণ পূর্বক প্রস্তাব পাঠানোর নির্দেশনাও দেয়া হয়। জাতীয় বেতনস্কেল ২০১৫ এর কারণে সৃষ্ট ক্ষতি ও বেতন বৈষম্য দূরীকরণের নিমিত্ত এন্ট্রি পদ ৯ম গ্রেড ধরে সরকারি মাধ্যমিকে একটি যুগোপযোগী ও যৌক্তিক পদ সোপান সৃষ্টি করা যায়। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা পর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা এখনো ভেবে দেখতে পারেন। তাতে মাধ্যমিক শিক্ষায় গুণগত পরিবর্তন আসবে।

সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের পদসোপানগুলো কয়েকটি ধাপে করা যেতে পারে। সহকারী শিক্ষক নবম গ্রেড ধরে সিনিয়র সহকারী শিক্ষক অষ্টম গ্রেড আর সিনিয়র শিক্ষক সপ্তম গ্রেড। বিভাগীয় প্রধান হতে পারে ষষ্ঠ গ্রেড। সহকারী প্রধান শিক্ষক পঞ্চম প্রেড আর প্রধান শিক্ষক চতুর্থ গ্রেড। প্রমোশন জটিলতা কাটানোর জন্য ডাবল শিফটের স্কুলগুলোতে দুটো করে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। অনুরূপভাবে প্রধান শিক্ষকের পদও থাকতে হবে দুটি। কারণ একটি ডাবল শিফটের স্কুলে একজন প্রধান শিক্ষক দিয়ে স্কুল চালাতে গিয়ে তাকে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। কাজের চাপও থাকে প্রচুর।

অন্যদিকে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রশাসনের সাথে সংশ্লিষ্ট পদগুলো মাধ্যমিকের জন্য উন্মুক্ত রাখা হলে মাধ্যমিকে প্রমোশন জটিলতা নিয়ে শিক্ষকদের মাঝে যে গণঅসন্তোষ বিরাজ করছে তা দূর করা সম্ভব। আর মাধ্যমিকের লোকবল দিয়ে মাধ্যমিক পরিচালনা করা গেলে মাধ্যমিকের কাজে গতিশীলতা আসবে। প্রমোশন জটিলতার অনেকাংশ কেটে যাবে।

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ মাধ্যমিক শিক্ষা নবম-দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত করা হয়েছে যা পূর্বে ছিল ষষ্ঠ-দশম শ্রেণি পর্যন্ত। সরকারি ইন্টারমিডিয়েট কলেজগুলোতে প্রভাষক হতে অধ্যাপক পর্যন্ত পদ রয়েছে। বেসরকারি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়েও সহকারী শিক্ষক পদের পাশাপাশি সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষক পদ বিদ্যমান। ২০০৮ সাল হতে দশটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে জনবল কাঠামো অপরিবর্তিত রেখেই একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি চালু করা হয়েছে। অথচ সরকারি মাধ্যমিকে এরকম কোনো পদ সৃষ্টি করা হয়নি। আর তাদের পদমর্যাদা বৃদ্ধি করে পদায়নের কোনো সুযোগও সৃষ্টি করা হয়নি। এসব বিদ্যালয়গুলোর জন্য নতুন পদ সৃষ্টি করে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্য থেকে যারা এমফিল, পিএইচডি ও উচ্চশিক্ষিত এমন জনবল দিয়ে নতুন করে ঢেলে সাজানো যেত। এটাও হতে পারে প্রমোশনের সুযোগ সৃষ্টি করার আরো একটি ক্ষেত্র।

শিক্ষাক্ষেত্রে মাধ্যমিকে উচ্চশিক্ষাকে প্রধান্য না-দেয়া কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। সরকারি কলেজের একজন প্রভাষক পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের পরে তিনি যদি সহযোগী অধ্যাপক হতে পারেন। তাহলে মাধ্যমিকে একজন শিক্ষক পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করার পর প্রমোশনের ভিত্তিতে কেন প্রধান শিক্ষক হতে পারবেন না? অন্যদিকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এমফিল ডিগ্রি অর্জন করার পর কেন প্রমোশনের ভিত্তিতে সহকারী প্রধান শিক্ষক হতে পারবেন না? শিক্ষাক্ষেত্রে গবেষণা একটি ভাইটাল বিষয়। একে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা বা ছোট করে দেখার কারণ নেই। শিক্ষার মানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি লাভে এখন পর্যন্ত মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয় গবেষণাকর্মকে। যেহেতু বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তীর্ণ হয়েই চাকরিতে যোগদান করেন। সুতরাং এটি এখন বাস্তবায়ন হওয়াই বাঞ্ছনীয়। মাধ্যমিক শিক্ষাকে একটি ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে যেতে হলে গবেষণাধর্মী সৃষ্টিশীল বিষয়গুলোকে অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে হবে। আর এই গুরুত্ব তখনই বাস্তবায়িত হবে যখন পেশাগত দক্ষতার ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।

অনেক বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ইতিমধ্যে আত্তীকরণ হয়েছে। শিক্ষা একটি অভিন্ন সূত্রে গাথা। তাই সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষকদের মাঝে যাতে কোনো প্রকার মতানৈক্য সৃষ্টি না-হয় সেই লক্ষে একটি টেকসই সুযোগযোগী নিয়োগবিধি ও আত্তীকরণ নীতিমালা দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

মাধ্যমিক শিক্ষার আরেক নাম বাণিজ্যিক সেক্টর।অভিভাবকদের এরকম মনোভাব প্রকাশের অন্যতম কারণ হলো- সম্মানের চেয়ে অর্থের প্রতি ঝোঁক আজকে মাধ্যমিকের পিছিয়ে থাকার বড় একটি কারণ। যা দেশের শিক্ষাব্যস্থার জন্য একটি অশনি সংকেত। তাদের কোচিংমুখিতা দূর করার জন্য ডিপার্টমেন্টাল পরীক্ষা চালু করা একান্ত প্রয়োজন। তাহলে তারা পেশাগত দক্ষতা অর্জনে মনোনিবেশ করতে বাধ্য হবেন। কোচিং বাণিজ্য বন্ধকরণ কেবল কাগুজে আইনের মলাটে নয়, বরং বাস্তবতার আলোকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

লেখক: সাহিত্যিক গবেষক

সংবাদটি শেয়ার করুন

পাঠকের অভিমত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :