করোনায় দেশের অর্থনৈতিক চাকা চলছে ঈর্ষণীয় গতিতে

লীনা পারভীন
 | প্রকাশিত : ২৯ অক্টোবর ২০২০, ১২:২৫

জীবন আগে না জীবিকা আগে? গোটা দেশ তখন এই আলোচনায় মত্ত। কারণ বিশ্বের অন্যান্য দেশ জীবনের পেছনে ছুটছে। না, আমি কোনো নীতিকথার আলোচনায় আসিনি। এই একটি প্রশ্ন তখন টক শো, কলাম, রাস্তাঘাট সব জায়গায় আলাপের ইস্যু। বলছিলাম করোনা আসার পর থেকে চলতে থাকা আলাপ প্রসঙ্গে। মার্চের শুরুতে যখন প্রথম আমাদের দেশে করোনা শনাক্ত হলো, সারা দেশে লকডাউন শুরু হলো ২৬ তারিখ থেকে। নতুন এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের একমাত্র কৌশল হিসেবে তখন লকডাউনেই ভরসা সবার।

বিশ্বের সকল দেশ চলে গেল লম্বা লকডাউনে। আমরাও শুরু করলাম লকডাউন জীবন। পাশের দেশ ভারতও তখন লকডাউনকেই বেছে নিয়েছিল। কিন্তু আমাদের অর্থনৈতিক বা সামাজিক কাঠামো তো আর অন্যান্য দেশের মতো নয়। ১৭ কোটি মানুষের দেশে সবাইকে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ বা অর্থনৈতিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া মুখের কথা নয়। তারপরও আমাদের সরকার তার সাধ্যমতো বিভিন্ন স্তরে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এগিয়ে এসেছিল বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের লোকেরা। সহায়তার হাত বাড়িয়েছে ব্যক্তি পর্যায়ের অনেকেই।

কিন্তু এভাবে আর কতদিন? এর মধ্যেই নিম্নবিত্তের মানুষের মধ্যে শুরু হয়েছিল অনিরাপত্তার হাতছানি। করোনার থেকেও একটা সময় পেটের ক্ষুধাই যেন হয়ে উঠছিল বড় শত্রু। মানুষ যেন না খেয়ে মারা যায় সেই লক্ষ্যেই একটি বাস্তব সিদ্ধান্ত নিলেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। তিনি উপলব্ধি করলেন, জীবন ও জীবিকা কোনোটিই কোনোটির থেকে আলাদা কিছু নয়। জীবনের জন্য জীবিকা যেমন দরকার, আবার ঠিক তেমনি জীবিকার জন্যও জীবনের দরকার। তিনি কিছুটা বুঝে নিলেন করোনার পালস। বুঝতে চাইলেন অর্থনীতির পালসও।

নিজ দেশের জনগণের পালস তিনি ঠিকঠাক পড়তে পারেন এ বিষয়টি এর আগেও তাঁর অনেক কর্মকাণ্ডে বোঝা গেছে। অসুস্থ হলে সুস্থ হওয়ার একটা উপায় বের হয়ে যায় কিন্তু ক্ষুধার্ত হয়ে মরতে বসলে সেখানে উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব। ক্ষুধা মানুষকে টেনে নিয়ে যায় অন্য পথে। কারণ পেট শান্ত রাখাই প্রধান টার্গেট থাকে মানুষের। ন্যায়-অন্যায় বিবেচনাবোধ কাজ করে না সেখানে। মানুষের হাতে যদি সামর্থ্য থাকে তবে সে প্রাপ্য সুবিধাগুলো অর্জনের চেষ্টা করে। আর সেই সামর্থ্যের অন্যতম রাস্তা হচ্ছে অর্থনৈতিক কর্মে নিজেকে যুক্ত রাখা।

দেশের অর্থনৈতিক চাকাকে বন্ধ রেখে সরকারই বা সহায়তা দেবে কতদিন? তুমুল সমালোচনা ও তর্কের মাঝেই মারাত্মক স্রোতের বিপরীতে গিয়ে একটি সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। গোটা বিশ্ব একদিকে চলেছে আর তিনি একা চলেছেন আরেক দিকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, যারা বিশ্বের স্বাস্থ্যমন্ত্রী, তারাও আশঙ্কার কথাই বলেছে সেদিন। আমরা জনগণও যুক্ত ছিলাম তাঁর সমালোচনায়। কেউ উদ্দেশ্যমূলকভাবে আবার কেউ ভয়ে বা না বুঝেই মিশেছিলাম এই ‘জীবন ও জীবিকার’ তর্কে। সেদিন না বুঝলেও আজ আমরা যথেষ্ট বুঝতে পারছি তিনি সঠিক ছিলেন। তাঁর সাহস আজ স্বীকৃতি পেতে শুরু করেছে।

একজন নেতার মধ্যে যদি সাহস না থাকে, ঝুঁকিকে মাথায় রেখেই কৌশল নির্ধারণ করতে ব্যর্থ যে নেতা তিনি আসলে নেতাই নন। জীবনে ঝুঁকি থাকবেই, তাই বলে কি বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যায়? ২% চান্স থাকলেও অনেক সময় শেষ মুহূর্তে থাকা রোগীকে বাঁচাতেও ডাক্তাররা শেষ চেষ্টা হিসেবে অনেক শক্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। করোনাকে না চিনলেও দেশ ও দেশের মানুষের কথা বিবেচনায় রেখে শেখ হাসিনা সেদিন যে বিরাট সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন সেটিই ধীরে ধীরে আদর্শ হতে চলেছে। নেতা যদি উদ্দেশ্যে অবিচল থাকেন তাহলে সেটিকে অর্জনের জন্য ঠিক কোনো না কোনো রাস্তা বের করে নেন।

ধীরে ধীরে সবকিছু স্বাভাবিক করে দিয়ে অর্থনীতির চাকাকে সচল হতে দিয়েছিলেন তিনি। মানুষ আবার প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করলো। কারও দয়ার ওপর নির্ভর করে নয়, নিজের শ্রমেই আয়-রোজগার করে বাঁচা শুরু করলো আমাদের শ্রমজীবীরা। অফিস আদালত সবকিছুই খুলে গেলো। স্থবির হতে চলা দেশ যেন আবারও ফিরে পেতে থাকলো ইমিউনিটি পাওয়ার। বলা হয়ে থাকে, করোনার বিরুদ্ধে লড়তে হলে চাই শারীরিক সক্ষমতা বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। ইমিউনিটি পাওয়ার নির্ভর করে আপনি কতটা সচল আছেন তার ওপর। কেবল পুষ্টিকর খাবার খেলেই হয় না, মানসিকভাবেও প্রফুল্ল থাকা লাগে। নির্ভার থাকা লাগে লড়াইয়ের ময়দানে।

ঠিক একই উপায়ে গোটা বাংলাদেশ মানসিকভাবে আবার চাঙা হয়ে উঠলো সবদিক থেকে। মাসের পর মাস লকডাউনে থেকেও যেখানে অন্যান্য দেশ করোনায় মৃতের সংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি, সেখানে সবকিছু খোলা রেখেও বাংলাদেশে মৃত্যুর হার অনেক কম। অথচ আশঙ্কা করা হয়েছিল আমাদের দেশে মৃত্যুর হার হবে অনেক বেশি। ঘন বসতিপূর্ণ একটি দেশে যেখানে সামাজিক দূরত্ব টিকিয়ে রাখাই প্রায় মুশকিলের একটি কাজ, সেখানে সবকিছু খুলে দিয়ে কেমন করে করোনা ঠেকানো যাবে সেটি নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন আমাদের বিশেষজ্ঞরাও। এর পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের দুর্বল চিত্রও ছিল এই চিন্তার অন্যতম কারণ।

দুশ্চিন্তা বা সমালোচনাকে আমি অবাস্তব বলছি না। কারণ করোনার কোনো প্রতিষেধক যেখানে নেই, নেই কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা বা প্রতিরোধক কোনো উপায়, সেখানে এমন সিদ্ধান্তকে অবাস্তব বা অবিবেচনাপ্রসূত ভাবাই স্বাভাবিক। এখানেই হয়তো একজন নেতার সঙ্গে অন্যদের পার্থক্য। একজন নেতা যে দৃষ্টি থেকে কোনো বিষয়কে বিবেচনা করেন বা দেখার চেষ্টা করেন, সাধারণেরা সেখানে পৌঁছাতেই পারে না অনেক সময়। শেখ হাসিনা একজন ট্র্যাডিশনাল লিডার নন, আধুনিক বিশ্বে ‘সিচুয়েশনাল লিডারশিপ’ বলে এক ধরনের লিডারশিপ স্টাইল অধিক আলোচিত। এই ধরনের নেতৃত্ব বাস্তবতার নিরিখে পরিস্থিতিকে বিবেচনায় রেখে কৌশল নির্ধারণ করেন। এক্ষেত্রে তারা কোনো সেট ফর্মুলাকে মাথায় না রেখে সমস্যার নানা দিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সময়ের বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেন। শেখ হাসিনাকে তাই আমি মনে করি একজন সিচুয়েশনাল লিডার, যিনি ট্র্যাডিশন এবং বাস্তবতা দুটোর সংমিশ্রণে একদম নিজস্ব একটি কৌশলে করোনাকে মোকাবিলায় নেমেছিলেন। এমন সিদ্ধান্ত শর্ট টার্মে সমালোচিত হলেও ফলাফল বলে এটিই সঠিক নীতি।

করোনা মোকাবিলায় আজ যখন অন্যান্য দেশের অর্থনৈতিক চাকা থমকে গেছে সেখানে বাংলাদেশ চলছে ঈর্ষণীয় গতিতে। আমার বিশ্বাস, শেখ হাসিনার এই মডেল খুব দ্রুত তাঁকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে, যার প্রকাশ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

লেখক: কলামিস্ট

ঢাকাটাইমস/২৮অক্টোবর/এসকেএস

সংবাদটি শেয়ার করুন

পাঠকের অভিমত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :