ওনারা ২৪ জন আমার সহকর্মী

মহিবুল ইসলাম খান
 | প্রকাশিত : ০৩ আগস্ট ২০২১, ১২:৫২

ওনারা ২৪ জন আমার সহকর্মী। কনস্টেবল। চাকরির বয়স আমার চাকরির দ্বিগুণেরও বেশি। এক পদে টানা ৪০ বছর কাজ করে গেছেন। এরকমই এক দিনে কোনো এক সকালে কোনো এক জেলার পুলিশ লাইনে আরও অনেকের সাথে এসেছিলেন তারাও। মাপজোক, ওজন, লাফঝাঁপ, মাঠের মধ্যে ঘাড়গুজে বসে পরীক্ষা দিয়ে পুলিশের খাকি পোশাক গায়ে জড়িয়ে দূরন্ত কৈশোরকে পেছনে ফেলে হয়ে গেলেন পুলিশ সদস্য।

দীর্ঘ চল্লিশ বছর কাজ করে গেছেন। হাতে লাঠি, ঘাড়ে রাইফেল নিয়ে। সময়ের পরিক্রমায় হাতের লাঠির বদলে উঠেছে আধুনিক ব্যাটন, ঘাড়ের সাথে সিলিংয়ে ঝোলা থ্রিনটথ্রির জায়গা দখল করেছে চাইনিজ রাইফেল। অথচ ইউনিফর্মের শোল্ডারের জায়গাটা খালিই রয়ে গেছে। কোন Rank ব্যাজ তার শোভাবর্ধন করেনি। হয়ত প্রতি তিন চার বছর পরপর ব্রেস নম্বরটা (কনস্টেবল নম্বর পিতলের চাকতিতে লেখা থাকত একসময়) বদলেছে।

দুরন্ত যৌবনে টগবগে ঘোড়ার মত ছুটে চলা সে যুবক আজ চাকরির শেষ দিনে এসে ভারাক্রান্ত। অনেকে অসুস্থ; জীবনের বেশিরভাগ সময় পরিবার থেকে দূরে থেকে, সারাদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ডিউটি শেষে পুলিশ লাইন ব্যারাক বা থানার খাটিয়ায় শুয়ে হয়ত ভেবেছেন দূরের কোনো এক জেলায় রেখে আসা স্ত্রী, সন্তানদের মুখ। রাতের পর রাত কখনও জনবহুল, কখনও নির্জন রাস্তায় চেকপোস্ট করতে করতে ক্লান্ত চোখে হয়ত ভেসে উঠেছে প্রিয়মুখগুলো। জানিনা তারা ৪০ বছরে কতটা ঈদ নিজের পরিবারের সাথে করতে পেরেছেন? তবে নিশ্চিত জানি ঈদের দিনের নামাজটাও অনেকেরই পরার সুযোগ হয়নি। দুপুরে পুলিশ লাইন বা থানার মেসে সহকর্মীদের সাথে ঈদ উদযাপন করেছেন আর চোখের পানি নীরবে মুছে ঈদের খাবারটা খেয়েছেন।

পুলিশের চাকরিতে অধিকাংশ কনস্টেবল নীরবেই চলে যান চাকরির শেষ কর্মদিবসে। রিজার্ভ অফিস থেকে একটি সিসি নিয়ে, ৪০ বছর ধরে শরীরে জড়িয়ে থাকা ইউনিফর্মটা জমা দেয়ার অনুভূতিটা কেমন তা আমি চোখ বুজলেই অনুভব করতে পারি। আমি নিজেও যে এই ইউনিফর্মকে খুব ভালোবাসি। ৪০ বছর যিনি পুরো বিভাগকে, দেশকে নিজের সর্বস্ব উজাড় করে, চরম ত্যাগ শিকার করে সেবা দিয়ে গেলেন, শেষ দিন তাকে কদাচিত কেউ বলে আপনার ৪০ বছরের সেবার জন্য ধন্যবাদ।

গত কয়েক বছরে আমাদের সহকর্মীরা জেলা পর্যায়ে পুলিশ সংস্কৃতির বড় একটি পরিবর্তন এনেছেন। প্রায় প্রতি জেলার পুলিশ সুপারগণ কনস্টেবলদের বিদায়বেলা তাদের সুসজ্জিত গাড়িতে বাড়ি পাঠাচ্ছেন। যার অনুপ্রেরণা নিশ্চয়ই মান্যবর আইজিপি স্যারের পুলিশ সদস্যদের কল্যাণে গৃহীত পদক্ষেপ ও দিকনির্দেশনা। আজ পাবনা জেলা পুলিশের তিনজন এএসআই, ২৪ জন কনস্টেবলকে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে বিদায় সংবর্ধনা জানানো হয়। বিদায়বেলা তাদেরকে ‘আপনার সার্ভিসের জন্য ধন্যবাদ’ বলতে পারাটা আমার জন্যও গর্বের ও আনন্দের।

লেখক: পুলিশ সুপার, পাবনা

সংবাদটি শেয়ার করুন

পাঠকের অভিমত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :