পাঁচ খুনিকে ফেরানোর চেষ্টা থাকলেও সাড়া কম

রুদ্র রাসেল, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২২, ১২:১৯ | প্রকাশিত : ১৫ আগস্ট ২০২২, ১০:২৫

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১২ আসামির মধ্যে পাঁচজন এখনো বিদেশে পলাতক। তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে সাজা কার্যকরের জন্য কয়েক বছর ধরেই কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে সরকার। ইন্টারপোলের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও বহাল রয়েছে। তবে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সেসব দেশের আইন।

অন্যদিকে দণ্ডপ্রাপ্তরা ছাড়াও বঙ্গবন্ধু হত্যায় পরোক্ষভাবে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করতে কমিশন গঠন করতে যাচ্ছে সরকার। কমিশনের খসড়া প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার অগ্রগতির বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি শামসুল হক টুকু ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। খুনিরা যেসব দেশে পালিয়ে আছে সেসব দেশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছে আমাদের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আমরা দেশগুলোর সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি।’

এত দিন ধরে ফিরিয়ে আনতে না পারার কারণ হিসেবে সাবেক এই স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ওই সব দেশের নিজস্ব কিছু আইন রয়েছে, যা খুনিদের ফিরিয়ে আনতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। আমরা সেসব দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে খুনিদের ফিরিয়ে আনার প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নৃশংসভাবে জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে কতিপয় বিপদগামী সেনা কর্মকর্তা। একে পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ড বলে মনে করা হয়। শুধু হত্যাকারীরাই নয়, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও কেউ কেউ কুশীলবের ভূমিকা রেখেছেন বলেও ধারণা করা হয়।

এর সঙ্গে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে দায়ী করেন শামসুল হক টুকু। বলেন, ‘পঁচাত্তরের পর থেকেই জাতির প্রত্যাশা ছিল বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার করা। কিন্তু জিয়া ইনডেমনিটি আইন করে খুনিদের দায়মুক্তি দিয়ে দিলেন, পৃষ্ঠপোষকতা দিলেন। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসেও পৃষ্ঠপোষকতা দিলেন।’ পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু হত্যার রায় কার্যকর করল উল্লেখ করে শামসুল হক টুকু বলেন, শেখ হাসিনার দুঃসাহসিক নেতৃত্বের ফলেই এসব সম্ভব হয়েছে। একইভাবে তার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে দণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হবে। খুনিদের দ্রুত ফিরিয়ে এনে দণ্ড কার্যকর করা হোক- এ চাওয়া গোটা জাতির।’

খুনিদের অবস্থান প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, তারা দুই খুনির অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত। অন্য তিনজনের অবস্থান জানতে প্রবাসীদের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। অবস্থান নিশ্চিত হয়ে সরকারকে জানালে তাদের পুরস্কার দেওয়া হবে বলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে।

খুনিরা কে কোথায়

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ১২ আসামির মধ্যে ছয়জনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। পলাতক অবস্থায় জিম্বাবুয়েতে মারা গেছেন আজিজ পাশা। বাকি পাঁচজনের মধ্যে এম এ রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে এবং এবিএমএইচ নূর চৌধুরী কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। এ ছাড়া রিসালদার মোসলেম উদ্দিন খান, খন্দকার আব্দুর রশিদ এবং শরিফুল হক ডালিমের অবস্থান নিশ্চিত হতে সরকার কাজ করছে।

বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, খন্দকার আব্দুর রশিদ লিবিয়া, পাকিস্তান বা আফ্রিকার একটি দেশে এবং রিসালদার মোসলেম উদ্দিন ইউরোপের একটি দেশে ও শরিফুল হক ডালিম পাকিস্তান, লিবিয়া বা স্পেনে রয়েছেন। তারা মাঝেমধ্যেই অবস্থান পরিবর্তন করেন। তারা এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকায় যাতায়াত করছেন বলে গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে।

এ এম রাশেদ চৌধুরী

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের মধ্যে রাশেদ চৌধুরী ব্রাজিল থেকে ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। ২০০৪ সালে দেশটিতে রাজনৈতিক আশ্রয় পান। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এলে রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করা হয়। এরপর ২০১৮ সালে দুবার এবং ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চিঠি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর সঙ্গে একাধিক বৈঠকে রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত পাঠানোর দাবি তোলেন। কিন্তু ফাঁসির আসামি বলে তাকে ফেরত দিতে অনীহা দেখিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।

নূর চৌধুরী

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রথম আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর নূর চৌধুরীকে দেশে ফেরত আনতে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেয় কানাডাকে। ২০০৪ সালে একবার এবং ২০০৭ সালে একবার নূরকে দেশে ফেরত পাঠানোর কথা বলে কানাডা। কিন্তু তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকার বিষয়টি নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। ২০০৯ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে নূরকে ফের ফেরত চায়। এরই মধ্যে কানাডা থেকে বহিষ্কার এড়াতে নূর চৌধুরী সে দেশের অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরে প্রি-রিমুভ্যাল রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট (প্রাক-অপসারণ ঝুঁকি মূল্যায়ন) আবেদন করেন। এ ধরনের আবেদন সাধারণত এক বছরের মধ্যে নিষ্পত্তি করা হয়। কিন্তু নূর চৌধুরীর ক্ষেত্রে কানাডার অ্যাটর্নি জেনারেল ১০ বছরেও সেটি নিষ্পত্তি করেনি। বাংলাদেশ সরকার ২০১৮ সালের জুলাইয়ে কানাডার ফেডারেল কোর্টে একটি মামলা দায়ের করে। মামলায় নূর চৌধুরীর অবস্থানসংক্রান্ত তথ্যের বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার আবেদন করা হয়। পরের বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর কোর্ট বাংলাদেশের পক্ষে রায় দেয়। অর্থাৎ নূর চৌধুরীর অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য জানানোর জন্য কানাডা সরকারকে নির্দেশ দেয়। তবে এ বিষয়ে কানাডার সরকার এখনও কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি।

মোসলেম উদ্দিন খান

মোসলেম উদ্দিন খান ইউরোপের কোনো একটি দেশে পালিয়ে আছেন বলে ধারণা করা হয়। তবে করোনা মহামারির মধ্যে গত বছরের জুন মাসে কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা বঙ্গবন্ধুর এ খুনির ভারতে আটক হওয়ার খবর ছাপে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারেনি। পরবর্তীতে এর কোনো সত্যতা মেলেনি।

শরিফুল হক ডালিম

শরিফুল হক ডালিম পাকিস্তান, লিবিয়া বা স্পেনে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তার বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো তথ্য নেই সরকারের কাছে।

খন্দকার আব্দুর রশিদ

ধারণা করা হচ্ছে, আব্দুর রশিদ পাকিস্তান বা আফ্রিকার কোনো একটি দেশে পালিয়ে আছেন। তবে সরকার নিশ্চিত কোনো তথ্য পায়নি। যে ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে

২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর খুনি সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, মহিউদ্দিন আহমদ (ল্যান্সার), এ কে বজলুল হুদা এবং এ কে এম মহিউদ্দিনের (আর্টিলারি) মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় । আরেক খুনি আবদুল মাজেদের ফাঁসি কার্যকর করা হয় ২০২০ সালের ১১ এপ্রিল। আবদুল মাজেদ ভারতে পালিয়েছিলেন। করোনার সময় দেশে এলে গ্রেপ্তার হয় এই খুনি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঢাকায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ পরিবারের ১৮ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করে ঘাতকরা। ঘটনার ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা এলে ওই ঘটনায় মামলা করা হয়।

১৯৯৮ সালে হত্যার দায়ে ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয় নিম্ন আদালত। বিষয়টি উচ্চ আদালতে গড়ালে ২০০০ সালে হাইকোর্ট ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। ২০০৯ সালে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখলে আসামিরা রিভিউ আপিল করেন। ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি রিভিউ আপিল খারিজ করা হয় এবং পরদিন ২৮ জানুয়ারি পাঁচ খুনির মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।

ঢাকাটাইমস/১৫আগস্ট/আরআর)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :