অত্যাধুনিক আগ্রাসনে লঙ্ঘিত হচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যুর অধিকার

এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকার
 | প্রকাশিত : ২৭ জানুয়ারি ২০২৪, ১০:১৪

জন্মলগ্ন থেকেই পৃথিবী নানা চড়াই-উতরাই, অভাব-অনটন, সংকট, প্রাকৃতিক ও অতি-প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি, অতিমারি, সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, জঙ্গিবাদ, বর্ণবাদ, ধর্মযুদ্ধ, শক্তিমত্তার লড়াই, পারমাণবিক যুদ্ধ ইত্যাদি লক্ষ লক্ষ অশুভ সময়ের সাথে মোকাবিলা করে আজকের আধুনিক বিশ্বের রূপ লাভ করেছে। 'আধুনিক'- শব্দটি ধনাত্মক অভিব্যক্তিসম্পন্ন। কাজেই বিশ্ব যখন তার প্রকাশে অন্য সকল সমৃদ্ধির সাথে পুরোপুরি মানবিক অভিব্যক্তিতে প্রস্ফুটিত হতে পারবে, কেবল তখনই তাকে যথার্থভাবে আধুনিক বিশ্ব বলাটা সমীচীন হবে। সকল বিবেচনায় বর্তমান বিশ্বকে আমাদের কাক্সিক্ষত আধুনিক বিশ্ব বলার উপযুক্ত সময় হয়েছে বলে আমার মনে হয় না।

মানবতাকে উপেক্ষা করে, মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারকে বিসর্জন দিয়ে সারা পৃথিবী যখন জোর করে ক্ষমতা প্রদর্শনীর নেশায় মাতোয়ারা, তখন সত্যিকার অর্থে কী করে বলি- আমরা আধুনিক বিশ্বে বাস করি? বারুদের গন্ধ, যুদ্ধের ডামাডোল, দুর্বলকে আঘাত করে জোর করে দেশ দখল কিংবা সম্পদ আহরণ, নিজস্ব ঘারানার শক্তির বলয়ে যাদেরকে আনা সম্ভব নয়- তাদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ কিংবা নিষেধাজ্ঞার মতো স্বেচ্ছাচারী নীতি আরোপ করা আজকাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের রাজনীতির নৈমিত্তিক চর্চা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার সাথে অনুন্নত, উন্নয়নশীল, উন্নত ইত্যাদি বিভিন্ন ভাগে বিভাজিত করে, এমনকি ধর্ম-বর্ণ, জাত-পাতের পরিচয়কে প্রাধান্য দিয়ে একে অপরের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন দেশ। নানারকম কূটচালে এবং মিথ্যাচারের ফাঁদে ফেলে যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা, সর্বোপরি নিজের প্রয়োজনে অন্যের স্বাধীনতাকে হরণ করার মতো সকল হীন প্রচেষ্টা হিসেবে যুদ্ধাস্ত্রের প্রয়োগ এবং ক্রমাগত সামরিক সামর্থ্য বৃদ্ধির প্রবণতা বর্তমান পৃথিবী যেভাবে প্রত্যক্ষ করছে, কী করে বলতে পারি এই বিশ্ব প্রকৃত অর্থেই আধুনিক বিশ্ব? আধুনিকতার নামে এমন একটি আবেগ ও মানবতাহীন পৃথিবী নিঃসন্দেহে কারো কাম্য ছিল না কখনোই।

অতিবাহিত সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সংস্থাপনা এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে পৃথিবীর বাহ্যিক চেহারায় পরিবর্তন এসেছে সত্যি, কিন্তু মানুষের মনস্তত্ত্ব কিংবা মানবিক বিচারে উন্নত সভ্যতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দিনশেষে বর্তমান বিশ্ব কতটুকু আধুনিক হতে পেরেছে- তা নিয়ে প্রশ্নাতীত সন্দেহ আছে। তার সাথে এটিও বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে, ঘুরেফিরে তথাকথিত উন্নত, উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত রাষ্ট্রগুলো এই বিশৃঙ্খল বিশ্বব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে মূলত ধর্মাশ্রয়ী সাম্প্রদায়িক মননের দিকেই ক্রমাগত ঝুঁকে পড়ছে।

আনুষ্ঠানিক ধর্মচর্চার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ অব্দি কোনো ধর্মই যেমন সকল ধর্মকে পাশাপাশি নিয়ে প্রকৃত অর্থে পথ চলতে সক্ষম হয়নি, তেমনি করে সাম্প্রদায়িক মননে বিভক্ত পৃথিবীর নাগরিক সমাজ সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের দর্শনে প্রকৃত শিক্ষা ও সংস্কৃতির নির্যাস দ্বারা অর্জিত মানবিক মূল্যবোধের আদর্শ সহজাতভাবে বর্তমানে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। সম্ভব হলে মোড়ল এবং শাসক শ্রেণির বাইরে বিশ্বের অধিকাংশ সাধারণ শ্রেণির মানুষই হয়তো এই পেশীশক্তিসর্বস্ব বিশ্বনেতাদের ত্যাজ্য করে বেরিয়ে আসতেন। বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শোষিত মানুষেরা আজ যেন তাদের স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করার অধিকারটুকুও হারিয়ে বসেছে। রকেট হামলা, বোমা বারুদের গোলার আঘাতে নির্বিচারে হত্যা করা শিশু, কিশোর, নারী, বৃদ্ধসহ সাধারণ মানুষদের ছিন্নভিন্ন মৃতদেহের নির্বাক মিছিলে উন্নত সভ্যতার আধুনিক নেতাদের পাশবিক মননের উল্লাসে ইতিহাসের কলঙ্কিত এই অধ্যায় শোষিত মানুষের রক্তে লেখা হচ্ছে সেই কাক্সিক্ষত স্বাভাবিক মৃত্যুর ইচ্ছাকে অসম্মানিত করে।

কিন্তু এটাই চরম সত্য যে, কাউকে তাড়াতে গেলে নিজেকেও তার পেছনে দৌঁড়াতে হয়। বিরামহীন দৌঁড়ানো সম্ভব নয় বলে যিনি তাড়া করেন, তিনিও এক পর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে যান। পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে আমেরিকা যেভাবে পুরো পৃথিবীতে যুদ্ধ প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করছে কিংবা নিজেকে জড়িয়ে ফেলছে, তাতে বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর এই রাষ্ট্রটির সামরিক, কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অচিরেই ক্লান্ত হয়ে যাবার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এভাবে আর খানিকটা পথ চললে হয়তো বিশ্ব নেতৃত্বে মসনদের অধিকারের ক্ষেত্রে পদচ্যুত হয়ে বিপদে পড়তে হবে।

সারা বিশ্বকে এক টেবিলে বসাবার যে যোগ্যতা এখনো তাদের আছে বলে আমরা মনে করি, চলমান পরিস্থিতিকে লাগাম টেনে না ধরলে ভবিষ্যতে এই যোগ্যতাও তারা অবশ্যই হারাবে। তখন হয়তো তাদের বহু বিভাজিত বিশ্বের খণ্ডিত অংশের অর্থাৎ পশ্চিমের একাংশের নেতা হিসেবে টিকে থাকার প্রাণান্তকর প্রয়াস চালিয়ে যেতে হতে পারে। বিশেষ করে ইউক্রেন পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে ইসরাইলকে ন্যক্কারজনকভাবে সমর্থন জোগানোর বিষয়কে কেন্দ্র করে বিপরীত বলয়ে যে শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে, তা যে ভয়াবহ চেহারায় রূপ নিতে পারে, সেই শঙ্কা অমূলক নয়। আর প্রাকৃতিকভাবে যদি ভাগ্য বিপর্যয় অনিবার্য হয়েই থাকে, তাহলে তাদের বর্তমান আচরণ সঠিক পথেই চলছে বলে ধরে নিতে হবে। যদিও বিনা যুদ্ধে একক নেতৃত্বকে প্রশংসিত করে ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে বিশ্বনেতাদেরকে সঙ্গে নিয়েই কল্যাণমুখী মানবিক আধুনিক বিশ্ব গড়ে তোলার সুযোগ এসেছিল অতিপ্রাকৃতিকভাবে, যখন সমগ্র বিশ্ব একই সময়ে করোনা ভাইরাসে জ্বরাগ্রস্ত হয়েছিল।

পৃথিবীর সকল সামরিক ও পারমাণবিক শক্তি অচল ও অর্থহীন হয়ে গিয়েছিল মূহূর্তেই। কীভাবে বেঁচে থাকা যায় সেটাই তখন ছিল মানুষের একমাত্র আকুতি। হাইপোথিটিক্যালি বলাই যায় হাতে গোনা দু'এক জন মোড়ল যদি বিশ্বব্যাপী মনোপলি ভ্যাকসিন ব্যবসা করতে পারতেন, তাহলে অস্ত্রবিক্রীর অর্থনীতির চাহিদা এত দ্রুত হয়তো দেখা দিত না। তুচ্ছ শামুকে পা কাটতে শুরু করেছে বর্তমান মানবসভ্যতার। সময় থাকতে শুভবুদ্ধির উদয় হোক পরাশক্তির মগজে, যুদ্ধ বন্ধ হোক মানবতার কল্যাণে। মানবিক মূল্যবোধ, শিক্ষা ও সংস্কৃতির নির্যাসে শান্তির সৌরভ ছড়িয়ে পড়ুক আধুনিক বিশ্বের সকল প্রান্তরে।

এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকার: পুলিশ সুপার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :