জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট: কয়েক মাইলজুড়ে লাইন, নগরজুড়ে তীব্র যানজট

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৪৬
অ- অ+

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার ঢেউ লেগেছে দেশের বাজারেও। তবে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার সরকারি আশ্বাসের মধ্যেই রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের মজুতদারি ও সিন্ডিকেট কারসাজিতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

এদিকে রাজধানীতে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। পয়লা বৈশাখের ছুটির পর থেকে পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের সামনে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানবাহনের সারি দেখা গেছে, যা নগরজুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি করেছে।

রাজধানীর এয়ারপোর্ট, নিকুঞ্জ, প্রগতি সরণি ও শাহবাগ, রামপুরা, মিরপুর, যাত্রাবাড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে—বাস, প্রাইভেটকার, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন। অনেকেই আগের রাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও নিশ্চিতভাবে তেল পাচ্ছেন না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থেকে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।

মোটরসাইকেল চালক জায়ান বলেন, “আগে কিছুটা অপেক্ষা করলেই তেল পাওয়া যেত, এখন লাইনের শেষই দেখা যায় না।”

আরেক চালক সাদিদ জানান, প্রায় ১২ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পেতে চরম কষ্ট করতে হয়েছে তাকে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, কারসাজি রোধে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং তথ্যদাতাদের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানও অব্যাহত রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শক্তিশালী বাজার তদারকি, প্রযুক্তিনির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ ছাড়া জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। অন্যথায় এ সংকট আরও তীব্র হয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়াতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার অভাবকে কাজে লাগিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরেই বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। সুযোগ বুঝে তারা কখনো সরবরাহ কমিয়ে, কখনো মজুত রেখে এবং কখনো পরিবহন ব্যয়ের অজুহাতে দাম বাড়িয়ে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। এতে ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে এবং মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকিও বাড়ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অন্তত দুটি বড় সিন্ডিকেট জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরিতে সক্রিয়। এর একটি চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক, যেখানে বিদেশি জাহাজ থেকে অবৈধভাবে তেল খালাস করা হয়। অন্যটি ঢাকাকেন্দ্রিক, যা ডিলার ও খুচরা পর্যায়ে সরবরাহে কারসাজি করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ট্যাংক লরিগুলো থেকে পথে তেল চুরি করা হয়। কখনো ডিপোতেই অতিরিক্ত তেল তুলে তা কালোবাজারে বিক্রি করা হয়। পাশাপাশি অনেক পাম্প মালিক দাম বাড়ার অপেক্ষায় তেল মজুত করে রেখে হঠাৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেন, ফলে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়।

সম্প্রতি বিভিন্ন জেলায় অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধভাবে মজুত তেল জব্দ করা হয়েছে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় প্রায় ৬ হাজার লিটার ডিজেল, জামালপুরে ৩ হাজার লিটার পেট্রোল এবং শেরপুরে একটি ভবনের নিচতলায় ২৫ হাজার লিটার তেল উদ্ধার করা হয়। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও হাটহাজারীতেও পাম্পে তেল মজুত রেখে বিক্রি বন্ধ রাখার প্রমাণ মিলেছে।

জ্বালানি বিশ্লেষকরা বলছেন, জাহাজ থেকে ডিপো, ডিপো থেকে পাম্প—প্রতিটি স্তরে কঠোর নজরদারি ছাড়া এ সংকট নিরসন সম্ভব নয়। একইসঙ্গে লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

অন্যদিকে, ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন—অননুমোদিতভাবে তেল মজুত ও বিক্রি বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে। তাদের মতে, জ্বালানি খাতে শতভাগ অটোমেশন না হলে এ ধরনের কারচুপি বন্ধ করা কঠিন।

(ঢাকাটাইমস/১৬ এপ্রিল/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নেতাকর্মীদের অন্যায় না করার শপথ করালেন ধর্মমন্ত্রী কায়কোবাদ
হঠাৎ অসুস্থ জ্বালানিমন্ত্রী টুকু, সিসিইউতে ভর্তি
আওয়ামী সরকারের আমলে জ্বালানি খাতের দুর্নীতির মাশুল এখন দিচ্ছে জনগণ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
পূবাইলে ফজলুল হক মিলনকে মন্ত্রিসভায় রাখার দাবিতে দোয়া মাহফিল
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা