জরাজীর্ণ ভবনে পাঠদান, ঝুঁকিতে সাতক্ষীরার ২৫০ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী

বাইরে তখন বৃষ্টি। শ্রেণিকক্ষের ভেতরে বসে পাঠ নেওয়ার কথা ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের। কিন্তু ছাদ চুইয়ে পানি পড়ায় একপর্যায়ে বই-খাতা সামলে বসতে হয় তাদের। কোথাও আবার পাকা শ্রেণিকক্ষের অভাবে টিন কিংবা গোলপাতার ছাউনির নিচেই চলছে পাঠদান। আর জরাজীর্ণ ভবনের ফাটল ধরা দেয়াল ও ছাদ নিয়ে তৈরি হয়েছে দুর্ঘটনার শঙ্কা।
সাতক্ষীরার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর এমন চিত্র বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। জেলার সাতটি উপজেলার ২৫০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোর সমস্যায় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের তালিকা ও প্রয়োজনীয় তথ্য নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখায় পাঠানো হয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১ হাজার ৯৫টি। এর মধ্যে ২৫০টি বিদ্যালয়ের ভবন জরাজীর্ণ অথবা প্রয়োজনের তুলনায় অবকাঠামো অপর্যাপ্ত। বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে পিইডিপি-৫ প্রকল্পের আওতায় নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা রয়েছে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) আশাশুনি উপজেলার কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, অনেক বিদ্যালয়ের ভবনের দেয়াল ও ছাদে ফাটল রয়েছে। কোনো কোনো স্থাপনার বিভিন্ন অংশ দীর্ঘদিনের ব্যবহারে নষ্ট হয়ে গেছে। পর্যাপ্ত পাকা শ্রেণিকক্ষ না থাকায় কোথাও টিনের ঘরে, কোথাও আধাপাকা স্থাপনায় আবার কোথাও গোলপাতার ছাউনির নিচে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হচ্ছে।
আশাশুনির নবীননগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থা এর একটি উদাহরণ। বিদ্যালয়টিতে পর্যাপ্ত পাকা ভবন না থাকায় আধাপাকা গোলপাতার ছাউনির নিচে পাঠদান করতে হয়। বৃষ্টি হলে শ্রেণিকক্ষের ভেতরে পানি পড়ে যায়।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মুকুল রানী সরকার বলেন, ‘বিদ্যালয়ে পাকা ভবন না থাকায় আধাপাকা গোলপাতার ছাউনির নিচে পাঠদান করতে হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই শ্রেণিকক্ষের ভেতরে পানি পড়ে। এতে পাঠদান করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। এমন পরিবেশে শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখাও কঠিন।’
শিক্ষকেরা জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছোট বয়সের শিশুদের দীর্ঘ সময় ঝুঁকিপূর্ণ বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসিয়ে পাঠদান করা কঠিন। বর্ষায় পানি পড়া, গরমের সময় টিনের ঘর উত্তপ্ত হয়ে ওঠা এবং শ্রেণিকক্ষের সংকট—সব মিলিয়ে পাঠদানে নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
শুধু পাঠদানেই নয়, বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সংকটের প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির ওপরও। শিক্ষকদের মতে, আনন্দময় ও নিরাপদ পরিবেশ শিশুদের বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। বিপরীতে শ্রেণিকক্ষের দুরবস্থা তাদের স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অভিভাবকেরাও দ্রুত বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা বয়সে ছোট। তাই তাদের জন্য নিরাপদ ভবন ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। জরাজীর্ণ ভবনে পাঠদান চলতে থাকলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যায়।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে শুধু শিক্ষক ও পাঠ্যবই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ, পর্যাপ্ত অবকাঠামো, সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ও শিশুদের উপযোগী পরিবেশ। অবকাঠামোগত সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে শিক্ষার মানের পাশাপাশি শিশুদের বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সাতক্ষীরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. রুহুল আমীন বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার নির্দেশনা অনুযায়ী জেলার সাতটি উপজেলার জরাজীর্ণ ভবনবিশিষ্ট ২৫০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তালিকা ও প্রয়োজনীয় তথ্য পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, পিইডিপি-৫ প্রকল্পের আওতায় এসব বিদ্যালয়ের ভবন পুনর্নির্মাণ হবে বলে আমরা আশা করছি। নতুন ভবন নির্মাণ করা হলে বিদ্যালয়গুলোতে শিশুদের জন্য নিরাপদ ও আনন্দমুখর পরিবেশে পাঠদান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’
দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত সংকটে থাকা বিদ্যালয়গুলোর দিকে এখন তাকিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। তাঁদের প্রত্যাশা, শুধু তালিকা তৈরির মধ্যেই উদ্যোগ সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হবে। নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ পেলে সাতক্ষীরার এসব বিদ্যালয়ের শিশুদের পাঠদানের পরিবেশ যেমন বদলাবে, তেমনি কমবে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও।
(ঢাকা টাইমস/২৯আগস্ট/এসএ)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন











































