তবু হুমায়ূনই আছেন

হাবিবুল্লাহ ফাহাদ
| আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৩:২৩ | প্রকাশিত : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১২:২১

‘অনেকে বলেন, মৃত্যুর পর আপনি শত বছর বেঁচে থাকবেন। আপনার বই আপনাকে বাঁচিয়ে রাখবে। তবে আমি মৃত্যুর পর একদিনও বাঁচতে চাই না। যখন আমিই থাকবো না তখন বেঁচে থেকে লাভ কী?’ একবার এক জন্মদিনের অনুষ্ঠানে কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ এমন মন্তব্য করেছিলেন। উদযাপনের এই আয়োজন হয়েছিল কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগারের শওকত ওসমান মিলনায়তনে।

হুমায়ূন আজ নেই। কিন্তু আছেন। তাঁর সৃষ্টিতে। কথাসাহিত্যে যে ভিত তিনি রচনা করে গেছেন তা সহজে ভেঙে পড়ার নয়। এখনও তিনিই সেরা। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই এই পৃথিবীর মায়া তিনি কাটিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি এতটুকু। বরং দিনকে দিন তাঁর পাঠক বাড়ছে। এখনও বইমেলায় হুমায়ূন আহমেদের বই কিনতে স্টলের সামনে পাঠকের ভিড় চোখে পড়ার মতো। বিকিকিনিতেও গত পাঁচ বছর তার বই এগিয়ে। ধারেকাছে কেউ নেই।

কারণ কী? প্রশ্ন ছিল ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী সুদীপ্তের কাছে। ‘আসলে হুমায়ূন আহমেদের বই যেভাবে পাঠকের মন ও মননে প্রভাব ফেলতে পারে, অন্য লেখকরা তাতে পিছিয়ে আছেন। এটা গল্প বলার ভঙ্গির কারণে। ভাষার সরলতা। বই পড়ে মনে হয়, লেখক কথার ছলে গল্প বলে যাচ্ছেন। এত মোলায়েম ভাষায় কজন লিখতে পারেন বলুন?’

হুমায়ূন আহমেদের বই কারা বেশি কেনেন? স্টলগুলো ঘুরে তরুণ-তরুণীদের সংখ্যাই বেশি মনে হয়েছে। বয়স্ক মানুষরা যেন তাঁর বই কেনেন না, এই ধারণাও ভুল। বরাবরই পাঠক হিসেবে তরুণ-তরুণীর সংখ্যা বেশি। বুড়ো বয়সে বই পড়ার আগ্রহ কিংবা সাধ্য কজনের থাকে? একে তো বয়সের ভার তার ওপর রোগশোকÑ চাইলেই কি শুয়ে বসে বই পড়ার মতো অবস্থা সবার থাকে? আর পড়–য়ার স্বভাব গড়ে ওঠে তরুণ বয়সেই। যে বয়সকে বাঁধা যায় না সময়ের বাঁধনে।

হুমায়ূন আহমেদের লেখার সমালোচকের সংখ্যা হয়তো কম নয়। তিনি বেঁচে থাকতে অনেক সমালোচনা শুনে গেছেন। মৃত্যুর পরও এটা চলছে। চলবেও। কারণ জীবিত হুমায়ূন আহমেদ আর মৃত হুমায়ূন আহমেদ দুজনই সমান শক্তিশালী। এই মূল্যায়ন তাঁর লেখালেখির বিচারে। জনপ্রিয়তার দৃষ্টিতে। সাহিত্যের বোদ্ধারা বলেছেন, বাংলা সাহিত্যে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পর হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শরৎচন্দ্রকেও তিনি ছাড়িয়ে গেছেন এমনটাও বলতে শোনা যায়। এই জনপ্রিয়তা কি এত সহজেই ম্লান হয়ে যাবে? যাবে না।

তাঁর মতো একজন কথাসাহিত্যের জাদুকর যত্তদিন বাংলা সাহিত্যে না আসবেন বোধ হয় তত্তদিন জনপ্রিয়তায় শ্রেষ্ঠত্বের আসন তাঁরই দখলে থাকবে। যার প্রতিফলন এখনও বইমেলা ঘুরলে চোখে পড়ে।’ বলছিলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের শিক্ষক তৌহিদুর রহমান।

এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলা ঘুরে বেশ কয়েকটি প্রকাশনীর স্টলের ভিন্ন সাজ চোখে পড়েছে। হুমায়ূন আহমেদ না থেকেও যে আছেন বোঝা যায় কাকলী প্রকাশনীর স্টল দেখে। স্টলের শিরস্থানে জায়গা পেয়েছে কথাসাহিত্যের জাদুকরের ছবি। এখনও এই প্রকাশনীতে হুমায়ন আহমেদের বইয়ের ক্রেতাদের ভিড় বেশি। অন্যপ্রকাশের স্টলটি সেজেছে একটু ভিন্ন সাজে। বেশ শৈল্পিক ছোঁয়া আছে আয়োজনে। আর আছে হুমায়ূন আহমেদের প্রতিচ্ছবির উপস্থিতি। স্টলে সাজানো বইয়ের সিংহভাগ প্রয়াত এই কথাসাহিত্যিকের। মেলায় আসা পাঠক এখনও শুরুতেই হুমায়ূন আহমেদের বই হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখেন। সময়, অনন্যা, অন্বেষা, মাওলা ব্রাদার্সসহ যারা তাঁর বই ছেপেছেন সবার মন্তব্য অভিন্ন। পাঠকপ্রিয়তায় এখনও হুমায়ূন অতুলনীয়।

হুমায়ূন আহমেদ তাঁর উপন্যাসের অনেক জায়গায় একটি লাইন ব্যবহার করেছেন। ‘পাখি উড়ে যায় ফেলে যায় পালক।’ তিনি আজ নেই। তবুও হুমায়ূনই আছেন। এই থাকাটা পাঠকের হৃদয়ে। একটি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা মেলায় এসেছেন। তাঁর সঙ্গে কথা হয় অন্যপ্রকাশের স্টলে। ‘হুমায়ূন আহমেদ মারা গেছেন এটা আমি বিশ^াস করতে চাই না। তিনি তো আছেন। মেলায় এখনও তাঁর বই পাওয়া যায়। নতুন মলাটের বই দেখলে তাঁর কথা মনে পড়ে। মনে হয় এই যে তিনি আসবেন, অটোগ্রাফ দেবেন। আমি তাঁর চলে যাওয়াটা মনে করতে চাই না।’

তানিয়া সুলতানা। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে পড়েছেন। এখন চাকরি করছেন একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে। মেলায় হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে অভিজ্ঞতা বলছিলেন তিনি। “প্রথম হুমায়ূন আহমেদকে কাছ থেকে দেখি মেলায় এসে। ২০০৮ সালের কথা। তিনি অন্যপ্রকাশ স্টলে বসে অটোগ্রাফ দিচ্ছেন। সামনে শত শত তরুণ-তরুণীর লম্বা সারি। খুব ব্যস্ত। একের পর এক বইয়ে অটোগ্রাফ দিচ্ছেন। মাথা তুলে তাকানোর ফুরসত নেই। জানতে চাইলেন, ‘কী নাম?’ বললাম। তিনি লিখে দিলেন, ‘তানিয়ার জন্য শুভেচ্ছা।’ বইটি আজও যতেœ তুলে রেখেছি। মানুষটাকে মিস করি। মনে পড়লে বইয়ের পাতা উল্টে তাকিয়ে থাকি। বড় অবেলায় চলে গেছেন তিনি।’’

হুমায়ূন সমালোচকদের দৃষ্টিতে তিনি কোনো সাহিত্যিক ছিলেন না। ছিলেন কাহিনিকার। গল্পের ছলে কাহিনি বলে গেছেন। সহজ গদ্যের কারণে পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছেন। অনেকে আবার তাঁকে হালকা ধরনের লেখক বলেছেন। লেখালেখিতে তিনি ঠাট্টা করেন। চটুল। সিরিয়াস সাহিত্যিক বলতে নারাজ অনেকে। কিন্তু তাদের এই অভিযোগ কি পুরোপুরি ঠিক? এটা ঠিক যে তাঁর লেখালেখির একটা বড় অংশ থাকে হাসির খোরাক। তবে তাতে ভাঁড়ামো ছিল না। অনেকটা রাখঢাক রেখে তিনি এমন হাসির খোরাক লেখার পরতে পরতে জুড়ে দেন যে, বলার কিছু থাকে না। লেখকের গল্প বলার ভঙ্গি গম্ভীর হলেও পাঠক হাসতে বাধ্য।

হুমায়ূন আহমেদ তাঁর সৃষ্টি নিয়ে বলেছেন, ‘আমার সাহিত্য পড়লে লোকে আনন্দ পাবে। পড়ার আনন্দটা পাবে এটুকুই বলতে পারি। কিন্তু সে যে পড়ে বিশাল জ্ঞানী হয়ে যাবে, আমি সেটি মনে করি না। বিশাল একটা বোধ তৈরি হবে, সেটাও আমি মনে করি না। আমি লিখে লিখে নিজে আনন্দ পাই এবং এমনভাবে লেখার চেষ্টা করি যাতে করে পাঠক পড়ে আনন্দ পায়। জ্ঞান দেওয়ার কিছু নেই।’

বইমেলায় তখন সন্ধ্যা নেমেছে। পাঠকের আনাগোনা বেশ। অনেক জায়গা নিয়ে মেলা হচ্ছে। যে কারণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষের জন্য খুব একটা ভিড় মনে হচ্ছে না। কাকলী প্রকাশনীর সামনে কথা হয় সুনীতি চাকমার সঙ্গে। তিনি এসেছেন চট্টগ্রাম থেকে। শুধু বইমেলার জন্য। পড়াশোনা করেন চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ে। হুমায়ূনের জনপ্রিয়তা কেন এখনও তুঙ্গে? জানতে চাইলে এই সময়কে এই তরুণী বলেন, ‘যদি প্রশ্ন করি, তাঁর মতো কজন লিখতে পারেন? কী উত্তর দেবেন? তিনি নেই। তাতে হয়তো নতুন কোনো লেখা আমরা পাচ্ছি না। কিন্তু যা লিখে গেছেন তা কি সব আমাদের পড়া হয়ে গেছে? যারা বই পড়তে শিখছে তারাও তো হুমায়ূনের লেখা এড়িয়ে যেতে পারবে না। অন্যরকম এক সম্মোহন আছে। তাঁর বই পড়তে শুরু করলে শেষ না করা পর্যন্ত স্বস্তি পাওয়া যায় না। পাঠককে এতটা গভীরভাবে ধরে রাখতে বর্তমান লেখকরা পারছেন না বলেই হুমায়ূন আহমেদের বিকল্প খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’

এটা ঠিক যে, হুমায়ূন আহমেদের বইগুলো খুব একটা স্বাস্থ্যবান নয়। তিনি স্বল্প পরিসরে উপন্যাস শেষ করে দেন। পাঠকের এই আক্ষেপ অবশ্য পুরোপুরি ঠিকও নয়। পাঠক পড়তে গিয়ে যে জগতে ঢুকে পড়েন সহজে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে চান না। দীর্ঘসময় পথ চলতে চান ভিন্ন জগতে। সেই আকাক্সক্ষা থেকেই অনেকে বোধ হয় বলে থাকেন হুমায়ূন আহমেদ বড় উপন্যাস খুব একটা লেখেননি। তবে এটাও ঠিক, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ বাংলা সাহিত্যের অদ্বিতীয় সৃষ্টি। ‘বাদশা নামদার’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘দেয়াল’ উপন্যাসগুলো কি এত সহজেই ভুলে যাবে পাঠক?

ছোটগল্পে হুমায়ূন আহমেদের মুন্সিয়ানা কে না জানে? এত কম কথায়, কম পরিসরে হৃদয়ে দাগ কাটার মতো গল্প বাংলা সাহিত্যে খুব কম লেখকই লিখতে পেরেছেন। এক একটি গল্প শেষ হলে মনের মধ্যে হাহাকার সৃষ্টি হয়। ইশ্! যদি আরও বড় হতো। তারপরও কী ঘটেছিল? এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উক্তি, ‘শেষ হইয়াও হইলো না শেষ’Ñ উপযুক্ত মন্তব্য। তাঁর গল্পে ওঠে এসেছে নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবন, বিচিত্র আকাক্সক্ষা ও অনুভূতি। চাওয়া-পাওয়ার নানা বিষয়ের পাশাপাশি জীবনের নানা অভিজ্ঞতা বর্ণনা আসছে সরল ভাষায়। আনন্দ, বেদনা, বিষাদের ছোঁয়ায় কখনও কখনও গল্পের চরিত্রগুলো হয়ে ওঠে খুব কাছের মানুষ।

‘এই সব দিনরাত্রি’। গল্পটিতে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তার কাহিনি বলা হয়েছে। অভাব-অনটনে যিনি ক্ষতবিক্ষত। গল্পের প্রণববাবু বকেয়া বেতনের স্কুলশিক্ষক। তিনি ছেলে-মেয়ের সাধ পূরণে অক্ষম। আর্থিক অনটনে বিক্ষত মধ্যবিত্ত বাবা। গল্পে স্কুলশিক্ষক প্রণববাবুর নিয়মিত বেতন হয় না, জ্যাঠার বাড়িতে খাওয়াদাওয়া, সেখানে টাকা দেন অনিয়মিত। চা খাওয়ার অভ্যাস আছে, চা জুটলেও চিনি জোটে না, দুধের প্রশ্নই আসে না। বিপন্ন ছেলে সুবলকে প্রয়োজনে টাকা দিতে পারেন না, টাকা দিতে পারেন না শ্বশুরবাড়িতে অসহায় মেয়ে অজুকে। ‘তাঁর যে মেয়ে কলকাতায় শিবপুরে ছিল, সেও কী একটা ঝামেলায় পড়েছিল। এক হাজার টাকা চেয়ে চিঠি লিখেছিল। ছোট্ট চিঠি, কিন্তু সেই চিঠি পড়ে তিনি সারা রাত ঘুমাতে পারেননি।’ প্রণববাবুর গণিতের হিসাব মিলে গেলেও জীবনের হিসাব মেলে না। গণিতের চেয়েও জীবন দুর্বোধ্য-কঠিন।

‘ফেরা’ গল্পে বাড়ির কর্তা বেশ রাত্রিতে একটি বড় রুই মাছ নিয়ে বাড়ি ফেরেন। দারিদ্র্য জর্জর নিম্নবিত্ত এ পরিবারের প্রতিটি সদস্যের কাছে রাতটি আনন্দময় হয়ে ওঠে- ‘বাসন-কোসন কলতলায় রাখতে গিয়ে হাসিনা অবাক হয়ে দেখে মেঘ কেটে অপরূপ জ্যোৎস্না উঠেছে। বৃষ্টিভেজা গাছতলায় ফুটফুটে জ্যোৎস্না। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। অকারণেই তার চোখে জল এসে যায়।’ এটাও খুব একটি গল্প, বিষয়ও সামান্য। একটা রুই মাছ, একটা ছোট্ট সাধ পূরণ কত সাধারণ এই আখ্যান। অথচ এই সামান্যের ভেতরে যে অসামান্যতা লুকিয়ে আছে, যে গভীর গভীরতর আনন্দ লুকিয়ে আছে, তা হুমায়ূন আহমেদের পক্ষেই দেখা সম্ভব হয়েছে।

‘সৌরভ’, ‘নিশিকাব্য’, ‘জলছবি’, ‘জীবনযাপন’, ‘সুখ অসুখ’ প্রভৃতি গল্পেও যে মায়া তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন তা জুড়িয়ে ফেলে পাঠক মন। তাঁর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গল্পগুলোয় যুদ্ধের ব্যাপারটি সরাসরি আসেনি, বরং এসেছে মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষা ও অর্জন, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ, ত্যাগ-তিতিক্ষার এক সূক্ষ্ম অথচ হৃদয়গ্রাহী বিবরণ; যেমন ‘জলিল সাহেবের পিটিশন’, ‘উনিশ শ একাত্তর’, ‘অসুখ’, ‘শ্যামল ছায়া’ প্রভৃতি। ‘অদ্ভুত গল্প’, ‘ভৌতিক গল্প’, ‘অতিপ্রাকৃত গল্প’ ইত্যাদি গল্প সাহিত্যে নতুন মাত্রা জুড়ে দিয়েছে। ‘ছায়াসঙ্গী’, ‘ভয়’, ‘পিঁপড়া’, ‘সে’, ‘কুকুর’, ‘আয়না’ প্রভৃতি গল্পের উদাহরণ বাংলা গল্পের দীর্ঘ ইতিহাসে খুব সুলভ নয়। ‘খাদক’, ‘চোখ’, ‘অচিন বৃক্ষ’, ‘অয়োময়’, ‘আয়না’, ‘ভয়’, ‘ব্যাধি’, ‘পিশাচ’, ‘গন্ধ’, ‘গুনীন’, ‘অঁহক’ প্রভৃতি গল্পকে কোনো ধাঁচে ফেলে মূল্যায়ন করা সহজ হবে না।

কথার জাদুকরের প্রেমের গল্পগুলো যেন হয়ে উঠেছে বেদনার গল্প, হারানোর গল্প, না-পাওয়ার গল্প। ‘রূপা’, ‘একটি নীল বোতাম’ বা ‘কল্যাণীয়াসু’ অসাধারণ গল্প। ‘ভালোবাসার গল্প’, ‘নন্দিনী’, ‘একজন ক্রীতদাস’, ‘গোপন কথা’, ‘শঙ্খমালা’ ‘অসময়’ ‘পাখির পালক’ প্রভৃতি গল্প পড়লেই বোঝা যাবে, তিনি শেষে এসে পাঠকের মনে বেদনা ছড়িয়ে দিয়েছেন।

একাত্তরে বিপদগ্রস্ত হুমায়ুন আহমেদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন আহমদ ছফা। আহমদ ছফা কোন সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, হুমায়ুন আহমেদের মেধা নিমাই ভট্টাচার্যের সমান। হুমায়ূন আহমেদ বিভিন্ন সময় তার লেখায় আহমদ ছফার প্রসঙ্গ এনেছেন। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুল করেননি বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় এই কথাসাহিত্যিক।

হুমায়ূনের চরিত্ররা

হিমু
‘প্রচ- রোদে নিউমার্কেট এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে যুবক। হাতে একটি সিগারেট। আজ হরতাল। কখন একটি বাস পুড়বে, সেই আগুনে সে সিগারেট ধরাবে!’ এই বিস্ময়কর তরুণটিই হলো হিমু। ‘হিমুর হাতে কয়েকটি নীল পদ্ম’ বইতে এভাবেই একটি ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয়। হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট চরিত্রগুলোর মধ্যে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা চরিত্রের একটি হচ্ছে হিমু। অনেক তরুণ পাঠক হিমু হতে চেয়েছে বই পড়ে। খালি পায়ে পকেটবিহীন হলুদ পাঞ্জাবি পরে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়িয়েছে হিমুর মতো। এভাবে খুব কম লেখকই তাঁর চরিত্রের ছাপ পাঠকের মননে ফেলতে পেরেছেন। যা নব্বইয়ের দশক থেকে হিমুকে দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ করে গেছেন।

হিমু হয়ে ঘুরে বেড়ানো তরুণ প্রজন্ম সম্পর্কে লেখক বলেছিলেন, ‘আমি মজা পাই। আবার দুঃখও পাই আরেক সেন্সে। আমাদের এখানে সাইকিয়াট্রিস্টরা অনেক ওয়ার্ড ব্যবহার করে। আর সেখানে একটি ওয়ার্ড আছে হিমু ওয়ার্ড। তার মানে হিমু হইয়া পাগল হইয়া গেছে। আমার একবার যাইতে হইছিল ওদের কাছে। বাচ্চারা যারা হিমু হইয়া পাগল হইয়া গেছে তাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য। ওদের বোঝানোর জন্য যে, এতে পাগল হওয়ার কিছু নেই। আমি মনে খুবই কষ্ট পেলাম এদেরকে দেখে। এরা হিমু সেজে পাগল হয়ে বসা। আমি ওদেরকে বুঝাইয়া বলতে গেলাম, শোনো এই হিমুগুলো আমার লেখা। কাজেই আমি জানি, এটা ফিকশন। এটা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার কিছু নেই। এরা আমার দিকে এমনভাবে তাকালো যেন আমি কিছু বুঝি না। কিছু জানি না।’

মিসির আলী
মোটা ফ্রেমের ভারী চশমা পরা লোকটি কিছুতেই বিশ্বাস করেন না অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা। যত রহস্যময় ঘটনাই ঘটুক, যুক্তি দিয়ে তার সমাধান খুঁজে নেন। এই যুক্তিবাদী মানুষটির নাম ‘মিসির আলী’। হিমুর ঠিক বিপরীত। হিমু যেমন যুক্তি মানে না, মিসির আলী আবার যুক্তির বাইরে হাঁটেন না। হুমায়ূন আহমেদের তৈরি করা চরিত্রগুলোর মধ্যে ‘মিসির আলী’ই তাঁর সবচেয়ে প্রিয়। ‘হিমু’কে যদি অগোছালো আর যুক্তিতর্কবিরোধী চরিত্রের প্রতীক বলা হয়, মিসির আলী হচ্ছে সম্পূর্ণ তার বিপরীত। মানুষের মন, আচরণ, স্বপ্ন এবং সংকট যুক্তির আলোকে ব্যাখ্যা করাই হলো মিসির আলীর একমাত্র কাজ। তিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘পুনর্জন্ম থাকলে মিসির আলী হয়ে ফিরে আসতাম। কারণ লজিক। মিসির আলী লজিক্যাল লোক। লজিক আমার পছন্দ।’

এছাড়া শুভ্র চরিত্রটিও তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন আপন দক্ষতায়। যে নিজেকে পৃথিবীর সব ধরনের জটিলতা থেকে দূরে রাখতে চায়। দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে ভাবতে চায় না। বাবার বিপুল সম্পদ তাকে টানে না। শুভ্র মোটা ফ্রেমে চশমা পরে বইয়ের জগতে ডুবে থাকতে ভালোবাসে।

মাতাল হাওয়া উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ বলেছেন, কেউ মরতে চায় না। তবুও সবাইকেই মরতে হয়। এত জনপ্রিয়তার উঁচুতে থাকতেও মৃত্যু চিন্তা ভুলে যাননি তিনি। প্রায়ই তাঁর কথায় ওঠে এসেছে বিষয়টি। মানুষ কেন এত কম আয়ু পায়Ñ এ নিয়েও তাঁর আক্ষেপ ছিল। বলেছেন, ‘মৃত্যু নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই। মরে গেলাম ফুরায়া গেল। তবে এটা আমার কাছে খুব পেইনফুল। একটা মানুষ পৃথিবীতে এতো ক্ষমতা নিয়ে আসে, ৭০ বা ৮০ বছর বাঁচে। তারপর শেষ। আর একটা কচ্ছপ সাড়ে তিনশ বছর বাঁচে। হোয়াই? কচ্ছপের মতো একটা প্রাণীর এতো বছর বাঁচার প্রয়োজন কী?’ তবে ছোট হলেও জীবনের গুরুত্ব সম্পর্কেও বলে গেছেন। ‘জীবন অনেক, অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার।’ তারাশঙ্করের কবি’র মতো মাঝে-মধ্যে আমার বলতে ইচ্ছে করে, ‘জীবন এত ছোট ক্যান?’

আসলেই ৬৪ বছরের এত ছোটজীবন তাঁর জন্য যথেষ্ট ছিল না। তিনি বড় অবেলায় চলে গেছেন। অনেক দেওয়ার ছিল। পাঠকের নেওয়ারও ছিল বেশ। তবে তাঁর চলে যাওয়ার পর জাদুকরী সৃষ্টির চাকা বন্ধ হয়ে গেছে ঠিক, কিন্তু যেটুকু তিনি ছড়িয়ে গেছেন তা কি ফুরাবে সহজে? শতবর্ষ পরেও হুমায়ূন আহমেদের পাঠকপ্রিয়তা কমবে না। তা না হলে শরৎচন্দ্রের মতো জনপ্রিয় লেখকের ‘দেবদাস’ শতবর্ষ পরে এসেও সমান জনপ্রিয় থাকতো না।

ব্যক্তিগতভাবে হুমায়ূন আহমেদ মনে করতেন, মরে গেলে তিনি মাটিতে মিশে যাবেন। এটুকুই। অস্তিত্ব থাকবে না। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘দ্য মোমেন্ট আই উইল ডাই-আমি মাটির সঙ্গে মিশে যাবো।’ হয়তো মাটির সঙ্গে তার মাটির গড়া শরীরের প্রণয় হতে সময় লাগেনি। সময় লাগেনি এক হয়ে মিশে যেতে। কিন্তু পৃথিবীর বুকে মায়া-ভালোবাসার যে বীজ বুনে গেছেন তা সহজে হারিয়ে যাবে না। কথাসাহিত্যের গোলাপ কাননে সুবাস ছড়াবে অনন্তকাল।

হাবিবুল্লাহ ফাহাদ : সাংবাদিক ও লেখক

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত