‘হেভিওয়েটের জেলায়’ লড়াই তুঙ্গে

বদরুল ইসলাম বিপ্লব
 | প্রকাশিত : ২৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৯:১৮
ঠাকুরগাঁও-১: বামে প্রচারণায় আ.লীগের রমেশচন্দ্র সেন, ডানে বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

উত্তরের সীমান্তঘেঁষা জনপদ ঠাকুরগাঁওয়ের দিকে এবার দৃষ্টি থাকবে রাজনীতি সচেতনদের। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই জেলার একটি আসন থেকে লড়ছেন। আওয়ামী লীগের ঘাঁটিতে তিনি একবার জয় ছিনিয়ে এনেছিলেন ২০০১ সালে।

জেলার অন্য দুটি আসনের একটিতে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত এবং একটিতে মহাজোটের ওয়ার্কার্স পার্টি, আওয়ামী লীগের দুই বিদ্রোহী, জাতীয় পার্টি ও বিএনপির প্রার্থী নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিল সমীকরণ।

ঠাকুরগাঁও-১

এই দুই ডাকসাইটে নেতা আছেন ভোটের লড়াইয়ে। নৌকা নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী দলের সভাপতিম-লীর সদস্য সাবেক পানি সম্পদমন্ত্রী রমেশচন্দ্র সেন। ধানের শীষ নিয়ে নেমেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এখানে কেউ কারো চেয়ে কম নয়।

আসনটি বরাবরই আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ২০০১ সালে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার পর একবারই জেতেন ফখরুল। বরে পরের নির্বাচনেই ৫৭ হাজারেরও বেশি ভোটে হারেন তিনি।

দুই নেতার লড়াই এরই মধ্যে জমে উঠেছে। ১১ ডিসেম্বর ভোটের প্রচারের দ্বিতীয় দিনে মির্জা ফখরুলের গাড়িবহরে হামলার অভিযোগ ওঠার পর কয়েকদিন এলাকায় উত্তেজনা ছিল। তবে পরে স্তিমিত হয়ে আসে।

দুই প্রার্থীই জমজমাট প্রচার চালিয়ে এলাকায় ভোট চেয়েছেন। আর কার অবস্থান ভালো সেটি বোঝার উপায় নেই। যদিও দুই পক্ষই সহজ জয়ের প্রত্যাশায়।

এই আসনে চার লাখ ২১ হাজার ভোটারের মধ্যে এক লাখ ২০ হাজারের বেশি হিন্দু এবং পাঁচ হাজারের বেশি আদিবাসী ভোটার সব সময় নির্বাচনে প্রভাবক হিসেবে দেখা দেয়। তারা আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবেই পরিচিত। রমেশ চন্দ্র সেন নিজেও হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্য হওয়ায় তিনি এই ভোট পেতে খুবই আত্মবিশ্বাসী।

মির্জা ফখরুলও ভোটের প্রচারে হিন্দুদের প্রতি আহ্বান রেখে নানা বক্তব্য রেখেছেন। বলেছেন, তার ওপর আস্থা রাখতে। বলেছেন, তারা ক্ষমতায় এলে সবাই ভালো থাকবে। 

রমেশ চন্দ্র গত দুই মেয়াদে এলাকায় যা যা করেছেন তা তুলে ধরে নৌকায় ভোট চাইছেন। তিনি সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পাড়া-মহল্লায় উঠান বৈঠক ও জনসভা করেছেন।

শুরুতে রমেশকে নিয়ে দলের একাংশের আপত্তি থাকলেও পরে বিভেদ মিটিয়ে নৌকার পক্ষে নেমেছে সবাই।

মির্জা ফখরুল এই আসনটি ছাড়াও বগুড়া-৬ আসনেও প্রার্থী হয়েছেন। ওই আসনে বিএনপিনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচন করতেন। সেটি দলটির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হওয়ায় ফখরুলের জয়ের ব্যাপারে সংশয় নেই বললেই চলে। তারপরও নিয়মিত তিনি যাচ্ছেন সেখানে।

দুটি আসনে প্রার্থী হওয়ায় প্রভাব পড়েছে ঠাকুরগাঁওয়ে। তিনি কখনো নিজ এলাকায়, কখনো যাচ্ছেন বগুড়ায়। ফখরুলের অনুপস্থিতিতে তৈরি হওয়া শূন্যতা ঢাকছেন তার স্ত্রী রাহাত আরা বেগম, ছোটভাই মির্জা ফয়সাল আমীন এবং মেয়ে মির্জা শামারুহ। দেশে গণতন্ত্র নেই দাবি করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, মানুষের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলে ভোট চাইছেন।

জেলা বিএনপির সভাপতি তৈমূর রহমানের অভিযোগ, পুলিশ তাদের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করায়, ভয়ে অনেক নেতাকর্মী ঠিকমতো প্রচারে অংশ নিতে পারছে না।

ঠাকুরগাঁও-২

বালিয়াডাঙ্গী, হরিপুর ও রাণীশংকৈল উপজেলার একাংশ নিয়ে গঠিত আসনটিতে নৌকার প্রার্থী দবিরুল ইসলাম জিতেছেন টানা ছয়বার। এবার সেটি সাতে নিতে চান তিনি।

দবিরুলের পক্ষে নেতাকর্মীরা নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। নৌকার পোস্টারে ছেয়ে গেছে এলাকা। ভোট প্রার্থনা চলছে গানে গানে।

এভানে ধানের শীষের প্রার্থী জামায়াত নেতা আব্দুল হাকিম নাশকতার মামলায় ১ নভেম্বর থেকেই কারাগারে। তার পক্ষে প্রচার চলেছে অনেকটাই চুপিসারে। করা হয়নি নির্বাচনী অফিস।

ভোটের প্রচার চলাকালে এই আসনে জামায়াত ও বিএনপির প্রায় ৭০ জন নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন। এরপর চুপসে যায় নেতাকর্মীরা। ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে মাইকিং শোনা যায়নি।

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক টি এম মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমরা একদিকে আওয়ামী লীগের এবং অন্যদিকে পুলিশি ঝামেলায় নির্বাচনী মাঠে নামতে পারছি না। সে কারণে প্রকাশ্যে নির্বাচনী মিছিলও করা যায় না। পোস্টার লাগালে ছিঁড়ে ফেলছে প্রতিপক্ষের লোকজন।’

জানতে চাইলে দবিরুল বলেছেন, ‘জামায়াতের প্রার্থী কারাগারে থাকায় তার পক্ষে মাঠে কাজ করার কেউ নেই, পোস্টার লাগানোরও কেউ নেই। তারা পোস্টার না লাগালে আমরা কি তাদের পোস্টার লাগিয়ে দেব?’

দবিরুল ১৯৮৬ সালে সিবিপির প্রার্থী হিসেবে নৌকা নিয়ে জেতেন। পরে যোগ দেন আওয়ামী লীগে। এরপর ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে জেতেন।

ঠাকুরগাঁও-৩

পীরগঞ্জ ও রাণীশংকৈল উপজেলার একাংশ নিয়ে গঠিত আসনটিতে এবার মহাজোট বেকায়দায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহের কারণে। মহাজোটের পক্ষ থেকে নৌকা দেওয়া হয়েছে জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির  ইয়াসিন আলী। তিনি দশম সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী।

২০০৮ সালেও আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ। কিন্তু ১৯৯৬ সালে জয়ী আওয়ামী লীগের নেতা ইমদাদুল হক তাকে না মেনে প্রার্থী হয়েছেন মোটর গাড়ি প্রতীক নিয়ে। ক্ষমতাসীন দলে বিদ্রোহী আরও একজন গোপাল চন্দ্র রায়। মার্কা সিংহ। জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য ইমদাদুল হকও লড়ছেন লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে।

মহাজোটের প্রার্থী ইয়াসিন আলী নৌকা নিয়ে লড়লেও তার পক্ষে নেই আওয়ামী লীগ বা সহযোগী সংগঠন। তারা সবাই ইমদাদুলের পক্ষে। ইয়াসিন প্রচারে নেমে হামলার শিকারও হয়েছেন। পীরগঞ্জ উপজেলার লোহাগাড়া বাজারে তার প্রচার কেন্দ্রে আগুন দেওয়া হয়েছে। ইয়াসিন আলী এ নাশকতার জন্য ইমদাদুলের সমর্থকদের দায়ী করেছেন।

দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে ইমদাদুল চলে বেড়াচ্ছেন এলাকা। তিনি জয়ের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী। আওয়ামী লীগ নেতা ও হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সহসভাপতি গোপাল চন্দ্র রায়ের সিংহ মার্কাও মহাজোটের প্রার্থী ইয়াসিনের জন্য বিপত্তির কারণ।

২০০১ ও ২০০৮ সালে জয়ী জাতীয় পার্টির সভাপতিম-লীর সদস্য হাফিজ উদ্দীন আহম্মদও ছাড় দিচ্ছেন না। আর মহাজোটের চারজন প্রার্থীর ভোট ভাগাভাগিকে সুযোগ হিসেবে দেখছেন বিএনপির জাহেদুর রহমান জাহিদ। প্রথমবারের মতো জয় ছিনিয়ে আনতে একে সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

২০০৮ সালে ৪৬ হাজার ৫৪৫ ভোট পেয়ে মহাজোটের প্রার্থী হাফিজ উদ্দীন আহম্মেদের কাছে এক লাখ ১৩ হাজার ৫৬২ ভোটে হারেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :