সিজার: প্রয়োজন কতটা?

হাবিবুল্লাহ ফাহাদ, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ০৭ জুলাই ২০১৯, ১১:০১

রাজধানীর একটি নামকরা হাসপাতালে গিয়েছিলেন মাসুদ দম্পতি। মাসুদের স্ত্রী নিলুফার (ছদ্মনাম) আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। সন্তান প্রসবের বিষয়ে পরামর্শ করলে চিকিৎসক বলেন, ‘কোনটা চান? নরমাল না সিজার?’

নিলুফার স্বাভাবিক প্রসবের আগ্রহ দেখালে চিকিৎসক বলেন, ‘ব্যথা ওঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তীব্র ব্যথা। সহ্য করতে হবে।’

৯ মাস পূর্ণ করে ওই দম্পতি আবার হাসপাতালে গেলে চিকিৎসক জানান, বাচ্চার অবস্থা এখনো ভালো আছে। চাইলে সিজার করে বের করে দেওয়া যাবে। আর নরমাল চাইলে ব্যথার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

মাসুদ দম্পতি দ্বিধায় পড়ে যান। বলেন, ‘কোনটা ভালো হবে?’

চিকিৎসক বলেন, ‘আমি তো বলবো বাচ্চা বের করে নিলেই ভালো। এখনো অবস্থা ভালো। পরে যদি কোনো সমস্যা হয়, তখন বাচ্চার ঝুঁকি থাকবে।’

চিকিৎসকের কথা শুনে নিলুফারের মুখ শুকিয়ে আসে। তবে সিজার-পরবর্তী শারীরিক ধকলের কথা চিন্তা করে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে চান। কিন্তু চিকিৎসক বলেন, ‘হাজার হাজার মানুষের সিজার হচ্ছে। সমস্যা হলে কি কেউ করতো? বাচ্চার অবস্থা এখনো ভালো আছে। সিজার করে বের করে দিই।’ নিরুপায় মাসুদ দম্পতি শেষমেশ সিজারের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।

একটা সময় ছিল স্বাভাবিক প্রসবে শিশুর জন্ম বেশি হতো। বাসাবাড়িতে ধাত্রীদের হাতে সন্তান জন্ম নিতো। দিন যত যাচ্ছে এই চিত্র বদলাচ্ছে। এখন স্বাভাবিক প্রসবের গ্যারান্টি খুবই কম। চিকিৎসকরা শুরু থেকে রোগীদের সিজারে উদ্বুদ্ধ করেন। স্বাভাবিক প্রসব করতে চাইলে কী ধরনের প্রস্তুতি থাকা দরকার বা চলাফেরা কেমন হওয়া উচিত তা নিয়েও কোনো দিকনির্দেশনা দেন না তারা।

অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকের বলার ভঙ্গি বা অনাগ্রহের কারণে স্বাভাবিক প্রসব গর্ভবতী মায়ের জন্য অসহনীয় ব্যথাদায়ক বলে মনে হয়। পরিবারের স্বজন ও চিকিৎসকের ভীতিকর কথাবার্তায় প্রসূতি নিজেই স্বাভাবিক প্রসবে ভয় পান। সিজারের সিদ্ধান্ত নেন।

তবে শারীরিক জটিলতার কারণে প্রসবে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে। মা ও শিশুর জীবনের ঝুঁকি থাকলে তখন সিজার করতে হয়। কিন্তু এর বাইরেও একশ্রেণির বাণিজ্যমুখী চিকিৎসক ও ক্লিনিকগুলো বেশি অতিরিক্ত টাকার আশায় প্রসূতিকে সিজারে উদ্বুদ্ধ করেন।

সাধারণত স্বাভাবিক প্রসবের পর একজন মা একদিন পরেই হাসপাতাল ছাড়তে পারেন, যদি তিনি এবং সন্তান সুস্থ থাকে। কিন্তু অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম নিলে মা ও শিশু দুজনকেই কমপক্ষে তিনদিন হাসপাতালে থাকতে হয়। তার ওপর সিজারিয়ান শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকিও স্বাভাবিক শিশুর চেয়ে বেশি। চিকিৎসকরা বলেন, স্বাভাবিক প্রসবে জন্ম নেওয়া শিশুর চেয়ে সিজারিয়ান শিশুর বুদ্ধিমত্তা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম।

অপ্রয়োজনীয় সিজার ঠেকাতে হাইকোর্টও নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে। এ জন্য একটি নীতিমালা করার কথাও বলেছে উচ্চ আদালত। কারণ দিন যত যাচ্ছে সিজারের হার তত বাড়ছে। উচ্চ আদালতে করা একটি রিটে বলা হয়েছে, গত বছর দেশের হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে ৭৭ শতাংশ অপ্রয়োজনীয় সিজার করা হয়েছে, যা আশঙ্কাজনক।

২০১৭ সালে সরকারি এক জরিপে দেখা গেছে, দেশে স্বাভাবিক প্রসব ৬২ দশমিক ১ শতাংশ আর সিজারিয়ান ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং অন্যান্যভাবে ২ দশমিক ৫ শতাংশ সন্তানের জন্ম হয়।

ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে বা বিডিএইচএস-এর তথ্য অনুসারে, ‘২০০৪ সালে সিজারের মাধ্যমে সন্তান হতো ৪ শতাংশ, ২০০৭ সালে তা বেড়ে হয় ৯ শতাংশে। ২০১১ সালে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ শতাংশে। আর ছয় বছরে এই সংখ্যাটি বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।’

অথচ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, একটি দেশে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব হার ১০-১৫ শতাংশের মধ্যে থাকা উচিত।

আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিজারিয়ানের কারণে প্রাকৃতিক জন্মের লাভজনক দিকগুলোও নষ্ট হতে পারে। যেমনÑ শিশু মায়ের প্রসবের পথ দিয়ে যদি স্বাভাবিকভাবে বের হয় তাহলে তার শরীর কিছু ভালো ব্যাকটেরিয়া গ্রহণ করতে পারে। এসব ব্যাকটেরিয়া শিশুর রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। কিন্তু অস্ত্রোপচারের ফলে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সে যেতে পারে না। এছাড়া মায়ের বুকের দুধ পান করার জন্য মায়ের সঙ্গে শিশুর যে শারীরিক নৈকট্যে আসা দরকার, সিজারিয়ান হলে সেটি প্রয়োজনের তুলনায় দেরিতে ঘটে।

সিজারের হার কমাতে হাইকোর্টের নির্দেশনা মেনে এখনই সময়োপযোগী নীতিমালা করা প্রয়োজন। শুধু বাণিজ্যের আশায় যেসব হাসপাতালে সিজার করা হচ্ছে তাদের শনাক্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। সিজার একজন মায়ের শারীরিক সক্ষমতা কমিয়ে ফেলে। মায়ের স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে যায়। নানা ধরনের ব্যথা-বেদনা ও অস্বস্তি নিয়ে বাকি জীবন তাকে বেঁচে থাকতে হয়। একশ্রেণির মানুষের অতি অর্থলিপ্সা বিপুল সংখ্যক মানুষের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

স্বাভাবিক প্রসবের হার বাড়লে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি কমে আসবে। শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত হবে। কমবে প্রসব সংক্রান্ত ব্যয়ও।

(ঢাকাটাইমস/০৭জুলাই/এইচএফ/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :