ভবনে লার্ভার স্রোতে জরিমানার ঢেউ

এক মাসে ঢাকা উত্তরে আদায় ৫০ লাখের বেশি, ঢাকা দক্ষিণের ৩০ লাখ। আবাসিক ভবনে সাঁটানো হচ্ছে স্টিকার, দ্বিতীয়বার লার্ভা মিললে হবে জরিমানা

কাজী রফিক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২২ আগস্ট ২০১৯, ১২:০১ | প্রকাশিত : ২২ আগস্ট ২০১৯, ১১:৫৬

ডেঙ্গু জ্বরের ব্যাপক বিস্তারের মধ্যে এর সম্ভাব্য প্রজননক্ষেত্রগুলোকে চিহ্নিত করার পাশাপাশি দায়ীদের শাস্তি দিতেও শুরু করেছে নগর কর্তৃপক্ষ। গত এক মাসের অভিযানে দুই সিটি করপোরেশন অন্তত ৮০ লাখ টাকা জরিমানা করেছে।

নগর কর্তৃপক্ষ আশা করছে, এই অভিযান এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রের বিষয়ে নগরবাসীকে সচেতন করবে এবং এর ফলে ঝুঁকি কমে আসবে। যেসব স্থাপনায় জরিমানা করা হয়েছে তার মধ্যে আবাসিক ভবন নেই বললেই চলে। সেখানকার বাসিন্দাদের সতর্ক ও সচেতন করা হচ্ছে মূলত।

জরিমানা করা হয়েছে, এর মধ্যে সিংহভাগ নির্মাণাধীন স্থাপনা। এর বাইরে হাসপাতাল, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, সুপার শপেও দেখা গেছে এডিসের বংশবিস্তারের উপযোগী পরিবেশ। বাণিজ্যিক ও নির্মাণাধীন ভবনের মালিক বা ব্যবস্থাপনায় জড়িতদের আনা হচ্ছে শাস্তির আওতায়। একাধিক ব্যক্তিকে কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। তবে সরকারি স্থাপনায় অভিযান তুলনামূলক কম, আর সেখানে লার্ভা মিললে জরিমানার উদাহরণও পাওয়া যাচ্ছে না।

সিঙ্গাপুর এবং কলকাতার মতো শহরেও বাসাবাড়িতে গিয়ে নগর কর্তৃপক্ষের পরিদর্শন এবং ব্যবস্থা নেয়ার নজির আছে। তবে এতদিন বাংলাদেশে আইন থাকলেও বিষয়টির প্রয়োগ ছিল না।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মমিনুর রহমান মামুন ঢাকাটাইমসকে এই অভিযানের বিষয়ে বলেন, ‘আমরা অনেক বাসায় গিয়েছি, সেখানে আমাদের গুরুত্বই দেওয়া হয়নি। আবার কিছু বাসায় গিয়ে দেখেছি, সেখানকার বাসিন্দারা নিজেরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে সবকিছু পরিষ্কার করে রেখেছে। আমরা আশা করি, জনগণ তার নিজের সমস্যাটা বুঝবে এবং সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি নিজেরাও সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসবে।’

‘আমি কিছু করব না, আমি সিটি করপোরেশনকেও সহযোগিতা করব না, এটা তো হতে পারে না। আমাদের যে অ্যাকশন বা আইনগুলো আছে, সেগুলো নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। অনেকেই তার বাসায় দেখলাম লার্ভা, কিন্তু তারা সেটা আমলে নিচ্ছে না।’

অন্য মশার সঙ্গে এডিস ইজিপ্টি মশার আচরণগত পার্থক্য আছে। এই মশাগুলো প্রধানত ঘরোয়া পরিবেশে থাকতে পছন্দ করে। আর ভবনের ভেতর বা আশপাশে বিভিন্ন স্থানে যেখানে পানি জমতে পারে সেখানে ডিম পারে। অবশ্য বাইরেও বিভিন্ন এলাকা যেমন পরিত্যক্ত টায়ার, বোতল, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত গাড়ির ভাঙা অংশ বা এমন কোনো পাত্র থাকে, যেখানে স্রোত থাকে না, সেখানে ডিম পারে মশাগুলো।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের প্রধান কীটতত্ত্ববিদ ভুপেন্দর নাগপাল গত ৫ আগস্ট ঢাকায় এক সেমিনারে এডিসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কার্যকর কিছু কৌশল বলে গেছেন। তিনি বলেছেন, ফগার মেশিনে রাস্তা বা উন্মুক্ত জায়গায় কীটনাশক ছিটিয়ে এডিস মশা মারার আশা কেবলই ‘মিথ’।

‘এ মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করাটাই আসল। সাধারণ মানুষের কাছে একটা সহজ বার্তা আমাদের পৌঁছে দিতে হবে। তা হলো আপনার বাড়ি সপ্তাহে অন্তত এক ঘণ্টা পরিষ্কার করুন।... ডেঙ্গুর সব প্রজননস্থল আমাদের ধ্বংস করতে হবে।’

‘তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাসার কোথাও যেন এক ফোঁটা পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বাসাবাড়িতে জমে থাকা পানির উৎস বন্ধ করতে পারলেই এডিসের প্রজনন বন্ধ করা সম্ভব।’

এই কীটতত্ত্ববিদ জানিয়েছেন, মানুষের ঘরবাড়ির বাইরে সরকারি অফিস, হাসপাতাল, পরিত্যক্ত গাড়ি, বিমানবন্দরের চৌবাচ্চা বিশেষ করে নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানি বিপজ্জনক। আবাসিক, বাণিজ্যিক বা অফিস আদালতের পাশাপাশি নির্মাণাধীন ভবনে নজর দিলেই পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসা সম্ভব বলেও জানিয়েছেন এই কীটতত্ত্ববিদ।

এর মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মশা মারতে নতুন ওষুধ আমদানির পাশাপাশি এডিসের সম্ভাব্য প্রজননক্ষেত্রগুলো পরিচ্ছন্ন করার দিকে নজর দিচ্ছে। বিভিন্ন ভবনের পাশাপাশি লোকালয়ের আশপাশে অবহেলার কারণে পাত্রে পানি জমে থাকে- এমন স্থান চিহ্নিত করার পাশাপাশি জরিমানাও করছে তারা।

ঢাকা উত্তরের অভিযানে জরিমানা বেশি

জরিমানায় এগিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। গত রবিবার থেকে ‘চিরুনি অভিযান’ শুরু হয়েছে তাদের। তবে ভবন পরিদর্শনে আবার এগিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।

গত ২৪ জুলাই থেকে শুরু হওয়া অভিযানে এখন ২৯ দিনে ঢাকা উত্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তারা পরিদর্শন করেছেন এক হাজার ৮০০-এর বেশি স্থাপনা। এর মধ্যে ১৩৩টি স্থানে এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত হয়।

গতকালের আগ পর্যন্ত এসব স্থাপনার মালিকদের ৪৮ লাখ ২৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আর গতকাল জরিমানা করা হয় আরও দুই লাখ টাকা।

আবাসিক ভবনে ঢাকা উত্তর আরও একটি কাজ করছে। যেখানে বিপজ্জনক পরিস্থিতি পাওয়া গেছে, সেখানে লাল স্টিকার সাঁটানো হচ্ছে। এতে লেখা হয়েছে, ‘সাবধান, এই বাড়িতে মশার লার্ভা পাওয়া গিয়াছে।’

নগর কর্তৃপক্ষ আশা করছে, ভবনের বাসিন্দারা এতে সতর্ক হবে। আর দ্বিতীয় দফা অভিযানে আবার একই চিত্র পাওয়া গেলে করা হবে জরিমানা। আর এই এক মাসে বাণিজ্যিক ও নির্মাণাধীন ভবনে পরিস্থিতির বিবেচনায় ১৩৯ জনের বিরুদ্ধে মামলাও করে ঢাকা উত্তর। আর ১৩৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডও দেওয়া হয়েছে।

যারা অভিযান চালাচ্ছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জরিমানা করেছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাজিদ আনোয়ার। তিনি ১৪২ স্থানে গিয়ে ৩১টিতে মশার লার্ভা শনাক্ত করেছেন। জরিমানা করেছেন সর্বমোট ২৬ লাখ টাকা।

ডিএনসিসির অঞ্চল-১ এর নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম ফকির ১৫৮ স্থানে অভিযান করেন। এর মধ্যে আটটিতে মশার লার্ভা পাওয়া যায়। ১২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা জরিমানা আদায় হয়। মশার লার্ভা পাওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতাল এবং একই এলাকার ল্যাবএইড হাসপাতাল।

৩১৩ স্থানে অভিযান করে ৩১টি স্থাপনায় মশার লার্ভা পেয়েছেন আরেকজন নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনি মালিকদের ৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন।

অঞ্চল-২ এর নির্বাহী কর্মকর্তা শফিউল আজম ২৮৪ স্থানে অভিযান চালিয়ে ২৩ জায়গায় লার্ভা পাওয়া যায়। জরিমানা আদায় হয় তিন লাখ ৭২ হাজার টাকা।

অঞ্চল-৩ এর নির্বাহী কর্মকর্তা হেমায়েত হোসেন ২২৪ স্থানে অভিযান চালিয়ে ১৮ জায়গায় মশার লার্ভা পান। তিনি জরিমানা করেন তিন লাখ টাকা।

অঞ্চল-৪ এর নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহা বিনতে সিরাজ ৩২২ স্থানে অভিযান চালিয়ে আটটি স্থাপনায় লার্ভা পান। জরিমানা আদায় হয় ৯৫ হাজার টাকা।

একটি সুপারসহ ১০ স্থানে অভিযান পরিচালনা করে দুটিতে লার্ভা পেয়েছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল হামিদ মিয়া। তিনি দুই লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন তিনি।

একই পরিমাণ স্থাপনায় অভিযান পরিচালনা করে একটিতে লার্ভা পান আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা সগীর হোসেন। এ সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন ভবন মালিককে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

ডিএনসিসির অঞ্চল-৫ এর নির্বাহী কর্মকর্তা মীর নাহিদ আহসান জরিমানার পাশাপাশি আরও ৩২ প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ পাঠান।

আবাসিক ভবনে জোর বেশি ঢাকা দক্ষিণের

ঢাকা দক্ষিণের জনসংযোগ কর্মকর্তা উত্তম কুমার ঢাকা টাইমসকে জানান, তাদের সংস্থার পক্ষ থেকে বাসাবাড়িতে গিয়ে লার্ভা ধ্বংসে নজর দেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৫৮ হাজার ৭৪৮ বাড়িতে অভিযান চালানো হয়েছে। এগুলোর মধ্যে এক হাজারের বেশি বাড়িতে লার্ভা পাওয়ার পর তা ধ্বংস করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ভবনের বাসিন্দাদের এ বিষয়ে সতর্ক ও সচেতন করা হচ্ছে। এই অভিযানে জরিমানা আদায় করা হয়েছে প্রধানত বাণিজ্যিক ভবন ও নির্মাণাধীন স্থাপনায়। এ ছাড়া স্কাউটস সদস্যরা এক লাখ ১১ হাজার বাসাবাড়িতে সচেতনমূলক লিফলেট বিতরণ করেছে।

ঢাকাটাইমস/২২আগস্ট/কারই/ডব্লিউবি/এমআর

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :