শশীকাহন: পৌরাণিক উপাখ্যান: ফ্যান্টাসি থ্রিলার সিরিজ,পর্ব- ছয়

ড. রাজুব ভৌমিক
 | প্রকাশিত : ২৫ আগস্ট ২০১৯, ২১:১৫

কন্ঠী দ্বীপ ছেড়ে দেবী আজ্রিয়া ও যুবরাজ নিম্ব চলে যায়। যাদুকর শশীরা এখন সাধারণ শশীদের সাথে মিশতে পারবে। তারা তাদের যাদুশক্তি পুনরায় ফিরে পেয়েছে। সবাই যুবরাজ নিম্বের ও দেবী আজ্রিয়ার জয়গান করছে। এদিকে আকাশ পথে ভ্রমণ করার কিছুদিন পর যুবরাজ নিম্ব ও দেবী আজ্রিয়া লাগগিন্তা রাজ্যে পৌঁছে যায়। রাজপ্রাসাদে মহারাজ শশাঙ্ক ও রানী কুর্নষা তাদের ফিরার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। গত কয়েক মাসে মহারাজ শশাঙ্কের আবার শারীরিক অবস্থার বেশ অবনতি হয়। তাই তার ইচ্ছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তার পুত্র নিম্বের সাথে দেবী আজ্রিয়ার বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করবে। এরপর যুবরাজ নিম্বের রাজ্যাভিষেক করবে। 

রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করে যুবরাজ নিম্ব প্রথমে যুবরাজ মঞ্জটকে প্রধান ফটকের সামনে দেখে। তাকে দেখা মাত্র যুবরাজ নিম্ব সানন্দে বুকে জড়িয়ে ধরে। যুবরাজ মঞ্জট জানে না যে যুবরাজ নিম্ব তার আপন ভাই নয়। তা না জানা স্বত্তেও সে নিম্বকে ছোট বেলা থেকে একদম সহ্য করতে পারত না। সব সময় নিম্বের ক্ষতি কামনা করত। যুবরাজ নিম্ব মঞ্জটকে কার প্রাণের অধিক ভালবাসত। যুবরাজ মঞ্জটের শত দোষ ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখত। ‘মঞ্জট মনে হয় তোকে কতদিন দেখেনি। তোকে দেখে আমার আজ প্রাণটি ভরে গেল রে।’ যুবরাজ নিম্ব বলল। এদিকে মঞ্জটের বুকের জ্বালা যেন আর একটু বেড়ে যায়। 

মঞ্জটের খুব সহজেই তার নিজের আসল মনোভাব লুকাতে পারে। যুবরাজ নিম্বকে দেখে মঞ্জট একদম সহ্য করতে পারছে না। কিন্তু সেটা না প্রকাশ করে মঞ্জট বলল, ‘ভ্রাতাশ্রী, আমার প্রণাম নিবেন। গত কয়েকদিন আপনার বহু মহৎ কর্ম সম্পর্কে শুনেছি।’ এই বলে মঞ্জট যুবরাজ নিম্বের কন্ঠী দ্বীপের কাহিনী ও রাক্ষসের কাহিনী প্রসংশা করে বলল। তখন যুবরাজ নিম্ব ভাবতে লাগল কি করে যুবরাজ মঞ্জট তার এ খবরগুলো এত তাড়াতাড়ি জেনে যায়। মঞ্জট হঠাৎ তার ভুল বুঝতে পারে। সে এ খবর গুলো জানার কারণ হচ্ছে যুবরাজের পিছনে তার নিজস্ব গুপ্তচর লেলিয়ে দেয়া। যুবরাজ নিম্ব যাতে কিছু বুঝতে না পারে তাই হঠাৎ মঞ্জট বলল, ‘ভ্রাতাশ্রী, ভাল কাজ কেউ কখনো লুকাতে পারে না। আচ্ছা ওসব বাদ দেন। আপনার সাথে দেবী আজ্রিয়ার বিবাহ অনুষ্ঠানে অনেক আনন্দ ফুর্তি করব। আমার কিন্তু আপনার কাছ থেকে একটি উপহার চাই।’ 

‘ও আচ্ছা, তাই নাকি? ঠিক আছে আমার কাছ থেকে কি উপহার হিসেবে চাস? কথা দিলাম দিব।’ যুবরাজ নিম্ব হাসতে হাসতে বলল। ‘ভ্রাতাশ্রী, আমি আপনার কোমরে রাখা প্রিয় ছোট্ট চুরিটি উপহার হিসেবে চাই। আমি জানি এ চুরিটি আপনার অনেক প্রিয়, ভ্রাতাশ্রী। তাই আমি এই চুরিটি চেয়েছি। এ চুরিটি আমার কাছে স্মৃতি হিসেবে সবসময় রাখতে চাই। কারণ এ চুরিটি আমার কাছে থাকলে আমার মনে হবে আপনি আমার সাথে সবসময় আছেন।’ মঞ্জট বুদ্ধি করে বলল। যুবরাজ নিম্ব তার ছোট্ট ভাইয়ের আবদার শুনে আর না বলতে পারলেন না। আর দেরি না করে তখুনি যুবরাজ নিম্ব তার কোমর থেকে চুরিটি নিয়ে তার ছোট ভাই মঞ্জটের হাতে তুলে দেয়। ‘এই নে দিলাম তোকে। আশীর্বাদ করি চুরিটি যেন তোর জীবনে মঙ্গল বয়ে আনে।’ এই বলে যুবরাজ নিম্ব তার কক্ষে চলে যায়। দেবী আজ্রিয়া অনেক আগেই তার কক্ষে চলে গেছে। 

দেবী আজ্রিয়া ও যুবরাজ নিম্ব রাজপ্রাসাদে তাদের নিজ নিজ কক্ষে বিশ্রাম নিচ্ছে। বহুদূর আকাশপথে ভ্রমণ করে তারা এখন ভীষণ ক্লান্ত। সন্ধ্যা বেলায়  রাজরক্ষীর মাধ্যমে মহারাজ শশাঙ্ক যুবরাজ নিম্ব ও দেবী আজ্রিয়াকে তার সাথে দেখা করার জন্য আদেশ পাঠায়। যুবরাজ নিম্ব ও দেবী আজ্রিয়া দুইজন মহারাজের সামনে কিছুক্ষণের মধ্যে উপস্থিত হয়। মহারাজ শশাঙ্ক যুবরাজ নিম্বকে দেখামাত্র বুকে জড়িয়ে ধরে। ‘তোকে কতদিন দেখি না পুত্র।’ শশাঙ্ক বলল। যদিও যুবরাজ নিম্ব আগে জানত না যে মহারাজ শশাঙ্ক তার প্রকৃত পিতা নয়। কিন্তু এখন নিম্ব জানে যে তার প্রকৃত পিতা শিল্পী কলুনা। ছোট বেলায় মহারাজ শশাঙ্ক কলুনার ইচ্ছায় তার কাছ থেকে শিশু নিম্বকে নেয়। আর এই ঘটনা শুধু কলুনা, মন্ত্রী সিনাতি, মহারাজা শশাঙ্ক, ও মহারাণী কুর্নষা ছাড়া আর কেউ জানে না। মহারাজ শশাঙ্ক তার সব সন্তানকে সমানভাবে ভালবেসেছে। যুবরাজ নিম্ব কখনো বুঝতে পারেনি যে মহারাজ শশাঙ্ক তার প্রকৃত পিতা নয়। প্রথমে যুবরাজ নিম্ব ভেবেছে যে সে মহারাজকে শিল্পী কলুনার সাথে তার পরিচয়ের সব ঘটনা খুলে বলবে কিন্তু কোন কারনে নিম্ব সে ঘটনা মহারাজ কে বলেনি।

‘পিতাশ্রী, আপনার শরীরের এই অবস্থা কেমন হয়েছে? রাজবৈদ্যকে আমি এখুনি ডেকে পাঠাচ্ছি।’ যুবরাজ নিম্ব বলল। ‘বয়স হয়েছে পুত্র, এখন এটাই স্বাভাবিক। আমি এখন তোদের বিয়ে শেষ করে, তোর রাজ্যাভিষেক করতে পারলেই আমার দায়িত্ব শেষ হবে।’ মহারাজ শশাঙ্ক বলল। এরপর মহারাজ দেবী আজ্রিয়া ও যুবরাজ নিম্বকে তাদের বিবাহের দিনক্ষণ ধার্যের কথা বলল। ‘আমি গত সপ্তাহে রাজজ্যোতিষীর পরামর্শে তোদের বিবাহের দিনক্ষণ ধার্য করেছি। সামনের পূর্ণিমা রাতে তোদের বিবাহ অনুষ্ঠিত হবে।’ মহারাজ শশাঙ্ক বলল। মহারাজ শশাঙ্কের মনে ভীষণ এক অজানা ভয় কাজ করছে। কারণ তিনি যখন রাজ জ্যোতিষীর সাথে যুবরাজ নিম্ব ও দেবী আজ্রিয়ার বিবাহ-ক্ষণ ধার্যের শলাপরামর্শ করছে তখন জ্যোতিষী মহারাজকে বলেন, ‘এই বিয়ে ঘোর অমঙ্গল আনবে, মহারাজ। এই বিয়ের ফলে চন্দ্রগ্রহের ভবিষ্যত সংকটপূর্ণ হবে। এই বিয়ে বেশিদিন টিকবে না।’ কিন্তু মহারাজ শশাঙ্ক জ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণীকে আমলে নেননি। পরিবর্তে তিনি জ্যোতিষীকে আদেশ দেন যে এ কথা যেন সে কাউকে না বলে এবং বিবাহের জন্য একটি ভাল দিন ঠিক করে দেয়।

মহারাজা শশাঙ্ক জ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণীর সম্পর্কে যুবরাজ নিম্ব ও দেবী আজ্রিয়াকেও কিছু বলেনি। মহারাজ শুধু বলেছে যে তাদের বিবাহের দিন আগামী পূর্ণিমা রাতে ঠিক হয়েছে। এদিকে মহারাজের শরীর দিনদিন খারাপ হয়ে পড়ছে। মহারাজ শশাঙ্ক যুবরাজ নিম্বকে আরেকবার বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘পুত্র, লাগগিন্তা রাজ্যের শশীরা অনেক ভাগ্যবান যে তারা তোর মত একজনকে রাজা হিসেবে পাবে। আমি তোকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করি যাতে প্রজাদের জন্য তুই একজন আদর্শ রাজা হতে পারিস।’ যুবরাজ নিম্ব মহারাজের পায়ে পড়ে প্রণাম করে। দেবী আজ্রিয়াও মহারাজের কাছ থেকে আশীর্বাদ নেন। এরপর  যুবরাজ ও দেবী তাদের নিজ নিজ কক্ষে চলে যায়। 

লাগগিন্তা রাজ্যের সবাই এখন বিবাহ উৎসবে মত্ত। যুবরাজ নিম্ব ও দেবী আজ্রিয়ার বিবাহ উপলক্ষে রাজপ্রাসাদকে  প্রজারা বিভিন্ন ফুল ও রঙ দিয়ে সাজিয়েছে। লাগগিন্তার চারিদিকে এখন উৎসবের আমেজ। লাগগিন্তা রাজ্যের সব রাজা ও গুনীজনদের বিবাহ উপলক্ষে আমন্ত্রণ পত্র ইতিমধ্যে পাঠানো হয়েছে। রাজ পরিবারের বিয়ে উপলক্ষে মহারাজা শশাঙ্ক তার প্রজাদের জন্য পুরো বছরের খাজনা মওকুপ ঘোষণা করেছে। তিনি মন্ত্রী সিনাতিকে আদেশ দিয়েছে তিনি যেন রাজকোষের কিছু অর্থ গরীব শশীদের দান করে।  লাগগিন্তা রাজ্যের প্রজারা এখন মহানন্দে ভাসছে। 

এদিকে সূর্যগ্রহেও দেবী আজ্রিয়া ও যুবরাজ নিম্বের বিবাহের খবর পৌঁছে গেছে। যদিও এই বিবাহের ঘোর বিরোধ করেছিলেন স্বয়ং দেবরাজ কৃতনু ও মহাদেবী উষা কিন্তু অন্য সকল দেবতারা এ বিয়ের সংবাদে মোটামুটি খুশি। বেশিরভাগ দেবতারা চান তারাও যেন তাদের পছন্দের একজনকে বিয়ে করতে পারে, হোক সে শশী কিংবা দেবতা। আজ দেবী আজ্রিয়া সে বাধা না মেনে যুবরাজ নিম্বকে বিয়ে করছে। দেবী আজ্রিয়া অন্য সব দেবতাদের জন্য বিকল্প পথ পাড়ি দিচ্ছে। এজন্য অধিকাংশ মহালয়ের দেবতারা দেবী আজ্রিয়ার কর্মকান্ডে সন্তুষ্ট।  তাই এ বিয়ে উপলক্ষে তারা তাদের দেবশক্তির পূর্নপ্রয়োগ চন্দ্রগ্রহে করছে। এতে চন্দ্রগ্রহে এখন একপ্রকার অঘোষিত বসন্তের হাওয়া বইছে। পুরো চন্দ্রগ্রহে শশীদের বাগানে ফুল ও ফলে এখন পরিপূর্ণ, আর ক্ষেতে ফসলে পরিপূর্ণ। বাতাসে শশীদের প্রাণ জুড়ানো শীতল হাওয়া বইছে। আকাশে সূর্য়ের হাসি, নেই তার কোন তীব্রতা। নেই কোন রোগ-শোক, সব শশীরা এখন আনন্দে আত্মহারা। 

এদিকে বিয়ের দিনক্ষণ জানার পর যুবরাজ মঞ্জট খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ছে। যুবরাজ মঞ্জট তার কক্ষে পায়চারি করছে। যুবরাজ নিম্বের রাজ্যাভিষেকর আর বেশি দিন নেই। মহারাজ শশাঙ্কের ঘোষণা অনুযায়ী বিয়ের একমাসের মধ্যে যুবরাজ নিম্বের রাজ্যাভিষেক হবে। যুবরাজ নিম্বকে মঞ্জট কখনো রাজা হতে দিবে না বলে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করছে। কিন্তু যেভাবে সব-কিছু এগুচ্ছে তা দেখে যুবরাজ মঞ্জট এখন ভীষণ চিন্তিত। সে দেখছে কিভাবে এখন চন্দ্রগ্রহের উপর মহালয়ের দেবতাগনের সুদৃষ্টি বইছে। হঠাৎ যুবরাজ মঞ্জটের পাপের দেবতা কিতমুর বরের কথা মনে পড়ে যায়। যুবরাজ মঞ্জট তার কঠোর সাধনায় সিদ্ধি লাভ করে দেবতা কিতমুর কাছ থেকে দুটি বর পায়। এক বরে মঞ্জট দেবতা কিতমুকে পুত্র হিসেবে সাত জন্মে পাইবে। আর দ্বিতীয় বর হচ্ছে মঞ্জটের তার জীবনে একটি মহাপাপ করবে আর সে পাপের ভাগীদার শুধু দেবতা কিতমুই হবে। সে পাপ কখনো মঞ্জটকে স্পর্শ করতে পারবে না বা তার মৃত্যুর পরে সে পাপকর্মের জন্য শান্তিকুন্জে যেতে বাধা পাবে না। 

বিলম্ব না করে যুবরাজ মঞ্জট ঐ বর দুটি স্মরণ করে দেবতা কিতমুকে আহ্বান করে। সঙ্গে সঙ্গে দেবতা কিতমু তার সম্মুখে উপস্থিত হয়। ‘প্রভু, আশা করি আমার দুটি বরের কথা আপনার এখনো স্মরণ আছে। আজ একটি বর চাহিতে আপনাকে স্মরণ করেছি।’ যুবরাজ মঞ্জট বলল। ‘অবশ্যই, কোন বরটি চাও?’ দেবতা কিতমু বলল। ‘প্রভু, আমার প্রথম বর অনুযায়ী আমি শীঘ্রই একটি মহাপাপ করতে যাচ্ছি। আর সে পাপকর্মের ভাগীদার শুধুই আপনি হবেন। আজ আপনাকে তা স্মরণ করানোর জন্যই আমি আহবান করেছি।’ মঞ্জট বলল। ‘ঠিক আছে, তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হবে। তবে মনে রেখ তোমার পাপকর্মের প্রত্যক্ষ শাস্তি না পেলেও তুমি পরোক্ষ ফল অবশ্যই ভোগ করবে।’ এই বলে দেবতা কিতমু অদৃশ্য হয়ে যায়। 

যুবরাজ মঞ্জট সব দিক চিন্তা করে বুঝল যে তার হাতে আছে এখন শুধু একটি মাত্র উপায় আর সেটি হচ্ছে যুবরাজ নিম্বকে হত্যা করা। যুবরাজ নিম্বকে হত্যা করলেই সে লাগগিন্তা রাজ্যের রাজা হতে পারবে। তার পাওয়া বর অনুযায়ী সে যুবরাজ নিম্বকে হত্যা করলে সে পাপের ভাগীদার হবে না। সব ঠিক আছে কিন্তু মঞ্জট চায় সে যুবরাজ নিম্বকে এমনভাবে হত্যা করতে যাতে শশীরা বুঝতে না পারে যুবরাজ নিম্বকে কে বা কারা হত্যা করেছে। কারণ যদি জানাজানি হয় যে যুবরাজ মঞ্জট যুবরাজ নিম্বকে হত্যা করেছে তাহলে সে রাজা হতে পারলেও রাজা হিসেবে শশীদের আস্থা অর্জন করতে পারবে না। তাই সে ঠিক করল সঠিক সময়ে সে যুবরাজ নিম্বকে গোপনে হত্যা করবে। 

আজ যুবরাজ নিম্বের বিয়ের আগেরদিন রাত। লাগগিন্তা রাজ্যের চারিদিকে বাদ্য সুরের আওয়াজে বাতাস ঘনীভূত। চারিদিকে প্রজাদের হইচই। প্রজারা নানা রঙে লাগগিন্তা রাজ্যের মাঠ-পথতকে সাজিয়েছে। গভীর রাতে যুবরাজ মঞ্জট নিম্বকে হত্যা করবে বলে জানালা দিয়ে তার কক্ষে আসে। যুবরাজ নিম্বের কক্ষে তখন কেউ ছিল না। মঞ্জট তার কক্ষে ঢুকে দেখে যুবরাজ নিম্ব বিশ্রাম নিচ্ছে। তখন নিম্বের উপহার দেয়া সে চুরিটি দিয়ে মঞ্জট তাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। হঠাৎ দেবী আজ্রিয়া যুবরাজ নিম্বের কক্ষের দরজায় নক করে তার নাম ধরে ডাকতে থাকে। আর এতে ভয় পেয়ে মঞ্জট জানালা দিয়ে তৎক্ষনাৎ পালিয়ে যায়। মঞ্জটের সব পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।

আজ যুবরাজ নিম্ব ও দেবী আজ্রিয়ার বিবাহের দিন। অসংখ্য দেবতা শশীদের বেশে তাদের বিয়ে দেখবে বলে আজ রাজপ্রাসাদে উপস্থিত। লাগগিন্তা রাজ্যের সব রাজা ও গুনীজনরাও উপস্থিত। সবার উপস্থিতে বেশ জাঁকজমকভাবে যুবরাজ নিম্ব ও দেবী আজ্রিয়ার বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। যুবরাজ মঞ্জট অনেক চেষ্টা করেও যুবরাজ নিম্বকে হত্যা করার সুযোগটি পায় নি।

যুবরাজ নিম্ব ও দেবী আজ্রিয়ার বিয়ে শেষ হবার প্রায় এক সপ্তাহ হয়ে গেল। লাগগিন্তা রাজ্য এখনো উৎসবের আনন্দে মেতে আছে। যুবরাজ নিম্ব ও দেবী আজ্রিয়া এখনো তাদের কক্ষ থেকে বের হয়নি। মঞ্জট এ নিয়ে খুবই চিন্তিত। চারিদকে তার গুপ্তচর লেলিয়ে দিয়েছে। তাদেরকে বলা আছে যে যুবরাজ নিম্বকে রাজপ্রাসাদের বাহিরে দেখা মাত্র তাকে সংবাদ দিতে। এদিকে মহারাজ ঘোষণা দেয় আর তিন সপ্তাহ শেষে যুবরাজ নিম্বের রাজ্যাভিষেক হবে। শুনে মঞ্জট ভীষণ ক্ষেপে যায়। মঞ্জট কিছুতেই নিম্বকে রাজা হতে দিবে না। বিয়ে শেষ হবার দুই সপ্তাহ শেষে ধীরে ধীরে লাগগিন্তা রাজ্যে বিয়ের আমেজ কমতে থাকে। আজ প্রথম বার যুবরাজ নিম্ব তার কক্ষ ছেড়ে দেবী আজ্রিয়ার জন্য একটি ফুল নিজ হাতে আনার জন্য রাজপ্রাসাদের সামনের ফুলের বাগানটিতে প্রবেশ করে। যুবরাজ মঞ্জটের গুপ্তচর তা দেখে মঞ্জটকে এ সংবাদটি খুব দ্রুত দেয়। 

মঞ্জট দ্রুত সংবাদটি শুনে রাজপ্রাসাদের সামনের বাগানে প্রবেশ করে। অনেকক্ষণ যুবরাজ নিম্বকে খোঁজে কিন্তু মঞ্জট যুবরাজ নিম্বকে দেখে না। খুঁজতে খুঁজতে রাজপ্রাসাদের সামনের ফুলের বাগানটির  অনেক গভীরে চলে যায়। যুবরাজ নিম্বকে না দেখে মঞ্জট হতাশ হয়। হঠাৎ মঞ্জট বাগানের ভিতর পায়ের আওয়াজ শুনতে পায়। মঞ্জট সে আওয়াজের দিকে অগ্রসর হয়। ‘মঞ্জট, তুমি এখানে কি করছো?’ যুবরাজ নিম্ব বলল। মঞ্জট নিম্বের গলার আওয়াজ শুনে আঁতকে উঠে। ‘ভ্রাতাশ্রী, আজ বহু দিন হল আপনাকে দেখি না। দূর দেখে দেখি আপনি বাগানে প্রবেশ করছেন তাই ভাবলাম আজ আপনার দর্শন নিতেই হবে।’ মঞ্জট চালাকি করে বলল। মঞ্জট অনেক ধূর্ত স্বভাবের। কিন্তু নিম্ব খুবই শান্ত স্বভাবের। মঞ্জটের কথায় নিম্বের মন গলে যায় এবং কয়েকটি ফুল হাতে নিয়ে সে মঞ্জটের সামনে উপস্থিত হয়। যুবরাজ নিম্ব মঞ্জটকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে বুকে জড়িয়ে ধরে। আর সে সুযোগে মঞ্জট তার জামার পকেট থেকে নিম্বের উপহার দেয়া চুরিটি তার ডান হাতে নেয়। এরপর আর কোন কিছু চিন্তা না করে মঞ্জট সে চুরিটি দিয়ে নিম্বের বুকে উপুর্যপুরি আঘাত করে। সাথে সাথে যুবরাজ নিম্বে বাগানের মাটিতে ঢলে পড়ে। যুবরাজ নিম্বের হাতের ফুলগুলো মাটিতে পড়ে থেতলে যায়। 

‘কেন রে ভাই তুই আমারে মারলি? রাজা হতে চেয়েছিস? তুই বললে এমনিতেই  আমি তোকে দিয়ে দিতাম। আমাকে হত্যা করে তোর পাপের ভাগীদার হতে হত না।’ মৃত্যুপথযাত্রী যুবরাজ নিম্ব বলল। ‘এ পাপের ভাগীদার আমি হব না।’ মঞ্জট দেবতা কিতমুর দেয়া বরের কথা জানান। ‘দেবী আজ্রিয়ার জন্য আমার’ বলতে যুবরাজ নিম্ব মৃত্যু বরণ করে। 

চলবে...

লেখক: কবি ও লেখক, অধ্যাপক: অপরাধবিদ্যা, আইন ও বিচার বিভাগ, জন জে কলেজ, সিটি ইউনিভার্সিটি নিউইর্য়ক, মনস্তাত্তিক বিভাগ, হসটস কলেজ, সিটি ইউনিভার্সিটি, নিউইর্য়ক। কাউন্টার টেরোরিজম কর্মকর্তা, নিউইর্য়ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট (এনওয়াইপিডি)।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :