প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের চেষ্টা

নজরুল ইসলাম ও সৈয়দ আলম
 | প্রকাশিত : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১০:৪৭
ফাইল ছবি

দুই বছর আগে সীমান্ত খুলে দিলেও দুই বছরের বিরূপ অভিজ্ঞতার পর মিয়ানমারের রাখাইনে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের আর দেশে ঢুকতে দেবে না বাংলাদেশ।

দুই দফায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর দিনক্ষণ চূড়ান্ত করেও মিয়ানমার রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারেনি বলে একজনকেও ফেরত পাঠানো যায়নি। এরই মধ্যে রাখাইন থেকে বাংলাদেশে নতুন করে অনুপ্রবেশের চেষ্টা হচ্ছে। তবে এবার কক্সবাজার সীমান্তে কঠোর অবস্থানে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি।

শুক্রবার গভীর রাতে কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলা নয়াপাড়া নাফনদী সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের চেষ্টার সময় ছয় জন রোহিঙ্গাকে আটক করে বিজিবি। পরে তাদেরকে পুশব্যাক করা হয় নিজ দেশে। এরপর বিজিবির পক্ষ থেকে সীমান্তজুড়ে আরো সতর্কতা বাড়ানো হয়। বিজিবি জানায়-এর আগেও ২২ জন রোহিঙ্গাকে অনুপ্রবেশের সময় প্রতিহত করে বিজিবি।

টেকনাফ-২ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফয়সাল হাসান খান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘সীমান্তে বিজিবি সবসময় রোহিঙ্গা প্রতিরোধ ও মাদকের বিরোদ্ধে সোচ্চার থাকে। নতুন করে ছয় রোহিঙ্গা প্রবেশের চেষ্টা কোনো বিষয় না। এরকম এর আগেও অনেক রোহিঙ্গা ঢুকার চেষ্টা করেছেন বিজিবি তাৎক্ষণাৎ প্রতিহত করেছে।’

বিজিবি সূত্র জানায়, শুক্রবার গভীর রাতে হ্নীলা নয়াপাড়া নাফ নদীর কুতুবদিয়া ঘাট এলাকা দিয়ে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে মিয়ানমারের ছয় রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়। টেকনাফের হ্নীলা নয়াপাড়া বিশেষ ক্যাম্পের নায়েক সুবেদার মোহাম্মদ শাহ আলমের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টহল দল তাদের আটক করে। আটক রোহিঙ্গাদের মধ্যে তিন জন নারী এবং তিন শিশুও ছিল। পরে গভীর রাতে আটক রোহিঙ্গাদের একই সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়।

বিজিবি জানায়, নতুন করে কোনও রোহিঙ্গা ঢুকতে দেওয়া হবে না। অনুপ্রবেশ রোধে সীমান্তে সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে বিজিবি। সম্প্রতি সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশকালে ২৮ রোহিঙ্গাকে প্রতিহত করা হয়েছে। পাশাপাশি মাদক পাচার ঠেকাতে মিয়ানমার সীমান্তে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ার পরও এ ঘটনা এর আগেও বেশ কয়েকবার ঘটেছে। বিশেষ করে চলতি বছরের শুরুর দিকে বান্দরবানের সীমান্ত অতিক্রম করে মিয়ানমারের প্রায় দেড়শ নাগরিক বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে।

তখন অনুপ্রবেশের প্রতিবাদ জানিয়ে ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত লুইন ওকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে প্রতিবাদলিপি দেওয়া হয়। কিন্তু এতেও কোনো কাজ হয়নি। এরপরও বিভিন্ন সময়ে নতুন করে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করেছে রোহিঙ্গারা। 

নতুন করে কোনো শরণার্থী যেন আর প্রবেশ না করতে পারে সেজন্য কঠোর অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। কোনো মূল্যেই কাউকে আর ঢুকতে না দিতে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির প্রতি কঠোর নির্দেশ রয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জৈষ্ঠ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে পাঠাতে সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছে ঢাকা। সেখানে নতুন করে প্রবেশ করতে দেওয়ার প্রশ্নই উঠে না।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. জমির ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘বাংলাদেশকে সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান অব্যাহত রাখতে হবে। যেন কোনোভাবেই আরও একজনও এখানে প্রবেশ না করতে পারে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করার জন্য মিয়ানমারকে চাপ দিতে হবে, তেমনি নতুন করে এরা কেন আসছে কঠোর প্রতিবাদ জানাতে হবে।’

টেকনাফ ল্যাদা রোহিঙ্গা শিবিরের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘মিয়ানমারে থেকে যাওয়া রোহিঙ্গারা কষ্টের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছে। এ কারণেই তারা এখনও বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে আগের মতো রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারছে না।’

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রবিউল হাসান বলেন, ‘মাঝে মধ্যে সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে থাকে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্তে প্রশাসনের শক্ত অবস্থানের কারণে কোন রোহিঙ্গা এখন সহসা প্রবেশ করতে পারে না।’

আশির দশক থেকেই প্রাণ বাঁচাতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলিমরা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া শুরু করে। তবে সবচেয়ে বড় ঢল নামে ২০১৭ সালের আগস্টে। এখন সব মিলিয়ে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে।

এদেরকে ফিরিয়ে নিতে একাধিকবার দিন তারিখ ঠিক হলেও মিয়ানমারের টালবাহানা আর রোহিঙ্গারা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পাওয়ায় প্রত্যাবাসন পিছিয়ে যাচ্ছে।

গত বছরের ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রথম সময়সীমা ঠিক হয়েছিল। রোহিঙ্গারা রাজি না হওয়ায় সেবার একজনকেও রাখাইনে পাঠানো যায়নি। গত ২২ আগস্ট দ্বিতীয় দফা প্রত্যাবাসন শুরুর দিনক্ষণ ঠিক হলেও রোহিঙ্গাদের সেই পুরনো অনাগ্রহে দ্বিতীয় দফায়ও ভেস্তে গেল প্রত্যাবাসন।

এবার প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার থেকে তিন হাজার ৫৪০ জন রোহিঙ্গার নামের তালিকা বাংলাদেশ সরকারকে দেওয়া হয়েছিল।

২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীদের হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন সহিংসতা ও নিপীড়নের শিকার হয়ে সাড়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।

২০১৮ সালের জানুয়ারি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি হয়। একই বছরের ৬ জুন নেপিদোতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মধ্যেও সমঝোতা চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী গত বছরের ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। তবে আবারও হামলার মুখে পড়ার আশঙ্কায় রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরতে অস্বীকৃতি জানানোয় ব্যর্থ হয় ওই উদ্যোগ।

সর্বশেষ চলতি বছরের জুলাই মাসে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে নতুন করে উদ্যোগের অংশ হিসেবে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদল। ১৫ সদস্যের দলটি দুই দিন ধরে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলোচনা ও বৈঠক করে। এসব বৈঠকে রোহিঙ্গাদের তরফে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব ও চলাফেরায় স্বাধীনতার দাবি তুলে ধরা হয়।

প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে রোহিঙ্গাদের পাঁচ দফা দাবিসহ কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত বিভিন্ন পক্ষের নানামুখী কর্মকাণ্ড, মুঠোফোনের যথেচ্ছ ব্যবহারসহ নানা কারণ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাধা হিসেবে কাজ করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফেরত পাঠানোর সমন্বিত কৌশলের অংশ হিসেবে প্রত্যাবাসনবিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, শিবিরে নিরাপত্তা জোরদারসহ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

ঢাকাটাইমস/৮সেপ্টেম্বর/এসএ/এনআই

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :