দ্যুতিময় চাঁদের হাটে সেই জাদুকর

হাবিবুল্লাহ ফাহাদ
 | প্রকাশিত : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:১৮

এখান থেকে, এই শহীদবেদি থেকে, এ জনসমাগম থেকে, কালো কাপড়ের ওপর সাদা হরফে লেখা মঞ্চ থেকে, কাঠের বাক্সে বন্দি মানুষটির কাছ থেকে যারা ফিরে গেছেন, ফিরে যাচ্ছেন, এখনও আছেন, আসছেন- সবার নাকেই গন্ধটা লাগছে। গন্ধ নয়, সুগন্ধটা ছড়িয়ে গেছে। চিনতে গিয়েও আবার অচেনা মনে হচ্ছে মানুষগুলোর কাছে। লাখো পায়ের হাজারো মানুষের মুখ। কারো হাতে গোলাপ, রজনীগন্ধা, দোলনচাঁপা, গাঁদাফুলে গাঁথা মালার গোলবৃত্তে লেখা শ্রদ্ধাঞ্জলি। বিনম্র শ্রদ্ধা। চিরবিদায় প্রিয় মান্যবর। প্রিয় সব্যসাচী। ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে সারি। সারির পর সারি। ব্যস্ত দুপুরে ব্যস্ত মানুষগুলো আজ থমকে গেছে এখানে, এখানে এসে। কফিনের পাশে। কিন্তু গন্ধটা? আসছে। নাকে লাগছে। এ গোলাপের সুবাস হতে পারে। না, এ গোলাপের সুবাস নয়। হতে পারে রজনীগন্ধা। না, তাও নয়। এ সুবাস রজনীগন্ধায় ধরেনি কখনও। তাহলে দোলনচাঁপা। অতটা অপরিচিত নাক তো নয় কারো। এ সুবাস দোলনচাঁপারও নয়। তবে, তবে এই সুবাস তো গাঁদা থেকে আসছে না। আসছে না অবুঝের মতো লেগে থাকা সবুজ পাতা থেকেও।

গরম রোদে যে যার গা শুঁকছে। ডিওডোরেন্ট কিংবা পারফিউমের গন্ধ এতটা তীব্র হয়নি। ঘামে জড়িয়ে যাওয়া শরীর থেকে এ সুবাস নির্গত হবে, অকল্পনীয় চিন্তা কারো মাথায় খেলছে না। কিন্তু রহস্যময় এ সুবাসেরও জট খুলছে না। তবে কোথা থেকে আসছে? তবে কি মৃত্তিকার ঘন অন্ধকার থেকে উঠে আসছে স্বর্গীয় সুবাতাস? তবে খুলে দেওয়া হয়েছে স্বর্গ বাগান, তাকে বরণ করে নিতে? তবে কি জলেশ্বরীর বুনো ফুলের গন্ধ উড়ে এসেছে এই শহরে? কাঠের বাক্সবন্দি মানুষটির মুখ, কাচের বাতায়নে দেখা যায়। চেহারায় লেপ্টে আছে ঘন, দীর্ঘ ধবল জুলফি। কাত হয়ে মানুষটা ঘুমোচ্ছে। হয়তো সেই জানে কোথা থেকে মিলছে এ সুবাসের সুখ। কিন্তু অন্তিম ঘুম ভাঙিয়ে তার কাছে জানতে চাওয়ার সাহস হচ্ছে না কারো। কবি কবির মুখে, ঔপন্যাসিক ঔপন্যাসিকের মুখে, গল্পকার গল্পকারের মুখে আর প্রাবন্ধিক, অভিনেতারাও যে যার মুখে, চোখে চোখ রেখে জানতে চাইছে, ‘সুবাসটা পাচ্ছেন, আপনিও?’ শোকাহত মুখ নড়ে ওঠে-‘তাই তো, কিন্তু কিসের? অদ্ভুত এক। কী বলেন?’ কবি বলেন, এ গন্ধ কবিতার, গল্পকার মুচকি হেসে বলেন, গল্পটা গন্ধের, ঔপন্যাসিক গর্বে সিনা উঁচিয়ে, গন্ধটা উপন্যাসের বলে দাবি করেন। নাটকের মুখগুলো সুখ খুঁজে, সুবাসটা তাদের ভেবে। কালি-কলমের শিল্পের মতো সংগীতের শিল্পীরাও এসেছিলেন, এসেছিলেন তারাও যারা রঙ, তুলি, প্যালেট, ক্যানভাস নিয়ে জাদু দেখান। তাদেরও মনে হচ্ছে বাজিকরের জাদুবাস্তবতার ইন্দ্রজালে আজ তারা আটকে গেছেন।

‘লোকটি কি বেঁচে যেতে পারে/এইবার শেষবার-বস্তুত যে ছিল পাপী-তাপী?’ হয়তো পারে। পারে কি, পেরেছে। লোকটি চলে যায়নি। মরে যায়নি। শেষ হয়ে যায়নি সব। শব থেকে নতুন করে শুরু হলো। লোকটি বেঁচে গেছে। বেঁচে আছে। নূরলদীনের মতো। ওই যে লালে লাল চাদর যে ছুঁড়ে ফেলেছিল। সংগীত উচ্চগ্রাম থেকে প্রবাহিত ধারার মতো নেমে এসেছিল নিচে এবং ধীরে উঠে দাঁড়িয়েছিল নূরলদীন। এই যে মানুষটি, এই কালো মঞ্চের নিচে বিভোর ঘুমে আচ্ছন্ন সব্যসাচী, জেগে উঠল বলে। অসুঁচে জড়িয়ে থাকা আলখেল্লাটা ছুড়ে ফেলে উঠে বসছেন : ‘ঘন হয়া আসেন সকলে,/লক্ষ করি দ্যাখেন সকলে।’ কারো মাটির চোখ দেখছে না তারে। এই যে, তিনি আমাদের আশপাশে ঘোরে। আমরা তার ঘোরেন। কিন্তু সুবাসটার কী হবে? নাক থেকে নাকে যা ছড়িয়ে যাচ্ছে। মানুষটি কি তবে সুবাস হয়ে গেছে? তাকে ভালোবাসার পর থেকে, দুটো ফোঁটা যখন খসে পড়েছিল চোখ থেকে। তখন থেকেই সুবাসটা আসছে নাকে। সব কষ্ট সহ্য করা যায়, সহ্য হয় না ভালোবাসার মানুষের দেওয়া কষ্ট। এ যে দাগ কাটে পরানের গহিন ভেতর। সুবাসটাও নাক বেয়ে, শ্বাসনালি বেয়ে সিঁধেছে পরানের গহিন ভেতরে।

লাল-নীল বিজলিবাতি দিনের বেলায় মাথায় তুলে একটা ঘর গাড়ি এসেছে। গ্রীষ্মের দুপুরে হালকা বৃষ্টিতে পেজা তুলোর মতো চুপসে যাওয়া মানুষগুলোকে রেখে মানুষটা শীতঘরে উঠে কোথায় যেন যাচ্ছে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শুকনো মুখগুলো আসছে। এদিকটায় ঠিক সুবাসের টানে। সুবাসটা খুব করে টেনে এনেছে। শবাধারে। যেখানে মানুষটা ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছে শীতঘরের আঁধারে। সুবাসটা দাঁড়িয়ে গেছে। নড়ছে না এক পা-ও। কেউ একজন পেছন থেকে জানতে চাইল, ‘রাজমুকুট পরা মানুষটি কোথায় যাচ্ছেন?’ উত্তর এলো, ‘যাচ্ছেন কোথায়? তিনি ফিরছেন তার আপন ভুবনে। এই ব্যস্ত, ইটপাথরের শহরে তার মন বসছে না। চলছেন এ শহরকে বিদায় দিয়ে জলেশ্বরীতে। তিনি যদি ভুলে যান কিংবা বলতে নাও পারেন তাকে যেন দিয়ে আসা হয় জলেশ্বরীতে। যেখান থেকে একদিন হারিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। স্বেচ্ছায়। তাকে খুঁজে পাওয়ার পর ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে আপন মাটিতে, মৃত্তিকার স্বর্গে। জীবনে যখন তিনি প্রথম এসেছিলেন শহরে। রংপুরে একা। বাবা বলেছিলেন, একা যাও। এই নাও, টাকা। একা চলতে শেখো। বলতে শেখো। চিনতে শেখো। সরু লাইন বেয়ে চলা সাপের মতো যানটাতে চড়ে নেমেছিলেন এসে রংপুর ট্রেনস্টেশনে। পেছন থেকে বাবা যখন হাত রাখলেন কাঁধে, খোকা বুঝল বাবা ছিলেন তার পিছু পিছু, ছেলের একা চলতে শেখার আনন্দে চোখ ভেজাতে।

জট খুলেছে অনেক রহস্যের। বিন্দু থেকে সিন্ধু। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতির মোটা দাগের অমিলগুলো মিলেছে। সম্পর্কের টানাপোড়েন ঘুচেছে। রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্রে দূরত্ব কমেছে। পাতার পর পাতা লেখা হয়েছে, হচ্ছে। বড় বড় আলোকচিত্রে তাকে উপস্থিত রেখে আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় কেউ কেঁদেছে। কেউ কাঁদিয়েছে। কেউ অধিক শোকে পাথর হয়ে গেছে ডায়াসে। খোলেনি শুধু সুবাস রহস্যের জট। এ নিয়ে হৈচৈ দেশজুড়ে। যে লেখক এসেছিলেন কবিকে, গল্পকারকে, ঔপন্যাসিককে বিভোর ঘুমে দেখতে, ফিরে গিয়ে তিনি লেখার টেবিলে তার ছায়া দেখেছেন। নরম সুবাস তার নিশ্বাসে মিলেছে। কালির হরফে ভরে যাওয়া পৃষ্ঠার ঘ্রাণ নিতে অবিকল সেই সুঘ্রাণ পেয়েছে। আজিজ সুপার থেকে বাংলাবাজার, নীলক্ষেত থেকে বাতিঘর, শহর থেকে শহরে সুবাসটা ছড়িয়ে গেছে। প্রকাশক থেকে প্রকাশকে, নতুন, পুরোনো লেখকে, বইয়ের মিহিন ভাঁজে সুবাসটাও ভাঁজ হয়ে আছে।

যে প্রেমিক এসেছিল প্রেমিকার হাত ধরে। কিংবা যে প্রেমিকা প্রেমিকের কাঁধে মাথা গুঁজে দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের কাছেও সুবাসটা অম্লান আজও। প্রেমিকার চুলের সুগন্ধ আর প্রেমিককে কাছে টানে না। সুবাসে ঢাকা পড়েছে সৌন্দর্য! অভিমানে প্রেমিকারা ফেটে পড়েছে বিক্ষোভে। মন থেকে মনে সেই বিক্ষোভের আগুন দাউ, দাউ জ্বলছে। গ্রাম থেকে শেষবার আসার সময় যে মানুষটি বলে এসেছিল, আসছি, আর কদিন বাদে। সে তো আজও আসেনি। মেয়েটি টলমল চোখে চিঠি গাঁথছে সেই সুবাসের শব্দে

‘আমারে সোন্দর তুমি কও নাই কোনো একদিন,

আমার হাতের পিঠা কও নাই কী রকম মিঠা,

সেই তুমি তোমারেই দিছি আমি যুবতীর চিন

চোখ-কানা দ্যাখো নাই বিছানায় আছে লাল-ছিটা?’

জবাবে শহরের ব্যস্ত মানুষটি, যে হারিয়ে গেছে সুবাসের আড়ালে। ফুল তোলা কাগজে লিখেছে সেওÑ

‘তোমারে যে ভালোবাসে এর থিকা আরো পাঁচগুণ

আল্লার কসম আমি দিমু তারে এই জামাখান,

আমার কলম আমি দিমু তারে, শরীলের খুন

দোয়াত ভরায়ে দিমু...’

যে নাবিক এসেছিল ঘুমিয়ে থাকা মানুষটিকে জলশ্বরীতে ফিরে যাওয়ার আগে একবার দেখতে, সে জাহাজ নিয়ে মাঝ সমুদ্রে গিয়েও পাচ্ছে সুবাস। যে নারী পাহাড়ে উঠছে, মাউন্ট এভারেস্টে-গন্ধটা তার নাকে বিঁধেছে নোলকের মতো। নৌকাডুবিতে যে ডুবুরি প্রাণ, নিষ্প্রাণের সন্ধানে গহিন পানিতে হারিয়ে যায়, তার নাকেও গন্ধটা লেগে আছে তখনও। যখন সে স্থল থেকে জলের মধ্যে সিঁধিয়ে গেছে। ক্লাসরুমগুলো মৌ মৌ সুবাসে ভরে গেছে। বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষক ক্লাসে এসে হোয়াইট বোর্ডে লিখছে আলোচ্য বিষয়, সুবাস : এক রহস্যের সন্ধানে। মেডিক্যাল মর্গে ফরমালিনের তেজ হারিয়ে গেছে অলীক সুবাসের কাছে। দেহতত্ত্বের কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে পারছেন না শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের ছুরি-কাঁচি এদিক-সেদিক ছুটছে। সুবাসটা ছুটছে তারও দ্বিগুণ গতিতে। মার্কেজের জাদুবাস্তবতার নজির টেনে কেউ কেউ বলছেন, এ অস্তিত্বের জাদুবাস্তবতা। গোলাপের সুবাস থেকে এসেছে। বাজিকরের কাছ থেকে, যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহিন ভেতর।

তারপর বছরের পর বছর। সব গন্ধ ভুলে একটা সুবাসে সুবাসিত হচ্ছে সবাই। তত দিনেও আবিষ্কার হয়নি সুবাসের নিগূঢ় রহস্য। শুধু উত্তর থেকে হাঁকডাক শোনা গেল। শোনা গেল সেখানকার মাটিতে ফলা ফসলে, গাছের ফলে কিংবা বাগনের ফুলে কেবলই সেই গন্ধ। বাতাসে, বৃষ্টিতে কিংবা ঝড়ের সঙ্গে সঙ্গে সুবাসটাও হানা দেয় দুয়ার থেকে দুয়ারে। মন থেকে মনে। জন থেকে জনে। সুবাসটা কোথা থেকে আসে, এ নিয়ে গবেষণা, আলোচনা চলছে। বইয়ের পাতাগুলো কর্পূরে ঢেকে দেওয়ার পরও ঘ্রাণটা উতলে উঠছে উনুনে ফোটা ভাতের মতো। অনুসন্ধানী সাংবাদিক, সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল শুধু গন্ধটার উৎসের সন্ধানে ছুটেছে। মাসের পর মাস। বছর পর বছর। হাঁপিয়ে উঠে যখন সবাই ক্ষ্যান্ত হয়েছে সুবাস রহস্য অনুসন্ধানে, যখন ব্যর্থ মনোরথে সবাই ফিরছে ঘরে, কোটি কোটি চোখ তাকিয়ে নিশীথে নীলিমার চাঁদ হাঁটে, তখন কেউ একজন রাজমুকুট নিয়ে জিব্রাইলের ডানায় ভর করে এসে, পশ্চিমের আকাশে, দেখা দিল, বলে গেল

‘ফুলের গন্ধের মতো থেকে যাবো তোমার রুমালে

ধূপের গন্ধের মতো তোমাদের শান্ত সন্ধ্যাকালে

সমস্ত দিনের শেষে থেকে যাবো নদী পারাপার

তখনো যাত্রীর দেখা পাওয়া যাবে এই নদী পার।

ভোরের প্রথম আলো হয়ে চুমো খাবো ওই গালে

ছায়া লয়ে সরে যাবো বেলাটি পোহালে।’

কাঁই? কাঁই কথা কন, কাঁই তুমি বাহ্? আড়ালে ক্যান রন?

জবাব এল, ‘আমি সৈয়দ শামসুল হক কখনো বেঁচে ছিলাম/কবিতা লিখতাম/সশব্দ আড্ডায় রাজপথ ভাসিয়ে দিয়ে মাঝরাতে/বাসায় ফিরতাম/হঠাৎ যখন মনে পড়তো বিধবা মায়ের কথা/চিঠি লিখতাম/হঠাৎ যখন চোখে পড়তো মরো-মরো ফুলগাছ/পানি দিতাম...’

রাত তখন নিস্তব্ধতার শব্দঘরে আড়ি পেতেছে। কোলাহল থেমে গেছে। চোখগুলো অবাক, আটকে যায় থমকে যায় সময়। ফেটে পড়ে কণ্ঠস্বর: ওই তো, ওই তো দ্যুতিময় চাঁদের হাটে তিনি সেই জাদুকর। যিনি রুমাল নাড়েন কালের গহিন ভেতর।

.........................................................

[সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ। বাংলা সাহিত্যের এ বরেণ্য লেখক ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর একটি হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর কুড়িগ্রাম মহকুমায় (বর্তমানে জেলা) এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।]

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :