কোথাও ঠাঁই নেই

হাবিবুল্লাহ ফাহাদ
| আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০১৯, ১৭:৪৮ | প্রকাশিত : ২০ নভেম্বর ২০১৯, ১৭:৩৬

সড়ক আছে, মানুষ আছে, গাড়ি নেই।

বাস স্টপেজে মানুষ আর মানুষ। দু-একটি গাড়ি আসছে। শো করে চলে যাচ্ছে। থামছে না। নতুন করে লোক তুলছে না। গেটে ঝুলছে যাত্রী। ভেতরে পা ফেলার জায়গা নেই। জানালা গলিয়ে চোখ রাখলে দেখা যাচ্ছে।

সকাল আটটা। জোয়ার সাহারায় প্রায় পৌনে একঘণ্টা অপেক্ষা করলাম। কাজ হলো না। বাসে উঠতে পারলাম না। দু-একটি বাস যাও থামছিল, এতটাই ভিড় যে পা ফেলার জায়গা নেই গেটে। উঠবো কীভাবে? বাধ্য হয়ে গেলাম কাছেই ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশনে।

এবার যদি গতি হয়। অফিস যাওয়ার তাড়া। একবার চোখ ঘড়িতে, একবার সিগন্যাল বাতির দিকে। স্টেশনের একজন কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলাম, ঢাকামুখী কোনো ট্রেন আসছে কি-না? জানা গেল আসছে। লোকাল মেইল। অপেক্ষা আর অপেক্ষার পর দূরের রেলক্রসিংয়ের গেট পড়লো। সিগন্যাল বাতি লাল হলো। বুঝলাম ট্রেন আসছে।

আমার মতো অন্য অপেক্ষমাণরাও পিঁপড়ের মতো জড়ো হতে থাকল। যারা এতক্ষণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রতীক্ষায় ছিল। পুবের লোকেরা প্লাটফর্মের ধারে সারি ধরে দাঁড়িয়ে গেল। পশ্চিমপারের যাত্রীরা প্লাটফর্ম টপকে নেমে গেল লাইনে। আমিও তাদের একজন। দুপাশ থেকেই ট্রেনে ওঠার চেষ্টা হবে। দুটো দুয়ার। প্রস্তুত আরোহীরা। খানিকবাদে পোঁ পোঁ করতে করতে স্টেশনের দিকে এগুতে থাকলো ট্রেনটি। ঠিক যেন কুচকুলো কালো একটি অজগর তরতর করে বেয়ে আসছে।

ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকলো সাদাকালো পোশাকের মানুষগুলো। অফিসযাত্রী। গেটে ঝুলতে ঝুলতে আসছে। দূর থেকে। একটি দুয়ারও দেখা যাচ্ছে না। দুপাশেই পেঁপের মতো ঝুলছে মানুষ। গাছটিই ঢেকে গেছে। কেউ কেউ দুই কামরার মাঝে-জোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে সটান। ট্রেনটি হুশ্ হুশ্ করতে থামলো। দম নেওয়ার আগেই পঙ্গপালের মতো হামলে পড়লো মানুষগুলো। নতুনদের ভিড়ে ভেতর থেকে কেউ বেরিয়ে আসতে পারছেন না। নামতে পারছেন না। হৈ-হৈ করে উঠতেই বেকুল মানবকূল খানিক থামলো। দুয়ার ফাঁকা হলো না। দুজন দুপাশে দাঁড়িয়ে। যতই বলা হচ্ছে, নেমে দাঁড়ান, লোকগুলোকে নামতে দিন। ততই যেনো মানুষগুলো পোস্টারের মতো সেটে যাচ্ছিল দুয়ারের দুই দেয়ালে। কাগজের রোলারের মতো চিড়ে চ্যাপ্টা হতে হতে একজন একজন নামতে লাগলেন। নারী-পুরুষ, সবাই। কেউ আবার দুষ্টু ইঙ্গিত করলো। এসবেও খেয়াল নেই কারো। কামরাগুলো বমনের মতো উগড়ে দিচ্ছে একেকটি মানুষ। নতুন জীবন নিয়ে নেমে আসছে। কর্মবীর মানুষের সে কী ব্যাকুলতা!

সবাই নামতেও পারেনি, তার আগেই আবার সেই পোঁ...পোঁ...পোঁ। এক-দুই-তিনবার তারস্বরে বেজে উঠলো হুইশেল। ছেড়ে যাওয়ার সংকেত। হুড়মুড় করে উঠতে লাগলো সবাই। এই দৌড়ে পিছিয়ে পড়লাম আমি। নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। লোকোমোটিভের শ্বাসযন্ত্র ফোঁস ফোঁস করতে করতে এগুতে লাগলো।

দেখতে লাগলাম, লোহার গোল চক্রগুলো ধীরে ধীরে গড়িয়ে যাচ্ছে ইস্পাতের লাইনে। কী শৃঙ্খলা তাদের! সারি সারি সৈন্যের মতো একটির পেছনে আরেকটি ছন্দ তুলে গরিয়ে যাচ্ছে। এতটুকু ভাবান্তর নেই, কোনো দিকে, কারো দিকে; কে উঠতে পারলো, কে রয়ে গেল, এসবের ভাবনা নেই। ভাবনার সময় নেই। সৈন্যদের চোখঢাকা টুপির মতো ওদেরও চোখগুলো ঢেকে দেওয়া হয়েছে। জগতের কোনো সুখ-দুঃখ যেন স্পর্শ না করে। ওরা পেছনে তাকাতে শেখেনি। পেছনে তাকালে সামনে এগোনো যায় না, ওরা জানে। 

লেখক: সাংবাদিক ও গল্পকার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :