কোয়ালার কান্না, জ্বলছে ওয়ালাবি!

অরুণ কুমার বিশ্বাস
 | প্রকাশিত : ০৮ জানুয়ারি ২০২০, ২৩:৫২

মনে করুন আপনি এক্সপ্রেসওয়ে ধরে যাচ্ছেন- বিশ্বের একমাত্র ‘দেশ ও মহাদেশ’ অস্ট্রেলিয়ার নিউসাউথ ওয়েলস থেকে ক্যানবেরার পথে। রাত যত গভীর হয়, সেই পথে ব্যক্তিগত গাড়ি চালানো ততটাই কঠিন হয়ে পড়ে। কী ভাবছেন, কেন কঠিন মনে হয়! হাইওয়েতে যথেষ্ট আলোর ব্যবস্থা নেই, নাকি সেই রাস্তায় যত্রতত্র লেভেল ক্রসিং বা বিপদজনক মোড় রয়েছে! নাকি হাইওয়ে পুলিশ সিকিউরিটি চেকের নামে অকারণ গাড়ি থামিয়ে আপনার গতির পথে বিরক্তিকর যতি চিহ্ন টেনে দেয়!

বাস্তবে এসবের কিছুই ঘটে না সেখানে, অথচ তারপরও আপনি মনের আনন্দে ইচ্ছে মতো গাড়ি চালাতে পারবেন না। কী করে চালাবেন শুনি! সেখানে কি অগণিত গেছো ক্যাঙারু নেই! বা ক্যাঙারুদের বিশেষ স্বজন ওয়ালাবি (ক্যাঙারুর সিবলিংস বলা যায়) বসবাস করে না! রাতের বেলা ঘন জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে ছুটে চলা রাস্তায় একটু আলোর আভাস পেলেই ওরা অমনি গাছ ছেড়ে মাটিতে নেমে আসে। কেন আসে জানেন? না না, কেবল খাবারের সন্ধানে নয়, মানুষ নামক প্রাণিকুলের সঙ্গে একটু ভাব-ভালোবাসা বা ঘনিষ্ঠতা করবার জন্যে।

ফলে যা হবার তাই হয় আর কি! এক্সপ্রেসওয়েতে চাইলেও সবসময় গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। হাই-স্পিডিং কারের ব্রেক চাপতে গেলে গাড়ি উল্টে যেতে কতক্ষণ! বেচারা ক্যাঙারুরা কৌতূহলের বশে আলোর ফুটকি দেখে রাস্তায় নেমে এসে শেষে গাড়িচাপা পড়ে মরে। প্রতি বছর এভাবে নাকি কয়েক লক্ষ ক্যাঙারুর প্রাণ সংহার হয়। সত্যি, মর্মান্তিক।

গত বছর অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণে গিয়ে আমি দেখেছি এই ক্যাঙারু-কোয়ালা বা ওয়ালাবিরা কত নিরীহ ও শান্ত-শিষ্ট দেখতে! কাছে গেলেই ওদের গাল টিপে কিংবা সংক্ষিপ্ত লেজ (ক্যাঙারুর লেজ অবশ্য তত ছোটো নয়, ওরা বরং লেজের উপর ভর করেই দিব্যি লাফাতে বা নাচতে পারে) নেড়ে আদর করে দিতে ইচ্ছে করে। কদিন ধরেই দেখছি, অস্ট্রেলিয়ার কিছু এলাকায় স্মরণাতীত কালের সবচে ভয়াবহ বুশফায়ার বা দাবানল চলছে। শুধু গাছপালা জ্বলছে তা নয়, এসব জঙ্গলের আদি অধিবাসী এসকল প্রাণী দেদার পুড়ে মরছে। এই আগুনের বিস্তার ও ভয়াবহতা এতটাই ব্যাপক যে, বেচারা ক্যাঙারুরা চাইলেও নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে খুব বেশিদূর ছুটতে পারছে না। খুব সহজেই ওদের লোমশ দেহে আগুন ধরে যায়। আগুন নিয়ে দিগ্বিদিক ছোটে অবোলা প্রাণীরা। ওরা তো আর জানে না, গায়ে আগুন ধরলে মাটিতে গড়াগড়ি দিতে হয়। প্রাণ বাঁচাতে ওরা না বুঝেই ছোটে, ফলে বাতাসের সংস্পর্শে আগুন আরো দাউ দাউ করে জ্বলে।

সবচে বেশি বিপদে পড়ে পোসাম, কোয়ালা আর ওয়ালাবি’রা। কোয়ালা মূলত গাছেই চড়তে পছন্দ করে। ওরা একটু ভীতু ও লাজুক প্রকৃতির, কোয়ালা তাই মাটিতে নামতে চায় না। আর জঙ্গলে যখন আগুন লাগে, সবার আগে পোড়ে ‘ডিপ ফলিয়েজ’ বা ঘন ঝোপ ও পাতাঅলা গাছেরা। সেখানেই চুপটি করে বসে থাকে কোয়ালাগণ। যেসকল গাছে ঝোপ বা পাতা কম, সেখানে আগুন তত দ্রুত ছড়াতে পারে না। অন্যদিকে, ওয়ালাবির স্বভাব চরিত্র অনেকটাই ক্যাঙারুর মতো। দেখতেও ওরা ক্যাঙারুসদৃশ। মামা-ভাগিনা টাইপ কিছু সম্পর্ক থাকবে হয় তো। আমার বেশ মনে আছে, সিডনিতে এক চিড়িয়াখানায় গিয়ে প্রথমে আমরা ওয়ালাবিকেই ক্যাঙারু ভেবে ভুল করেছিলাম। ওয়ালাবি গেছো-ক্যাঙারুর চেয়ে আকারে ছোটো, তাদের কান অপেক্ষাকৃত লম্বা, কৌতূহলী চোখ মেলে টালুক টুলুক করে তাকায়। ভারি মায়াময় সেই চাহনি। কাছে গেলে ওরা ছুটে পালায় না, বরং দুটো হাত এক করে এমনভাবে দাঁড়ায়, যেন সে আপনাকে সম্মান জানাচ্ছে।

টেলিভিশনের পর্দায় যখন অস্ট্রেলিয়ার বুশফায়ারের খবর দেখি, মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। চোখের কোণে জল জমে, হৃদয়টাও খুব দ্রব হয়। আহা, লেজে ভর করে ক্যাঙারুর সেই বড় বড় পদক্ষেপে ছুটে চলা, ওয়ালাবির লাজুক চোখে মায়াকাড়া দৃষ্টি, আর ইঁদুরসদৃশ পোসামের সুড়ুত করে ঘাসের আড়ালে লুকিয়ে পড়া!

খবরে প্রকাশ, ব্যাপক দাবানলে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে নাকি লক্ষ লক্ষ বন্যপ্রাণী জ্যান্ত পুড়ে মরেছে। পশুপ্রেমী ও খুব সংবেদী কোনো কোনো মানুষকে দেখা যাচ্ছে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আহত ক্যাঙারুদের কোলে তুলে নিচ্ছে, তারপর ওদের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করতে বোতলে করে দুধ ও পানি পান করাচ্ছে। তাদের অন্তর থেকে শ্রদ্ধা জানাই। কিন্তু এভাবে আর কতগুলো প্রাণীকে ওরা বাঁচাতে পারবেন! আদৌ পারবেন তো! সত্যি, খেয়ালি প্রকৃতির কাছে আমরা খুব অসহায়!

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :