কিশোর বয়সেই ভয়ংকর ধর্ষক-খুনি পারভেজ!

সিরাজুম সালেকীন, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০১ মে ২০২০, ১১:১৩ | প্রকাশিত : ০১ মে ২০২০, ১১:০২

নাম তার পারভেজ। সদ্য সতেরো বছরে পা দিয়েছে। এই বয়সে যেখানে তার পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার কথা, সেখানে হয়ে উঠেছে ভয়ংকর অপরাধী। ছিঁচকে চোর থেকে আস্তে আস্তে হয়ে ওঠে ভয়ংকর খুনি ও এক বিকৃত মানসিকতার ধর্ষক। এই বয়সেই চারটি ধর্ষণ ও পাঁচটি খুনের অভিযোগ এই কিশোরের বিরুদ্ধে।

চকলেট খাওয়ানোর প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিবেশি এক শিশুকে ধর্ষণের পর গলাটিপে হত্যার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় নয় মাস জেলও খেটেছে। মুক্তির পর আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে পারভেজ। গেল সপ্তাহে প্রতিবেশির বাড়িতে চুরি করতে গিয়ে প্রবাসীর স্ত্রী ও দুই মেয়েকে ধর্ষণসহ চার খুনে জড়িয়েছে এই কিশোর। অর্ধমৃত অবস্থায় কিভাবে মা ও তার দুই মেয়েকে ধর্ষণ করেছে তার বর্ণনাও দিয়েছে পারভেজ। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) হাতে গ্রেপ্তারের পর এই কিশোর সম্পর্কে ভয়ংকর সব তথ্য জানা গেছে।

গাজীপুরের শ্রীপুরের আবদার কলেজপাড়ায় বেড়ে উঠেছে পারভেজ। বাবা কাজিম উদ্দিন ভাংড়ি ব্যবসায়ী। সংসারে অভাব অনটন লেগে থাকায় স্কুলের গন্ডি পেরোনো হয়নি এই কিশোরের। ছোট থেকেই টাকা উপার্জনের নেশা বুদ করে তাকে। জড়িয়ে পড়ে চুরিতে। ছিঁচকে চুরি দিয়ে শুরু করা এই কিশোর আসক্ত হয়ে পড়ে বিভিন্ন নেশাতেও।

২০১৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আপন চাচার ভাড়াটিয়া হাসান ফালানের সাত বছরের ছোট মেয়ে লিলিমাকে চকলেট কিনে দেওয়ার প্রলোভনে ধর্ষণের পর হত্যা করে। এই ঘটনায় শ্রীপুর থানার একটি মামলা হয়। সেই মামলায় নয় মাস পর জেল থেকে জামিনে বের হয় পারভেজ।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, শ্রীপুরের আব্দুল আওয়াল কলেজ মাঠে ২১ শে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে শহীদ বেদিতে ফুল দেয় স্থানীয়রা। পরের দিন বিকালে লিলিমা ও তার পাঁচ বছরের চাচাতো ভাই রাজন ফুল কুড়াতে কলেজ মাঠে যায়। সেখানে থাকা পারভেজ কৌশলে রাজনকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। লিলিমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলবে এবং চকলেট কিনে দেবে এমন প্রলোভনে কলেজের নবনির্মিত ভবনের পেছনে নিয়ে যায়। পরে ধর্ষণ শেষে লিলিমাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। এরপর মরদেহ কাগজ দিয়ে ঢেকে রেখে যায়।

রাতে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠায়। পরের দিন নিহতের বাবা বাদী হয়ে পারভেজের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন।

পিবিআই জানায়, ধর্ষণ মামলায় জামিনে বের হয়ে প্রতিবেশি মালয়েশিয়া প্রবাসী রেদোয়ানুল ইসলাম কাজলের মেয়ে দশম শ্রেণির ছাত্রী সাবরিনা সুলতানা নূরা ও পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী হাওয়ারিনকে প্রায় উত্যাক্ত করত পারভেজ। বাড়ির সামনে কেরাম বোর্ড বসিয়ে খেলার পাশাপাশি নিয়মিত জুয়া, মাদকসেবন ও আড্ডা দিত। দেড় মাস আগে একদিন সন্ধ্যায় গোপনে প্রবাসীর বাড়িতে ঢোকে পারভেজ। পরে খাটের নিচে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় ধরা পড়ে।

প্রবাসী কাজলের দোতলা বাড়ির ওপরের তলায় এক ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে থাকতেন তার স্ত্রী স্মৃতি আক্তার ফাতেমা। প্রায় দুই যুগ ধরে কাজল মালয়েশিয়ায় থাকেন। ছুটিতে বাড়ি আসেন। ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক ফাতেমাকে মালয়েশিয়াতে বিয়ে করেন। সেখানেই তাদের দুই মেয়ের জন্ম হয়। পরে সবাই বাংলাদেশে এসে বসবাস শুরু করে। কাজল আবারো প্রবাসে চলে যান।

গত ২৩ এপ্রিল তার স্ত্রী ও তিন সন্তানসহ চারজনকে গলাকেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। নিহতরা হলেন- প্রবাসীর স্ত্রী স্মৃতি আক্তার ফাতেমা, বড় মেয়ে নূরা আক্তার, ছোট মেয়ে হাওয়ারিন ও ছোট ছেলে ফাদিল আল সাদ।

এরমধ্যে নূরা হাজী আবদুল কাদের একাডেমিতে দশম শ্রেণিতে এবং হাওয়ারিন ব্রাইট স্কলার ক্যাডেট মাদ্রাসার ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী ছিল। হত্যার সময় তিনজনের শরীরে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে।

ঘটনার তিনদিন পর প্রধান অভিযুক্ত পারভেজকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। এরপর তার কাছে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার ভয়ংকর তথ্য।

পিবিআই বলছে, ঘটনার দিন রাতে ফাতেমা ও তার মেয়ের দামি মোবাইল চুরির জন্য ওই বাড়িতে যায় পারভেজ। প্রথমে পার্শ্ববর্তী বাবুলের বাড়ির দেয়াল দিয়ে ওই বাড়ির ছাদে যায়। এরপর দোতলার বাথরুমের জানালা দিয়ে নূরা ও হাওয়ারিনের ঘরে প্রবেশ করে খাটের নিচে লুকিয়ে থাকে। এসময় নূরার কানে হেডফোন ছিল এবং হাওয়ারিন ঘুমাচ্ছিলো। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর দোতলা থেকে নিচতলায় গিয়ে রান্না ঘর থেকে একটি বটি নিয়ে আসে পারভেজ।

পরে নূরার মায়ের (ফাতেমা) রুমের দরজা খোলার চেষ্টা করলে শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়। রুমের লাইট দিয়ে ফাতেমা কেউ ঢুকছে কিনা দেখতে থাকে। এসময় পারভেজকে দেখতে পেয়ে ফাতেমা চিৎকার দেয়। সঙ্গে সঙ্গে পারভেজ তার হাতে থাকা বটি দিয়ে ফাতেমাকে এলোপাথাড়ি কুপাতে থাকে। রক্তক্ষরণ হতে হতে তিনি মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন।

কিছু সময় পর নূরা জেগে উঠলে তারও মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গা কোপানো হয়। নূরার ছোট ভাই (বাক প্রতিবন্ধী) ফাদিল আল সাদ জেগে উঠলে তাকেও জবাই করে খাটের নিচে রাখা হয়। সবশেষ ছোট মেয়ে হাওয়ারিন জেগে উঠে চিৎকার দেয়। পারভেজ তাকেও কুপিয়ে জখম করে। এরপর নূরাকে ধর্ষণ করে এবং তার মাকে ওড়না দিয়ে হাত-পা বেঁধে অর্ধমৃত হাওয়ারিনকে ধর্ষণ করে। মৃত্যু নিশ্চিত হতে একে একে চারজনকে গলাকেটে নৃশংসভাবে হত্যা করে ভয়ংকর এই কিশোর।

এসময় একটি স্বর্ণের চেইন, দুইটি কানের দুল, নাকফুল ও দুটি মোবাইল নিয়ে পালিয়ে যায়।

এসব আলামতসহ পিবিআই ২৬ এপ্রিল ভোরে তাকে গ্রেপ্তার করে। মাদকাসক্ত ও বিকৃত মানসিকতার থাকায় পারভেজ সহজেই এই হত্যাকাণ্ডে ঘটিয়েছে বলে দাবি করে পিবিআই। সংস্থাটি বলছে, এই হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনাটি একাই ঘটিয়েছে এই ভয়ংকর কিশোর।

এদিকে ঘটনার সঙ্গে ওঁৎপ্রোতভাবে জড়িত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। গত মঙ্গলবার রাত ও বুধবার সকালে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন- কাজিম উদ্দিন, মো. বশির, মো. হানিফ, মো. হেলাল ও মো. এলাহি মিয়া।

পিবিআইয়ের হাতে আগেই গ্রেপ্তার পারভেজের বাবার নাম কাজিম উদ্দিন। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আরও কয়েকজন জড়িত বলে জানিয়েছে র‌্যাব। তাদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশের এই এলিট ফোর্সটি।

র‌্যাব দাবি করেছে, মালয়েশিয়া থেকে হুন্ডির মাধ্যমে প্রায় ২০ লাখ টাকা পাঠিয়েছে এমন খবরে প্রতিবেশির বাড়িতে ডাকাতির পরিকল্পনা করে পারভেজ ও তার বাবা কাজিম উদ্দিনসহ আরও কয়েকজন। ঘটনার দিন রাতে গ্রিল ভেঙে প্রথমে বাড়িতে প্রবেশ করে পারভেজ। এরপর আরও কয়েকজন প্রবেশ করে। তারা প্রথমে প্রবাসীর স্ত্রী ফাতেমাকে জিম্মি করে নগদ ৩০ হাজার টাকা ও হাতে-গলায় থাকা স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নেয়। চেহারা নিচে ফেলায় প্রথমে ধর্ষণ এরপর কুপিয়ে হত্যা করে। একইভাবে দুই মেয়েকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। সবশেষ বাড়িতে থাকা প্রতিবন্ধী ছেলেকে গলাকেটে হত্যা করা হয়। পারভেজও এই হত্যাকাণ্য ও ধর্ষণে অংশগ্রহণ করে বলে জানায় র‌্যাব।

র‌্যাব আরও জানিয়েছে, ফাতেমা ও তার মেয়েরা পারভেজ ও তার বাবা কাজিমকে চিনে ফেলায় সবাইকে হত্যা করা হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক হাফিজুর রহমান হাফিজ ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘এরই মধ্যে আলামত সংগ্রহ করে সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে। সেই রিপোর্ট হাতে আসলে এই হত্যার রহস্য আরও পরিষ্কার হবে।’ হত্যা ও ধর্ষণে কয়জন জড়িত ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে এখনই কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’

ঢাকাটাইমস/০১মে/এসএস/এমআর

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত