সাহেদের যত শিকার, বাদ যায়নি শাহ সিমেন্ট-ট্রান্সকমও

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ১৩ জুলাই ২০২০, ১৫:৫১

সাধারণ মানুষ আর ছোট-বড় টিকাদারই নয়, বড় বড় প্রভাবশালী শিল্পপ্রতিষ্ঠানও বাদ যায়নি রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদের প্রতারণা থেকে। দেশের বৃহৎ সিমেন্ট উৎপাদন কোম্পানি শাহ সিমেন্ট থেকে স্বনামধন্য ইলেকট্রনিক পণ্য প্রস্তুতকারক ট্রান্সকম লিমিটেড পর্যন্ত রয়েছে তার প্রতারণার শিকারের তালিকায়। আর ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত স্বনামধন্য ‘রিজেন্ট গ্রুপ’ নামটাই হাইজ্যাক করে নিয়েছেন সরকারি নথিতে উল্লিখিত ‘ভয়ংকর প্রকৃতির লোক’টি।

এসব প্রতারণা করতে গিয়া সাহেদ সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ও প্রধানমন্ত্রীর এডিসি বা রাজনৈতিক নেতা পরিচয় দিতেন। এতে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস করত না কেউ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-২ থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো একটি চিঠি থেকে জানা যায়, ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর এডিসি ছিলেন বলে পরিচয় দিতেন সাহেদ।

প্রধানমন্ত্রীর পিএস পরিচয় দিয়ে সাহেদ গত বছর পদ্মা সেতুতে পাথর সরবরাহ করার কথা বলে বাজারদরের চেয়ে বেশি মূল্যে পাথর কিনতে থাকেন সিলেটের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। ব্যবসায়ীরা পাথর পাঠান আর সাহেদ তা বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে নগদ বিক্রি করে টাকা হাতিয়ে নেন। ওদিকে পাথর সরবরাহকারীদের সাহেদ যে চেক দেন ব্যাংকে তা প্রত্যাখ্যাত হতে থাকে। এ ঘটনায় উত্তরা থানায় জিডি এবং সিলেট আদালতে মামলা করেন এক ব্যবসায়ী।

ব্যক্তি পর্যায়ের পাওনাদারদের সাহেদ মামলা ও নিজের গানম্যান দিয়ে ভয় দেখাতেন বলে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর বক্তব্যে উঠে আসে। এমনকি গুম করে দেওয়ার হুমকি দিতেন বলে অভিযোগ। তেমনই উদাহরণ টাঙ্গাইলের গোবিন্দাসীর মাটি খনন ব্যবসায়ী অমলেশ ঘোষ। গত বছরের শুরুর দিকে সাহেদের রিজেন্ট কেসিএর অধীনে নদীখননের জন্য চুক্তিবদ্ধ হন তিনি। অমলেশ ঘোষ বলেন, ‘কাজের একপর্যায়ে ২১ লাখ ৭৪ টাকা টাকা পাওনা হই। টাকা চাইতে গেলে আমাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। টাঙ্গাইল ডিবি অফিস ও এসপি অফিস থেকেও ফোনে হুমকি দেয়া হয়েছিল আমাকে।’

সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সাহেদের প্রতারণার আরেক অধ্যায় ২০১০ সালে ধানমন্ডি এলাকায় বিডিএস ক্লিক ওয়ান এবং কর্মমুখী কর্মসংস্থান সোসাইটি (কেকেএস) নামে দুটি এমএলএম কোম্পানি খোলার মাধ্যমে। গ্রাহকদের শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেন তিনি। গ্রাহকদের কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করতে গা ঢাকা দেন সাহেদ।

জানা যায়, এ সময় সাহেদ তাদের সাতক্ষীরার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, যেখানে তিনি এর আগে আর কখনো যাননি। সেখানকার কেউ তাকে প্রায় চিনেই না।

তবে পালিয়ে বাঁচতে পারেননি সাহেদ। ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকরা তার বিরুদ্ধে মামলা করলে ২০১১ সালে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ব্যক্তি পর্যায়ের প্রতারণা মামলায় প্রথমবারের মতো গ্রেপ্তার হন তিনি।

প্রভাবশালী কোম্পানি পর্যায়ে সাহেদের প্রতারণার খবর প্রথম চাউর হয়, যখন ট্রান্সকম লিমিটেডের সঙ্গে এসি কেলেঙ্কারির ঘটনায় তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। প্রথম আলোর মালিক লতিফুর রহমানের ট্রান্সকম গ্রুপের এই প্রতিষ্ঠানের মামলায় সাহেদ কাফরুল থানায় গ্রেপ্তার- এই খবর পেয়ে সেখানে হাজির হয় শাহ সিমেন্টসহ ২৫টি কোম্পানির প্রতিনিধিরা।

শাহ সিমেন্ট কোম্পানির সূত্রে জানা যায়, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা পরিচয়ে শাহ সিমেন্ট কোম্পানি থেকে সাত হাজার বস্তা সিমেন্ট বাকিতে নেন মো. সাহেদ। শাহ সিমেন্টকে দেওয়া তার চেক ব্যাংক ফেরত দেয় (বাউন্স) অ্যাকাউন্টে টাকা নেই বলে।

শুধু শাহ সিমেন্ট নয়, সবার সঙ্গেই সাহেদ ব্যবসায়িক লেনদেন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাবেক এডিসি কিংবা সাবেক সেনা কর্মকর্তা পরিচয়ও দিতেন। লেনদেনের সময় যে চেক দিতেন তিনি, তা ব্যাংকে প্রত্যাখ্যাত হতো সবই। ট্রান্সকম গ্রুপের সঙ্গে পেরে উঠতে না পারলেও বহু প্রতিষ্ঠানের টাকা তিনি মেরে দেন এভাবে।

ট্রান্সকমের সঙ্গে সাহেদের প্রতারণার বিষয়ে জানা যায়, ২০০৯ সালের জুনে ট্রান্সকম ইলেকট্রনিক্স থেকে সাহেদ রাইজিং শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিং কোম্পানি এবং রাইজিং রিয়েল এস্টেট প্রা. লি. নামে তার দুটি কোম্পানির অনুকূলে ওয়ার্ক অর্ডার দিয়ে ১৯ লাখ টাকার এসি এবং টিভি কেনেন। এর বিপরীতে তিনি তিনটি চেক দেন, যেগুলো একের পর এক প্রত্যাখ্যাত হয় ব্যাংকে। পরে এসিগুলো বাজারমূল্যের চেয়ে কম মূল্যে গুলশান ডিসিটি মার্কেটে বিক্রি করে দেন সাহেদ। ঘটনা জানতে পেরে ১৫ জুলাই সেখানে পুলিশ নিয়ে হাজির হন ট্রান্সকমের কর্মকর্তারা। সাতটি এসিসহ সাহেদকে গ্রেপ্তার করে কাফরুল থানার পুলিশ। এর আগে ২৬ জুন তার নামে দুটি প্রতারণা মামলা করেছিল ট্রান্সকম।

সাহেদের বেপরোয়া প্রতারণা থেকে রেহাই পায়নি তার ব্যবসায়িক অংশীদাররাও। একজন ব্যবসায়িক অংশীদার জানান, পাওনা নিয়ে কথা বলতে সাহেদের বাসায় গেলে তাদের তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিভিন্ন মন্ত্রীর সঙ্গে তার ছবি দেখিয়ে হুঁশিয়ার করেন, তার হাত অনেক লম্বা। যদি টাকা চায় ১০টা করে মামলা দেওয়া হবে তাদের বিরুদ্ধে।

সাহেদ তার হাত লম্বা বানানোর জন্য বেছে নেন মিডিয়া ও রাজনীতিকে। এই সুবাদে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির সান্নিধ্যে গিয়ে ছবি তুলে তা প্রচারের ব্যবস্থা নেন। অভিযোগ আছে, নানা কারসাজি করে বেসরকারি টিভি চ্যানেলেও মুখ দেখাতে শুরু করেন সাহেদ। একসময় টকশোতে নিয়মিত হয়ে যাওয়া সাহেদ এমনকি চ্যানেল আইয়ের তৃতীয় মাত্রার মতো দর্শক-আস্থার টকশোতে কথা বলার সুযোগ পেয়ে যান। তাকে প্রথম টিভি পর্দায় আনা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে কয়েকজন সাংবাদিক ভূমিকা রাখেন বলে প্রচার আছে। সাহেদের প্রতারণার কাজে মিডিয়ায় তার এই পরিচয় ব্যবহার করেন তিনি। সঙ্গে নিজের একটি আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার সম্পাদক পরিচয় তো ছিলই।

তবে টকশোতে সাহেদ নিজের পরিচয় ব্যবহার করতেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হিসেবে। ২০১৬-১৯ মেয়াদের আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ের বড় বড় প্রতারণা, এমনকি সরকারি বিভিন্ন কাজ ও সুযোগ-সুবিধা বাগানোর জন্য তার এই রাজনৈতিক পরিচয় ও যোগাযোগ ব্যবহার করেন সাহেদ।

জানা গেছে, সাহেদের বেপরোয়া প্রতারণার পেছনে শক্তি জুগিয়েছে তার বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ ওঠার পরও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায়। যেবার তিনি আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হন, সেবারই তার প্রতারণার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-২ থেকে পুলিশ সদর দপ্তরকে একটি চিঠি দেওয়া হয়। ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর উপসচিব মোহা. নায়েব আলী স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, মো. সাহেদ বিভিন্ন সময় নিজেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর ও লে. কর্নেল পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন অপকর্ম করে আসছেন। তিনি ১৯৯৬-২০০০ সময়কালে প্রধানমন্ত্রীর এডিসি ছিলেন বলেও পরিচয় দিতেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন ভয়ংকর প্রকৃতির লোক। তিনি নানা ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত। অভিযুক্ত ব্যক্তির নামে প্রতারণার দায়ে ইতিমধ্যে ঢাকার বিভিন্ন থানায় ৩১টি এবং বরিশালে ১টি মামলা রয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় প্রতারণা মামলায় দুই বছর জেল খাটেন তিনি।

সাহেদ রিজেন্ট গ্রুপ নামে যে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের পরিচয় দেন, এই নামটিও তিনি ‘হাইজ্যাক’ করেন। সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম আকবর খোন্দকারের ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত রিজেন্ট গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করছে। সাহেদ ২০১৪ সালে ‘রিজেন্ট গ্রুপ’ নামে কোম্পানি খুললে ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে গোলাম আকবর খোন্দকার আইনজীবীর মাধ্যমে সাহেদের ‘রিজেন্ট গ্রুপ’ বরাবরে আইনি নোটিশ পাঠান।

১৯৮৮ সালে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ থেকে নিবন্ধিত গোলাম আকবর খোন্দকারের রিজেন্ট গ্রুপের জমি নিজের বলে প্রচার করার মতো প্রতারণাও করেন সাহেদ। ২০১৫ সালে কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভে গোলাম আকবর খোন্দকারের রিজেন্ট গ্রুপের জমির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে তা ‘ফিল্ড ভিজিট’ বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেন। এ ঘটনায় গোলাম আকবর চৌধুরী সাহেদের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন।

সাহেদকে একজন বড় মাপের প্রতারক হিসেবে উল্লেখ করে মূল রিজেন্ট গ্রুপের ডেপুটি ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্যারিস্টার আকবর খন্দকার সাংবাদিকদের বলেন, ‘ফেক রিজেন্ট গ্রুপের ওয়েবসাইটে গেলে দেখা যাবে সাহেদ আমাদের অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর নাম ব্যবহার করছে।’

সাহেদের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে রিজেন্ট হসপিটাল লিমিটেড (মিরপুর ও উত্তরা), ঢাকা সেন্ট্রাল কলেজ, রিজেন্ট ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, হোটেল মিলিনা, আরকেসিএস মাইক্রোক্রেডিট ও কর্মসংস্থান সোসাইটি। একটিরও বৈধ লাইসেন্স নেই।

সরকারের সঙ্গেও প্রতারণা করেন মো. সাহেদ। তার লাইসেন্সবিহীন রিজেন্ট হাসপাতালকে করোনা চিকিৎসায় চুক্তিবদ্ধ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে। আর এ কাজে মন্ত্রণালয়কে ব্যবহার করেন তিনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে তারা সাহেদের রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তিব্দধ হয়। এই চুক্তির আওতায় কয়েক হাজার মানুষের করোনা স্যাম্পল নিয়ে পরীক্ষা ছাড়াই মনগড়া রিপোর্ট দিয়ে ধরা খেলেন সাহেদ। বেরিয়ে আসে তার নানা প্রতারণার ভয়ংকর সাম্রাজ্য। এই রিপোর্টে যার সামান্যই উঠে এসেছে।

(ঢাকাটাইমস/১৩জুলাই/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :