রাজধানীতে নতুন মাদক-১

ইয়াবার বিকল্প আইসের বাজার তৈরির চেষ্টায় সিন্ডিকেট

সিরাজুম সালেকীন
 | প্রকাশিত : ০৩ নভেম্বর ২০২১, ১১:০৫

ইয়াবা ট্যাবলেটের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি শক্তিশালী নতুন মাদক ‘আইস’ সেবন ও ব্যবসায় জড়াচ্ছে অভিজাত পরিবারের সন্তানরা। রাজধানীর অভিজাত এলাকার উচ্চবিত্ত পরিবারের বিপথগামী ছেলে-মেয়েদেরে মধ্যে এর চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় তারা ইয়াবার বিকল্প এ মাদকের বাজার তৈরির চেষ্টা করছে। মিয়ানমার থেকে দেড়-দুই হাজার টাকায় কেনা এক গ্রাম আইস রাজধানীতে বিক্রি করে ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা।

বেশি মুনাফার লোভে অনেক ইয়াবা কারবারি এখন ঝুঁকছেন আইস সিন্ডিকেটে। যেমন রাজধানীকেন্দ্রিক আইস বিক্রির মূলহোতা হিসেবে সামনে আসছে আলোচিত ‘ইয়াবা সুন্দরী’ ইডেন ডি সিলভা বা ইয়াবা কুইন সিলভার নাম।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

আইস-এর পূর্ণ নাম ক্রিস্টাল মিথাইল এমফিটামিন। লবণের মতো দানাদার এই ‘আইস’ দেখতে কখনো চিনির মতো, কখনো মিছরির মতো। আইস উচ্চমাত্রার মাদক, যা সেবনের পর মানবদেহে দ্রুত উত্তেজনার সৃষ্টি করে। এটি ১০ থেকে ১২ বার সেবনে একজন মানুষের মস্তিষ্কে বিরূপ প্রভাব পড়ে। মস্তিষ্কবিকৃতিতে মৃত্যুও হতে পারে। তাছাড়া অনিদ্রা, অতিরিক্ত উত্তেজনা, স্মৃতিভ্রম ও হৃদরোগকে বেগবান করে।

প্রথম দিকে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া থেকে দেশে আইস আসত। বর্তমানে ওই উৎস থেকে আসা একেবারে কমে গেছে। মাদক কারবারিরা এখন সীমান্তবর্তী দেশ মিয়ানমার থেকে আনছে আইসের চালান। মিয়ানমারের নাফ নদী ও সমুদ্র জলসীমা হয়ে প্রথমে কক্সবাজার আসে ভয়ংকর এই মাদক। ১০ থেকে ১২টি চক্র এই কারবারিতে জড়িত। তাদের মাধ্যমেই বিভিণ্ন কায়দায় রাজধানীতে আসছে আইস।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, রাজধানীর অভিজাত এলাকার উচ্চবিত্ত পরিবারের বিপথগামী ছেলে-মেয়েরা আইস সেবন ও কারবারের সঙ্গে জড়িত। ইয়াবার বিকল্প এই মাদকের বাজার তৈরিতে চেষ্টা করছে তারা। কারবারিরা মিয়ানমার থেকে এক গ্রাম আইস কেনেন দেড় থেকে দুই হাজার টাকায়। আর দেশের ভেতরে এর দাম ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। প্রতি গ্রামে লাভ ১৩ থেকে ২৩ হাজার টাকা। মিয়ানমার থেকে আনা চালান কক্সবাজারের টেকনাফ হয়ে পরে ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিক্রি হয়।

বিশেষ করে রাজধানীর উত্তরা, বনানী, গুলশান, বসুন্ধরা, রমনা, ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর এলাকায় অর্ধশতাধিক কারবারি সক্রিয়। তাদের নামের তালিকা করে গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। বেশি লাভ করতে এসব সিন্ডিকেটের সদস্যরা নিজেরাই কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে গিয়ে অভিনব পদ্ধতিতে রাজধানীতে আইস নিয়ে আসছে।

ইয়াবা তৈরির মূল উপাদান এমফিটামিন। ইয়াবায় থাকে ২০-২৫ শতাংশ এমফিটামিন। আইসও তৈরি হয় এমফিটামিন দিয়ে। তবে আইসের পুরোটাই এমফিটামিন। তাই ইয়াবার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি আইস সেবনে। কাচের টোব্যাকো পাইপের (ভং) তলায় আগুনের তাপ দিয়ে ধোঁয়া আকারে এটি গ্রহণ করে মাদকসেবীরা।

একবার আইস সেবন শুরু করলে আর এর থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায় না। যে কারণে ওই আইসসেবী যেকোনো অপরাধকর্মের মাধ্যমে টাকা জোগানোর চেষ্টা করবে। ইতিমধ্যে আইসের একটা ক্রেতাশ্রেণিও তৈরি হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে 'অভিজাত শ্রেণির' কাছে আইস জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় অনেকে এ ব্যবসায় জড়িয়েছে।

জানা গেছে, একসময় উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা ইয়াবা, গাঁজায় আসক্ত থাকলেও বর্তমানে আইসের প্রতি তাদের ঝোঁক বেড়েছে। আইস তাদের ভাষায় ‘স্টাফ’ ও ‘বরফ’। তাদের মধ্যে একটা কথার প্রচলন আছে, ‘ইয়াবা এখন রিকশাচালকরা সেবন করে, আমরা কেন তা খাব।’ তারা (উচ্চবিত্তের সন্তানরা) এখন গাঁজা সেবন করলেও তা বিদেশ থেকে অবৈধভাবে উপায়ে এনে সেবন করে।

গোয়েন্দারা বলছে, নতুন মাদক আইস কারবারে ধনী পরিবারের সন্তানরা জড়িত। এই (আইস) কারবারিতে অনেক টাকা প্রয়োজন হয়। অনেকে পরিবার থেকে টাকা এনে এই ব্যবসা চালাচ্ছে। তারা সহজে ধনীর হবার আশায় এই কারবারিতে জড়িত।

রাজধানীকেন্দ্রিক আইস বিক্রির মূলহোতা হিসেবে আলোচিত ‘ইয়াবা সুন্দরী’ ইডেন ডি সিলভা বা ইয়াবা কুইন সিলভার নাম রয়েছে। তার আরেক সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন ভাস্তে রাসেল। এই তালিকায় আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে। সিন্ডিকেটটির মূলহোতা র‌্যাবের হাতে বিলাসবহুল ফেরারি গাড়ি, অস্ত্র-মাদক ও বিপুল বিদেশি মুদ্রাসহ গ্রেপ্তার মিশু হাসান ও জিসান। তাদের প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন আলোচিত মডেল পিয়াসা। তিনিও র‌্যাবের হাতে আটক হয়ে কারাগারে আছেন।

সিন্ডিকেটটি রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় ডিজে পার্টির নামে আইসসহ বিভিন্ন মাদক বিক্রি ও সরবরাহ করত। কয়েক বছরে বনে গেছেন কোটি কোটি টাকার মালিক। মিশু হাসান ছিলেন এই চক্রের মাদক বিক্রি ও সরবরাহের মূল কারিগর। মাদকসহ অবৈধভাবে উপার্জিত কোটি কোটি টাকা দিয়ে বিদেশ থেকে দামি গাড়ি আনতেন মিশু। আর গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে ট্যাক্স ফাঁকিও দিতেন। জিসান ও মিশুর প্রায় ৫০টির বেশি ক্লায়েন্ট রয়েছে। এ ছাড়া দুবাইসহ বিদেশে তাদের ক্লায়েন্ট রয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছে, দেশের জব্দ করা বিভিন্ন আইসের রাসায়নিক পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সবই প্রায় এক চালানের মাদক। আইস আসক্তদের কিডনি, লিভারসহ অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি হয়। স্বভাব হয়ে ওঠে হিংস্র। হত্যাসহ যেকোনো অপরাধ করতে তারা দ্বিধা করে না। (দ্বিতীয় কিস্তি আগামীকাল)

(ঢাকাটাইমস/৩নভেম্বর/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :