এডিস মশা থেকে সতর্ক থাকবেন যেভাবে

স্বাস্থ্য ডেস্ক, ঢাকাটাইমস
  প্রকাশিত : ০৮ অক্টোবর ২০২২, ০৯:৫৪
অ- অ+

ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাবের কারণে উদ্বিগ্ন মানুষ। মশা অতি ক্ষুদ্রকায় পতঙ্গ হওয়ায় তার রূপ-প্রজাতি বিশ্লেষণ করে চিনে ওঠা বেশিরভাগ মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় না। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ৩,৫০০ এর বেশি প্রজাতির মশা রয়েছে। এর মধ্যে এডিস মশা মানুষের শরীরে রোগজীবাণু সংক্রমণের বাহক হিসেবে কাজ করে। ডেঙ্গুর মতো রোগ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তা মারাত্মক বিপদের কারণ হতে পারে। এমন কি ঘটতে পারে মৃত্যুও।

এডিস ইজিপ্টাই নামের মশার কামড়ে ডেঙ্গু রোগের সৃষ্টি হয়। এ রোগে আক্রান্ত হলে শরীরে ব্যাথা হয়, লাল গুটি দেখা দেয়, মাংসপেশী ও হাড়ের জোড়াতেও ব্যাথা হয়। চূড়ান্ত পর্যায়ে গেলে রক্তক্ষরণের ফলে এ রোগে মৃত্যুও হতে পারে। প্রথমবারের ধাক্কা সামলে উঠলেই যে মুক্তি তা কিন্তু নয়। ডেঙ্গু রোগে কেউ দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলে তা প্রথমবারের চেয়েও মারাত্মক হতে পারে৷।

ডেঙ্গু, এডিস মশা বাহিত একটি ভাইরাস ঘটিত জ্বর রোগ। ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি স্ট্রেইন (ডেন-১, ২, ৩ ও ডেন-৪) এর যেকোনো একটি দিয়ে ডেঙ্গু জ্বর হতে পারে। আর এই ভাইরাস বহন করে এডিস প্রজাতির মশা।

ডেঙ্গুর জীবাণু বহনকারী এডিস মশা খালি চোখে দেখে শনাক্ত করা সম্ভব। এই জাতীয় মশার দেহে সাদা কালো ডোরাকাটা দাগ থাকে, যে কারণে এটিকে টাইগার মশা বলা হয়। এই জাতীয় মশা মাঝারি আকারের হয়ে থাকে এবং এর অ্যান্টেনা বা শুঙ্গটি কিছুটা লোমশ দেখতে হয়। পুরুষ মশার অ্যান্টেনা স্ত্রী মশার চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি লোমশ দেখতে হয়।

ডেঙ্গু মশা দিনের বেলায় সব চেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে। বলা হয় যে সকাল ও বিকেলে সংক্রমণের সম্ভাবনা সব চেয়ে বেশি। গবেষণা অনুসারে, মশা দিনের বেলায় সব চেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে, সূর্যোদয়ের প্রায় ২ ঘন্টা পরে এবং সূর্যাস্তের কয়েক ঘন্টা আগে। যদিও, এডিস ইজিপ্টাই মশা সূর্যাস্তের পরেও মানুষকে কামড়াতে পারে। ডিম পাড়ার সময়কালে এডিস মশা একাধিক বার কামড়াতে পারে। ডিম পাড়ার পর ডিমগুলি বেশ কয়েক মাস ধরে পড়ে থাকে। জলের সংস্পর্শে এলেই সেগুলি থেকে বাচ্চা বের হয়।

ডেঙ্গু মশার কামড়ের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হল সেই জায়গা, যেখানে মশা একজন মানুষকে কামড়ায়। ডেঙ্গু সংক্রমিত মশা শরীরের বিভিন্ন অংশ, যেমন পায়ের গোড়ালি, কনুইয়ের চারপাশে কমড়ায়।

এডিস মশার একটা বিষয় হলো, তারা সাধারণত একাধিক ব্যক্তিকে কামড়ায়। তাই ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির শরীর থেকে এডিস মশার মধ্যে ভাইরাস সংক্রমণ হওয়ার পর ঐ মশার কামড়ে ডেঙ্গু হয়।

এডিস মশার দুটি প্রজাতি ঢাকা শহরে দেখা যায়, তার মধ্যে একটি হলো এডিস ইজিপ্টি আরেকটি হলো এডিস অ্যালবোপিকটাস। এডিস ইজিপ্টিকে নগরের মশা বা গৃহপালিত মশা বলা হয়ে থাকে। এ মশা নগরীর বাড়ি এবং বাড়ির আশেপাশে বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানিতে জন্মায়।

ইজিপ্টি মশা ডেঙ্গুর প্রধান বাহক। আমাদের দেশে ৯৫ ভাগ ডেঙ্গু রোগ ছড়ায় ইজিপ্ট প্রজাতির এডিস মশা। ডেঙ্গুর সেকেন্ডারি বা এপিডেমিক বাহক হচ্ছে এডিস অ্যালবোপিকটাস। অ্যালবোপিকটাস মশা বিভিন্ন পাত্র ছাড়াও গাছগাছালি যুক্ত এলাকায় গাছের কোটর, কলাগাছের দুই পাতার মাঝখানে, কচুর পাতার মাঝখানে, কাটা বাঁশের গোঁড়ায় জমে থাকা পানিতে জন্মায়।

বাংলাদেশ ১৯৬৪ সালে প্রথম ডেঙ্গু আসে তখন এটিকে ঢাকা ফিভার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বেশি হয় ২০০০ সালে। ওই বছর সরকারি হিসাব মতে ৫,৫০০ জন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় এবং ৫৫০ জন মারা যায়। ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে বাঁচতে নানাভাবে সতর্ক থাকতে হবে। কিন্তু সব সময় রক্ষা পাওয়া সহজ হয় না। কোনো কারণে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গেলে তখন নিজের প্রতি হতে হবে আরও বেশি যত্নশীল।

ডেঙ্গুর লক্ষণগুলো জেনে রাখা জরুরি। কোনো ধরনের উপসর্গ দেখা দিলেই যাতে সতর্ক হওয়া যায়। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জ্বর, র‌্যাশ, গায়ে ও হাত-পায়ে ব্যথা ইত্যাদি হলো প্রাথমিক লক্ষণ। এই রোগে আক্রান্ত হলে শরীর অনেকটাই দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তাই ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ দেখা দিলে বা ডেঙ্গু ধরা পড়লে খেতে হবে এই ৫ খাবার-

পানি

ডেঙ্গু হলে শরীরে অনেক ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শরীরে পানির ঘাটতি দেখা দেয়। যে কারণে এই জ্বরে আক্রান্ত হলে দিনে অন্তত তিন লিটার পানি পান করতে হবে। সেইসঙ্গে খেতে হবে তাজা ফলের রস, ডাবের পানি, আখের রস ইত্যাদি। এতে দ্রুত সুস্থ হওয়া সহজ হবে।

মাছ ও ডিম

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে নিয়মিত মাছ ও ডিম খাওয়া জরুরি। ডেঙ্গু রোগীর জন্যও এটি অবশ্য করণীয়। এক্ষেত্রে খেতে হবে ছোট মাছ। এতে তেল কম ও প্রোটিন বেশি থাকে। শরীরে শক্তি জোগানোর জন্য প্রোটিন খুব জরুরি। সেইসঙ্গে ডিমেও থাকে প্রচুর প্রোটিন। এছাড়া থাকে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি-সহ নানা উপাদান। তাই ডেঙ্গু থেকে দ্রুত সুস্থ হতে মাছ ও ডিম খান নিয়মিত।

মুরগির মাংস

ডেঙ্গু রোগীদের ক্ষেত্রে মুরগির মাংস খাওয়া উপকারী। মুরগির মাংসে থাকে যথেষ্ট প্রোটিন। এছাড়া ফ্যাট থাকে অনেক কম। যে কারণে শরীরে শক্তি পাওয়া যায় পর্যাপ্ত। মাসল লস হয় না। তাই দ্রুত সুস্থ হতে মুরগির মাংস খান। অতিরিক্ত মসলাদার নয়, অল্প মসলায় রান্না করা বা মুরগির মাংসের স্যুপ খান।

ফল

ডেঙ্গু রোগীদের জন্য কার্যকরী একটি খাবার হলো ফল। এতে আছে প্রচুর ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। শরীর ভালো রাখতে সাহায্য করে বিভিন্ন ধরনের ফল। এক্ষেত্রে পেঁপে, আপেল, পেয়ারা, ড্রাগন ফল ও মৌসুমী বিভিন্ন ফল খান।

সবজি

সুস্থ থাকার জন্য সবজি খাওয়ার বিকল্প নেই। সবজি খেলে শরীরে ফাইবারের ঘাটতি পূরণ হয়। ফাইবার শরীর ভালো রাখতে কাজ করে। সেইসঙ্গে সবজিতে থাকে পর্যাপ্ত ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। যে কারণে পর্যাপ্ত সবজি খেলে ডেঙ্গুকে কাবু করা সহজ হয়।

যেভাবে সতর্ক থাকবেন

দিনের বেলা পায়ে মোজা ব্যবহার করতে পারেন। ফুল হাতার জামা পরুন। শিশুদের হাফপ্যান্টের বদলে ফুলপ্যান্ট বা পায়জামা পরাতে হবে। দিনে ও রাতে ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করতে হবে। মশা যেন না কামড়াতে পারে এজন্য মশাবিরোধী বিভিন্ন ক্রিম বা তেল শররের খোলা স্থানে ব্যবহার করুন। দরজা-জানালায় নেট লাগাতে হবে। মশা তাড়াতে স্প্রে, লোশন, ক্রিম, কয়েল, ম্যাট ব্যবহার করতে পারেন। ফুলদানি, অব্যবহৃত কৌটা, বাড়িঘরের আশপাশে যে কোনে পাত্রে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করুন। ঘরের বাথরুমে কোথাও পানি জমাবেন না। বাড়ির ছাদে বাগানের টবে বা পাত্রে যেন পানি জমে না থাকে। প্রয়োজনে প্রতিদিন পানি বদলে ফেলুন। বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড়, জঙ্গল, জলাশয় ইত্যাদি পরিষ্কার রাখুন।

এডিস মশা খুব অল্প পানিতে (৫ মিলি বা ১ চা চামচ পানি) ডিম পাড়ে যা পানি ছাড়াও প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে। এই জন্যই লার্ভা ধ্বংসে টেমিফস ১ গ্রাম/১০ লিটার পানিতে খুব কার্যকরী, যা ব্যবহার পরিবেশ ও মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়। নির্মাণাধীন ভবনের প্রজননস্থল ধ্বংস করে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত রোগের প্রাদুর্ভাব কমানো সম্ভব।

এডিস মশার জন্ম হয় পাত্রের জমে থাকা পানিতে। সপ্তাহে অন্তত একদিন নিজের বাড়ি এবং বাড়ির চারদিকে ঘুরে দেখুন, কোথাও কোনো পাত্রে পানি জমে আছে কি না। যদি থাকে তাহলে তা ফেলে দিন বা পরিষ্কার করুন। যদি পাত্রটি এমন হয় যে, পানি ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না তাহলে সেখানে কীটনাশক বা কেরোসিন বা ব্লিচিং পাউডার বা লবণ দিন।

গাড়ির অব্যবহৃত টায়ার বাসায় রাখবেন না কারণ এখানে এডিস মশার জন্ম হয় যদি রাখতেই হয় তাহলে ছাউনির নিচে রাখুন যেন পানি জমা না হয় । দই বা যেকোনো খাবারের পাত্র বাইরে ফেলবেন না। বাথরুমে যদি পানি ধরে রাখতে হয় তাহলে পানির পাত্র সপ্তাহে অন্তত একবার ব্লিচিং পাউডার বা ডিটারজেন্ট দিয়ে ভালো করে ধুয়ে আবার পানি ভর্তি করুন।

এডিস মশা পানির পাত্রের কিনারে ডিম পাড়ে এবং পাত্রের গায়ে আটকে থাকে। যে কারণে পানি ফেলে দিলেও ডিম নষ্ট হয় না। তাই এটাকে ব্লিচিং পাউডার বা ডিটারজেন্ট দিয়ে ভালোভাবে ঘষে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

আপনার বাড়ির পাশে কোন নির্মাণাধীন ভবন থাকলে, এটার বেজমেন্ট, লিফটের গর্ত, ইট ভেজানোর চৌবাচ্চা, ড্রাম পরীক্ষা করুন। যদি এসব জায়গায় জমে থাকা পানিতে ছোট ছোট পোকা দেখতে পান তাহলে বুঝবেন সেটি এডিস মশার লার্ভা বা বাচ্চা। নির্মাণাধীন ভবনের মালিককে সামাজিকভাবে চাপ প্রয়োগ করুন যেন সে তার বাড়িতে মশা জন্মানোর স্থান তৈরি না করেন। নির্মাণাধীন ভবন যদি আপনার হয় তাহলে সেখানে জমে থাকা পানিতে কীটনাশক বা কেরোসিন বা ব্লিচিং পাউডার দিয়ে রাখুন।

আপনার বাড়ির আশেপাশে যদি মশা জন্মানোর মতো কোনো সরকারি বেসরকারি স্থাপনা থাকে তাহলে ওই অফিসকে জানান। বাড়ির আশেপাশে গাছের গর্ত বা কাটা বাঁশের গোঁড়া মাটি দিয়ে বন্ধ করে দিন। কারণ গাছের কোটর বা বাঁশের গর্তে এডিস মশার জন্ম হয়।

(ঢাকাটাইমস/০৮ অক্টোবর/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
পদোন্নতি না পেয়ে পদত্যাগ করলেন সিআইডির ভারপ্রাপ্ত প্রধান আলী আকবর?
আদ-দ্বীন হাসপাতালে ৬ নবজাতকের মৃত্যু: হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি
ডিবি উত্তরা বিভাগের ডিসি হলেন ইলিয়াস কবির
ঢাকার সড়কে এআই নজরদারিতে এক মাসে ৬৭২ মামলা, মোট জরিমানা প্রায় ৯ কোটি
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা