আদ-দ্বীন হাসপাতালে ৬ নবজাতকের মৃত্যু: হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি

রাজধানীর মগবাজারে আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার প্রমাণ পেয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি।
কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ও নার্সদের গাফিলতি, দীর্ঘ সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এসি) ব্যবস্থা বন্ধ থাকা, পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশনের অভাব এবং অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতির কারণে ওই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতে পারে।
বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন।
মন্ত্রী বলেন, সরেজমিন পরিদর্শন, ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক, নার্স ও কর্মীদের বক্তব্য এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তদন্ত কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, গত ২৭ মে ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক, নার্স, স্টাফ এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
কী পেয়েছে তদন্ত কমিটি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডটি হাসপাতাল পরিচালনার উপযোগী ছিল না। কক্ষটিতে দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকায় এবং পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়। একই সঙ্গে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যায়।
তদন্ত কমিটির ভাষ্য, দায়িত্বে থাকা নার্সদের মধ্যে চরম অবহেলা ও অসহযোগিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। নবজাতকদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করা হয়নি। এমনকি অভিভাবকদের অনুরোধ সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের দ্রুত অবহিত করা হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রায় ৯০০ বর্গফুট আয়তনের ওই কক্ষে ১১ জন রোগী, নবজাতক ও স্বজন মিলিয়ে প্রায় ৫০ জন অবস্থান করছিলেন, যা ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি।
তদন্ত কমিটির মতে, হাসপাতাল পরিচালনার মৌলিক শর্ত পূরণে প্রশাসনিক ব্যর্থতাও ছিল।
ময়নাতদন্ত না হওয়ায় মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—ছোট ও বদ্ধ কক্ষে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি, দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকা, বিকল্প ভেন্টিলেশনের অভাব, বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যাওয়া। তদন্ত কমিটির মতে, এসব পরিস্থিতিতে নবজাতকদের দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীদের তদারকির জন্য কোনো চিকিৎসক দায়িত্বে ছিলেন না। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় নার্সদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও ছিল না।
এ ছাড়া আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি এবং রোগী ও স্বজনদের অতিরিক্ত উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। হাসপাতালের ভেতরে যত্রতত্র কাচের ছোট কক্ষ নির্মাণ করায় পুরো ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেছে তদন্ত কমিটি।
ভবিষ্যতে বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ভবনের উপযোগিতা যাচাই এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছে কমিটি।
তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলসহ সম্ভাব্য সব বিষয় আইনের আলোকে বিবেচনা করা হবে।
তিনি জানান, ঘটনাস্থলের সংশ্লিষ্ট পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষটি ইতিমধ্যে সিলগালা করা হয়েছে। তবে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুই শতাধিক রোগী থাকায় পুরো হাসপাতাল বন্ধ করা হয়নি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, এই ঘটনার পর বেসরকারি হাসপাতালগুলোর তদারকি আরও জোরদার করা হয়েছে। সারা দেশের হাসপাতালগুলো পরিদর্শন করে অনুরূপ অনিয়ম পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে রোববারের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানানো হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































