আজ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

দেড় যুগে দেশের দুর্নীতি কতটা নির্মূল করতে পেরেছে দুদক

মিজান মালিক, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ২১ নভেম্বর ২০২২, ০৯:০০

দেখতে দেখতে ১৮ বছর পার করল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দেড় যুগ। কম সময় নয়। একটা স্বাধীন প্রতিষ্ঠানকে তার সবটুকু সক্ষমতা দেখানোর জন্য যথেষ্ট সময়। কিন্তু দুদক এই সময়ে দেশের দুর্নীতি কতটা নির্মূল করতে পেরেছ? যারা দেশের সুশাসন নিয়ে কাজ করেন, তারা দুদকের ১৮ বছরকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন। তারা বলছেন, দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণে প্রতিষ্ঠানটি কতটুকু সফলতা দেখাতে পেরেছে সে বিষয়ে খোদ দুদকের কাছ থেকে বক্তব্য জানা দরকার। তবে আপাত দৃষ্টিতে যা দেখা যায়, তার মূল কথা হলো দুদক এখনো তাদের চেষ্টাটা চালিয়ে যাচ্ছে।

দুর্নীতি দমন ব্যুরোর কাছ থেকে দুর্নীতি দমনে আশানুরূপ কাজ না পেয়ে দেশের মানুষ হতাশ হয়। দুর্নীতি দমন ব্যুরোর কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করে দাতা সংস্থাও। দেশের ভেতরেও ব্যুরোর কাজ নিয়ে সমালোচনা হয়। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার নতুন একটি আইন করে। ২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করে। কমিশনের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় বিচারপতি সুলতান হোসেন খানকে। আর কমিশনার হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর এম মনিরুজ্জামান মিঞা ও অডিট বিভাগের মনির উদ্দিন আহমেদকে নিয়োগ দেয় সরকার। কমিশন গঠনের ফলে তাদের কাছে সবার প্রত্যাশা বেড়ে যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক সত্য হচ্ছে, ওই সরকার তাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে কমিশন বা দুদক গঠন করলেও এর বিধিবিধান বা অর্গানোগ্রাম করে দেয়নি। এ জন্য শুরুতেই কাজ করতে গিয়ে হোঁচট খায় প্রতিষ্ঠানটি। সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে ফের তাগিদ আসে। এমনকি গণমাধ্যম থেকেও দুদককে সক্রিয় করার বিষয়ে নানা ধরনের প্রতিবেদন করা হয়। পরে ওই সরকারের শেষ সময়ে এসে দুদককে সক্রিয় করার নানামুখী পদক্ষেপ নেয়া হয়। কিন্তু ততদিনে জল অনেকদূর গড়িয়ে যায়। ২০০৬ সালের শেষের দিকে সরকারের নিয়ন্ত্রণ সংকুচিক হয়ে পড়ে। দেশে এক এগারোর জরুরি সরকার আসে ২০০৭ সালে। তখন রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র দিয়ে বিদায় নেন জোট সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া চেয়ারম্যান ও অপর দুই কমিশনার। জরুরি সরকারের সময়ে তাড়াহুড়া করে বিধিমালা ও অর্গানোগ্রাম করা হয়। তা দিয়েই দেশে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু হয়। ওই অভিযানে দেশের দুই দলের প্রধান থেকে শুরু করে শীর্ষ রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, সরকারি আমলা ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত অনেকেই গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠায়। অনেকের সাজাও হয়। কিন্তু স্বল্প সময়ে দেশ থেকে দুর্নীতি তাড়াতে গিয়ে সে সময় দুদক হুটহাট করে মামলা করায় সরকার পরিবর্তন হলে অনেকের মামলা টেকেনি। তবে কারো কারো মামলা থেকে যায় চলমান।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দুদক চেয়ারম্যান লে. জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরী পদত্যাগ করে চলে যান। তবে তার সঙ্গে নিয়োগ পাওয়া কমিশনার হাবিবুর রহমান ও মনজুর মান্নান থেকে যান। সরকার হাসান মশহুদ চৌধুরীর স্থলাভিষিক্ত করে জাঁদরেল সচিব গোলাম রহমানকে। তার সময়ে চেষ্টা ছিল ওয়ান ইলেভেনের সময়কার মামলা ও তদন্ত সচল রাখার। কিন্তু আইনি বাধায় তিনিও তেমন পেরে ওঠেননি। তবে নতুন তদন্ত বা মামলা করে আলোচনায় ছিল তার কমিশন। কমিশনার হাবিবুর রহমান ও মনজুর মান্নানের মেয়াদ শেষ হলে দুদকে নতুন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক জেলা জজ মুক্তিযোদ্ধা মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ও দুদকের এক সময়ের মহাপরিচালক বদিউজ্জামান। তাদের নিয়োগের পর কমিশন বেশ কিছু আলোচিত মামলা ও তদন্ত করে। এর মধ্যে ছিল ২০০৯ সালের সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আবুদল মান্নান খান, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের মামলা করা। এই কমিশনের সময়ে গণমাধ্যমে ডেসটিনি ও হলমার্কের জালিয়াতি এবং দুর্নীতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে অনুসন্ধান শেষে মামলা করে। এর বাইরে বিশ^ব্যাংক থেকে পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তার অনুসন্ধানও শুরু করে এই কমিশন। তবে কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু শুরু থেকেই পদ্মা সেতুর অনুসন্ধানের ঘোরবিরোধী ছিলেন। মামলা হয়েছিল সাবেক মন্ত্রী আবুল হোসেন, আবুল হাসান ও সাবেক সেতু সচিবসহ ৭-৮ জনের বিরুদ্ধে। মামলার চার্জশিটের বিরোধিতা করেও আলোচনায় আসেন কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। পরে অবশ্য মামলাটির ফাইনাল রিপোর্ট হয়। সরকারও বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিল।

যাই হোক, এই কমিশনের মেয়াদেই বেসিক ব্যাংকের সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেংকারির ঘটনা অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। এমনকি অনুসন্ধান শেষে ৬১টি মামলাও করা হয়। কিন্তু ব্যাংকটির চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে কোনো একটি মামলায়ও আসামি করা হয়নি। এমনকি পর্ষদের কাউকেও না। এ নিয়ে দুদক সমালোচনায় পড়ে। অবশ্য পরে দুদক আবদুল হাই বাচ্চুকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তিনি ‘পর্ষদ ঋণ প্রদানের বিষয়ে সবকিছু জানে’ বলে দায় তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেন। অপরদিকে, পর্ষদ সদস্যরা দায় চাপান বাচ্চুর ওপর। এভাবে ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় একে অপরকে দোষারোপ করে দুদকের কাছে বক্তব্য দেন। দুদক তা রেকর্ড করে রাখলেও কার্যত মামলাগুলোর তদন্ত শেষ করতে পারেনি। উচ্চ আদালত থেকেও একাধিকবার দুদককে তদন্ত শেষ করার জন্য তাগিদ দেয়া হয়েছে। এখনো সেই তাগিদের মধ্যেই আছে দুদক। কবে শেষ হবে এই মামলাগুলোর তদন্ত তা কেউ বলতে পারেনি।

দুদকের আরেকটি অক্ষম দিক হলো দেশ থেকে অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারা। দুদক ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করে কিছু মানি লন্ডারিং মামলা করলেও ২০১৫ সালে আইন পরিবর্তন করে দুদকের কাছ থেকে মানি লন্ডারিং আইনে তদন্ত ভার দেয়া হয় এনবিআর ও সিআইডিসহ পাঁচটি সংস্থাকে। এমনকি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকেও এ কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়। আর দুদকের হাতে দেয়া হয় সরকারি কর্মকর্তাদের বিষয়টি। যদি তাদের কেউ মানি লন্ডারিং বা অর্থপাচার করেন তার দেখভালের। ফলে বেসরকারিভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারে জড়িতদের বিরুদ্ধে দুদক আর কোনো তদন্ত করতে পারেনি। যদিও হাইকোর্ট থেকে একটি রায়ে দুদককে অর্থপাচার ঘটনার তদন্ত করার সুযোগ রয়েছে মর্মে বলা হয়। কিন্তু মূল আইনে ক্ষমতা কার্টেল করায় দুদক এখন অর্থপাচার তদন্ত ও মামলার ক্ষেত্রে একেবারে ঘুমিয়ে।

সাবেক সিনিয়র সচিব ইকবাল মাহমুদ দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেয়ার পর ধারণা করা হচ্ছিল তিনি অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে শক্ত কিছু করবেন। কিন্তু তার সময়ে প্যারাডাইস ও পানামা কেলেংকারির অনুসন্ধান শুরু হলেও শেষ করতে পারেননি। এমনকি তার পাঁচ বছর মেয়াদে বেসিক ব্যাংকের অর্থ কেলেংকারির তদন্তেরও কোনো সুরাহা করতে পারেননি। তবে তার সময়ে দুর্নীতির মামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এমনকি অনুসন্ধান পর্যায়েও অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়। ফাঁদ মামলার কার্যক্রমও শুরু হয় তার সময়ে। কিন্তু মেয়াদের শেষের দিকে এসে চুপসে যায় গ্রেপ্তার অভিযান ও হাতেনাতে ঘুষসহ ফাঁদ মামলার কার্যক্রম। তার সময়ে দুদকের বিধিমালা পরিবর্তন করে থানার পরিবর্তে দুদক কার্যলয়েই মামলা দায়েরের পদ্ধতি চালু করা হয়।

বর্তমান কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক আমলা মোহাম্মদ মঈন আবদুল্লাহ। কমিশনার হিসেবে আছেন সাবেক সিনিয়র সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান ও সাবেক জেলা জজ জহুরুল হক। তাদের নেতৃত্বে গঠিত কর্শিনও অর্থপাচারের বিরুদ্ধে জোড়ালো কোনো ভূমিকা রাখতে পারছেন না। এমনকি বেসিক ব্যাংকের মামলার নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে তেমন কোনো তৎপরতা নেই। দুদকের মামলা হওয়ার পর আসামি গ্রেপ্তার অভিযানও বন্ধ। তবে অর্থপাচার আইনে সংশোধনী আনতে বর্তমান কমিশন থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এটি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিদ্যমান বাস্তবতায় কেন দুদকের হাতে মানি লন্ডারিং আইনে তদন্তের ক্ষমতা দরকার তাও তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। তাদের প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ হয়ে বর্তমানে বিবেচনার জন্য সরকারের আর্থিক বিভাগে রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দুদকের কাজ আরও দৃশ্যমান হওয়া দরকার। দুই-চার পাঁচ লাখার পেটি দুর্নীতির জন্য অবৈধ সম্পদের মামলার দুর্নীতি নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তাদের ব্যস্ত রাখলে দেশের বড় দুর্নীতি হাত ফসকে যাবে। যেটা হচ্ছেও। বিশেষ করে দেশ থেকে অর্থপাচারের মতো বৃহৎ দুর্নীতি দেশকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে। তার বিরুদ্ধে দুদককে অগ্রণী ভূমিকায় আসতে হবে। যদিও খোদ দুদকের কমিশনার জহুরুল হক সাংবাদিকদের এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, দেশ থেকে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা নয়, লাখ কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। কিন্তু আইনি সীমাবদ্ধতায় তেমন কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না। আমরাও তার সঙ্গে বলতে চাই, অর্থপাচারের ওপর তদন্তের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করে দুদক আরো শক্ত হয়ে আর্থিক খাতের দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে আরো সোচ্চার হোক।

(ঢাকাটাইমস/২১নভেম্বর)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন এর সর্বশেষ

ডলার সংকটের মধ্যেও গাড়ি আমদানিতে রেকর্ড

বছরে ২৬ হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছে ‘অবৈধ’ বিদেশিরা

অস্থির রোহিঙ্গা ক্যাম্প, নানা শঙ্কা-ঝুঁকি

পুলিশ বক্স উচ্ছেদ নিয়ে ডিএনসিসি-পুলিশ মুখোমুখি, এখন কী হবে...

অর্থনীতিতে ইতিবাচক মোড়

আওয়ামী লীগ ক্ষমা করেছে, নেতারা কীভাবে জানবেন? প্রশ্ন শুভাকাঙ্ক্ষীদের

‘গোপনে দেশ ছাড়তে’ তৎপর কাউন্সিলর মাসুম মোল্লা, বিমানবন্দরে পুলিশের চিঠি

বেশি মনখারাপ হলে ফারদিনের ভিডিও দেখেন বাবা

‘ফারদিনের মৃত্যুতে কেউ দায়ী নয়’, বুশরাকে দায়মুক্তি দিয়ে ডিবির প্রতিবেদন যাচ্ছে আদালতে

অবৈধ সম্পদ: স্বাস্থ্যের আবজাল কারাগারে, স্ত্রী পালিয়ে অস্ট্রেলিয়ায়, মামলায় ধীরগতি

এই বিভাগের সব খবর

শিরোনাম :