মুশতাক-তিশাকে বইমেলা থেকে তাড়িয়ে দেয়া যেভাবে দেখা হচ্ছে

মেহেদী সম্রাট, ঢাকা টাইমস
| আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:৪৭ | প্রকাশিত : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:১৬

খন্দকার মুশতাক আহমেদ ও সিনথিয়া ইসলাম তিশা। সামাজিক মাধ্যমে বহুল আলোচিত দুটি নাম। ৪২ বছর বয়সের ব্যবধানকে পাশ কাটিয়ে ভালোবেসে একে অন্যকে বিয়ে করেছেন এই দম্পতি। রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য ছিলেন খন্দকার মুশতাক আহমেদ একই কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন সিনথিয়া ইসলাম তিশা। তাদের এই বিয়েকে অনেকেই বলছেন ‘অসম বিয়ে’। নিজেদের প্রেম ও পরিণয়ের গল্প নিয়ে এবারের একুশে বইমেলায় ‘তিশার ভালোবাসা’ ও ‘তিশা অ্যান্ড মুশতাক’ নামে দুটি বইও লিখেছেন তারা। বই দুটি প্রকাশ করেছে মিজান পাবলিশার্স। সেই বইয়ের লেখক হিসেবে মেলায় গিয়ে শুক্রবার এক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে এই দম্পতিকে।

এদিন মুশতাক আহমেদ ও তার স্ত্রী তিশাকে ‘ভুয়া ভুয়া’ ও ‘ছি ছি’ দুয়োধ্বনি দিয়ে বইমেলা প্রাঙ্গণ থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য করেন মেলায় আসা শতাধিক দর্শনার্থী। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদেরকে নিরাপত্তা দিয়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের গেট দিয়ে মেলা প্রাঙ্গণ থেকে বের হয়ে যেতে সাহায্য করেন।

বিষয়টি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন মন্তব্য, আলোচনা-সমালোচনা চলছে সামাজিক মাধ্যমে। এই দম্পতিকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় সরব থাকা নেটিজেনদের কেউ কেউ বলছেন, তাদের এই বিয়ে নৈতিকতা বিবর্জিত একটি কাজ, এটি সামাজিক অবক্ষয়ের কুফল। কেউ আবার বলেছেন, আইনগতভাবে তারা কোনো অপরাধ করেননি, প্রত্যেক মানুষেরই অধিকার রয়েছে নিজের জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার।

মুশতাক-তিশা দম্পতির ‘অসম বিয়ে’ এবং তাদের বইমেলা থেকে বিতাড়িত করার ঘটনা নিয়ে ঢাকা টাইমস কথা বলেছে ভিকটিম মুশতাক আহমেদ, মেলা কর্তৃপক্ষ, লেখক-প্রকাশক, সমাজবিজ্ঞানী এবং মানবাধিকার কর্মীদের সঙ্গে। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন তারা।

শুক্রবারের ওই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে মুশতাক আহমেদ বলেন, “প্রথমে অনেক মানুষ আমাদের সঙ্গে সেলফি তুলতে ভীর করেছিল। তারা আমাদের পক্ষেই স্লোগান দিচ্ছিল। তারপর হঠাৎ কিছু উচ্ছৃঙ্খল মানুষ একটা অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। পরে আমরা বইমেলা থেকে চলে আসতে বাধ্য হই। এই পরিস্থিতি যারা তৈরি করেছে তারা এটি কেন করেছে আমার বোধগম্য হচ্ছে না। সবার যেমন বাক স্বাধীনতা রয়েছে, তেমনি আমারও বই লেখার অধিকার রয়েছে। আমি আশা করব যথাযথ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন।”

বইমেলায় সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব মেলা কর্তৃপক্ষের দাবি করে মুশতাক আরও বলেন, “বিষয়টি নিয়ে আমি বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিবের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদেরকে লিখিতভাবেও জানাব। আমরা আবার মেলায় যাব, কিন্তু বইমেলায় সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব মেলা কর্তৃপক্ষের।”

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা টাইমস জানতে চেয়েছিল বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব কে এম মুজাহিদুল ইসলামের কাছে। মুঠোফোনে তিনি বলেন, “সবারই অধিকার আছে বইমেলায় আসার। বাংলা একাডেমি এটা নিয়ে নির্দিষ্ট করে কোনো কথা বলবে না। আমরা তো কাউকে বের করিনি। মেলায় কে কীভাবে আসবেন এটা যার যার বিষয়। ওখানে ঝামেলা হওয়ায় পুলিশকে অবহিত করা হয়েছিল। ওই প্রকাশনীকে বলা হয়েছিল, তাদেরকে যদি নিজেদের স্টলের মধ্যে রাখতে পারেন তাহলে রাখেন, পাশের স্টলে যেন ডিস্টার্ব না হয়। এরপর ওই দম্পতি স্বেচ্ছায় মেলা থেকে চলে যান।”

মুজাহিদুল ইসলাম আরও বলেন, “মেলায় কাউকে আলাদা করে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়। তার নিরাপত্তার জন্য কি আলাদা ফোর্স ব্যবহার করব? সেটা কি সম্ভব?”

বইমেলা থেকে কাউকে বের করে দেওয়ার অধিকার কোনো নাগরিকের নেই উল্লেখ করে মানবাধিকার ও নারীঅধিকার নিয়ে কাজ করা সমাজকর্মী খুশি কবীর ঢাকা টাইমসকে বলেন, “সাধারণ কোনো নাগরিক যদি মনে করেন মোরাল পুলিশিংয়ের দায়িত্ব তার হাতে, সে যা খুশি করতে পারে, তাহলে আমাদের রাষ্ট্র আমাদের সমাজ তো হয়ে যাবে যে যেরকম চায় সেরকম। আমাদের সরকার আছে, পুলিশ আছে, বইমেলা কর্তৃপক্ষ আছে সর্বোপরি আমাদের একটা রাষ্ট্রযন্ত্র আছে, এখানে কোনো পাবলিক কাউকে বইমেলা থেকে বের করে দেওয়ার অধিকার রাখে না। তারা প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারে। আমাদের কাউকে ভালো না-ই লাগতে পারে। তাই বলে আমরা কি তাকে বইমেলা থেকে বের করে দিতে পারি?”

বিষয়টিকে খুবই ভয়াবহ প্রবণতা উল্লেখ করে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ এবং সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে খুশী কবির আরও বলেন, “কে কাকে বিয়ে করেছে, কেন বিয়ে করেছে, বয়সের পার্থক্য কী- এটাতো অন্যদের মাথাব্যাথার কারণ নয়। পাবলিক ইচ্ছেমতো তাদের হাতে আইন তুলে নিতে পারে না। এটি বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ এবং সরকারের দেখা উচিত। এ ধরনের ঘটনা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে যায় না। এগুলো এ দেশে কাম্য নয়।”

বইমেলা থেকে অসম বয়সী দম্পতি লেখক মুশতাক ও তিশাকে বের করে দেওয়াকে ‘মানবাধিকারের লঙ্ঘন’ বলে উল্লেখ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সমাজবিজ্ঞানী রাশেদা ইরশাদ নাসির। তিনি ঢাকা টাইমসকে বলেন, “সব লেখাই যে প্রশংসাযোগ্য হবে তা তো নয়, সমালোচনা হতেই পারে। তাই বলে কাউকে বের করে দেওয়ার অধিকার তো কারো নেই। আর অসম বয়সের বিয়ের কথা যদি বলি, তাহলে এটাতো যার যার ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয়।”

প্রসঙ্গক্রমে বর্তমান প্রজন্মের কথা এলে রাশেদা ইরশাদ আরও বলেন, “আমাদের সামাজিক শাসনটা কমে আসছে। এখন এটা হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। আগে যে সামাজিক অনুশাসন ছিল, যেমন- ছেলেমেয়েরা সন্ধ্যার মধ্যে বাড়ি ফিরবে, পরিবারের সবার সঙ্গে থাকবে, পরিবারের সবাই একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করবে, নিয়মমাফিক পড়াশোনা করবে, সীমিত সময় টিভি দেখবে, পরিবারের বড়দের পরামর্শ মেনে চলবে– এগুলো কিন্তু এখন হয় না। এখনকার ছেলেমেয়েরা খেয়ালখুশিমতো রাত জাগছে, দিনের বেলায় ঘুমাচ্ছে, যে যার মতো চলছে। এর কারণ আগের সেই পারিবারিক বন্ধনটা এখন আর নাই। পরিবার যে একটা প্রতিষ্ঠান এই ধারণাটা দিনদিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। সম্পর্কগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, সম্পর্কগুলোর মধ্যে অনেকটা গ্যাপ তৈরি হয়েছে। বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক, বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর সম্পর্ক, শিক্ষকের সঙ্গে শিক্ষার্থীর সম্পর্ক এখন আর আগের মতো নেই। সমাজে একটা জেনারেশন গ্যাপ তৈরি হয়েছে। যার ফলে সামাজিক অবক্ষয় ঘটছে। মুশতাক-তিশার ‘অসম বিয়ে’ বা বইমেলার ওই ঘটনাই তার প্রমাণ।”

“নৈতিকতার জায়গা থেকে সামাজিকভাবে এরকম অসম বিয়ের ঘটনা মেনে নেয়া যায় না, তবে সাহিত্য-সংস্কৃতি ও জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র বইমেলা থেকে কাউকে এভাবে বের করে দেওয়ার উচ্ছৃঙ্খলতাও কাম্য নয়” উল্লেখ করে তুষারধারা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী লেখক ও প্রকাশক আমিনুল ইসলাম মামুন বলেন, “একটি হচ্ছে সামাজিক বিষয় আরেকটি হচ্ছে আইনগত বিষয়। আইনগত দিক থেকে যদি বিবেচনা করা হয় তাহলে, বয়সের পার্থক্য যাই হোক, তারা বিয়ে করেছেন এটা অপরাধ নয়। কিন্তু সামাজিক বা নৈতিক দিক থেকে কেউ কেউ এ ধরনের অসম বয়সের বিয়েকে সমর্থন না-ও করতে পারেন। এটা যার যার ব্যক্তিগত বিষয়। আমি যদি এটাকে সমর্থন না করি তাহলে আমি এটা থেকে বা তাদের থেকে দূরে থাকব। নৈতিকভাবে আমি সেটাকে বর্জন করতে পারি। তবে, বইমেলা থেকে কাউকে এভাবে দুয়োধ্বনি দিয়ে বের করে দেওয়াটা কখনোই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না।”

লেখক ও প্রকাশক মামুন আরও বলেন, “যেহেতু এটা ব্যাক্তিগত বিষয় তাই ওই দম্পতিরও উচিত ছিল এটাকে পাবলিকলি প্রমোট না করা। তারা কিন্তু বিভিন্নভাবে সামাজিক মাধ্যমে, গণমাধ্যমে এবং সর্বশেষ বই লিখে বিষয়টিকে পাবলিকলি নিয়ে এসেছেন। এতে সমাজে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।”

(ঢাকাটাইমস/১১ফেব্রুয়ারি/এফএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন এর সর্বশেষ

মজুত ফুরালেই বাড়তি দামে বিক্রি হবে সয়াবিন তেল

কোন দিকে মোড় নিচ্ছে ইরান-ইসরায়েল সংকট

ছাদ থেকে পড়ে ডিবি কর্মকর্তার গৃহকর্মীর মৃত্যু: প্রতিবেদনে আদালতকে যা জানাল পুলিশ

উইমেন্স ওয়ার্ল্ড: স্পর্শকাতর ভিডিও পর্নোগ্রাফিতে গেছে কি না খুঁজছে পুলিশ

জাবির হলে স্বামীকে বেঁধে স্ত্রীকে জঙ্গলে ধর্ষণ, কোথায় আটকে আছে তদন্ত?

নাথান বমের স্ত্রী কোথায়

চালের বস্তায় জাত-দাম লিখতে গড়িমসি

গুলিস্তান আন্ডারপাসে অপরিকল্পিত পাতাল মার্কেট অতি অগ্নিঝুঁকিতে 

সিদ্ধেশ্বরীতে ব্যাংক কর্মকর্তার মৃত্যু: তিন মাস পেরিয়ে গেলেও অন্ধকারে পুলিশ

রং মাখানো তুলি কাগজ ছুঁলেই হয়ে উঠছে একেকটা তিমিরবিনাশি গল্প

এই বিভাগের সব খবর

শিরোনাম :