ভিক্ষা এখন বাণিজ্য, টার্গেট রমজান ও ঈদ

হাসান মেহেদী, ঢাকা টাইমস
| আপডেট : ২৩ মার্চ ২০২৪, ১৫:০৪ | প্রকাশিত : ২৩ মার্চ ২০২৪, ০৮:৪২

রাজধানীতে বর্তমানে তিন ধরনের ভিক্ষুক দেখা যায়। এরমধ্যে রয়েছে সাময়িক সময়ের জন্য প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ঢাকায় আসা অতিথি ভিক্ষুক। যারা বিশেষ দিবস বা দিনকে টার্গেট করে ভিক্ষার কাজে নামে। এরপর ফিরে যায় নিজ এলাকায় ও পুরোনো পেশায়।

বছরজুড়ে বিভিন্ন গণপরিবহন, অফিসপাড়া, বিভিন্ন মসজিদের সামনে ও বাসা বাড়িতে সুস্থ শরীরের নানা বয়সী নারী-পুরুষ ভিক্ষাবৃত্তি করেন। এদের অনেকেই সুস্থ স্বাভাবিক হলেও বিভিন্ন বাহানা দিয়ে ভিক্ষা করেন তারা। এরা মূলত রাজধানীর পেশাজীবী ভিক্ষুক।

এছাড়াও সহায় সম্বলহীন হতদরিদ্র কর্মহীন ও অসুস্থ অনেকেই সহায়তা চেয়ে ভিক্ষা করে থাকেন। সারাদিন ভিক্ষার অর্থ ও উত্তোলিত খাদ্যসামগ্রী দিয়েই চলে তাদের জীবন জীবিকা।

ঢাকার স্থায়ী ভিক্ষুকদের কাছ থেকে জানা গেছে, শব-ই-বরাত, শব-ই-কদর এবং ঈদে পাড়া মহল্লা ও মসজিদের সামনে অনেক অপরিচিত ভিক্ষুকের আনাগোনা বাড়ে।

বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে থাকা ভিক্ষুক আজগর মিয়া ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘রোজার ঈদ আইলেই গ্রামেত্তন কতডি মানুষ ঢাহা আইয়া পরে ভিক্ষা করতো। তাগো লাইগা আমরা এই মাসে তেমন ভিক্ষা পাই না। আমরা সরকারের কাছে আবেদন করি এইসব ভুয়া ভিক্ষুকদের যেন জেলে দেয়। আমরেয়া লেংরা লুলা ভিক্ষা আমাগো অধিকার। আর ওরা (অতিথি ভিক্ষুক) সুস্থ হইয়াও এক মাসের লাইগা আহে ভিক্ষা করতে।’

সরেজমিনে জানা যায়, রমজান মাস এলেই নগরীর বিভিন্ন স্থানে ভিক্ষুকের উপদ্রব বাড়ে। সকাল থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত তারা ভিক্ষা করে। অনেকে আবার এই কাজের সহায়তায় শিশুদের ব্যবহার করেন।

বেশ কয়েক বছর ধরে রাজধানীতে ঈদুল ফিতরকে ঘিরে অতিথি ভিক্ষুকের আধিক্য দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন নগরবাসী। রোজার শুরু থেকে অতিথি ভিক্ষুকের সংখ্যা বাড়তে থাকে বলে জানান তারা।

সরেজমিন বেশকিছু ভিক্ষুকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইতোমধ্যে ঢাকার বাইরে থেকে বিপুল সংখ্যক ভিক্ষুক রাজধানীতে এসেছে। এদের মধ্যে পেশাজীবী ভিক্ষুক ও অতিথি ভিক্ষুকের সংখ্যাই বেশি। ঢাকায় বেশ কিছু সিন্ডিকেট দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে স্বল্প আয়ের মানুষদের ভাড়া করে ঢাকায় এনে খণ্ডকালীন ভিক্ষাবৃত্তিতে নামিয়ে দেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। আবার অনেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আত্মীয় স্বজন নিয়ে ঢাকায় এসে এক মাসের জন্য বাসা ভাড়া নিয়ে বিভিন্ন বাসা বাড়িতে, মসজিদের সামনে, ব্যাংকপাড়া ও অভিজাত এলাকায় ভিক্ষার কাজে নেমে পড়ছে।

শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর ইস্কাটনের অফিসার কোয়ার্টার্স এলাকায় সমাজ সেবা অধিদপ্তর ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের যৌথ অভিযান চলে। অভিযানে ২৯ জন ভিক্ষুককে পুনর্বাসনের জন্য মিরপুরের ভিক্ষুক পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়।

অভিযান পরিচালনা করেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুল হাসান।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী সমাজসেবা অফিসার আকমল হোসেন ঢাকা টাইমসকে বলেন, সম্প্রতি রাজধানীতে ভিক্ষুকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। সিটি কর্পোরেশনের সহায়তায় সমাজসেবা অধিদপ্তর ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসনের জন্য বিভিন্ন এলাকায় অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

তিনি আরও বলেন, ইস্কাটন এলাকায় দুপুরের দিকে প্রায় দেড়শ ভিক্ষুক ছিল। আমাদের অভিযান শুরু হতে দেখেই অনেকেই দৌড়ে পালিয়ে গেছে। তাদের মধ্য থেকে ২৯ জন ভিক্ষুককে আমরা ধরতে পেরেছি।

অভিযানে আটক মো. মোস্তফা (৬০) ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমি আজকেই ভৈরব থেইকা ঢাকায় আইছি। আমার দুনিয়ায় কেউ নাই। দুই মাইয়া আছিল বিয়া দিইয়ালছি। এহন পেডের দায়ে ভিক্ষা করি। দেশে (গ্রামে) তেমন ভিক্ষা পাই না তাই ঢাহা আইছি। স্যারেরা আমারে ধরছে। কইলো আমারে নাকি তাগো লগে লইয়া যাইবো। খাওন দিবো থাহার যায়গাও দিবো। এমন হইলেতো আমার লাইগা ভালোই হয়।’

খিলগাও নন্দিপাড়া থেকে ইস্কাটন এলাকায় এসে আটক হয়েছেন ৫৫ বছর বয়সী সুফিয়া বেগম। তিনি ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমি আইজকাই আইছি ভিক্ষা করতে। এর আগে কহনো করি নাই। মানষের বাসা বাড়িতে কাম কইরা সংসার চালাই। আগে জানলে আমি এইহানে ভিক্ষা করতে আইতাম না। অভাবে পইরা আইছি। স্যারেরা আমাগো নাকি লইয়া যাইবো।’

উল্লেখ্য, ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য ২০১০ সালে ‘ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান’ শীর্ষক কর্মসূচি হাতে নেয় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। তবে ২০১০ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৪ বছর পার হলেও সারাদেশের মাত্র ১৭ হাজার ৭১০ জন ভিক্ষুককে পুনর্বাসন করা হয়েছে। এছাড়া সমাজসেবা অধিদপ্তর কিংবা প্রকল্পের তেমন কার্যক্রম লক্ষ্য করা যায়নি।

এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম ঢাকা টাইমসকে বলেন, এই সমাজে যারা ভিক্ষা করেন তারা খুবই অসহায়, সম্বলহীন, কর্মহীন। বিশেষ স্থানে, অভিজাত পাড়ায় ভিক্ষুকরা আসেন কিছু সহায়তা পাওয়ার আশায়। তারা যদি প্রত্যেকে পরিপূর্ণ স্বাবলম্বী হলে ভিক্ষা করতে আসতো না। অনেক ভিক্ষুক আছেন যারা ইচ্ছা করে ভিক্ষা করেন না। তাদের অনেকেই প্রতিবন্ধী, অসুস্থ এবং কর্মক্ষম। এ সকল মানুষের পাশে সকলের দাঁড়ানো নৈতিক দায়িত্ব।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকার ভিক্ষুক পুনর্বাসনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে। তবে যারা দায়িত্বরত আছেন বাস্তবে তাদের কার্যক্রম চোখে পড়ার মতো না। ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থানে এত টাকা ব্যয় করছে সরকার সেই টাকার কাজ কোথায় হচ্ছে। দুর্নীতির কারণে সরকারের ব্যয়ের হলেও কাজ হচ্ছে না। ফলে ভিক্ষুকের সংখ্যা বাড়ছে। যদি ভিক্ষুকদের কর্মসংস্থান করা যেত, তাদের পুনর্বাসন বাস্তবায়ন করা যেত তাহলে রাজধানীতে ভিক্ষুক থাকতো না। সমাজে প্রতিটি সেক্টরেই দুর্নীতি। দুর্নীতির কারণেই ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন শতভাগ বাস্তবায়ন হয় না।’

সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য মতে, বিমানবন্দরে প্রবেশ পথের পূর্ব পাশের চৌরাস্তা, বিমানবন্দর পুলিশ ফাঁড়ি ও এর আশপাশের এলাকা, হোটেল রেডিসন সংলগ্ন এলাকা, ভি আই পি রোড, বেইলী রোড, হোটেল সোনারগাঁও, হোটেল রূপসী বাংলা সংলগ্ন এলাকা, রবীন্দ্র সরণি এবং কূটনৈতিক জোন সমূহের এলাকা প্রাথমিকভাবে ভিক্ষুকমুক্ত ঘোষণা করেছে সরকার। এ সকল এলাকা ভিক্ষুকমুক্ত রাখার লক্ষ্যে নিয়মিত মাইকিং, বিজ্ঞাপন, লিফলেট বিতরণ এবং বিভিন্ন স্থানে নষ্ট হয়ে যাওয়া ফ্লাগস্ট্যান্ড মেরামত ও নতুন স্থাপন করার কাজ চলমান রয়েছে। তবে অন্যান্য এলাকাগুলোতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের এমন কার্যক্রম নেই বললেই চলে।

জানা গেছে, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৪১টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে ২ হাজার ৯শ’ জন ভিক্ষুককে আটক করা হয়। আটককৃতদের রাখার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় ৭৫০ জনকে (ভিক্ষাবৃত্তি না করার শর্তে) মুক্তি দেওয়া হয়। অবশিষ্ট ২ হাজার ১৫০ জনকে বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণের নিমিত্তে আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে আটককৃত ভিক্ষুকদের আশ্রয়কেন্দ্রে রাখার নিমিত্তে ৫টি আশ্রয়কেন্দ্রের অভ্যন্তরে ফাঁকা জায়গায় অস্থায়ী ভিত্তিতে ১৬টি টিনসেড ডরমিটরি ভবন নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে।

জানা যায়, ‘ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান’ শীর্ষক কর্মসূচির ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে ঢাকায় ২য় কিস্তিতে (অক্টোবর ২৩-ডিসেম্বর ২৩) ২৯ লাখ ১৭ হাজার ৩১৬ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও সারাদেশে ১২ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদান করেছে সরকার। এই অর্থবছরে দেশে উপকারভোগীর সংখ্যা ৩ হাজার জন।

(ঢাকাটাইমস/২৩মার্চ/এইচএম/এমআর/পিএস)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :