কর্মীদের আন্দোলনে এলজিইডিতে অচলাবস্থা

সিরাজুম সালেকীন
 | প্রকাশিত : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৮:১৯

চাকরি স্থায়ী করার দাবিতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের (এলজিইডি) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিক্ষোভ থামছে না। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এলজিইডি ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে কর্মীদের এই আন্দোলন সাত দিনে ঠেকেছে। দাবি আদায় না হলে কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছেন কর্মীরা।

এদিকে কাজ ছেড়ে কর্মীদের একটি বড় অংশ আন্দোলনে নামায় মাঠপর্যায়ে এলজিইডির কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটছে। স্থবির হওয়ার পথে বিভিন্ন প্রকল্পের কার্যক্রম। এলজিইডির একাধিক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলমান এই বিক্ষোভ কর্মসূচিতে কয়েক হাজার কর্মচারী অংশ নিচ্ছেন। এতে আছেন এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পের কর্মকর্তারাও। আন্দোলনরত কর্মীরা বলছেন, দাবি আদায় না হলে এবার আর তারা ঘরে ফিরে যাবেন না। প্রয়োজনে ঢাকার বাইরেও আন্দোলনে নামবেন এলজিইডির অস্থায়ী চাকুরেরা। আজ কর্মসূচিতে উপস্থিতি আরও বাড়বে বলে জানান তারা।

আন্দোলনরত কর্মচারীদের অভিযোগ, যুগের পর যুগ তারা দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে এলজিইডিতে কাজ করে গেলেও তাদের স্থায়ী করা হচ্ছে না। এ ব্যাপারে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকার পরও এলজিইডি বিভাগের ঊর্ধ্বতন কিছু কর্মকর্তার কারণে এটি কার্যকর হচ্ছে না। বরং প্রায় দুই যুগ অস্থায়ী পদে চাকরি করা কর্মচারীদের ইচ্ছামতো ছাঁটাই করে দেওয়া হচ্ছে।

রুহুল আমিন। টাঙ্গাইল এলজিইডিতে দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে কম্পিউটার অপারেটর পদে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে (মাস্টার রোলে) চাকরি করছেন। তাকে স্থায়ী করা তো দূরে থাক, বছর তিনেক আগে দৃশ্যত কোনো কারণ ছাড়াই ছাঁটাই করা হয়েছে।

 

‘এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে দীর্ঘ ২৩ বছর চাকরি করেছি। কিন্তু চাকরি স্থায়ী হয়নি। অনেক ধরনা দিয়েছি। বড় কর্মকর্তারা বলেছেন চাকরি স্থায়ী হবে। হয়নি। বরং ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে আমাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।’

এই কর্মী জানান, ‘তার চাকরি স্থায়ী করার ব্যাপারে আদালতের নির্দেশনা থাকলেও এলজিইডি তার তোয়াক্কা করেনি। অথচ এখনো আমার যে বয়স আছে তাতে পাঁচ বছর চাকরি করতে পারব।’

এলজিইডি কর্মচারী ঐক্য পরিষদের সহ-সভাপতি ফেরদৌস আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা আজ ছয় দিন ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় পড়ে আছি। শুধুমাত্র স্থায়ী একটা চাকরির আশায়। আমরা তো কোনো অন্যায় আবদার করছি না। আমাদের দাবি যৌক্তিক। আদালতের নির্দেশনা আছে। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে এলজিইডির বড় কর্তাদের মন গলছে না। তারা আমাদের দাবিকে গুরুত্বই দিচ্ছে না।’ 

আন্দোলন আরও জোরদার করা হচ্ছে জানিয়ে ফেরদৌস আহমেদ বলেন, ‘রবিবার (আজ) সারা দেশ থেকে আরও লোক আসবে। এখন পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে কেউ কোনো কথা বলেনি। কোনো আশা দেয়নি। আমরা দাবি আদায় না করে ঘরে ফিরব না।’

আন্দোলনে অংশ নেওয়া হাবিবুল ইসলাম বলেন, ‘১৮ বছর চাকরির পরও যদি স্থায়ী হতে না পারি, তাহলে আর কবে হব? আমাদের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ কী? তাদের জন্য তো কিছুই করতে পারি নাই। আমাদের চাকরি স্থায়ী করার ব্যাপারে আদালতের রায় আছে। কিন্তু প্রধান প্রকৌশলী ঘোরাচ্ছেন। আমরা দাবি আদায়ে মাঠে নেমেছি। চাকরি স্থায়ী না হলে ঘরে ফিরব না।’

এলজিইডি কর্মচারী ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রফিকুল ইসলাম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘২০১০ ও ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্ট এলজিইডির মাস্টার রোল ও উন্নয়ন প্রকল্পের সাত হাজার ৫২৬ জনের স্থায়ী নিয়োগ দিতে রায় দেয়। রায়ের পর তিন হাজার ৮২৩ জনকে স্থায়ী করা হয়। পদ শূন্য না থাকায় বাকিদের পরে স্থায়ী করা হবে বলে তখন ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু সম্প্রতি পাঁচ হাজারের বেশি পদ শূন্য থাকলেও মাস্টার রোল ও উন্নয়ন প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না।’

‘বিষয়টি নিয়ে আমরা একাধিকবার এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদের কাছে গিয়েছি তিনি আশ^স্ত করেছেন। অথচ এখন জানতে পেরেছি আমাদের বাদ দিয়ে নতুন লোক নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এই প্রতিবাদে আমরা চার দিন ধরে আন্দোলন করছি।’

আন্দোলনরত শ্রমিকদের অভিযোগ, যুগের পর যুগ দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে চাকরি করছেন তারা। অথচ কর্তৃপক্ষ তাদের চাকরি স্থায়ী করার ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। এ ব্যাপারে উচ্চ আদালতে রায় আছে। অথচ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি করছেন।

আন্দোলনকারীরা জানান, স্থায়ী নিয়োগ না হওয়ায় তাদের সাতজন কর্মকর্তা-কর্মচারী দুশ্চিন্তায় স্ট্রোক করে মারা গেছেন। এবারের আন্দোলনে পায় কুড়িজনের বেশি শ্রমিক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আছেন।

ফরিদপুরে এলজিইডির আঞ্চলিক কার্যালয়ে কম্পিউটার অপারেটর পদে কুড়ি বছর ধরে কাজ করছেন একজন কর্মচারী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মী জানান, ‘চাকরি জীবন ২০ বছর পার হয়েছে। শূন্যপদ আছে, অথচ আমাকে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না। এখনো মাস্টার রোলে কাজ করি। এখানে যারা আন্দোলন করতে এসেছেন, কারও চাকরির বয়সই ১০ বছরের কম নয়। আমরা যদি এখনো স্থায়ী হতে না পারি, তবে কবে হব?’

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিদিনের কাজ জড়িত। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ আন্দোলনে আসায় দৈনন্দিনকার কাজে এর প্রভাব পড়ছে। এটি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে এই বিভাগে অচলাবস্থা দেখা দিতে পারে।

এ ব্যাপারে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তিনি কল ধরেননি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :