নারীদের সম্পত্তির অধিকার রক্ষায় আমরা কি সচেতন?

মো. মাশফাকুর রহমান
| আপডেট : ০৮ মার্চ ২০১৯, ১৬:২৮ | প্রকাশিত : ০৮ মার্চ ২০১৯, ১৬:১৯

একটি দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। দেশের উন্নয়ন কল্পে গৃহীত সব স্বল্প ও দীর্ঘকালীন পরিকল্পনা এবং কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হলে, নারীদের সর্বস্তরে সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার গুরুত্ব ইতিমধ্যেই স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত সত্য। কিন্তু,  নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করার উপায় প্রশ্নে আমাদের সামাজিক প্রেক্ষিত, বাস্তবতা, সংস্কৃতি, পারিবারিক কাঠামো,সম্পদের মালিকানা, নারী শিক্ষা, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রভৃতি নিয়ামকগুলো বিবেচনায় নেয়া অত্যন্ত জরুরি। যে পারিবারিক কাঠামো ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীরা বেড়ে ওঠে, সেই সামাজিক পরিবেশ কতটা তাদের প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সহায়ক, বা কতটা অন্তরায় তা বিশ্লেষণ ও বিবেচনার অভাবে নারীর ক্ষমতায়নে গৃহীত অধিকাংশ পদক্ষেপসমূহ খুব বেশি আলোর মুখ দেখে না।

ক্ষমতা কাঠামোর মূল ধারায়, অর্থ্যাৎ আর্থিক কার্যক্রম ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারলে প্রকৃত ক্ষমতায়নে গৃহীত কর্মসূচি কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান দেবে এমন আশা করা কঠিন। সম্পত্তির ওপর নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা 'নারীর ক্ষমতায়নে'র অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ। কিন্তু, আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোতে নারীদের প্রাপ্য সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিতকরণের পথে অনেক বাধা বিদ্যমান, যা নারীদের অন্যান্য অধিকার প্রতিষ্টার পথে অন্যতম প্রধান  'অন্তয়ায়' হিসেবে আবির্ভূত হয়। উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইন/বিধিতে নারীর সম্পত্তির অধিকার প্রশ্নে আলোচনা বা সমালোচনার শেষ নেই। কিন্তু, যতটুকু অধিকার ইতিমধ্যে প্রচলিত বিধিতে আছে, সেটুকু কি আদৌ রাষ্ট্র বা এ সমাজ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে? সত্যিকার অর্থে ‘নারীর ক্ষমতায়ন' জন্য সর্বস্তরে নারীর অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ সৃষ্টি আবশ্যক। প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিতকরণের নিমিত্ত নারীদের প্রাপ্য সম্পত্তির ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নাতীত। আমাদের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় অর্থ, সঞ্চয়, পুঁজি, বিনিয়োগ, সম্পদের বন্টন প্রভৃতি নিয়ামকগুলোতে নারীকে তার স্পেস তৈরি করে দিতে পারাটাই মূল চ্যালেঞ্জ। আর এটা নিশ্চিত করা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

নারী নির্যাতন, যৌতুক এবং বাল্য বিবাহ প্রভৃতি সামাজিক ব্যাধির মূল উৎপাটনে নারীর আর্থিক ও সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করা প্রধানতম উপায়। রাষ্ট্রযন্ত্রের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে নারীদের বিশেষ সুবিধা প্রদানের নীতি তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ কিছুটা প্রশস্ত করলেও প্রাপ্য সম্পত্তির ওপর অধিকারহীনতা নারীর ক্ষমতায়ন কল্পে গৃহীত পদক্ষেপগুলো টেকসই' সমাধান দিতে পারছে না।

নারীরা আর্থিক ও সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণের খাটো হয়ে থাকায়, অন্যান্য ক্ষেত্রগুলো,  প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বলয়, ব্যবসায়িক উদ্যোগ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল, সামাজিক আন্দোলন এবং উন্নয়নে নেতৃত্ব প্রভৃতি ক্ষেত্রে নারীদের অবস্থান সংকুচিত হয়ে আসে। এতে, আমাদের সামাজিক বাস্তবতায়, অধিকাংশ পরিবারে নারীদের ভাবা হয় ‘অতিথি’। কন্যাদের ক্যারিয়ার বা শিক্ষার জন্য খরচ করতে খুব আগ্রহী এমন সচেতন পিতা-মাতার সংখ্যা এখনো বেশ নগণ্য। নিজের নিরাপত্তা ও পরবর্তী প্রজন্ম হিসেবে নারীর সক্ষমতা ও সামর্থ্যের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস আছে এমন পিতা-মাতা এ সমাজে হাতে গোনা। কলেজ-স্কুলগামী ছেলে সন্তানের জন্য সাইকেল বাবদ বা প্রাইভেট টিউটর বাবদ পিতা-মাতাকে যতটা উদারহস্তে বিলাতে দেখা যায়, কন্যাদের প্রয়োজনে যানবাহন বা ‘টিউটর নিয়োগ’ এর চিন্তায় তাদের এতটা উদ্বিগ্ন হতে দেখা যায় না।

অসম ও অপ্রতুল আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় আমাদের 'পিতা-মাতা'রা প্রায়শ একজন কর্মক্ষম পুরুষের, অর্থ্যাৎ, ছেলে সন্তানের জন্য প্রত্যাশী থাকে, যাতে করে বৃদ্ধকালে তাদের জীবিকার নিরাপত্তা থাকে। মূলত, আর্থিক নিরাপত্তা বোধ অনেকাংশে এভাবে আমাদের পিতা-মাতাদের ভাবতে শেখায়। আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তাহীনতাবোধ পিতা- মাতাদের এমন সংকীর্ন চিন্তায় ভাবতে অনেকটা বাধ্য করে।

একজন একজন অবিবাহিতা নারী আমাদের পিতামাতার সংসারে কর্মহীন থাকে, তখন সে হয়ে ওঠে ‘বোঝা’। কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা-মাতা'র  কন্যা পাত্রস্থ করা নিয়ে যতটা মাথাব্যথা চোখে পড়ে, ভাইদের মধ্যে সেই উদ্বিগ্নতা খুব বেশি লক্ষণীয় নয়। বোনদের বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নে খরচ, পড়াশোনার ব্যয় এবং যৌতুক বা গিফট প্রভৃতি খাতে ভাইদের কর্তৃক ব্যয়িত অর্থের যোগানকে বোনদের প্রাপ্য সম্পত্তির বদলে পরিশোধযোগ্য' মনে করা হয়। কন্যারা তার পিতা-মাতার সূত্রে প্রাপ্য সম্পত্তি দাবি করতে সংশয়বোধ করে।  একদিকে পিতার সূত্রে প্রাপ্যতায় তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে কুণ্ঠাবোধ করে চক্ষু-লজ্জার খাতিরে, অন্য দিকে স্বামীর সংসারে, স্বামী বেচে থাকা অবধি স্ত্রী হিসেবে সম্পত্তি নিয়ে ভাবনা তার মাথায় আসে না, কারণে আমাদের মায়েরা বরাবরই উদার ও মমতাময়ী।

এভাবে, ধীরে ধীরে,  সম্পত্তি ও অর্থের ওপর তার যখন অধিকার থাকে না, তখন নারীরা বাধ্য হয়েই, তাদের মধ্যে অন্যের আশ্রয়ে ও করুণার পাত্র হয়ে উঠতে অভ্যস্ত হতে হয়। ফলে, নারীর মধ্যের আত্ম-নির্ভরশীলতাবোধ, আত্ম-মর্যাদা, আত্ম-পরিচয় নিয়ে বেড়ে উঠার রাস্তা পিচ্চিল হয়ে যায়। হীনম্মন্যতা তাদের মধ্যে বাসা বাধে।  তাদের উদ্যোম,সৎ সাহস ও স্বনির্ভরতার বাসনা ফ্যাকাসে হয়ে ওঠে। সত্যি বলতে, এই হীনম্মন্যতা একজন ভালো উদ্যোক্তা ও নেতৃত্ব গুণসম্পন্ন হয়ে দাঁড়াবার পথ হয়ে কণ্টকময় ও বন্ধুর। ফলে, নিজেদের অধিকার এর প্রশ্নে সোচ্চার হয়ে নীতি নির্ধারণ পর্যায়ে সক্রিয় অংশগ্রহণ করা এবং একটি কার্যকর চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হিসেবে দাঁড়ানো খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সামাজিক  নাজুক অবস্থান ও অসচ্ছলতার কারণে নারীরা তাদের পিতা-মাতা বা শেষ আশ্রয়- এফ (পিতা-মাতা ও ভাই'দের) নিকট নিজেদের প্রাপ্য সম্পত্তির অধিকার নিয়ে কথা বলতে চায় না। পিতা-মাতা মৃত্যুবরণ করলে এমনও হয়, অনেক ভাইয়েরা পিতা-মাতার ত্যক্ত সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হয়ে রেকর্ডকরণ বা রেকর্ড হালকরণকালে ওয়ারিশন সনদে বোন'দের বা পিতার বোনদের অস্তিত্ব অস্বীকার করে সমুদয় নিজেদের নামে লিখনভুক্ত করে হস্তগত করতে হীন প্রয়াস চালায়।  

বোনের সম্পত্তি বা পিতার বোনের সম্পিত্তি হস্তগত করার হীন চেষ্টায় এমন কি মিথ্যা তথ্য দিয়ে নারীদের নি:সন্তান বা মৃত বলে ঘোষণা করার দৃষ্টান্তও এদেশে বিরল নয়। কিন্তু, ধৈর্যশীল নারী উত্তরাধীকারীরা (বোন বা পিতার বোন) নিজের পিতার সংসারের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হবার আশংকায় টু' শব্দটিও করে না। অনেক ক্ষেত্রে এমন অধিকার সচেতন নারীদের সম্পত্তির অধিকার চাওয়ার ‘সৎ সাহস’ কে 'দুঃসাহস' হিসেবে দেখা হয়।

আমাদের সংস্কৃতিতে এই প্রবণতাকে স্বার্থপরতা বলে ধরা হয়। এমনকি এজন্য অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদের নিকট তাদেরকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। এছাড়া, খুব স্বতস্ফূর্তভাবে আমাদের দেশে অধিকাংশ পরিবারে বিবাহিত নারীদের প্রাপ্য সম্পত্তি  তাদেরকে সামাজিক পরিবেশে বুঝিয়ে দেয়ার রীতি বিরল। নির্ভরশীল পিতা-মাতা তাদের মেয়েদের সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য প্রত্যাশা করলেও নিজেদের আশ্রয় ও নির্ভরতা, ছেলে সন্তানদের সাথে পাছে সম্পর্ক নষ্ট হয়, ভেবে আর মুখ খোলেন না। পিতা-মাতা কিন্তু সব সন্তানের প্রাপ্যতা সাম্য ও ন্যয্যতার ভিত্তিতে বুঝিয়ে দেয়ার মানসিকতা রাখে। পারিবারিক বাস্তবতায় বর্ণিত প্রেক্ষিতে, সম্পত্তি অধিকার মোতাবেক বন্টন করে দিতে খুব আগ্রহী হয়ে ওঠে না।

সম্পত্তির (ভূমি) মালিকানার অন্যতম প্রধান শর্ত ও নিয়ামক হল, দখল ও নিয়ন্ত্রণ।  কিন্তু, বিবাহিত নারীদের দ্বারা নিজেদের সম্পত্তির ওপর দখল ও নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন, পিতা/ভাইদের বা তাদের সন্তানদের ওপর নির্ভর করতে হয়। এক সময়ে, ভাইয়েরা বা ভাই'দের সন্তানরা নিজেদের 'সম্পত্তি' হিসেবে ভাবতে শুরু করে। অধিকাংশ পরিবারে ভাই'দের মধ্যে সম্পত্তির বন্টনকালে বোন ও বিধমা মা' দের বন্টনের বাইরে বঞ্চিত করা হয়।

আমাদের সমাজে, সংসারে নারী'দের রিপ্রডাক্টিব ও হোম ম্যানেজার এর মত অসামান্য ভূমিকা-কে আর্থিক মানদণ্ডে বিবেচনার রীতি কম, বিধায় তাদের এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ অবদান পরিবারের অন্যান্য সদস্য বা সন্তানদের নিকট খুব দৃশ্যমান ও বিশেষ কিছু মনে হয়না।এ কারণেই সংসারে, পিতাকে দেবতার আসনে বসালেও মা'দের প্রতি এমন শ্রদ্ধাপূর্ণ ভয় তেমন থাকে না। সন্তানদের প্রতি মা'দের দেয়া অনুশাসন পালন-কে বাধ্যতামূলকমনে করার প্রবণতা খুব কম। সম্পত্তি ও সম্পদের উপর অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ না থাকায়, পরিবারের সন্তান ও অন্যান্য সদস্য কর্তৃক 'গৃহিনী ' নারীদের প্রাপ্য ন্যূনতম মর্যাদা ও সম্মান দেয়ার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না। এমন পরিবার এ সমাজে খুজে পাওয়া খুব কঠিন হবে, যেখানে বৃদ্ধ বিধবা মা' নিজে তার স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তি একান্ত নিজের আর্থিক সংকটে নিজের মতো করে বিক্রি করে খরচ করার অধিকার রাখে। বিধবা মা'দের ভরণ পোষণ বাবদ তাদের প্রাপ্য সম্পত্তির অধিকার উধাও হয়ে যায়।

এদেশের বাস্তবতায়, নারীরা সম্পত্তির অধিকার চাইলে, তাদের সম্পর্ক ছিন্নকারী ও অসামাজিক হিসেবে দেখা হয়। এই অন্যায্য 'মূল্যবোধ' বা দৃষ্টিভঙ্গির জাতা কলে পড়ে অনেক মা'দের পিতার সূত্রে প্রাপ্তসম্পত্তির অধিকার থেকে চিরকাল বঞ্চিত হয়ে থাকতে হয়েছে। এমন কি,  সম্পত্তির দাবি করে স্বত্বের প্রতিষ্ঠায় আদালতের আশ্রয় নিয়ে অনেক নারীদের তাদের ভাই'দের বা পিতা-মাতার পরিবারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে আশ্রয়হীন হয়ে বাচতে হয়েছে। এমন উদাহরণ অনেক। এ সমাজে খুব কম পরিবার পাওয়া যাবে, যেখানে সেচ্ছায় ও স্ব প্রণোদিত হয়ে নিজেদের বোনের বা বাবা'র বোন ( ফুফু) দের সম্পত্তি ডেকে বুঝিয়ে দিয়েছে। অনেকে আবার, ভবিষ্যতে যেন পিতার বোন'দের বা বোনেদের সন্তানরা দাবি করতে না পারে, বোন' দের নামমাত্র মূল্য বুঝিয়ে দিয়ে নিজেদের নামে লিখিয়ে নেয়ার সংস্কৃতি লক্ষ্যণীয়।

তাছাড়া, পিতা-মাতা তাদের ক্রয়কৃত সম্পত্তি নিজেদের ছেলে সন্তান'দের নামেই দলিল সম্পাদন করে লিখে নিতে বেশি নিরাপদ মনে করেন। তাই, পিতা-মাতার অর্থে ওই সম্পত্তির উপরে ছেলেদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়, আর নারীরা (কন্যা সন্তান) সেই সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়। আর, এ কারণে নারীদের তার পিতার অর্জিত সমুদয় সম্পত্তির উপর অধিকার প্রতিষ্ঠার আইনি সুযোগ খুব  সীমিত হয়ে যায়। অনেক পিতা মৃত্যুকালে তার সম্ভাব্য বিধবা স্ত্রীর আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তার শংকায়, সম্পত্তির একাংশ ছেলে সন্তানদের প্রাপ্যতার অতিরিক্ত হেবা ঘোষণা ডিড, বা উইল করে যান। অধিকন্তু, পিতা-মাতা জীবিট থাকাকালে সন্তানদের মধ্যে বন্টননামা দলিল করে প্রাপ্য সম্পত্তি সুষ্ঠুভাবে বন্টন করে দেয়ার রীতি না থাকায়, পরবর্তী প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে একে অপরের সাথে মামলা মকোদ্দমা লিপ্ত হয়।

যেটি আগেই বলছিলাম, নারীদের প্রাপ্য ভূ-সম্পত্তি ও  সম্পদের উপর অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ হতে ‘বঞ্চনা’ নারীদের অন্যান্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় অন্যতম বাধা। সংসারে, আয়ের উৎস ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নারীর অবদান কম থাকলে, পারিবারিক মৌলিক সিদ্ধান্তে মতামতের অধিকার খুব কমই থাকে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সন্তানদের নিকট কর্মজীবী মায়েদের আদেশ বা নির্দেশনা যতটা গুরুত্ববহন করে, অসচ্ছল মা' দের নির্দেশনা  সন্তানদের নিকট ততটা গুরত্ব পায় না। সংসারে'র চক্ষুশূল' বেকার ছেলে সন্তানটি ও ‘গৃহিনী’ নারীর মধ্যে খুব বেশি তফাৎ থাকেনা। মূলত দেখা যায়, সংসারে যে নারীদের দৃশ্যমান ও তথাকথিত আর্থিক  অবদান যত বেশি, তাদের পারিবারিক সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার তত বেশি। অধিকাংশ নারীর আর্থিক অসচ্ছলতা ও অসামর্থ্যের কারণে সংসারের সন্তানদের পড়াশুনা ও পেশা বা বৃত্তি বেছে নেয়াসহ প্রভৃতি সিদ্ধান্ত গ্রহণকালে মা'দের ভূমিকা খুব নগণ্য বলা চলে।

উত্তরাধিকার সংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট বিধি সমুহ মোতাবেক কন্যারা তাদের ভাইদের প্রাপ্য সম্পত্তির  অর্ধেক সম্পত্তির অধিকারী,কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এটুকুই সুষ্ঠুভাবে বোনদের মধ্যে বন্টিত হয়না। অনেক সময় কন্যা দায়গ্রস্ত বিধমা মা' অপ্রাপ্ত বয়সে কন্যাকে  'বাল্য বিবাহ' দিতে বাধ্য হয়। আবার, প্রাপ্য টুকু পেলেও সম্পর্ক ধরে রাখার মানসিকতা থেকে সংশ্লিষ্ট ভাই'য়ের কাছে নিজের প্রাপ্য সম্পত্তি চাষাবাদ বা দেখাশুনার দায়িত্ব সোপর্দ করতে হয়। নতুবা, ভাইয়ের সন্তান বা ভাই'দের  স্ত্রী'দের নিকট "গলগ্রহ" হয়ে চলতে হয়।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় অধিকাংশ পরিবারে বিবাহকালে পুরুষের স্ত্রীদের প্রতি  প্রতিশ্রুত "দেনমোহর" এর পরিশোধ সঠিকভাবে পরিশোধ করার রীতি নেই। এই  নামমাত্র অংক  শুধু নিবন্ধণের বহিতে লেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তাই, নারীরা এক দিকে, স্বামীর ও পিতা-মাতার ত্যাক্ত  সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়; আবার লজ্জা ও সম্পর্কের খাতিরে ঐ সম্পত্তির উপর অধিকার চাইতে না পারায় লোভী স্বামীর নিকট থেকে নিয়মিত  গালমন্দ শুনতে হয়। তখন, নারীরা এক অসহনীয় পারিবারিক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে অসহায় হয়ে পড়ে। অনেকে ক্র এ অসহায়ত্ব থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসেবে বিকৃত পন্থা অবলম্বন করে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয়।  অনেক নারীকে এমন দোটানার মুখোমুখি হয়ে সারাজীবন নিজের স্বামী-সন্তান দের নিকট ছোট হয়ে বাচতে হয়, এমন দৃষ্টান্ত বিরল নয়। এমন আশ্রয়হীনতার বোধ নিয়ে নিজস্ব জীবন যাপন এর উপর নূন্যতম স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেবার উৎসাহ ও সাহস দুটোই হারায়।  চিরকাল হীনমন্যতা ও পরনির্ভরতা এবং অপ্রাপ্তির আহাকার নিভৃতে কাঁদে। অব্যক্ত চাপাকান্নায় বুক ভেজে, কিন্ত মুখ ফুটে প্রতিবাদ করতে পারে না।

দেশে প্রচলিত আইনে শুধু পিতা-মাতা'র সম্পত্তি নয়, বিধবা নারীদের তার স্বামীর সম্পত্তির উপর প্রাপ্য অধিকার নেই বললেই চলে, নিজের টুকু চাইতে গেলে সন্তানরা সেই বিধমা মা'দের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হয়না, তখন বৃদ্ধ মা'রা না পারেন নিজের ভরণ পোষণ এর ব্যবস্থা করতে, না পারেন  প্রাপ্য সম্পত্তির নিয়ত্রণ করতে। আবার, কখনো বঞ্চিত অসহায় মা' বা কন্যা আদালতের দেয়ালের সীমানায় গিয়ে এতটা ঠায় পাইনা, কেননা তার স্বত্ব থাকলেও দখল ও নিয়ন্ত্রণ থাকেনা। আবার, নারীদের তার স্বামীর বা তার পিতার ত্যক্ত সম্পত্তির স্বত্বাধিকারি হিসেবে আদালতের আশ্রয় নিতে গিয়ে রিক্ত ও নিঃস্ব হয়ে পথে বসতে হয়েছে। দখলচূত্যি, ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং বিচারকার্যের দীর্ঘসূত্রিতা প্রভৃতি কারণে নারীরা  আইনী লড়ায়ে খুব কমই জয়ী হন। আবার অনেক নারীরা, ভাইদের বা ভাইয়ের সন্তান'দের বিরুদ্ধে আদালতের আশ্রয় নিতে কিছুটা বিব্রত বোধ করেন। তখন, নিরূপায় হয়ে বৃদ্ধার ছেলের সংসারের এক কোণে চিরকাল আশ্রীতের মত কোন রকম জীবন পার করে নেয়।

শিক্ষা ও সচেতনতার অভাবে অনেক নারী বুঝেনই না তাদের আইনগত প্রাপ্যতা কতটুকু এবং সেটা কিভাবে দাবী করতে হয়। একদিকে, পিতার পরিবারের নিকট থেকে অসহযোগিতা, অন্যদিকে, স্বামীর বা সন্তানদের চাপ সব মিলিয়ে নারীরা নাজুক হয়ে পড়ে, এক কনে সহয়ের মত পড়ে থাকেন। কর্মহীন পিতামাতাদের  বৃদ্ধকালে, সন্তানরা তাদের ভরণ পোষণ দিতে এতটা আগ্রহ বোধ করেন না। এজন্য অনেক সংসারে, শিশুরা যতটা যত্ন ও আদর পায়, একজন বৃদ্ধ পিতা-মাতা তার সামান্য টুকুও পায় না। অনেক পরিবারে অনেক বৃদ্ধ পিতা-মাতা শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার পর্যন্ত হন। গত বছরে, ঠাকুরগাওঁ বৃদ্ধ মা'  এর শারীরিক নির্যাতন এর জলন্ত দৃষ্টান্ত। সন্তানের সংসারে মানসিক ও পারিবারিক নির্যাতন, অবহেলা এবং অসম্মান নি:শব্দে মেনে নিতে হয়, এমন মা'দের সংখ্যা ভুরি ভুরি। অনেক পিতা-মাতাদের জীবনের সায়াহ্নে বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিতে বাধ্য হতে হয়। নিজের শখ,আকাঙ্ক্ষা, মনোবাসনা ও ইচ্ছে কে জলাঞ্জলি দিয়ে অসহায় ও মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়। বৃদ্ধ পিতার প্রয়োজন এর চেয়ে মা'দের প্রয়োজন' কে খাটো খাটো করে দেখার  প্রবণতা অনেক পরিবারেই বিদ্যমান।

কর্মক্ষম সন্তান'রা বাবা'র হাতেই খরচের টাকা তুলে দিতে অভ্যস্ত। মা'দের হাতে খরচের জন্য কিছু টাকা হাতে তুলে দেয়ার প্ররবনতা একটু কমই। ফলে, বৃদ্ধ অনেক মা' তাদের সামান্য নূন্যতম ইচ্ছে টুকু পুরণ করতে পারেনা। তাকে সন্তান ও স্বামীর মুখাপেক্ষী হতে হয়। অনেক মা' রা তাদের নূন্যতম চাহিদা মেটাতে না পারলেও মুখ ফুটে বলতে চায় না, পাছে স্বামী বা সন্তান মন খারাপ করে বা পুত্রবধূর সাথে সম্পর্ক নষ্ট হয়।  আর্থিক অসচ্ছলতা ও নির্ভর্শীলতার দ্বারা সৃষ্ট হীনমন্যতা' অনেক নারীদের অস্তিত্ব সংকট এবং আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগায়।

সংসারের অথৈ সাগরে ভাসমান নারীরা খড়কুটো বা  সাধ্যের সীমানায় যেটুকু হাতের কাছে আসে, সেটুকু আঁকড়ে ধরতে চাই। আর একারণে, সংসারে পুত্রবধুর  স্ত্রী হিসেবে দাবী এবং মা' হিসেবে সন্তানের উপর দাবি/অধিকার প্রতিষ্ঠার শিতল যুদ্ধ চলতে থাকে।  আর এই বিবাদ ও কলহ নারীদের আরো 'নাজুক' করে তোলে। বৃদ্ধ মা'রা আরো বেশি নিরাপত্তাহীন বা পারিবারিক অংগনে অনেকটা অসহায় হয়ে পড়ে। তাছাড়া, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক পরিমন্ডলে নারীদের সামজিক বুনিয়াদ বা সংসারের বাইরের কমিউনিটিতে অংশগ্রহণের  সুযোগ সীমিত হওয়ায় তাদের পক্ষে কথা বলার কোনো সামাজিক গোষ্ঠীও গড়ে ওঠে না।

আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে নারীদের আর্থিকভাবে আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রদেয় বিশেষ ভাতা বা অন্যান্য কর্মসূচি তাদের ভরণপোষোণ জন্য প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপর্যাপ্ত। নারীদের সম্পত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ ও অধিকার না থাকার দরুণ অনানুষ্ঠানিক উৎস বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান (ব্যাংক, বিমা) মর্টগেজের প্রদানের মাধ্যমে  ঋণ বা অর্থায়ন সুবিধা পায় না। অধিকাংশ সামাজিক পরিমণ্ডলে সমিতি ও পার্টনার শিপ এর মাধ্যমে সুযোগের অভাবে নারীদের মধ্যে ব্যবসায়ীক উদ্যোক্তা হিসেবে আভির্ভূত হওয়ার সুযোগও অনেক সীমিত।  

বর্ণিত প্রেক্ষাপটের মূল ও প্রধানত্ম কারণ মূলত অর্থ ও সম্পত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার অভাব। এভাবে, সম্পত্তির অধিকার বঞ্চিত নারীরা এক ধরনের মানসিক দৈন্যতার ‘দুষ্টচক্র’ এর  বাইরে বের হতে পারে না। নিজের আত্মীয় বা মেয়ের ঘরের আত্মীয় দের আগমনে বৃদ্ধ মা'দের মধ্যে আগত আত্মীয়দের আপ্যায়ন ইচ্ছে সর্বাপেক্ষা হলেও সামর্থ্য ঠিক উলটো। পরিতাপের বিষয়, অনেক পরিবারে বৃদ্ধ অসচ্ছল মা'দের সন্তান বা পুত্রবধূর নিকট অতিরিক্ত 'মানুষ' মনে করা হয়। তার চিকিৎসা ও বৃদ্ধ বয়সের খরচ বাড়তি' মনে হয়। বিপত্তি শুধু এখানেই না, পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোতে, পুরুষের প্রয়োজন এর তুলনায় নারী'দের প্রয়োজন খুব কমই গুরুত্ব পায়। এমন সামাজিক বাস্তবতায় নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নের জন্য নারীদের সামাজিক পরিমণ্ডল ও পরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে প্রচলিত বিধি মোতাবেক নারীদের প্রাপ্য সম্পত্তি ও সম্পদের উপর অধিকার ও নিয়ত্রণ প্রতিষ্ঠার নিমিত্ত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। শুধু আইনি কাঠামো দিয়ে ও কোটা ব্যবস্থা বা ক্ষমতা কাঠামোতে  সংরক্ষিত আসনের অধিকার সৃষ্টির মাধ্যমে প্রকৃত টেকসই ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠা খুব কঠিন। নতুন প্রজন্মের মধ্যের নারীর প্রাপ্য সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করণের মানসিকতা সৃষ্টিতে সচেতনতা বৃদ্ধির কল্পে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ অতীব জরুরি।

ভেবে দেখুন তো, আমরা নিজেদের প্রাপ্য সম্পত্তির অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যতটা সচেতন, নিজের বোনের,মা' বা স্ত্রীর প্রাপ্য সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করতে কি আদৌ ততটা সচেতন ও আগ্রহী? উত্তর, সম্ভত ‘না’। আমরা আমাদের মা বা স্ত্রীর পিতা-মাতার পরিবারের নিকট তাদের সম্পিত্তি বুঝে নিতে যতটা আগ্রহী, আমাদের বোন-দের বা ফুফুদের ( পিতার বোন) সম্পত্তি স্ব প্রণোদিত হয়ে বুঝিয়ে দিতে কিন্তু ততটা আগ্রহী নই। এটা স্বার্থপরতা। ন্যায্যতা ও সাম্য হলো, নিজের অধিকার বুঝে নেয়া এবং অন্যের অধিকার সংরক্ষণে স্বচেষ্ট হওয়া। তবেই, নারীদের প্রাপ্য সম্পত্তির উপর তাদের প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে এবং নারীরা পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে, এবং সকল মহলে তাদের প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা পাবে।  

আমাদের মাথায় রাখা উচিত, যে, আমরা আমাদের বোনদের বা ফুফুদের সম্পত্তি বুঝিয়ে দিলেই কেবল প্রত্যাশা করতে পারি, আমাদের মা'এর ও স্ত্রীর দের তাদের পিতার সূত্রে প্রাপ্য সম্পত্তি আমরা নৈতিকভাবে দাবী করতে পারি। আমরা, শুধু যদি আমাদের স্বার্থের জন্যই কেবল আইন এর কথা বলি, চলবে না। এভাবেই নারীদের সম্পত্তির উপর পুরো সমাজে ন্যয্যতাভিত্তিক প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠা পাবে। ভুলে গেলে চলবে না, সমাজের প্রায় অর্ধেক নারীদের আমাদের উন্নয়নে যতটুকু অবদান, সেই উন্নয়নের সুফল ভোগ করার অর্ধেক অধিকারীও তারাই। তাদের বঞ্চিত করলে সম্পদের সুষ্ঠু বন্টন হয়না, সম্পদের সুষ্ঠু বন্টন কেবল ধনী গরীবের মধ্যে নয়, সকল সামাজিক গোষ্ঠির মধ্যেই সুষম বন্টন নিশ্চিত করা জরুরি। নারীদের উন্নয়নের কর্মকাণ্ডে অবদানের ন্যয্য প্রতিদান থেকে বঞ্চিত করে একটি সুষ্ঠু ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব।

লেখক: সিনিয়র সহকারী সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :