ঘুষের টাকা ‘বান্ধবীর’ ব্যাংক হিসাবে

সিরাজুম সালেকীন, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৯ মে ২০১৯, ১২:০৫ | প্রকাশিত : ১৯ মে ২০১৯, ১০:৩৯
প্রকৌশলী ফজলে রব্বে

অবসরে যাওয়া এক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে অর্ধকোটি টাকা জমা পড়া নিয়ে তোলপাড় হচ্ছে। একটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুসন্ধান বলছে, এই টাকা আসলে সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) বরিশালের বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফজলে রব্বের।

অবসরে যাওয়া ওই সরকারি কর্মকর্তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করেন। এরপর তার স্ত্রী ও ফজলে রব্বেকে ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে একাধিকবার। পাশাপাশি ব্যাংকে লেনদেনের সব তথ্য প্রমাণও সংগ্রহ করা হয়েছে।

এই ঘটনাটির তদন্ত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীটি তথ্য পেয়েছে, ফজলে রব্বে ঘুষের একাধিক লেনদেন করেছেন তার বান্ধবীদের ব্যাংক হিসাবে। নিজের হিসাবকে পরিচ্ছন্ন রাখতে এই অভিনব কৌশল নিয়েছেন তিনি। 

একাধিক সরকারি চাকুরে স্ত্রীর হিসাবে ঘুষের টাকা লেনদেন বা স্ত্রীর নামে সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। আর এ কারণে একাধিক নারীকে স্বামীর অপকর্মের দায়ে কারাগারেও যেতে হয়েছে।

তবে ফজলে রব্বে নিজের স্ত্রীকে বাঁচিয়ে একাধিক নারীকে যুক্ত করেছেন ঘুষের টাকা লেনদেনে। এর তথ্য প্রমাণও আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ঢাকা টাইমসের সঙ্গে।

অভিযোগটি নিয়ে গত দুই মাস ধরে ফজলে রব্বের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছে ঢাকা টাইমস। একবার তিনি ফোন ধরার পর বলেন, ‘আমাকে মেরে ফেলেছে......, ‘আমাকে মেরে ফেলেছে......। তাদের বলেন- আমাকে মেরে ফেলতে। আপনার সঙ্গে সামনাসামনি সব কথা বলব। আমি ৫ তারিখ (এপ্রিল) ঢাকায় আসছি, এসে দেখা করব।’

আপনি বিভিন্ন সময় প্রেমিকাকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েছেন এমন প্রশ্নে ফজলে রব্বে বলেন, ‘জ্বি, জ্বি, জ্বি,।’

কিন্তু এরপর ফজলে রব্বে এই প্রতিবেদকের তিনটি মোবাইল ফোন নম্বর ব্লক করে দিয়েছেন। ঢাকা টাইমসের বরিশালের সহকর্মী ....কে দিয়ে ফোন করালে এক দিন ফজলে রব্বে পরে কথা বলবেন বলে জানান। এরপর সেই ফোন নম্বরটিও ব্লক করে রাখেন।

এরপর ফজলে রব্বের কার্যালয়ে দিনভর অপেক্ষা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সাংবাদিক আসার খবরে তিনি কার্যালয়ের বাইরে তালাবদ্ধ থাকা অবস্থায় দিনভর অফিস করেন। আর পেছনের গেট দিয়ে কোনো এক সময় বেরিয়ে যান।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে কর্মকর্তারা ফজলে রব্বের একাধিক বান্ধবীর ব্যাংক হিসাবে অবৈধ লেনদেনের বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছেন, তারা এখন তার অবৈধ সম্পদেরও খোঁজ করছেন। বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনকেও জানানো হবে বলে জানিয়েছেন অনুসন্ধান চালানো একজন কর্মর্তা।

বাহিনীটি জানতে পেরেছে, বরিশাল সড়ক ও জনপথ বিভাগে কর্মরত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফজলে রব্বে বিভিন্ন সময় ঠিকাদারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ নেন। এসব টাকাই তিনি তার একাধিক মেয়ে বন্ধুকে পাঠিয়েছেন।

সওজের এই কর্মকর্তার সঙ্গে অনেক নারীর সু-সম্পর্ক রয়েছে। যার প্রমাণ আইনশৃঙ্খলাবাহিনী পেয়েছে। এর মধ্যে ‘ফা’ অদ্যাক্ষরে এক নারীর ব্যাংক হিসাবে তিন দফায় নগদ ৫২ লাখ টাকা পাঠানো হয়।

এসব অর্থ ওই নারীর বেসরকারি একটি ব্যাংক একাউন্টে পাঠানো হয় তিনজন ঠিকাদারের পক্ষ থেকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুসন্ধান বলছে, প্রথম ধাপে একজন ঠিকাদার ২৫ লাখ টাকায় পাঠান। পরে দুজন ঠিকাদার ১২ লাখ ও ১৫ লাখ টাকা ওই একাউন্টে পাঠিয়েছিলেন।

বরিশালে যাওয়ার আগে ফজলে রব্বে গাজীপুরে নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন। ২০১০-১১ এবং ২০১১-১২ অর্থবছরে জয়দেবপুর-মির্জাপুর-টাঙ্গাইল-জামালপুর সড়কে প্রায় এক কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে মেরামতকাজ করান। মান বজায় রেখে কাজ করা হয়নি- এ অভিযোগ উঠলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ফজলে রব্বেকে অভিযুক্ত করে প্রতিবেদন দেয়। সে সময় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়।

আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর বিশেষ একটি শাখার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না শর্তে ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘সম্প্রতি একজন নারীর ব্যাংক একাউন্টে অসঙ্গতিপূর্ণ লেনদেন দেখে একাউন্ট মালিককে ডাকা হয়। তিনি স্বামীসহ আমাদের কার্যালয়ে আসেন। তার একাউন্টে অর্ধকোটি টাকার বেশি লেনদেন বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে টাকাগুলো নিজ পরিবারের বলে দাবি করেন। এ সময় তার স্বামীকে জিজ্ঞাসা করা হলে- তিনি টাকার বিষয় কিছু জানেন না বলে জানায়। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে ওই নারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।’

‘পরে জানা যায়, তার সঙ্গে সওজ কর্মকর্তার সম্পর্কের কারণে তাকে দিয়েছে। সওজ কর্মকর্তা ফজলে রব্বেকে ডাকা হয়। কিন্তু নানান টালবাহানা করে সে আসতে রাজি হচ্ছিলেন না; পরে অবশ্য আসতে বাধ্য হন। কেন তিনি এত টাকা তার প্রেমিকার ব্যাংক একাউন্টে দিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি (ফজলে রব্বে) জানান- টাকাগুলো ঘুষের ছিল। আর ওই নারীর সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের চেনাজানা। কর্মস্থল থেকে ছুটিতে ঢাকায় আসলেই তারা দেখা করেন। তাই টাকাগুলো দিয়েছেন।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীটির আরেকজন কর্মকর্তা ঢাকা টাইমসকে জানান, ‘সওজ কর্মকর্তার মোবাইল পরীক্ষা করে দেখা যায়- তার হোয়াটসঅ্যাপ ও ভাইবারে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ ছিল ওই নারীর। তাদের মধ্যে অন্তরঙ্গ ছবিও আদান প্রদান করার দৃশ্য পাওয়া গেছে। চ্যাটিংয়ে বিভিন্ন তরুণীর ছবি দিয়েছিন তার বান্ধবী। যাদের নিয়ে নামিদামি হোটেলে যাওয়ার কথাও সেখানে বলা হয়েছে।’

‘তার নানান অপকীর্তি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোচরে আসার পর সওজের এই কর্মকর্তা একজন মন্ত্রীকে ফোন করান; বিষয়টি সমাধানে। এমনকি কত টাকার বিনিময়ে বিষয়টি সমাধান সম্ভব সেটাও তিনি বলেছিলেন।’ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই কর্মকর্তা জানান, ‘এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সেগুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তিনি প্রেমিকাকে যে টাকা দিয়েছিলেন সেটা স্বীকার করে লিখিত দিয়েছেন।’

বিশেষ শাখার আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘তার সঙ্গে অনেক নৈতিক-অনৈতিক সম্পর্ক থাকতে পারে সেটা আমাদের দেখার বিষয় না। যখনই একটা ব্যাংক একাউন্টে সন্দেহাতীত লেনদেন হয়েছে তখন আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেছি। পরে জানা গেছে, সওজের কাজের পারসেন্টেজ হিসেবে এসব টাকা ফজলে রব্বেকে দেওয়া হয়েছিল। তিনি টাকাগুলো নিজের অনুকূলে না নিয়ে প্রেমিকাকে দিয়েছেন। তার বিষয়ে আমরা আরো খোঁজখবর নিচ্ছি।’

সওজের প্রথম শ্রেণির একজন ঠিকাদার বলেন, ‘ফজলে রব্বে গাজীপুরে থাকাকালে রাস্তার কোনো কাজ টাকা ছাড়া শেষ করা সম্ভব ছিল না। অবৈধভাবে অনেক ঠিকাদারের কাছ থেকে তিনি টাকা নিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সংস্কার কাজে ক্রটি ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে বিভাগীয় মামলাও হয়েছে।’

(ঢাকাটাইমস/১৯মে/এসএস/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :