গ্যাসের অবৈধ সংযোগ চলছেই

প্রতি চুলা ৩৫-৫০ হাজার টাকা; সরকারি রেটে চুলার বিল, কিন্তু ব্যাংকে নয়; সরকারের ঘরে রাজস্ব যাচ্ছে কি না জানে না গ্রাহক

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১০:৫৪ | প্রকাশিত : ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১০:১৫

আবাসিকে গ্যাস সংযোগ সরকারিভাবে বন্ধ থাকলেও আদপে তা থেমে নেই। নতুন ও সম্প্রসারিত স্থাপনার প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রে অবৈধভাবে সংযোগ নেওয়া হচ্ছে নানা কায়দায়। সরকারের খাতায় না ওঠা এসব সংযোগের প্রতিটি চুলার বিল মাস শেষে নেওয়া হয়। তা কোথায় জমা হয় গ্রাহকরা জানেন না। আর সংযোগ কিংবা সম্প্রসারণের সময় প্রতি চুলায় গ্রাহককে গুনতে হয় ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। কোথাও কোথাও তার চেয়ে বেশি।

এমন এলাকাও আছে, যেখানে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছে পুরো এলাকার বিল একত্রে চুক্তিতে। এলাকার নির্দিষ্ট লোকজন প্রতি মাসে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিল তুলে তা কোম্পানির লোকজনকে দেয়। এর পরিমাণ মাসে ২০ লাখের ওপর। এলাকাটি রাজধানীর পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত।

এসব টাকার ছিঁটেফোটাও সরকারি ঘরে জমা হয় না। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে এগুলোর সংযোগের কোনো তথ্য পেট্রোবাংলা কিংবা তিতাস গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানির কোনো পর্যায়ের নথিপত্রে নেই। ফলে গ্যাস সংযোগ বন্ধে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না।

সংযোগ নেওয়ার চেষ্টায় কয়েকজন ভুক্তভোগী এবং সংযোগ নিয়েছেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ করে মেলে আরও নানা তথ্য। সংযোগ দেওয়ার সময় তাদের আশ^স্ত করা হয়, তাদের নাম তিতাসের কম্পিউটারে রক্ষিত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সরকার গ্যাস সংযোগ আবার চালু করলে তাদের সিরিয়াল থাকবে এগিয়ে।

যারা অবৈধ পন্থায় সংযোগ কিংবা সম্প্রসারণে ইচ্ছুক নন তারা দেখছেন তাদের চোখের সামনে বিভিন্ন ভবনে সরকারি লাইনের গ্যাসের চুলা জ্বলছে। তারা না পারছেন বৈধভাবে গ্যাস নিতে, না পারছেন প্রতিবেশীর এসব বিষয়ে কাউকে বলতে।

এই প্রতিবেদক, গ্রাহক সেজে রাজধানীর দুটি এলাকার স্থানীয় ঠিকাদারদের কাছে কয়েকটি চুলায় গ্যাস সম্প্রসারণের ব্যাপারে কথা বলেন। তারা জানান, এখন সব ধরনের সংযোগ বন্ধ, তবে জায়গামতো লোক থাকলে সব সম্ভব।

যদি লোক না থাকে? তাদের ভাষ্য, তাহলে তারা অন্যভাবে (অবৈধ) সংযোগ নিয়ে দিতে পারবেন তারা। কোনো সমস্যা হবে না, সবকিছু ঠিক থাকবে, কেবল টাস্কফোর্সের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। তিতাস গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানির লোকজন এসে সরকারি রেটে অতিরিক্ত চুলাগুলোর বিল নিয়ে যাবে। আর পুরনো চুলার বিল আগের মতোই গ্রাহককে গিয়ে ব্যাংকে জমা দিতে হবে।

এই দুই প্রস্তাবের এক এলাকায় গ্যাস সংযোগ কিংবা সম্প্রসারণের জন্য প্রতি চুলার জন্য ৩৫ হাজার টাকা দাবি করেন ঠিকাদার। অন্য এলাকার ঠিকাদারের চাহিদা ৪৫ হাজার টাকা প্রতি চুলা। 

খিলক্ষেত থানা এলাকার এক ব্যবসায়ী আজহার মোড়ল (সংগত কারণে ছদ্মনাম ব্যবহার করা হলো) ১০ তলা ভবন নির্মাণ করছেন। আগে থেকে তাদের কয়েকটি চুলায় গ্যাস সংযোগ আছে। এখন দরকার আরও  ৪০টি চুলা। তারা দৌড়ঝাঁপ করছেন সংযোগ সম্প্রসারণের জন্য। একটি পক্ষ তাদের প্রস্তাব দিয়েছে ৮০-৯০ লাখ টাকায় তারা এসব চুলায় গ্যাস সংযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেবেন। কীভাবে সম্প্রসারণ দেওয়া হবে, জানতে চাইলে বলেন, তাদের এই সংযোগগুলো দেখানো হবে ২০১৩ সাল থেকে। সেবার কিছু সময়ের জন্য গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছিল সরকারি নির্দেশে।

সরকার ২০০৯ সালের ২১ জুলাই থেকে শিল্প এবং ২০১০ সালের ১৩ জুলাই থেকে আবাসিক গ্রাহকদের নতুন গ্যাস-সংযোগ দেওয়া বন্ধ করের। এরপর ২০১৩ সালের ৭ মে থেকে কেবল আবাসিক সংযোগ দেওয়া হয় কিছুদিনের জন্য। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত আবাসিকে গ্যাস সংযোগ বন্ধ, তবে বিশেষ বিশেষ এলাকায় স্থাপিত শিল্পে সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। 

আবাসিকে বৈধভাবে গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকলেও অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ কিংবা সম্প্রসারণ নেওয়া হচ্ছে রাজধানীর প্রায় সব নতুন ভবনে। কয়েকটি এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে সাম্প্রতিক সময়ে যেসব নতুন ভবন উঠেছে তার নব্বই শতাংশ এবং যেসব ভবন সম্প্রসারণ হয়েছে তার প্রায় ৯৫ ভাগ ভবনে গ্যাস সংযোগ সম্প্রসারণ হয়েছে। আর তা হয়েছে তিতাস গ্যাসের স্থানীয় ঠিকাদার ও আঞ্চলিক অফিসের লোকজনের মাধ্যমে।

বিশ্বরোড কুড়িল এলাকার একজন  গ্রাহক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্থানীয় ঠিকাদার তার কাছে প্রতি চুলায় ৩০ হাজার টাকা চেয়েছিল সংযোগ এনে দেওয়ার জন্য। কিন্তু তিনি তা গ্রাহ্য না করে আঞ্চলিক অফিসে কিছুদিন ঘোরাঘুরি করেন। ব্যর্থ হয়ে ওই ঠিকাদারের শরণাপন্ন হলে এবার তার কাছে চাওয়া হয় প্রতি চুলা ৪৫ হাজার টাকা। শেষে ৩৫ হাজার টাকায় রফা করে সংযোগ সম্প্রসারণ করেন তিনি। আর প্রতি মাসে সরকারি রেটে বিল দিচ্ছেন। কিন্তু সেটা সরকারি ঘরে যাচ্ছে কি না জানেন না তিনি।

সরকারি সংযোগ বন্ধ থাকার পরও অবৈধ এমন সংযোগের উদাহরণ দিয়ে এই প্রতিবেদক কুড়িলে তিতাস গ্যাসের আঞ্চলিক অফিসের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (ডিএমডি) কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসলে সব জায়গায় তো নজর রাখা যায় না। আমরা মাঝে মাঝে বিভিন্ন জায়গায় অবৈধ সংযোগের খবর পেলে কেটে দিয়ে আসি। আপনাদেরও যদি কোনো তথ্য থাকে আমাদের জানাবেন। আমরা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেব।’

ডিএমডি বলেন, গ্যাস সংযোগ বন্ধ সরকারি সিদ্ধান্ত। একমাত্র প্রধানমন্ত্রী আর জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী কিংবা উপদেষ্টার নির্দেশ ছাড়া সংযোগ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।  

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুড়িল, খিলক্ষেত, বাড্ডা, মেরাদিয়া, শেখের বাজার থেকে মিরপুর- মোহাম্মদপুর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আবাসিকে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগের চিত্র একই। শিল্প কারখানা ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য সংযোগ নেওয়ার পথ ভিন্ন।

একই ঘটনা ঘটছে সাভার, গাজীপুর এলাকায়ও। সেখানে মাইলের পর মাইল পাইপ বসিয়ে হাজার হাজার বাড়িতে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দিচ্ছে বিভিন্ন চক্র। তিতাস গ্যাস বারবার সেখানে অভিযান চালিয়েও নিবৃত্ত করতে পারছে না চক্রদের।

অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিবৃত্ত করতে সাম্প্রতিক সময়ে শহরাঞ্চলে গ্যাসের নতুন আবাসিক সংযোগ চালু করার সুপারিশ করেছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে গঠিত কমিটি। গত ১৮ মার্চ কমিটির সুপারিশ প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা হলেও এ বিষয়ে জ¦ালানি মন্ত্রণালয়ের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। গত এপ্রিলে জ¦ালানী প্রতিমন্ত্রী জানান, আর কোনোভাবে আবাসিকে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে না। 

কিন্তু অবৈধ সংযোগ নিবৃত্ত করা না গেলে যে উদ্দেশ্যে সরকার গ্যাস সংযোগ বন্ধ রেখেছে তার কোনো ফল হবে না। উল্টো সরকার বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। তাই অবৈধ সংযোগ বন্ধের দিকে বেশি নজর দেওয়ার জন্য গুরুত্বারোপ করা হয়েছিল। সেই নজরদারি তেমন নেই রাজধানীর কোথাও।

(ঢাকাটাইমস/১৬অক্টোবর/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :