সালতামামি ২০১৯

ক্যাসিনো আর গুজব আতঙ্কের বছর

সিরাজুম সালেকীন
ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৫:২৮ | প্রকাশিত : ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৪:২১

নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে পেরিয়ে গেছে ২০১৯ সাল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণ, পদ্মা সেতু নির্মাণে মাথা কাটা গুজবে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা, ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত হত্যা, বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যা, বনানীর এফআর টাওয়ারে আগুন, পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় কেমিক্যাল গোডাউনে আগুনে ৬৭ জনের মৃত্যু, কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য ও দমন, দুদক কর্মকর্তার ঘুষ গ্রহণ, আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা ডিআইজি মিজানকে বরখাস্ত ও এসপি হারুনকে প্রত্যাহারসহ নানা ঘটনা ঘটে।

এসব ঘটনাকে ছাড়িয়ে দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল শুদ্ধি বা ক্যাসিনো অভিযান। ২০১৯ সালের টক অব দ্য কান্ট্রি ছিল শুদ্ধি অভিযান। ক্যাসিনো অভিযানে সরকারি দলের বাঘা বাঘা নেতাদের নাম আসে এবং অনেকে গ্রেপ্তার হন। টানা তৃতীয় মেয়াদে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে শুদ্ধি অভিযান শুরু হলে দেশের রাজনৈতিক মহল হয়ে ওঠে সরগরম। অভিযান শুরুর পর দেশের মানুষের দৃষ্টি ছিল অভিযানের দিকে।

২১টির বেশি ক্লাব, সরকারি দলের নেতা, আলোচিত ঠিকাদার এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের তিনজন কাউন্সিলরকে দুর্নীতির দায়ে গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ধার করা হয় কোটি কোটি টাকা, মদ, জুয়ার সরঞ্জাম। ক্যাসিনোকাণ্ড ও দুর্নীতি-অনিয়মে জড়িত থাকায় ক্ষমতাসীন দলের হুইপ সামশুল হক চৌধুরী, সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, সংসদ সদস্য রতন ছাড়াও সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ীসহ অর্ধশতাধিক অনেক রাঘব বোয়ালকে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে দুদক।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়ে দেন, ‘অভিযান অব্যাহত থাকবে। কে কোন দলের সেটা দেখা হবে না।’

বিশেষ এলিট ফোর্স র‌্যাব অভিযান শুরু করলে ক্লাবপাড়ায় অভিযান শুরু করে পুলিশ কিন্তু সফলতা দেখাতে পারেনি। অভিযানও প্রশ্নবিদ্ধ হয় বাহিনীটির। এরপর বেশির ভাগ অভিযানে নেতৃত্ব দেয় র‌্যাব। কাউকে অযথা হয়রানি কিংবা অভিযানের প্রশ্নবিদ্ধ দূর করতে র‌্যাবকে দিয়ে অভিযান পদ্ধতিগত টেকনিক বলে উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

১৪ সেপ্টেম্বর সাবেক ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে কার্যত শুরু হয় শুদ্ধি অভিযান। ৮ আগস্ট রাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের সঙ্গে তার বাসভবনে দেখা করে এই চাঁদা চান দুই নেতা। উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার পেয়েছে- এমন কোম্পানির কাছ থেকে ভিসিকে টাকার ব্যবস্থা করে দিতে বলেন শোভন ও রাব্বানী। কিন্তু ভিসি তাতে রাজি না হওয়ায় তার সঙ্গে দুই নেতা রূঢ় আচরণ করেন। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসলে নজিরবিহীনভাবে ছাত্রলীগের পদ থেকে তাদেরকে সরে যেতে হয়। কমিটির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার ১০ মাস আগেই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক তাদের পদ হারান।
এ ঘটনার চারদিন পর ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী প্রথম অভিযান শুরু হয়। এদিন মতিঝিলের দুটি, গুলিস্তানের একটি এবং বনানীর একটি ক্লাবে অভিযান চালিয়ে ক্যাসিনোর বিষয়টি গণমাধ্যমের সামনে আনে র‌্যাব।

প্রথম ক্যাসিনো অভিযান শুরু করা হয় রাজধানীর ফকিরাপুলে ইয়ংমেনস ক্লাবে। মতিঝিল থানার পেছনে অবৈধভাবে চালানো এই ক্যাসিনোর মালিক ছিলেন যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূইয়া। ওইদিন রাতেই গুলশানের বাসায় অভিযান চালিয়ে খালেদকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। ক্লাব থেকে ১৪২ জনকে আটক করে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেওয়া হয়। জব্দ করা হয় দেড় ডজন এনালগ ও জিজিটাল ক্যাসিনো বোর্ড, নগদ ২৪ লাখ ২৯ হাজার টাকা। এ সময় খালেদের টর্চার সেলে অভিযান চালিয়ে সেটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

ওইদিন রাতেই ওয়ান্ডারার্স ক্লাব ও গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্রে অভিযান চালায় র‌্যাব। সেখানেও ক্যাসিনোর সরঞ্জাম, বিপুল পরিমাণ মদ, বিয়ার ও সিগারেটসহ বিভিন্ন ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্য উদ্ধার করা হয়। ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িতের তালিকায় নাম আসে স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওছার ও স্থানীয় কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদের।

তবে এই দুইজন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিশেষ করে ঘটনার আগে দেশের বাইরে থাকায় কমিশনার সাঈদ আর দেশে ফেরেননি। আর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্রে পাওয়া যায় কস্টিপাথরের মূর্তি, নগদ টাকা ও ক্যাসিনো সরঞ্জাম। ক্লাবটি পরিচালনায় নাম আসে যুবলীগের সাবেক নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের। ওই রাতে বনানীর গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ নামক ক্যাসিনোতে অভিযান চালায় র‌্যাব। পরে সেটি সিলগালা করা হয়।
খালেদের পর ২০ সেপ্টেম্বর গুলশানের নিকেতনে নিজ কার্যালয় থেকে জি কে শামীমকে সাত দেহরক্ষীসহ আটক করে র‌্যাব। বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন। শামীমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে সরকারের প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার কাজ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সচিবালয়, র‌্যাব হেডকোয়ার্টার্স, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতালসহ ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। তাকে গ্রেপ্তার না করতে অভিযানের দিন র‌্যাবের এক কর্মকর্তাকে দশ কোটি টাকা ঘুষ দিতে চেয়েছিলেন শামীম।

একই দিন কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-২। তার অফিস থেকে সাত প্যাকেট বিশেষ রঙের ইয়াবা, একটি বিদেশি পিস্তল ও তিন রাউন্ড গুলি জব্দ করা হয়।

২২ সেপ্টেম্বর পুলিশের মতিঝিল বিভাগ মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, আরামবাগ স্পোর্টিং ক্লাব, ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব ও ভিক্টোরিয়া ক্লাবে অভিযান চালায়। অভিযানে জুয়ার বিভিন্ন সামগ্রী উদ্ধার করা হয়।

২৫ সেপ্টেম্বর রাতে তেজগাঁওয়ের মণিপুরিপাড়ার বাসা থেকে গ্রেপ্তার হন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক লোকমান হোসেন ভূইয়া। তার বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ায় টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে মামলাটিতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।

৩০ সেপ্টেম্বর দেশের অনলাইনে ক্যাসিনোর প্রধান সমন্বয়ক সেলিম প্রধানকে বিদেশ পালিয়ে যাওয়ার সময় গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। সেলিমের গুলশান ও বনানীর বাসা থেকে ২৯ লাখ নগদ টাকা ও ২৩টি দেশের বৈদেশিক ৭৭ লাখ টাকা সমমূল্যের মুদ্রা উদ্ধার করা হয়। অনলাইন ক্যাসিনো থেকে সেলিম মাসে ৯ কোটি টাকা আয় করতেন বলে তথ্য পায় বাহিনীটি।

ঢাকা মহানগর যুবলীগের আলোচিত নেতা সম্রাট গ্রেপ্তার হচ্ছেন কি হচ্ছেন না এই নিয়ে চলছিল জল্পনা-কল্পনা। ৬ অক্টোবর ভোরে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় এই ক্যাসিনো হোতাকে। ওইদিন তাকে ঢাকায় এনে রাজধানীর রমনায় তার অফিসে কয়েক ঘণ্টা তল্লাশি শেষে পিস্তল-গুলি, মাদক ও বন্যপ্রাণীর চামড়া উদ্ধার করা হয়। পরে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত সম্রাটকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেয়। আলোচিত সম্রাটকে দুই দফা রিমান্ডে আনা হয়। রিমান্ডে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

১১ অক্টোবর গ্রেপ্তার হন মোহাম্মদপুরের আলোচিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজান। তাকে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল থেকে আটকের সময় নগদ দুই লাখ টাকা, একটি অবৈধ বিদেশি পিস্তল, চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। তার বাসায় অভিযান চালিয়ে ছয় কোটি ৭৭ লাখ টাকা সমমূল্যের চেক উদ্ধার করা হয়। এছাড়া তার অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি থাকার তথ্য পাওয়া যায়।

শুদ্ধি অভিযান শুরু হলে আত্মগোপনে থাকা ‘জনতার কমিশনার’ পরিচয়ধারী ডিএনসিসি ৩৩ নম্বরের আলোচিত কমিশনার তারেকুজ্জামান রাজীবকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। ১৯ অক্টোবর রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সাড়ে ছয় বছর আগে তিনি মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদীয়া হাউজিংয়ে ছোট্ট এক কক্ষে সস্ত্রীক ভাড়া থাকতেন পাঁচ হাজার টাকায়। বর্তমানে নিজের ডুপ্লেক্স বাড়ি, নামিদামি ব্র্যান্ডের গাড়ি ও বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে যান অল্প দিনে।

চাঁদাবাজির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা উপার্জনের অভিযোগে ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ময়নুল হক মঞ্জু গ্রেপ্তার হন ৩১ অক্টোবর। তার কাছ থেকে পিস্তল, মাদক ও যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। মঞ্জু গ্রেপ্তারের খবরে মিষ্টি বিতরণ করে ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসী।

অভিযান চালানো হয় ধানমন্ডি ক্লাব, তেজগাঁওয়ে অবস্থিত ফুয়াং ক্লাবসহ রাজধানীর বিভিন্ন মদের বার, স্প্রা সেন্টারে। অনিয়মের অভিযোগে বেশ কয়েকটি মদের বার ও প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ ও জরিমানা করা হয়।

ক্যাসিনোকাণ্ড ছাড়াও রাজধানীতে বড় দুটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর একটি বনানীর এফআর টাওয়ার। এফআর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডে ২৬ জন নিহত ও ৭০ জন আহত হন। এছাড়া পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টার আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যান ৭০ জন।

জুলাইয়ের শুরুতে পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা প্রয়োজন হচ্ছে বলে গুজব ছড়িয়ে ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয় ৫ জনকে। আর ২১ জন গণপিটুনির শিকার হন। খোদ রাজধানীর উত্তর বাড্ডার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে শিশুচোর সন্দেহে তসলিমা বেগম রেনু নামে এক নারীকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনার দিন রেনু তার সন্তান ভর্তির তথ্য জানতে বিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

অপরাধ ও দুর্নীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :