কাউন্সিলরের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ

কাজী রফিক, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ০৮ জানুয়ারি ২০২০, ০৮:০৮

সুয়ারেজের পাইপ স্থাপন থেকে শুরু করে অবৈধ গ্যাস সংযোগ, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, ইজিবাইকসহ নানা জায়গা থেকে চাঁদা আদায় এবং চাঁদাবাজিতে সমর্থনের অভিযোগ পাওয়া গেছে কাউন্সিলর নূরে আলমের বিরুদ্ধে। তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৫৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। আসন্ন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থন পেয়ে আবারও নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছেন নূরে আলম। যদিও নিজেকে তিনি ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন’ বলে দাবি করেন। একইসঙ্গে নিজের নেতাকর্মীদেরও অসৎ মানতে নারাজ নূরে আলম।

চরের টেকেরহাট, ঝাউলাহাটি, নবীনগর, মোহাম্মদনগর, আলীনগর, আশ্রাফাবাদ এলাকা নিয়ে গঠিত ওয়ার্ডটি সিটি করপোরেশনের একটি বর্ধিত ওয়ার্ড। বর্তমান মেয়াদে করপোরেশনের পক্ষ থেকে বড় ধরনের বরাদ্দ খরচ করা হয়েছে ওয়ার্ডটির জন্য। গত প্রায় পাঁচ বছরে ওয়ার্ডে ১৩০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয়েছে।

উন্নয়ন কাজ করতে গিয়ে নিজের এবং স্থানীয় নেতাকর্মীদের পকেট ভারি করেছেন নূরে আলম, এমন অভিযোগ ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের। ৫৫ নম্বর ওয়ার্ড ঘুরে গত পাঁচ বছরের নানা উন্নয়নের চিত্র চোখে পড়ে। রাস্তা, পয়ঃনিষ্কাষণ সুবিধার উন্নয়ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন সেখানকার বাসিন্দারা। একইসঙ্গে সুয়ারেজের সংযোগ দিতে কাউন্সিলর টাকা আদায় করেছেন এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। তবে কাউন্সিলরের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারেন না।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, ওয়ার্ডের সুয়ারেজ ব্যবস্থা ঠিক করার উদ্যোগ নেয়া হয় করপোরেশনের পক্ষ থেকে। কাজটি সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে করার কথা থাকলেও প্রতি বাড়ি মালিকের থেকে কাউন্সিলরের নেতৃত্বে বাড়ি প্রতি আড়াই হাজার থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে। টাকা আদায় করেছেন কাউন্সিলরের সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীরাই। টেকেরহাটে টাকা আদায় করেছেন কাউন্সিলরের দেহরক্ষী হিসেবে পরিচিত শাকিল ও মাসুদ। নবীনগর, মোহাম্মদনগর, আলীনগর এলাকা থেকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আল ইসলাম ও চানু। এছাড়া জাউলাহাটিতে মর্তুজা, লাল দাড়ি শহিদুল্লাহ, ওয়াহিদ, হাজী মজিবরের মাধ্যমে বাড়ি প্রতি কোথাওবা কাঠা প্রতি পাঁচ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়েছে।

ওয়ার্ডে অধিকাংশ গ্যাস সংযোগ অবৈধ হলেও তার বৈধতা মেলে টাকায়। অবৈধ সংযোগ পেতে চাইলে স্থানীয় নেতাকর্মীদের হাতে টাকা গুঁজে দিলেই বাড়িতে জ্বলে তিতাসের গ্যাস। চরের প্রায় ৬০ শতাংশ বাড়িতেই অবৈধ গ্যাস সংযোগ। ৫৫ নম্বর ওয়ার্ডে যুবলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন শাকিল, সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন ও  স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা নয়াগাঁও এলাকার বাসিন্দা সজীব এই গ্যাস বাণিজ্যের মূল হোতা বলে জানা গেছে। এছাড়া নবীনগর মসজিদ থেকে আলিনগর চৌরাস্তা পর্যন্ত এলাকায় টাকার বিনিময়ে গ্যাসের অবৈধ সংযোগ দিয়েছেন চানু ও সোলেমান ওরফে সালমান।

জমির পরিমাণ ও ভবনের উচ্চতা বিচারে বাড়ি প্রতি ২০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার বিণিময়ে এসব সংযোগ দেয়া হয়। সংযোগকালে রাস্তা খুঁড়তে অনুমোদন দেয়ার পাশাপাশি মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে থাকেন নূরে আলম। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলে পুনরায় এক জোড়া চুলার জন্য পাঁচ হাজার টাকা হারে দিলেই মিলছে সংযোগ। কামরাঙ্গীরচরে এমন চিত্র গত চার বছর ধরে দেখা যাচ্ছে।

শুধু আবাসিক স্থাপনায় নয়, অবৈধ সংযোগের ছড়াছড়ি স্থানীয় কারখানাগুলোতেও। অবৈধ গ্যাস সংযোগে চলে এমন কারখানার সংখ্যা এই ওয়ার্ডে অর্ধ শতাধিক। ডালার কারখানা হিসেবে পরিচিত এসব কারখানায় গ্যাস ব্যবহার করে তৈরি করা হয় রান্না ঘরে থালা-বাটি রাখার র‌্যাক। এক মালিক মোটা অংকের টাকা দিয়ে বৈধ সংযোগ দেয়া হয়েছে এসব কারখানায়। আবার প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা করে আদায় করা হয় কারখানাগুলো থেকে। কাউন্সিলর, তিতাস ও পুলিশের কিছু কর্মকর্তা এই টাকার ভাগ পান।
 
উন্নয়ন কাজে মৌসুমী চাঁদাবাজি করেই থেমে নেই নূরে আলম। ৫৫ নম্বর ওয়ার্ডের খোলামোড়া ঘাট, বাদশা মিয়া স্কুল, জাউলাহাটি চৌরাস্তা, সাইনবোর্ড, সিলেটি বাজার, আশ্রাফাবাদ এলাকায় চলাচলের অন্যতম যানবাহন ইজিবাইক। অবৈধ হলেও চাঁদার বিণিময়ে তার বৈধতা দেয়া হয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের আদায়কৃত এই চাঁদার একটি অংশ পান নূরে আলম।

ইজিবাইক চালকদের দেয়া তথ্য মতে, জাউলাহাটি চৌরাস্তায় প্রতি ইজিবাইক ও টেম্পু থেকে ১০০ টাকা করে আদায় করা হয়। আলিনগর, মোহাম্মদনগর এলাকাসহ সব স্ট্যান্ডে চাঁদার পরিমাণ একই। চাঁদা আদায়কারীর মধ্যে রয়েছেন আল ইসলাম, দানেশ, আলামিন, মর্তুজা, জিনু মিয়া ও শহিদুল্লাহ। কর্তৃত্ব বজায় রেখে কাউন্সিলরের চাঁদাবাজির অন্যতম অংশীদার বনে গেছেন থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আলী হোসেন।

নূরে আলমের ভাতিজা জসিমকে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবেই চেনেন স্থানীয়রা। তিনি ৫৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। আট থেকে ১০ জন ছেলেকে দিয়ে এই মাদক বাণিজ্য টিকিয়ে রাখেন জসিম। এছাড়া নূরে আলমের সহযোগী হিসেবে পরিচিত শাকিল চাঁদাবাজির পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন বিশাল মাদক সাম্রাজ্য।

এলাকাবাসী জানান, নিষিদ্ধ ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকেও নূরে আলম মাসোহারা পান। এ ছাড়া সম্প্রতি স্থানীয় এক সাংবাদিকের জমিতে স্যুয়ারেজ পাইপ বসানো নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হয়। নূরে আলম জোরপূর্বক ওই সাংবাদিকের জমিতে স্যুয়ারেজ পাইপ বসানোর চেষ্টা করেন। এ বিষয়ে একটি মামলাও হয়েছে।

এছাড়া ১৯৯১ সালে স্থানীয় টেকেরহাটি এলাকার সোনা মিয়া মসজিদের ৩৬ কাঠা জমি বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দেয়া তথ্যমতে, ওই সময় নূরে আলম কাউন্সিলর ছিলেন না। আর ওই জমিটি ছিল ওয়াকফর। যা বিক্রি নিষিদ্ধ ছিল। তৎকালীন ক্ষমতাশালীদের সঙ্গে আঁতাত করে তিনি এ জমি বিক্রি করেন। বিষয়টি নিয়ে নানা সময় বিতর্ক তৈরি হলেও নূরে আলম কাউন্সিলর হওয়ার পর কেউ এ বিষয়ে কথা বলতে সাহস পান না।

তবে এর কোনো অভিযোগই মানতে রাজী নন নূরে আলম। তিনি বলেন, ‘এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। এসব মিথ্যা অভিযোগ। আমি একজন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন লোক। আমার নেতাকর্মীরাও কোনো চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নয়।’

(ঢাকাটাইমস/৮জানুয়ারি/কারই/কেএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজধানী বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :