ফ্রিজের বাজারে ৮০ শতাংশই দেশীয় কোম্পানির দখলে

কবিরুল ইসলাম, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০১ মার্চ ২০২১, ১৯:০৩ | প্রকাশিত : ০১ মার্চ ২০২১, ১৮:৩৩

দেশে ফ্রিজের বাজারে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে ডিঙিয়ে দেশীয় কোম্পানিগুলো শক্ত অবস্থান করে নিয়েছে। বর্তমানে ফ্রিজ মার্কেটের প্রায় ৮০ শতাংশই দেশীয় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ফ্রিজের দখলে। এর মধ্যে এককভাবে ওয়ালটনের দখলে ৬৬ শতাংশ। মার্সেল, ভিশন, মিনিস্টারসহ দেশীয় আর দেশে সংযোজিত বিদেশি সিঙ্গারের দখলে বাকি ১১ শতাংশ। অর্থাৎ দেশে বিদেশি ফ্রিজ কেনার ক্ষেত্রে চাহিদা রয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ ক্রেতার।

মাত্র দুই দশকেই দেশীয় কোম্পানিগুলো ফ্রিজের বাজারে একক আধিপত্যে পৌঁছেছে। সুলভে কিনতে পারা আর মানের দিক দিয়েও বৈশ্বিক হওয়ায় শহরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গ্রাম বা মফস্বলে ফ্রিজের ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে। এছাড়া ছোট পরিবার ও নারী কর্মজীবির সংখ্যা বৃদ্ধি, গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতায়ন, কম খরচে দেশীয় ফ্রিজ কেনার সক্ষমতা এবং ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতাবান্ধব শর্তাবলীর কারণে দেশীয় ফ্রিজ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো বাণিজ্যিক সাফল্য পাচ্ছে।

মার্কেটিং ওয়াচ বাংলাদেশের (এমডব্লিউবি) করা ‘বাংলাদেশের ফ্রিজ শিল্প’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হয়। মার্কেটিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও এমডব্লিউবির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ড. মো. নাজমুল হোসাইন প্রতিবেদনটি সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন।

ড. মো. নাজমুল হোসাইন জানান, মাঠ পর্যায় ও ভার্চুয়ালি দেশের ২ হাজার ৪৪০ জন ফ্রিজ ব্যবহারকারী থেকে প্রাপ্ত তথ্য, ১০টি ফোকাস দল আলোচনা, ১০টি রিটেইল ষ্টোর অডিট, ১০ জন বিশেষজ্ঞের সমীক্ষা, ৩ হাজার ৮৬০টি অনলাইন ক্রেতার প্রতিক্রিয়া, ইলেকট্রনিক প্রোডাক্ট রিভিউয়ের মাধ্যমে ১৯৬টি পাবলিক পোস্ট বিশ্লেষণ এবং ৮টি প্রতিষ্ঠানের ৯টি টিভিসি বিশ্লেষণ করে গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১০ সাল পর্যন্ত ফ্রিজের বাজার বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর নিয়ন্ত্রণে ছিলো। বিপরীতে দেশীয় উদীয়মান কোম্পানিগুলো মার্কেট শেয়ার ছিল খুবই নগণ্য। তবে একইবছরে বিদেশী ব্র্যান্ডগুলো মার্কেট শেয়ার দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোর কাছে হারাতে থাকে। এর ফলে বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে বিদেশী ব্র্যান্ড কিনতে হয়নি। একইসঙ্গে এই শিল্পের বিকাশে দেশের মানুষের জীবনধারায় মান বেড়ে চলেছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের বর্তমান চেয়ারম্যান ও এমডব্লিউবির সহপ্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান ও ড. রাফিউদ্দীন আহমদ এবং গবেষক সাখাওয়াত হোসেন এ গবেষণায় যুক্ত ছিলেন।

ড. মো. নাজমুল হোসাইন বলেন, ২০১৫-২০১৯ এ পাঁচ বছরে ফ্রিজ শিল্প গড়ে ১৩ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ফ্রিজের তিন ক্যাটাগরির পণ্যের ক্ষেত্রে এ প্রবৃদ্ধি হারের ব্যাপক তারতম্য আছে (যেমন ফ্রস্ট ফ্রিজের প্রবৃদ্ধি হার ১০ দশমিক ৫ শতাংশ, নন ফ্রস্ট ফ্রিজ ৪০ শতাংশ এবং চেস্ট ফ্রিজ ১১ শতাংশ)।

গবেষণাচিত্রের বরাতে ঢাবির এ শিক্ষক জানান, দেশীয় ব্র্যান্ডের এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার পেছনে রয়েছে নিত্যনতুন প্রযুক্তির ব্যবহার, স্বয়ংক্রিয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ইনভার্টার টেকনোলজি, রিয়েল-টাইম টেম্পারেচার ডিসপ্লে, হলিডে মোড, টার্বো মোড, সুপারকুল মোড ইত্যাদির কারণে দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো যেমন ওয়ালটন, মার্সেল এবং যমুনা অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গবেষণায় ফ্রিজ ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ক্রেতা সন্তুষ্টি ও অসন্তষ্টির মাত্রা যাচাই করা হয়। অধিকাংশ ক্রেতাই দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোর ওপর সন্তুষ্ট। বেশিরভাগ ক্রেতা মনে করেন অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে তুলনামূলকভাবে ভালো মানের ফ্রিজ দেশীয় কোম্পানীগুলো বাজারে আনতে সক্ষম হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ক্রেতারা ফ্রিজ ক্রয়ের ক্ষেত্রে মূল্য সাশ্রয়ী, স্থায়িত্ব, বিদ্যুৎ সাশ্রয়, ডিজাইন, কম্প্রেসার, ওয়ারেন্টি, বিক্রয়োত্তর সেবা এবং অভিনব প্রযুক্তির ব্যবহারকে অধিকতর গুরুত্ব দিচ্ছেন। যদিও একইসঙ্গে স্বল্প শীতলীকরণ ক্ষমতা, ওয়াটার লিকেজ ,কম্প্রেসারের উচ্চ শব্দ, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচ, ফ্রস্ট ফ্রিজে বেশি বরফ জমা, নির্দিষ্ট সময় পরপর কম্প্রেসারের কার্যক্ষমতা হ্রাস পাওয়াসহ বেশকিছু অভিযোগও জানান ব্যবহারকারীরা।

গবেষকরা দেশীয় কোম্পানিগুলোর জন্য বেশ কিছু সুপারিশও তুলে ধরেছেন প্রতিবেদনে। এর মধ্যে রয়েছে─ অনলাইনভিত্তিক মার্কেটিং কার্যক্রম বৃদ্ধি করা, ক্রেতার সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, বিক্রয়োত্তর সেবার মান বৃদ্ধি করা, নির্দিষ্ট সময় পর কোম্পানির উদ্যোগে ফ্রিজ চেক করা। এছাড়া ব্যবহারকারীর অভিযোগ আমলে নিয়ে কোম্পানিগুলো তা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করলে ক্রেতা সন্তুষ্টির মাত্রা আরো বাড়বে বলে সুপারিশ করেছেন গবেষকরা।

গবেষণা ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে তারা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তির উন্নত ফ্রিজ তৈরিতে দেশীয় কোম্পানীগুলো যেভাবে বড় বিনিয়োগ করেছে এর ফলে অদূর ভবিষ্যতে দেশে ফ্রিজের চাহিদা আরো বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। দেশীয় কোম্পানিগুলো বড় পরিসরে ফ্রিজ রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়েও সক্ষম হবে। আর এজন্য সরকারকে দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোকে সব ধরনের লজিস্টিক সাপোর্ট প্রদান করতে হবে।

(ঢাকাটাইমস/০১মার্চ/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

অর্থনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :