এমপি পঙ্কজ দেবনাথের তদন্ত কি দুদকে ‘ফাইলবন্দি’!

সৈয়দ ঋয়াদ, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৩ মে ২০২১, ১২:৫৭ | প্রকাশিত : ১৩ মে ২০২১, ১২:৩৭

আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয়বারে মতো ক্ষমতায় এলে নিজ দলের ভেতরে ‘শুদ্ধি অভিযান’ শুরু করে। ২০১৯ সালের সেই অভিযানে অনেকের মতো প্রকাশ্যে আসে বরিশাল-৪ আসনের সাংসদ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথের সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য।

সেসময় তার বিরুদ্ধে ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িত থাকা, নিয়োগ বাণিজ্য, জমিদখলসহ অবৈধ উপায়ে বিপুল জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তদন্ত শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক।

পঙ্কজ দেবনাথের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১৯ সালে তার যাবতীয় ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিআইএফইউ) মহাব্যবস্থাপক বরাবর চিঠি পাঠায় সংস্থাটি। তার সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজন সাংসদ ও শতাধিক ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবের তথ্য চায় দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি।

এই ঘটনায় ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) বিশেষ পুলিশ সুপার (ইমিগ্রেশন) বরাবর পঙ্কজ দেবনাথের দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা চেয়ে দুদকের পক্ষ থেকে চিঠি পাঠানো হয়। দুদক পরিচালক ও অনুসন্ধান দলের প্রধান সৈয়দ ইকবাল হোসেন স্বাক্ষরিত সেই চিঠিতে পঙ্কজ দেবনাথের অবৈধ সম্পদ অর্জন ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার কথা বলে তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার অনুরোধ করা হয়।

স্বেচ্ছাসেবক লীগের এই সাবেক সাধারণ সম্পাদকের দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে সেসময় গণমাধ্যমকে ব্যাখ্যা দিয়ে দুদকের সাবেক সচিব দিলওয়ার বখত বলেছিলেন, এই সংসদ সদস্যের জ্ঞাত আয় বহির্ভূত উপায়ে সম্পদ অর্জন ও বিদেশে অর্থ পাচারের বিষয়ে দুদকের অনুসন্ধানে ‘প্রাথমিক প্রমাণ’ পাওয়া গেছে।

দুদকের একটি সূত্র জানায়, পঙ্কজ দেবনাথের বিরুদ্ধে এক হাজার ৫০০ কোটি সম্পদের অনুসন্ধান করছে সংস্থাটি। এর মধ্যে রয়েছে তার ঢাকায় ১০ তলা বাড়ি, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও পরিবহন ব্যবসা। অন্যদিকে কানাডার বেগম পাড়ায় বাড়ি ও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও তার বিশাল বিনিয়োগের কথা জানা যায়। একইভাব এই সাংসদের নির্বাচনী হলফনামা থেকে জানা যায়, গত দশ বছরে তার সম্পত্তি বেড়েছে অন্তত কয়েকশ গুণ।

তবে এতো কিছুর পরও এই সাংসদের বিষয়ে দুদকের তদন্ত অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা জানানোর মধ্যে আটকে ছিলো সংস্থাটির কার্যক্রম। এছাড়া স্বেচ্ছাসেবক লীগের এই সাবেক সাধারণ সম্পাদকের বিষয়ে ২০১৮ সালে একটি মামলা তদন্তাধীন থাকলেও এখনো সেটির নিষ্পত্তিও হয়নি।

জানা যায়, পঙ্কজ দেবনাথের বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগগুলো তদন্ত করছেন দুদক পচিালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন। দুদক কর্মকর্তাকে ফোন করলে তিনি এই বিষয়ে কোনো কথা বলতেই রাজি হননি। তবে এসব বিষয়ে এখনো অনুসন্ধান ও তদন্ত কাজ চলছে বলে জানান। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে রাজি হননি এই কর্মকর্তা।

স্বেচ্ছাসেবক লীগের এই সাবেক নেতার বিরুদ্ধে উঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে বেশ কয়েকদিন যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তার ব্যক্তিগত ফোন নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে স্বেচ্ছাসেবক লীগের এক প্রবীণ নেতা নিজের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে বলেন, আমাদের কাছে যতটুকু খবর আছে নেত্রীর নির্দেশের কারণে স্বেচ্ছাসেবক লীগ থেকে তাকে অপসারণ করা হয়। মূলত এরপর থেকেই দলীয় সাংগঠনিক কাজে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন।

পঙ্কজ দেবনাথের বিরুদ্ধে তদন্তের সময় দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন ইকবাল মাহমুদ। তার সময়েই এই এমপির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে সময়ক্ষেপণ হয়েছে আড়াই বছর। এই বিষয়ে দুদকের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যানকে ফোন করলে তিনি ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমি তো এখন দুদকে নেই। তাই এসব অনুসন্ধান কি অবস্থায় আছে আমি বলতে পারবো না।’

সাংসদদের দুর্নীতির অনুসন্ধান ও তদন্তের দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘দুদক কোনো কাজ করে না। বছরের পর বছর তাদের অনুসন্ধানই শেষ হয় না। মানুষ অভিযোগ করলেও প্রতিকার পায় না। দুর্নীতি দমন কমিশনের বেশিরভাগ অনুসন্ধানই লোক দেখানো।’

নিজ আসনে পঙ্কজের বিরুদ্ধে যতো অভিযোগ

১৪ অক্টোবর ২০১৯ সালে এই সাংসদের নানা দুর্নীতির ও অপকর্মের অভিযোগ এনে বরিশালের এক রেস্টুরেন্টে সংবাদ সম্মেলন করেন তার নিজ দলের কাজিরহাট আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সঞ্জয় চন্দ্র। সঞ্জয় ওই সংবাদ সম্মেলনে নিয়োগবাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, জমি দখলসহ এই সাংসদের বিরুদ্ধ ১৬টি অভিযোগ সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন সঞ্জয় চন্দ্র।

পঙ্কজ দেবনাথের নির্বাচনী এলাকা মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার ৯টি কমিউনিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৮ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেন। এই অবৈধ নিয়োগের বিরুদ্ধে সঞ্জয় চন্দ্র নিজ এলাকার সংসদ সদস্য পঙ্কজ দেবনাথ, বিদ্যানন্দপুর ইউপির চেয়ারম্যান আবদুল জলিলসহ ৪১ জনকে আসামি করে ২০১৭ সালের ৫ মার্চ দুর্নীতি দমন আইনে একটি মামলা করেন। ২০১৮ সালে দুদক মামলাটি তদন্ত শুরু করে।

সংবাদ সম্মেলনে সঞ্জয় সেসময় সাংবাদিকদের বলেন, ‘তার (পঙ্কজ দেবনাথ) বিরুদ্ধে মামলা করায় তিনি তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে আমার দুটি পা, একটি হাত হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে পঙ্গু করে দেন। আমার বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা মামলা দেন। যেই মামলার আমাকে ১৮ দিন কারাবন্দি থাকতে হয়।’

ভুয়া এই নিয়োগবাণিজ্য তদন্ত করেন বরিশালের দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বিত জেলা কার্যালয় বরিশালের সহকারী পরিচালক হাফিজুর রহমান। ২০১৯ সালের মার্চে তিনি চারজনকে অভিযুক্ত করে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে প্রতিবেদন পাঠান। তবে ওই তদন্ত প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট হতে না পেরে পুনরায় এই অভিযোগের তদন্ত করতে তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

এই মামলাটির তদন্তের বিষয়ে জানতে এই দুদকের সহকারী পরিচালক হাফিজুর রহমানকে ফোন করলে তিনি এই বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি। তবে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের একটি সূত্র ঢাকাটাইমসকে জানায়, শুরু হওয়ার পরই হঠাৎ এর তদন্ত কাজ বন্ধ হয়ে যায়।

দুদকে করা এই সাংসদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ও অনুসন্ধানে থেকে জানা যায়, গোবিন্দপুর ইউনিয়নের চরে দেড় হাজার একর জমি থেকে বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। একইভাবে আলিমাবাদ ইউনিয়নের শ্রীপুরের গাগড়িয়ার চরে নিজের চাচাতো ভাই রাম কৃষ্ণ দেবনাথকে ব্যবহার করে কয়েক হাজার একর খাস জমির ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করেছেন।

নিজের ক্ষমতা ও দলীয় প্রভাব কাজে লাগিয়ে স্থানীয় বালুমহালের দখলও নিয়েছেন তিনি। এই কাজে তিনি ব্যবহার করেছেন তার ভাই মনোজ কুমার দেবনাথ ও চাচাতো ভাই রিপন দেবনাথকে। বালুমহাল দখল করে এর থেকে বছরে আয় করেছেন শত শত কোটি টাকা।

বেশ কয়েক বছর আগে পঙ্কজ দেবনাথের নানান অনিয়মের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেন মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন সাগর। তিনি বলেন, আমাদের প্রিয় দল আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা আমার নিজের এলাকাতেই এখন তলানীতে। পঙ্কজ দেবনাথের অন্যায় ও অত্যাচারের অতিষ্ঠ এই আসনের মানুষ। তার অপকর্মে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে দলীয় নেতাকর্মীদেরও।

পরিবহন চাঁদাবাজি ও রুট দখল

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ২০০৯ সালে পঙ্কজ দেবনাথ ‘বিহঙ্গ’ পরিবহন নামে গাড়ি নামিয়ে পরিবহন ব্যবসা শুরু করেন। সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রথম একটি রুটের রুটের নিয়ন্ত্রণ নেন সরকারদলীয় এ সংসদ সদস্য। এরপর গত দশ বছরে আরও পাঁচটি রুটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন তিনি।

বিহঙ্গ পরিবহন যেই সড়ক দিয়ে চলাচল করে সেই সড়কের এক পরিবহন ব্যবসায়ী বলেন, এই সড়কটি এখন এই সংসদ সদস্যের পৈত্রিক সম্পত্তি হয়ে গেছে। এই রুটে তার পরিবহনের নাম ব্যবহার করে গাড়ি চালাতে গেলে তার লোকদেরকে দিতে হয় মোটা অংকের মাসোয়ারা। এছাড়া গাড়ি চালানো যায় না।

পরিবহন ব্যবসায়ীদের একটি সূত্র ঢাকাটাইমসকে জানায়, এমপি পঙ্কজ নিয়ন্ত্রিত এসব রুটে অন্তত তার কোম্পানির তিন শতাধিক গাড়ি চলাচল করে। আর এসব রুটে গাড়ি চালাতে অন্যদের গুণতে হয় মোটা অঙ্কের চাঁদা।

নিজের এলাকায় হত্যা, চোরাচালান, দলীয় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও নৈরাজ্যসহ নানা অপকর্ম করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন তারা। একই সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক করে ক্যাডার বাহিনী দিয়ে এলাকায় বিশৃঙ্খলা তৈরিরও অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে অস্বীকার করেন তিনি।

পঙ্কজ যে কারণে স্বেচ্ছাসেবক লীগ থেকে পদচ্যুত

পঙ্কজের উত্থান নব্বইয়ের দশকে ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে। তখনই রাজনীতিতে সক্রিয়তা বাড়ে তার, ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। পরে আওয়ামী লীগের সহযোগী স্বেচ্ছাসেবক লীগে যুক্ত হন। ২০০৩ সালে প্রথম সম্মেলনে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পান। আর তার সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতির দাযিত্ব পান আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। স্বেচ্ছাসেবক লীগের দ্বিতীয় সম্মেলন হয় ২০১২ সালে। ওই সম্মেলনে পঙ্কজ দেবনাথ ধরে রাখেন সাধারণ সম্পাদকের পদ। তবে ওই সম্মেলনে সভাপতি হন মোল্লা মোহাম্মদ কাউছার।

২০১৯ সালে ক্যাসিনোকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. কাউসারের সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথকেও অপসারণ করা হয়। সেইসঙ্গে সেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলনের সব কার্যক্রম থেকেও তাকে বিরত থাকতে বলেন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা।

ওই ঘটনার পরই বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পঙ্কজ অভিযোগ করে বলেন, ‘নিজ দলের ষড়যন্ত্রের শিকার আমি। আর এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে আছেন জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ ও কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতা।’ তার ভাবমূর্তি নষ্ট করতে একটি কুচক্রী মহল ষড়যন্ত্র করছেন বলে দাবি করেন।

(ঢাকাটাইমস/১৩মে/এসআর/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :