জমির দালাল থেকে যেভাবে উত্থান সাবেক এমপি আউয়ালের

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৩ মে ২০২১, ১৪:৪৭ | প্রকাশিত : ২৩ মে ২০২১, ০৮:২২

মিরপুরের পল্লবীর যুবক সাহিনুদ্দিনকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার লক্ষীপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এম এ আউয়ালের নানা কুকীর্তির কথা প্রকাশ পাচ্ছে। জাল-জালিয়াতি, ভূমি দখল ও প্রতারণার মাধ্যমে সবসময় বেপরোয়া ছিলেন সাবেক এই সাংসদ। এমপি হওয়ার পর ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের দিকেই বেশি মনোযোগী ছিলেন তিনি। সেই সঙ্গে বেড়ে যায় তার মাস্তানিও। বাড়তে থাকে দখল ও হামলার দৌরাত্ম্য। একসময় কিছুই ছিল না তার। জমির দালালি দিয়ে শুরু। এরপর দখল-জালিয়াতির মাধ্যমে হয়েছেন বিপুল অর্থের মালিক।

এলাকাবাসী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা যায়, পাঁচ বছর সাংসদ থাকাকালে অবৈধ অর্থের মালিক হতে পদটি পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছেন এম এ আউয়াল। এরপর সাবেক এমপি হিসেবেও তার দাপট কোনো অংশেই কম ছিল না। সরকারি দলের ঘনিষ্ঠভাজন হিসেবেও পরিচয় দিতেন নিজেকে। তরিকত ফেডারেশন থেকে বহিষ্কার হওয়ার পর নিজে দল গঠন করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের নেতার পরিচয় ধরে রাখেন তিনি।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মিরপুরের পল্লবী এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন সাবেক এই এমপি। সাধারণ মানুষকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা ছিল তার নেশা। সবশেষ ১৬ মে রাজধানীর পল্লবীতে কয়েক একর জমি কম দামে কিনতে না পারায় জমির মালিক সাহিনুদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে সরাসরি ইন্ধন ছিল সাবেক এই সংসদ সদস্যের। বৃহস্পতিবার ভোরে ভৈরব থেকে আউয়ালকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

পরে সংবাদ সম্মেলন করে বাহিনীটি জানায়, কলাবাগানে আউয়ালের অফিসে বসে এই হত্যার পরিকল্পনা হয়। হত্যার পরে কিলার সুমন ফোন করে আউয়ালকে বলেন, 'স্যার, ফিনিশড'।

এই ঘটনায় পল্লবী থানায় করা মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করছে গোয়েন্দা পুলিশ-ডিবি। শনিবার বিকালে ডিবির মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মানস কুমার পোদ্দার ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘সাহিনুদ্দিন হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাদের মধ্যে ছয়জন রিমান্ডে রয়েছেন। এরমধ্যে এম এ আউয়ালকে চার দিন জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি পাওয়া গেছে। আমরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছি।’

নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকা মানিক শুক্রবার ভোরে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন।

জোরপূর্বক দখলে নিয়ে হাউজিং প্রজেক্ট

মিরপুরের সিরামিকস এলাকার পূর্ব পাশের সরকারি, খাস ও অন্যের জমি জোরপূর্বক দখলে নিয়ে ‘হ্যাভিলি প্রপার্টি’ নামে হাউজিং প্রজেক্ট গড়ে তুলেছেন এম এ আউয়াল। প্রথমে তিনি ভুক্তভোগীদের জমি কেনার প্রস্তাব দিতেন। সেই প্রস্তাবে সাড়া না দিলেই বাসায় গিয়ে তার লোকজন চালাত প্রকাশ্যে হামলা, এরপর মিথ্যা মামলা। এসব দিয়েও দমানো না গেলে শেষমেশ ওই ব্যক্তিকে হত্যা করা হতো। আবার কাউকে গুম করেও দিত। পরে লাশ মিলত বিভিন্ন জায়গায়। আর এসব অপকর্ম চালানোর জন্য তার ছিল আট ক্যাডার বাহিনী।

অভিযোগ আছে, আউয়ালের প্রকল্পে জমির মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব ও মামলা থাকায় অনেকে প্লট কিনলেও মালিকানা ও দখল বুঝে পাচ্ছেন না।

আউয়ালের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

আউয়ালের নির্দেশে সাহিনুদ্দিন ছাড়াও মমিন বক্স, আবদুর রহমান চঞ্চল ও জহির নামে কয়েকজনকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এসব হত্যা মামলায় পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করেছিল। তারা জামিনের বেরিয়ে এসে আউয়ালের নির্দেশে আবারো এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াত এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাত। হত্যা ছাড়াও আউয়ালের মদদে তার বাহিনীর বিরুদ্ধে রাজিব নামে একজনের হাত কেটে নেয়া ও সাবু নামে একজনকে গলায় গুলি করা হয়েছিল। প্রাণে বেঁচে যাওয়া রাজিব ও সাবু এখন সেই ক্ষত নিয়ে বেড়াচ্ছেন।

যেভাবে আউয়ালের উত্থান

আউয়াল একসময় ঢাকায় জমির দালালি করতেন। বিভিন্ন জনের সঙ্গে প্রতারণা করে বিপুল সম্পদের মালিক হন। পরে ২০০৪ সালে আবাসন কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধন নেয় তার প্রতিষ্ঠান ‘হ্যাভিলি প্রপার্টি’ ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড। ২০১০ সালে রাজধানীর মিরপুরের উত্তর কালশীর বাউনিয়া মৌজায় প্রায় ৪০ একর জমি নিয়ে আলীনগর আবাসিক প্রকল্প শুরু করেন। এর কর্ণধার ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আউয়াল নিজেই। ২০১২ সালে রিহ্যাবের সদস্যপদও পান। শুরু থেকেই তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশ না শর্তে রামগঞ্জ উপজেলার আওয়ামী লীগের একজন নেতা বলেন, ‘২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনে তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের মনোনয়ন পান আউয়াল। এরপর তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সে সময় তার (আউয়াল) বিরুদ্ধে এলাকায় স্থানীয় প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হয়রানি, সরকারি বরাদ্দ লুটপাট ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ ছিল মানুষের মুখে মুখে। তখন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তার প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন। আউয়াল সংসদ সদস্য পদ ব্যবহার করে ঢাকায় জমি দখল করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। মূলত প্রতারণা দিয়ে তার উত্থান হয়েছে। সংসদ সদস্য হলেও এলাকায় আশানুরূপ উন্নয়ন করেননি।’

(ঢাকাটাইমস/২৩মে/এসএস/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :