স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়বে

রুদ্র রাসেল, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৯:০৯

করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটসহ কয়েকটি কারণে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা চলছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে বেশ। আগামীতে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গতি আরও হ্রাস পেতে পারে, এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নে অর্থনীতিতে সরকারের খরচের ধাক্কা আগামী দিনগুলোতে আরও জোরালো হবে। আরও প্রকট হবে অর্থনৈতিক সংকট। একইসঙ্গে দ্রব্যমূল্যের লাগাতার ঊর্ধ্বগতিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে। নিম্নআয়ের মানুষের আয়-ব্যয় আরও অসামঞ্জস্য হয়ে পড়বে। বাড়তি চাপে বেসামাল হয়ে উঠতে পারে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্তসহ স্বল্প আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা। যদিও ভারত সফর শেষে দেশে ফিরে গত মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও আসন্ন বৈশ্বিক মন্দাসহ ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কা প্রকাশ করেন। একইসঙ্গে কোনো জমি অনাবাদি না রেখে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করাসহ আমদানি নির্ভরতা কমানোর আহ্বান জানান।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের মানুষ এমনিতেই আর্থিক চাপে আছে। তাদের আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য নেই। ভীষন কষ্টের মধ্যে আছে বেশিরভাগ মানুষ। আগামী দিনগুলোতে এই চাপ আরও বাড়বে। সবমিলিয়ে স্বল্পআয়ের মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহে আরও চাপের মুখে পড়বে। এ থেকে মানুষকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিতে সরকার ব্যয়সংকোচনে যেসব নীতি ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তা চলমান রাখতে হবে। বিভিন্ন জোট বা অর্থনৈতিক অঞ্চল বিকল্পমুদ্রায় বৈদেশিক লেনদেনের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা শুরু করতে হবে। এছাড়া সরকারের অতিব্যয় আরও কমিয়ে আনাসহ অত্যন্ত প্রয়োজন ছাড়া আমদানিতে নিরুৎসাহিত করতে হবে। লাগাম টানতে হবে অর্থপাচারের।

দেশ-বিদেশের সার্বিক অর্থনীতির হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত নিয়ে গত বুধবার বিকালে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে বলা হয়, চলমান বৈশ্বিক মন্দার কারণে দেশে মার্কিন ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রা তথা টাকার অবমূল্যায়নে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে। এর প্রভাবে বাড়বে মূল্যস্ফীতি। টাকার অবমূল্যায়নের কারণে সরকারের খরচের মাত্রা বেড়ে যাবে। এতে অর্থনীতিতে সরকারের খরচের ধাক্কা জোরালো হবে, যা সৃষ্ট সংকট আরও প্রকট করে তুলতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মূল্যস্ফীতির হারে লাগাম টানতে অনেক দেশ এখন সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। এর নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্য দেশগুলোতেও পড়বে। বিশ্বব্যাপী পণ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বিরূপ প্রভাব, দেশের বাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের দাম বাড়ানোর ফলে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়েছে। এতে অর্থনীতিতে টাকার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়বে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসবহুল পণ্য আমদানি সীমিত করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহে রেশনিং নীতি চালু করা হয়েছে। এতে জ্বালানি আমদানিজনিত চাপ কিছুটা হলেও কমছে। গত অর্থবছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত আমদানির চাপ ৭ শতাংশ কমেছে।

পণ্যমূল্য বৃদ্ধি ও টাকার অবমূল্যায়নের কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই প্রতিবেদন বলছে, দিনদিন বাড়ছে মূল্যস্ফীতির হার। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখন গ্রামীণ এলাকায় অনেক বেশি। এতে নিুআয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় আয়-ব্যয়ের প্রবণতা অসামঞ্জস্য হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে, আয় কমেছে। একইসঙ্গে রপ্তানির চেয়ে আমদানি বেশি হওয়ায় ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতির উচ্চগতি ও তুলনামূলকভাবে রেমিট্যান্স প্রবাহের ধারা কম হওয়ায় সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাবে বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা ডলারের ওপর চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আগামীতে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি গতি আরও হ্রাস পেতে পারে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়।

আগামী দিনগুলোতে অর্থনৈতিক সংকটের যে শঙ্কা তৈর হয়েছে, সে বিষয়ে ঢাকা টাইমসকে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার যেসব নীতি বা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বা চলমান রেখেছে তা পরিবর্তন করতে হবে। যেসব কাজে বিদেশি মুদ্রা লাগে সেসব কাজ কমিয়ে দিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় আমদানি থেকে সরে আসতে হবে।

আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, ‘মেগা প্রকল্প বা যেসব প্রকল্পে লায়াবিলিটি (দায়) রয়েছে বা ক্ষতিকর তা নিয়ন্ত্রণ করে সব প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের অতিব্যয় ও দুর্নীতি নিয়ন্তণে কার্যকর পদক্ষেপ দরকার। তিনি বলেন, রেমিটেন্স (প্রবাসী আয়) বা অন্য উপায়ে বৈদেশিক মুদ্রা যতই আসুক ক্রমাগত পাচার ও অতিব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে কোনে পদক্ষেপই কাজে আসবে না।’ এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতিতে যে মন্দা ভাব, তার প্রভাব যেমন দেশে পড়েছে। ঠিক তেমনি পরবর্তীতে তীব্র বিশ্বমন্দার যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, এর নেতিবাচক প্রভাব তো বাংলাদেশে পড়বেই।’

তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী এখন সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। ফলে টাকার প্রবাহ কমবে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি কমে যাবে। উন্নয়ন প্রকল্প হবে কম। সব মিলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা থাকবে। রপ্তানি আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। রেমিট্যান্সের গতি ধরে রাখাও কঠিন হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশেও সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। এর প্রভাবেও দেশে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে গতি কমবে।’

এ থেকে পরিত্রাণের জন্য চলমান ব্যয়সংকোচন নীতিতে অটল থেকে সরকারকে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও আমদানি কমিয়ে আনতে হবে জানিয়ে ড. সালেহউদ্দিন বলেন, ‘আগামী দিনগুলোর জন্য পরিকল্পিত অর্থনৈতিক সমাধান এখখই ঠিক করতে হবে। নইলে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্তসহ স্বল্প আয়ের মানুষ আরও সংকটের মখে পড়বে।’

বৈশ্বিক অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ‘এই অর্থনৈতিক মন্দায় দেশে দ্রব্যমূল্য আরও বৃদ্ধি পাবে, দরিদ্র মানুষ বাড়বে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাবে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি কমবে। এতে মানুষ আরও আর্থিক সংকটে পড়বে। জীবন নির্বাহ দুরূহ হয়ে পড়বে।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়লেও সার্বিকভাবে টাকার প্রবাহ সংকুচিত রয়েছে। ফলে ব্যাংকিংখাতে তারল্য প্রবাহ কমেছে। কলমানির সুদের হার বেড়েছে। ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার কেনার কারণে ব্যাংকের অনেক টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আটকে আছে। সেগুলো বিশেষ প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ তারল্য সহায়তার আওতায় ব্যাংকিং খাতে ছাড়া হচ্ছে।

শেয়ারবাজারে নিম্নমুখী প্রবণতার সঙ্গে কিছু অস্থিরতা প্রত্যক্ষ করা গেছে। যে কারণে মূল্যসূচক, বাজার মূলধন এবং টার্নওভারে মন্দা দেখা দিয়েছে। শেয়ারবাজারে কোম্পানিগুলোর দুর্বল পারফরম্যান্স ও পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে এ অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

আসন্ন শঙ্কার কারণ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারিশ

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে প্রতিবেদনে বিদ্যমান পরিস্থিতি ও আসন্ন সংকটের পেছনে ৪টি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। কারণগুলো হচ্ছে- রাশিয়া-ইউক্রেন সংকট, করোনা মহামারির বিরূপ প্রভাব, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের প্রবাহ হ্রাস ও মূল্য বৃদ্ধি এবং মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আগ্রাসী সুদ বাড়ানোর নীতি।

প্রতিবেদনে প্রবৃদ্ধির হার ধরে রেখে ডলারের বিপরীতে টাকার মান স্থিতিশীল রাখতে এবং মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি রোধে রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে আরও সমন্বয়, স্থানীয় চাহিদার ক্ষেত্রে আমদানিসহ কিছু বিষয়ে কঠোরতা আরোপ করা এবং প্রণোদনা প্যাকেজগুলো চলমান রাখাসহ বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে।

যে কারণে কমছে রিজার্ভ

জানা গেছে, ডলারের বিপরীতে টাকার মানের অস্থিরতা সীমিত করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করছে। গত জুন পর্যন্ত ৭৪০ কোটি ডলার বাজারে ছেড়ে বিনিময় হারকে সহনীয় রেখেছে। এ কারণে রিজার্ভ কমে যাচ্ছে। গত বছরের আগস্টে রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৮০৬ কোটি ডলারে উঠেছিল। পরে তা কমতে থাকে। গত জুনে তা কমে ৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে নেমে যায়। এখন তা আরও কমে ৩ হাজার ৬৮৫ কোটি ডলারে নেমেছে।

এদিকে ঢাকাটাইমসের সঙ্গে আলাপকালে একাধিক অর্থনীতিবিদ বলেন, মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি দুই দফা সুদের হার বাড়ানোর পর আরেক দফা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। তারা সুদের হার বাড়ানোর কারণে বিশ্বব্যাপী ডলারের চাহিদা বেড়ে যায়। এ কারণে এখন ডলারে বিনিয়োগ করছে বিশ্বের বড় বড় করপোরেট হাউজ ও ব্যাংক। ফলে ডলারের চাহিদা এখন তুঙ্গে এবং এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে ডলার। পণ্যের দাম বাড়ায় ডলারের চাহিদাও বেড়েছে। এর দাম বাড়ার কারণে বিশ্বের রপ্তানিকারকরা এখন ডলারে পণ্য রপ্তানি করছেন। এতে তারা লাভবান হচ্ছেন। সবমিলিয়ে বৈদেশিক বাণিজ্য ডলারকেন্দ্রিক হওয়ায় প্রায় সব দেশই এখন সংকটে পড়েছে। মার্কিন ডলারের বিপরীতে বিকল্প মুদ্রায় লেনদেন বাড়ানোর জন্য অনেক দেশ বা অর্থনৈতিক অঞ্চল বা জোট থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সেগুলো এখনো সফল হয়নি।

(ঢাকাটাইমস/৩০সেপ্টেম্বর/এফএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :