মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিব্রতকর কর্মকাণ্ডের শাস্তি নেই!

সৈয়দ ঋয়াদ, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২২, ১৮:৩৯ | প্রকাশিত : ০২ অক্টোবর ২০২২, ১৪:২৫

উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) কার্যালয়ের বাগানে ‘ছাগলে ফুল খাওয়ার অপরাধে’ মালিককে দুই হাজার টাকা জরিমানা করে সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলেন বগুড়ার আদমদিঘী উপজেলার ইউএনও সীমা শারমীন। তার এমন কাণ্ডে হতবাক হয়েছিল পুরো দেশ। অবলা প্রাণীর ফুল খাওয়ার দায়ে তার মালিককে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে সরকার ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলকেও লজ্জায় ফেলেছিলেন তিনি।

এই একটি মাত্র ঘটনা নয়। সম্প্রতি মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের এ ধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড যেন রীতিতে পরিণত হয়েছে। প্রশাসন তো বটেই, এসব কারণে খোদ সরকারকেও বিব্রত হতে হচ্ছে।

কুমিল্লার বুড়িচংয়ের ইউএনও মোছাম্মৎ সাবিনা ইয়াছমিনকে ‘আপা’ সম্বোধন করায় তিনি স্থানীয় এক ব্যবসায়ীকে ‘মা’ বলে ডাকতে বলেন। মানিকগঞ্জের সিংগাইয়ের ইউএনও রুনা লায়লাকে ‘স্যার’ না বলে ‘আপা’ বলায় পুলিশ দিয়ে ব্যবসায়ীকে পেটানোর খবরও চাউর হয়েছিল।

সম্প্রতি মাঠ প্রশাসনের চার কর্মকর্তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নতুন করে সেই আলোচনায় যেন ঘি ঢেলেছে। তাদের একজন বান্দরবানের আলীকদমের ইউএনও মেহরুবা ইসলাম। তিনি ফুটবল খেলার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে খেলায় চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দলের ট্রফি বিতরণ না করে সবার সামনে ট্রফি আছড়ে ভেঙেছেন। এমন কাণ্ডের পর ওই কর্মকর্তাকে তিরষ্কার না করে উল্টো তাকে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। বগুড়া সদরের ইউএনও সমর কুমার পালের বিরুদ্ধে অভিযোগ এলজিইডির চতুর্থ শ্রেণীর এক কর্মচারীকে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দিয়েছেন। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার ইউএনওর বিরুদ্ধে এসএসসির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ রয়েছে। টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) অমিত দত্ত ভূমি নিজ অফিসের দুই কর্মচারীকে মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে।

এছাড়া নিজের স্ত্রীকে যৌতুকের জন্য মারধর করা, একাধিক বিয়ে, পরনারীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক থাকার জেরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্জারামপুর উপজেলার তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) সারোয়ার সালামের বিরুদ্ধে মামলা করেন স্ত্রী। সেই মামলা মহানগর হাকিম আদালতে চলমান থাকলেও ওই কর্মকর্তা নরসিংদীতে এখনো কর্মরত আছেন। কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন ভুরিভুরি অভিযোগ রয়েছে, যার বেশির ভাগই অমীমাংসিত বা সঠিক বিচার হয়নি।

সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার ২৭ নম্বর বিধিতে বলা হয়েছে, ‘সরকারি কর্মচারী সংকীর্ণতা, প্রিয়তোষণ, বেআইনিভাবে ক্ষতিগ্রস্তকরণ এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করিতে পারিবেন না।’ আর সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২২(২)-এ উল্লেখ আছে, ‘সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।’ সম্প্রতি সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো সরকারের কর্মচারী আচরণ বিধিমালা পরিপন্থী তো বটেই সেই সঙ্গে সংবিধানেরও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

সরকারের মাঠ প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা এই কর্মকর্তারাই পদোন্নতি পেয়ে দেশের বড় বড় দায়িত্ব নেবেন। সচিবালয় থেকে তৃণমূল প্রশাসনের সবকিছু চলবে তাদের অঙ্গুলিহেলনে। ভবিষ্যতে এমন গুরুভার যাদের ওপর বর্তাবে তাদের আচরণ যদি এমন অমার্জিত হয় ও বিতর্কিত হয় তাহলে রাষ্ট্র সামলাবে কারা? এমন প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের। সাধারণ বিষয় নিয়ে বিতর্কে জড়ানো এই কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চাকরিতে বিসিএসের মতো কঠিন প্রক্রিয়া পেরিয়ে যারা এই পর্যায়ে আসেন তারা নিঃসন্দেহে মেধাবী, তাহলে তাদের আচরণের এমন সমস্যা কেন সেটা নিয়েও আছে বিতর্ক। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সরকারের সাবেক অনেক আমলাও মনে করেন, ওসব কর্মকর্তার যথাযথ গ্রুমিং হয়নি। পারিবারিক শিক্ষারও অভাব রয়েছে। তাহলে প্রশ্ন আসে, বিসিএসে মানসিক দৃঢ়তা ও নৈতিক বিষয়ে কী কোনো পরীক্ষা করা হয় না?

মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সরকার ও শাসন বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘উপজেলা নির্বাহী অফিসার হোক কিংবা সহকারী কমিশানার (ভূমি) হোক, এসব বিষয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানের তরফ থেকে অভিযোগ হওয়া উচিত, জেলা প্রশাসন সেগুলো দেখবে। সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের চাকরি বিধি-বিধান রয়েছে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। সেগুলো সঠিক বাস্তবায়ন হলেই এ ধরনের সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু আমাদের সব বিষয় জেনারালাইজ হয়ে যাচ্ছে। যে কারণে কোনো কিছুই আর কাজ করছে না। এসব বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রচুর নিউজ হচ্ছে, হওয়া উচিত। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মহল ব্যবস্থা না নিলে বা শাস্তি না দিলে কর্মকর্তা এসব করতে থাকবে।’

জনমানুষের সঙ্গে কর্মকর্তাদের এ আচরণ সংবিধান পরিপন্থীতো বটেই সেই সঙ্গে তাদের চাকরিবিধি পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘সব কর্মকর্তা খারাপ নয়। তবে ইদানিং তাদের সংখ্যাই বেড়ে যাচ্ছে। কারণ তাদের অন্যায়ের জন্য কোনো ধরনের বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে না। একজন ইউএনও ট্রফি ভাঙলেন তাকে বদলি করে ঢাকায় এনে নির্বাহী মেজিস্ট্রেটের দায়িত্ব দেওয়া হলো। ফলে অপকর্ম করতে উৎসাহ পাচ্ছেন তারা। আমাদের আমলাতন্ত্রসহ সর্বক্ষেত্রে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি শুরু হয়েছে সে কারণেই এ ধরনের সমস্যা বেড়ে যাচ্ছে।’

মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিতর্কিত আচরণের বিষয়ে ঢাকা টাইমসের সঙ্গে কথা বলেছেন সরকারের সাবেক সচিব ও রাজনীতি বিশ্লেষক আবু আলম মো. শহীদ খান। তিনি বলেন, ‘কর্মকর্তাদের এ ধরনের আচরণ খুবই দুঃখজনক বিষয়। যারা এমন আচরণ করেন তারা বোঝেন না, জনগণের কল্যাণের জন্য তারা নিয়োজিত, এটাই তাদের দায়িত্ব। আমি মনে করি, এ ধরনের আচরণ যারা করেন তাদের শীর্ষ পর্যায়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’

কর্মকর্তাদের চাকরিবিধি অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা ও বিভাগীয় সংশোধনের বিষয়ে জোর দিয়ে সরকারের সাবেক এই সচিব বলেন, ‘যারা এমন আচরণ করবে, যেটা প্রশ্নবিদ্ধ অবশ্যই তাদের বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আনতে হবে। জনগণের জন্য যেমন অপরাধ করলে আইন আছে, কর্মকর্তাদের বেলায় এর ভিন্ন কিছু নয়। তবে যারা অপরাধ করার পর না শুধরাবেন তারা শীর্ষ পর্যায়ে গেলে সেটা হবে জাতির জন্য অভিশাপ। কর্মকর্তাদের কোনোভাবেই ভাববার সুযোগ নেই যে তিনি আইনের ঊর্ধ্বে।’

শুধু মাঠ পর্যায় নয়, সরকারের যে কোনো পর্যায়ের কাজ করুক না কেন সবাইকে সহনশীল হওয়ার পরামর্শ দিযেছেন সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক। তিনি বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে আসবে, আসাটাই স্বাভাবিক। সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা যাবে না। এইগুলো কোনো শিষ্ঠাচারের মধ্যে পড়ে না। চাকরিবধিতেও এসব বিষয়ে স্পষ্ট করে বলা আছে।’

বিভিন্ন সময় অপরাধ করেও সরকারি চাকরিতে বহাল থাকার বিষয়ে সাবেক এই সচিব বলেন, ‘চাকরিবিধি অনুসারে দোষী হলে অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজনে তাদেরকে সংশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে। সংশোধন না হলে বিভাগীয় যে সিদ্ধান্ত আছে সেভাবেই কঠোর হাতে তা দমন করতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, দিন শেষে সবারই জনগণের কথা ভেবে কাজ করতে হবে।’

তবে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের এ ধরনের আচরণকে সহজভাবে দেখতে নারাজ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘কর্মকর্তারা জনগণের সেবার জন্য নিয়োজিত কিন্তু তারা সেই বিষয়টি ভুলে যান। জনগণের কাছে জবাবদিহি করার কোনো প্রয়োজানীয়তাও মনে করেন না, যে কারণে তারা প্রায়শই বিতর্কে জড়ান। এছাড়া এসব কাজের জন্য তাদের সেই অর্থে কোনো শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় না। ফলে জবাবদিহির বাইরে চলে গেলে যা হয় আমাদের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তাই হয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে জানতে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের ব্যক্তিগত ফোনে তিন দিনে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তার ফোনে মেসেজ করা হলেও তিনি উত্তর দেননি। এছাড়া জনপ্রশাসন সচিবকে তার ব্যক্তিগত ফোন নম্বরে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

(ঢাকাটাইমস/০২অক্টোবর/এসআর/এফএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :