কারাগারে যা করছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সেই গাড়িচালক

আশিক আহমেদ, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২২, ১২:০৮ | প্রকাশিত : ০৬ অক্টোবর ২০২২, ১১:৩০

কারাগারে বন্দিদের সাক্ষাতের জন্য স্লিপ লেখার কাজ করছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের (ডিজি) সাবেক গাড়িচালক আবদুল মালেক। তিনি এখন কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে বন্দি রয়েছেন। রাজধানীর তুরাগ থানার একটি অস্ত্র মামলায় ৩০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি তিনি।

২০২০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ভোরে র‌্যাব-১ এর একটি দল রাজধানীর তুরাগ থানার কামারপাড়ার বামনেরটেক এলাকার বাসা থেকে আবদুল মালেককে গ্রেপ্তার করে। তখন তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগজিন, পাঁচ রাউন্ড গুলি, দেড় লাখ বাংলাদেশি জালনোট, একটি ল্যাপটপ ও মোবাইল জব্দ করা হয়। ওই ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি অস্ত্র মামলা আরেকটি জাল টাকার মামলা করে র‌্যাব।

কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারের একটি সূত্র জানায়, আবদুল মালেক একজন সাধারণ কয়েদি। তিনি অন্য বন্দিদের মতোই কারাগারের একটি সাধারণ সেলে থাকেন। কারাগারে অনেক রকমের কাজ রয়েছে। লেখালেখির কাজ, রান্নাবান্নার কাজ, মালির কাজসহ হরেকরকম কাজ। কয়েদিদের মধ্যে রুটিনমাফিক এসব কাজ বণ্টন করে দেওয়া হয়। এখন আবদুল মালেক স্লিপ লেখার কাজ করছেন। আবার অন্য কাজও তাকে দেওয়া হতে পারে।

কারাগারের সূত্রটি বলছে, সাধারণ বন্দিদের সঙ্গে গল্পগুজব করেই সময় পার করেন তিনি। এছাড়াও নামাজ-কালাম পড়েন আবদুল মালেক।

কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারের জেলার মো. লুৎফর রহমান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আবদুল মালেক আমাদের এখানে একজন সাধারণ বন্দি। কারাবিধি মেনে একজন কয়েদির সঙ্গে যেমন আচরণ করা দরকার, তার সঙ্গে ঠিক সেটাই করা হয়।’ এক সময়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী গাড়িচালক আবদুল মালেকের ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি, গাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল। জাল টাকার ব্যবসাও করতেন তিনি। এছাড়াও তিনি এলাকায় চাঁদাবাজিতে জড়িত ছিলেন। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন ব্যাংকে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ টাকাও গচ্ছিত ছিল তার।

গাড়িচালক আবদুল মালেক দীর্ঘদিন অধিদপ্তরের বিভিন্ন বিষয় নিয়ন্ত্রণ করেন। বিশেষ করে অধিদপ্তরের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য ছিল তার প্রধান কাজ। কোনো কর্মকর্তা যদি তার সুপারিশ না শোনেন তাহলে তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করাসহ শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটিয়েছেন একাধিকবার। ওই সময় কর্মকর্তারা লোকলজ্জার ভয়ে এসব বিষয় কখনও প্রকাশ করেননি।

নিজে অধিদপ্তরের সামান্য একজন গাড়িচালক হয়েও আবদুল মালেক একটি পাজেরো জিপ ব্যবহার করতেন। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ক্যান্টিন পরিচালনা করতেন তিনি। তার ছিল তেল চুরির সিন্ডিকেট, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যত গাড়িচালক তেল চুরি করেন, তার একটি অংশ তাকে দিতে হতো। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি পুরো অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছেন।

অস্ত্র মামলা: অস্ত্র মামলায় গাড়িচালক মালককে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেয় ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-৪ এর বিচারক মো. রবিউল আলম। রায়ে তাকে অস্ত্র রাখার জন্য ১৫ বছর এবং গুলি রাখার জন্য আরও ১৫ বছর সাজা দেওয়া হয়। তবে উভয় সাজা একসঙ্গে চলায় তাকে মোট ১৫ বছর কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

মালেককে গ্রেপ্তারের পর র‌্যাব জানায়, তার দুটি সাততলা ভবন, নির্মাণাধীন একটি ১০ তলা ভবন, জমি, গরুর খামার ও বিভিন্ন ব্যাংকে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ গচ্ছিত অর্থের সন্ধান পাওয়া যায়। তার সম্পদের অর্থমূল্য শত কোটি টাকারও বেশি।

দুদকের দুই মামলা: ২০২১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আবদুল মালেক ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব মামলা এখন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬ এ বিচারাধীন রয়েছে।

প্রথম মামলার অভিযোগে বলা হয়, অনুসন্ধান কর্মকর্তা গাড়িচালক মালেকের সম্পদের তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে মোট দুই কোটি ৯৯ হাজার ৪০ টাকার সম্পদের সন্ধান পান। যার বিপরীতে বৈধ আয় পাওয়া যায় মাত্র ৬০ লাখ ৯ হাজার ৩৪২ টাকা। দুদকের অনুসন্ধানে মালেকের বিরুদ্ধে ৯৩ লাখ ৫৩ হাজার ৬৪৮ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন ও এক কোটি ৫০ লাখ ৩১ হাজার ৮১০ টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের প্রমাণ মিলেছে। তার বিরুদ্ধে দুদক আইন ২০০৪ এর ২৭ (১) ও ২৬ (২) ধারায় মামলা করা হয়।

অপর মামলায় মো. আবদুল মালেকসহ তার স্ত্রীকে আসামি করা হয়। এই মামলার অভিযোগে বলা হয়, গাড়ি চালক আবদুল মালেকের স্ত্রী নার্গিস বেগমের অর্জিত সম্পদের পরিমাণ দুই কোটি ১২ লাখ ৩৫ হাজার ৪৩১ টাকা। ওই সম্পদের বিপরীতে বৈধ উৎস থেকে এসেছে এক কোটি এক লাখ ৪৩ হাজার ৩৮২ টাকা। অবশিষ্ট এক কোটি ১০ লাখ ৯২ হাজার ৫০ টাকা জ্ঞাত আয়ের উৎসবহির্ভূত। স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ পারস্পরিক যোগসাজশে তার স্ত্রী নার্গিস বেগমের ভোগ দখলে রাখতে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করায় তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ এর ২৭(১) ধারা এবং দণ্ডবিধি ১০৯ ধারায় মামলাটি করা হয়। তাদের অবৈধ সম্পদের মধ্যে রয়েছে- তুরাগের একটি টিনশেড বাড়ি, গরুর খামার ও সাততলা বাড়ির কিছু অংশ।

জাল টাকার মামলা: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক গাড়িচালক আবদুল মালেকের বিরুদ্ধে জাল টাকা রাখার অপরাধে ২০২০ সালের ২ সেপ্টেম্বর তুরাগ থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলা করে র‌্যাব। ওই মামলাটি বর্তমানে ঢাকা মহানগর মুখ্য হাকিমের আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

এ ব্যাপারে আবদুল মালেকের আইনজীবী শাহিনুর ইসলাম ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘তার সব মামলায় এখন সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। একটি মামলায় তার ৩০ বছরের সাজা হয়েছে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিবহন পুলের গাড়িচালক ও তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী আবদুল মালেক অষ্টম শ্রেণি পাস। তিনি ১৯৮২ সালে প্রথম সাভার স্বাস্থ্য প্রকল্পের গাড়িচালক হিসেবে যোগ দেন। বছর চারেক পর অধিদপ্তরের পরিবহন পুলে যোগ দেন। গ্রেপ্তারের আগ পর্যন্ত তিনি প্রেষণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিবহন পুলের গাড়িচালক ছিলেন।

(ঢাকাটাইমস/০৬অক্টোবর/এএ/এফএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

অপরাধ ও দুর্নীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

অপরাধ ও দুর্নীতি এর সর্বশেষ

এই বিভাগের সব খবর

শিরোনাম :