মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, বিষ ঢুকছে শরীরে

ফিচার ডেস্ক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২২, ১১:৫১ | প্রকাশিত : ২৯ অক্টোবর ২০২২, ১০:২৪

পৃথিবীজুড়ে এক আতঙ্কের নাম প্লাস্টিকদূষণ। মাছ–মাংস থেকে সবুজ শাকসবজি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। সাগর, নদী, পুকুর, বাতাস কোথাও প্লাস্টিকের দূষণ থেকে বাদ যাচ্ছে না। এমনকি হিমালয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্টেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পৌঁছে গেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন মহাসাগরের তলদেশে ৯৩০০০-২৩৬০০০ টন মাইক্রোপ্লাস্টিক জমে রয়েছে।

আকারে ক্ষুদ্র হওয়ায় এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক মাটি, পানি বা বাতাসের সঙ্গে সহজেই মিশে যাচ্ছে। এর ফলে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের বাস্তুসংস্থান। নদীর স্রোত, বৃষ্টি, বন্যা প্রভৃতি বিভিন্ন উপায়ে এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক পুকুর, নদী ও সমুদ্রে গিয়ে জমা হচ্ছে। খাবারের সামুদ্রিক ও স্বাদুপানির মাছের পেটে চলে যাচ্ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। ফলে সহজেই প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খলে ঢুকে পড়ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। খাদ্যশৃঙ্খলের প্রথম স্তরের খাদককে দ্বিতীয় স্তরের খাদক ভক্ষণ করে; দ্বিতীয় স্তরের খাদককে তৃতীয় স্তরের খাদক ভক্ষণ করে; তৃতীয় স্তরের খাদককে সর্বোচ্চ স্তরের খাদক ভক্ষণ করে। এভাবে খাদ্যশৃঙ্খলের পর্যায়ক্রমিক পরিক্রমায় মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে প্রবেশ করছে। ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে দিনে দিনে।

বিভিন্ন ধরনের নিত্যব্যবহার্য কসমেটিক, ডিটারজেন্ট, ফেসওয়াশ, স্ক্রাব, ক্রিম ইত্যাদিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। এমনকি টুথপেস্টেও ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক কোনো প্লাস্টিক থেকে প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি মাইক্রোপ্লাস্টিক নয়, বরং ইঞ্জিনিয়ারিং উপায়ে তৈরি করা মাইক্রোপ্লাস্টিক, যা এসব পণ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব পণ্য ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন আমাদের স্বাঁস্থ্যঝুকি বাড়ছে, অন্যদিকে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এসব কসমেটিক ব্যবহারের পর তা পানির সঙ্গে মিশে ভেসে যাচ্ছে খাল, নদী কিংবা সমুদ্রে।

গবেষণায় দেখা গেছে, মাছের শরীরে পাওয়া গেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। বর্তমানে অনেক বোতলজাত পানিতেও পাওয়া গেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। এ ছাড়া টি-ব্যাগের চায়ে মিশে যেতে পারে মাইক্রোপ্লাস্টিক। সাধারণত টি-ব্যাগ প্রাকৃতিক ফাইবার দিয়ে তৈরি হলেও তা এঁটে দিতে ব্যবহার করা হয় প্লাস্টিক। উচ্চ তাপমাত্রার প্রভাবে এসব থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক চায়ে ছড়িয়ে যেতে পারে। প্রায় ৯৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফুটন্ত পানিতে ১১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ন্যানোপ্লাস্টিক তথা সেকেন্ডারি মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির কথা জানিয়েছেন কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। এ ছাড়া কাপড়ে ব্যবহৃত সিনথেটিক ফাইবার যেমন পলিইস্টার, নাইলন প্রভৃতিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

এভাবেই প্রতিনিয়ত পরিবেশের প্রতিটি উপাদানের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে প্রাণিজগতের ওপর। এর ফলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য। ক্যানসার, হরমোনের তারতম্য, প্রজননপ্রক্রিয়ায় বাধা ছাড়াও মারাত্মক সব ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাইক্রোপ্লাস্টিক।

গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক রক্ত জমাট বাঁধিয়ে ফেলতে পারে। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে জমা হয়ে অঙ্গকে বিকল করে ফেলতে পারে। যেমন যকৃৎ বিকল হয়ে যেতে পারে। এই মাইক্রোপ্লাস্টিকের কারণে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এমন আরও ছোট–বড় নানা সমস্যা দেখা যায়।

সম্প্রতি বাংলাদেশের বিখ্যাত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিভাগের তরফ থেকে একটি গবেষণা চালানো হয়। যে গবেষণায় উঠে আসে বুকে ভয় ধরানো তথ্য। গবেষণা চালাতে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন বাজার থেকে ১৭টি প্রজাতির প্রায় ৪৮টি মাছ সংগ্রহ করা হয়েছিল। বাজারে পাওয়া যায় এমন দেশি মাছের মধ্যে প্রায় ১৫টি প্রজাতির মাছের শরীরে প্লাস্টিকের ক্ষতিকারক টুকরো পাওয়া গিয়েছে। এই মাছের তালিকায় রয়েছে রুই, তেলাপিয়া, কৈ, কালবাউস, বেলে, ট্যাংরা প্রভৃতি।

গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ৭৩ শতাংশ মাছের শরীরেই রয়েছে মাইক্রোপ্লাস্টিক কিংবা প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা। যা মানুষের শরীরে ধীরে ধীরে স্লো পয়জন ঘটায়। আপনিও বুঝতেও পারবেন না কখন মৃত্যু শিয়রে এসে হাজির হয়েছে। শুধু কি প্লাস্টিক? মাছের শরীরে জলাশয় কিংবা সমুদ্র থেকে ঢুকে যায় পারদ, সীসা, ক্রোমিয়ামের মত ক্ষতিকারক রাসায়নিক। তারপর মাছ সংরক্ষণের জন্য বেআইনিভাবে ব্যবহার করা হয় ফর্মালিন। এগুলি যে প্রাণঘাতী রোগের মোক্ষম কারণ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

মাছ মাংসে যে বিষ রয়েছে তার প্রমাণ মিলেছে অনেক আগেই। উৎপাদন বাড়াতে বহু মাছ, পশু এবং হাঁস মুরগির খামারে ব্যবহার করা হচ্ছে চামড়া শিল্পের বর্জ্য। এগুলিতে থাকে মাত্রারিক্ত ক্রোমিয়াম। সাধারণত মাছ, মুরগি কিংবা কোন মাংস রান্না করলে ক্রোমিয়াম সহজে নষ্ট হয় না। কারণ এদের সহনীয় ক্ষমতা প্রায় ২৯০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। আর আমরা রান্না করি মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপে।

মাছের শরীর থেকে বিষ সরাসরি ঢুকবে আপনার শরীরে। যার ফলে স্থায়ীভাবে বিকল হয়ে যেতে পারে কিডনি। অকেজ হয়ে যাবে লিভার। মস্তিষ্ক সহ শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেও ক্ষতি হতে পারে। এমনকি ক্রোমিয়াম শরীরের কোষ নষ্ট করে দেয়। পরবর্তীকালে যা ক্যান্সার সৃষ্টি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, প্রতিদিন ট্যানারিতে প্রায় ১০০ টন বর্জ্য উৎপাদিত হয় যা রিসাইক্লিং করে ব্যবহার করা হয় মুরগি এবং মাছের খাবার হিসেবে।

অপরদিকে মাছ সংরক্ষণ করতে ব্যবহার করা হয় ফরমালিন। এটি হলো একটি অত্যন্ত বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ। এমনকি এই ফরমালিন মর্গে মৃত দেহ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হয়। ফরমালিনের স্বল্প মেয়াদী ব্যবহারের প্রভাবে কাশি, শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব, ত্বকে জ্বালা,চোখের জল ভাব বেড়ে যাওয়া প্রভৃতি সমস্যা হতে পারে। আর যদি দীর্ঘদিন ধরে আপনার শরীরে ফরমালিন প্রবেশ করে তাহলে ব্লাড ক্যান্সার এবং অন্যান্য ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়বে। আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা এবং আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ফরমালিনকে মানব দেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক একটি রাসায়নিক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই ফরমালিনের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিডনি এবং লিভার। এর ফলে কোন ব্যক্তি কোমাতেও চলে যেতে পারেন।

মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হল তেলাপিয়া। দামে কম, স্বাদে ভালো। এই মাছের মধ্যে লুকিয়ে হৃদরোগ, পক্ষাঘাত, হাঁপানির মতো রোগ। আসলে তেলাপিয়ার মাঝে জমা হয় ডিবুটাইলিন নামক এক কেমিক্যাল। মুক্ত পানির মাছের থেকে খামারের চাষ করা তেলাপিয়ার শরীরে ডাই অক্সিন থাকে প্রায় ১১ গুণ বেশি।

যেভাবে বিষ মুক্ত মাছ খাবেন

মাছ কেনার সময় ফরমালিনের উপস্থিতি বোঝা যায় না। তাই ভালোভাবে সঠিক পদ্ধতিতে মাছ ধুতে হবে। বাজার থেকে মাছ কিনে কলের পানিতে অন্তত ১০ থেকে ১২ মিনিট ভালোভাবে ঘষে ঘষে মাছের টুকরোগুলো ধুয়ে নেবেন।

মাছের শরীরের যে অংশে তেলের ভাগ বেশি সেখানেই বিষাক্ত পদার্থ অতিরিক্ত পরিমাণে সঞ্চিত থাকে। তাই সেই অংশ খাওয়া একটু এড়িয়ে চলুন। বিশেষ করে মাছের মাথা আর পেটি।

বাজার থেকে কেনা মাছের কানকো কিংবা শরীর থেকে যদি কেরোসিন বা পুরনো কাদার গন্ধ থাকে তাহলে বুঝবেন মাছের দেহে কীটনাশক পদার্থ রয়েছে। এই ধরনের মাছ কিনবেন না।

কীটনাশক ওষুধ থেকে বাঁচতে মাছের ফুলকা আর চোখ বাদ দিয়ে দিন।

মাছের টুকরোগুলো প্রথমে সরিষার তেলে ডুবিয়ে কিছুক্ষণ ভাজুন। তাহলে এর ভিতরে সঞ্চিত কীটনাশক তেলের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে। তারপর ওই টুকরোগুলো অন্য তেলে রান্না করুন।

(ঢাকাটাইমস/২৯ অক্টোবর/আরজেড)

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :