জঙ্গি ছিনতাইয়ে নেতৃত্বদানকারী শনাক্ত

এম এস নাঈম, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০২২, ২৩:৩২ | প্রকাশিত : ২১ নভেম্বর ২০২২, ২৩:১৬

# সাঁড়াশি অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী

# দ্বায়িত্বে অবহেলার দায়ে পাঁচ পুলিশ বরখাস্ত

# সীমান্তে সতর্কতা জারি

# দুই জঙ্গির পুরনো অপরাধের ধরন, চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করছে র‌্যাব

# তদন্ত কমিটির ঘটনাস্থল পরিদর্শন

রাজধানী ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত (সিএমএম) প্রাঙ্গণ থেকে পালিয়ে যাওয়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই জঙ্গিকে ধরতে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিশেষ করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ, কাউন্টার টেরোরিজম, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন র‌্যাব, পুলিশ সদর দপ্তরের এলআইসি, সিআইডি ও এন্টিটেরোরিজম রাজধানীসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জঙ্গি ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের খুব কাছাকাছি রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যেকোন সময় তারা গোয়েন্দাজালে ধরা পড়বে। পাশাপাশি ফেলে যাওয়া মোটরসাইকেলের মালিককেও চিহ্নিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে দ্বায়িত্বে অবহেলার দায়ে পাঁচ পুলিশকে বরখাস্তও করা হয়েছে। এদিকে দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় নেতৃত্বদানকারীকেও শনাক্ত করেছে সিটিটিসি।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় দশ আসামিকে ১০ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। রবিবার রাতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শফি উদ্দিনের আদালত এ আদেশ দেন।

দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় সিএমএম আদালতের পরিদর্শক জুলহাস বাদী হয়ে রাজধানীর কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। সেই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আবু সাইদ আসামিদের রিমান্ডে নিতে আবেদন করলে আদালত দশ আসামির ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রিমান্ডে নেওয়া আসামিরা হলেন- শাহীন আলম ওরফে কামাল, শাহ আলম ওরফে সালাউদ্দিন, বিএম মজিবুর রহমান, সুমন হোসেন পাটোয়ারী, আরাফাত রহমান, খাইরুল ইসলাম ওরফে সিফাত, মোজাম্মেল হোসেন, শেখ আব্দুল্লাহ, আ. সবুর ও রশিদুন্নবী ভূঁইয়া।

সূত্র জানায়, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই জঙ্গি মইনুল হাসান শামীম এবং আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিবসহ তাদের ছিনিয়ে নিতে যারা সহযোগিতা করেছে তাদেরকে গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। আর এ অভিযানে পুলিশের সবকটি ইউনিট একসঙ্গে কাজ করছে। রাজধানী ও আশপাশে চলছে এ অভিযান। এছাড়া দেশের প্রায় সবগুলো সীমান্তে জারি করা হয়েছে বাড়তি সতর্কতা।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) হারুন-অর-রশিদ বলেন, যারা পালিয়েছেন এবং যারা সহযোগিতা করেছেন সবাইকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। তারা সবাই নজরদারিতে রয়েছেন। যেকোনো সময় তাদের গ্রেপ্তারে আমরা সক্ষম হবো। তারা যাতে পালাতে না পারে সেজন্য ইতোমধ্যে পুলিশপ্রধান সারা দেশে রেড অ্যালার্ট জারি করেছেন। সম্ভ্যাব্য সব স্থানেই অভিযান হচ্ছে।

মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পাওয়া পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ঘটনার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সিটিটিসি অভিযান পরিচালনা করছে। আমরা আশা করছি, তাদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হবো। কীভাবে জঙ্গিরা পালিয়ে গেল, কারা কীভাবে নিয়ে গেল, এগুলো দেখছি। তাদের প্রত্যেককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

র‌্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই শীর্ষ জঙ্গি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় র‌্যাব আদালত প্রাঙ্গণসহ অন্যান্য জায়গার সিসিটিভি ফুটেজ এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। একইভাবে পালিয়ে যাওয়া দুজন জঙ্গির পূর্ববর্তী অপরাধের ধরন, তাদের আত্মীয়-স্বজন ও বিভিন্ন সময় চলাচলসহ সবকিছু র‌্যাব পর্যালোচনা করছে। পলাতক জঙ্গিদের আইনের আওতায় আনতে র‌্যাবের সব ইউনিট ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা করছে বলেও জানান তিনি।

জঙ্গিদের ছিনিয়ে নিতে দুটি মোটরসাইকেলে সহযোগীরা আসলেও তাড়াহুড়ো করে পালানোর সময় একটি মোটরসাইকেল ফেলেই চলে যায় তারা। কোতোয়ালী থানায় থাকা জঙ্গিদের ফেলে যাওয়া মোটরসাইকেলটি পুরান ঢাকার এক বাসিন্দার নামে নিবন্ধন করা বলে জানায় বিআরটিএ। মোটরসাইকেলটি ১৬০ সিসির হোন্ডা ব্র্যান্ডের হরনেট মডেলের।

বিআরটিএ সূত্র জানায়, মোটরসাইকেলটির রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছিল ২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি। এটির প্রথম মালিকের নাম আরটিএর তথ্যভাণ্ডারে উল্লেখ আছে। গতকাল সোমবার পর্যন্ত মোটরসাইকেলের মালিককে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এছাড়াও জঙ্গিদের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা, কেন তার মোটরসাইকেলকেই ছিনতাই অপারেশনের জন্য বেছে নেওয়া হলো, এসব বিষয়েও তথ্য নেই কারও কাছে। পুলিশ জানায়, মোটরসাইকেলটি মালিক সরাসরি সরবরাহ করেছেন কি না, নাকি চুরি হয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মোটরসাইকেল চুরি হলে তো দলিল থাকার কথা। সার্বিক বিষয়গুলো তদন্ত করা হয়েছে।

এদিকে আদালতে আসামিদের আনা-নেওয়ার বিষয়ে দায়িত্বে অবহেলায় পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার জসিম উদ্দিন। বরখাস্ত হওয়া পুলিশ সদস্যরা হলেন- সিএসএম আদালতের হাজতখানার কোর্ট ইন্সপেক্টর মতিউর রহমান, হাজতখানার ইনর্চাজ পুলিশের এসআই নাহিদুর রহমান ভুইয়া, আসামিদের আদালতে নেওয়ার দায়িত্বে থাকা পুলিশের এটিএসআই মহিউদ্দিন, কনেস্টেবল শরিফ হাসান ও আব্দুস সাত্তার।

সীমান্তে সতর্কতা জারি

ঢাকার আদালত থেকে দুই জঙ্গি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় দেশের সবগুলো সীমান্তে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ওই দুই জঙ্গি যেন কোনোভাবেই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পালিয়ে না যেতে পারে সে জন্য বাড়তি সতর্ক অবস্থান নিয়েছে তারা। পুলিশ ও বিজিবির একাধিক সূত্রমতে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্তে, পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা, সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর, কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে সতর্ক রয়েছে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি।

দুই জঙ্গির পুরনো অপরাধের ধরন, চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করছে র‌্যাব

আদালত প্রাঙ্গণ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই জঙ্গির আগের অপরাধের ধরন, তাদের আত্মীয়স্বজন ও বিভিন্ন সময়ে চলাফেরাসহ সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে র‌্যাব। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন গণমাধ্যমকে এ কথা জানিয়েছেন।

দুই জঙ্গির ছিনতাইকারী শনাক্ত

দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিকে শনাক্ত করেছে ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। সোমবার সন্ধ্যায় ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সিটিটিসি প্রধান মো. আসাদুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়ার নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তির নাম আমরা পেয়েছি। তাকে শনাক্ত করা হয়েছে। তার সঙ্গে আরও কারা কারা ছিল এরকম বেশ কয়েকজনের নাম আমরা পেয়েছি। কিন্তু এই মুহূর্তে তদন্তের স্বার্থে ব্যক্তির নাম পরিচয় আমরা বলতে চাচ্ছি না।

সিটিটিসি প্রধান বলেন, জঙ্গিদের ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা কীভাবে হয়েছে সেটাও আমরা গোয়েন্দার মাধ্যমে জানতে পেরেছি। পরিকল্পনা ও অপারেশনে কারা কারা ছিল এরই মধ্যে গোয়েন্দা তথ্যে আমরা নিশ্চিত হতে পেরেছি। তাদের যতদ্রুত সম্ভব গ্রেপ্তার করা আমাদের মূল লক্ষ্য।

জঙ্গিদের টার্গেট শুধু চারজনই ছিল নাকি আরও জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার টার্গেট ছিল, এমন প্রশ্নের জবাবে আসাদুজ্জামান বলেন, চারজনকে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল তবে দুজনকে তারা নিয়ে যায়। প্রথমে চারজন নেমেছে তাদেরকেই তারা নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। যদি একসঙ্গে বেশি নামতো তাদেরও নিয়ে যেত হয়তোবা, এমন পরিকল্পনা থাকতে পারে। অপারেশনে যারা ছিল তাদের গ্রেপ্তার করলে পুরো পরিকল্পনা জানা যাবে। তাদের হয়তো আরও বড় পরিকল্পনা থাকলেও থাকতে পারতো।

তদন্ত কমিটির ঘটনাস্থল পরিদর্শন

এদিকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সোমবার দুপুরে ঘটনাস্থলে আসেন পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি আমিনুল ইসলাম, সিটিটিসির যুগ্ম কমিশনার এ এইচ এম কামরুজ্জামানসহ কমিটির অন্য সদস্যরা। তাদের সঙ্গে ছিলেন ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার জসিম উদ্দিন। কমিটির সদস্যরা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের প্রধান ফটক, সিএমএম আদালতের হাজতখানা, ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধ ট্রাইব্যুনালসহ বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন। ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার জসিম উদ্দিন বলেন, তদন্তের কাজে সার্বিক বিষয় নিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, গত রবিবার দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের প্রধান ফটকের সামনে থেকে আনসার আল ইসলামের দুই সদস্যকে ছিনিয়ে নেয় জঙ্গিরা। এর আগে, রবিবার সকাল ৮টা ৫ মিনিটে কাশিমপুর থেকে ১২ জন আসামিকে ঢাকার আদালতে প্রিজন ভ্যানে নিয়ে আসা হয়। সকাল ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে ঢাকার প্রসিকিউশন বিভাগে আসামিদের হাজিরা দেওয়ার জন্য সিজেএম আদালত ভবনের সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনাল ৮-এ নিয়ে যাওয়া হয়। এ মামলার শুনানি শেষে জামিনে থাকা ১৩ নম্বর আসামি মো. ঈদী আমিন (২৭) ও ১৪ নম্বর আসামি মেহেদী হাসান অমি ওরফে রাফি (২৪) আদালত থেকে বের হয়ে যায়।

এরপর বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটের দিকে আদালতের মূল ফটকের সামনে পৌঁছানো মাত্র আগে থেকেই দুটি মোটরসাইকেলযোগে অজ্ঞাতনামা আনসার আল ইসলামের ৫/৬ জন সদস্য, আদালতের আশপাশে অবস্থানরত আনসার আল ইসলামের আরও ১০/১২ জন সদস্য হামলা করে। তারা কনস্টেবল আজাদের হেফাজতে থাকা আসামি মইনুল হাসান শামিম ওরফে সিফাত ওরফে সামির ওরফে ইমরান (২৪), মো. আবু সিদ্দিক সোহেল (৩৪) মো. আরাফাত রহমান (২৪) ও মো. আ. সবুর ওরফে রাজু ওরফে সাদ ওরফে সুজনকে (২১) ছিনিয়ে নিতে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করে। কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা তাদের কর্মকাণ্ডে বাধা দিলে আসামিদের মধ্যে কোনো একজন তার হাতে থাকা লোহা কাটার যন্ত্র দিয়ে কনস্টেবল আজাদের মুখে আঘাত করে।

(ঢাকাটাইমস/২১নভেম্বর/এসএন/আরকেএইচ/কেএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :