তিতাস কমিউটার ট্রেন: নির্ধারিত মূল্যে টিকিট যেন সোনার হরিণ!

আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকাগামী লোকাল ট্রেন তিতাস কমিউটার। কর্মজীবী, শিক্ষার্থী, সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের জন্য আশীর্বাদ বলা যায়। বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকায় কাজে আসা মানুষ, যাদের কাজ শেষে ফিরতে হয় তাদের কাছে এই ট্রেনের টিকিটের চাহিদা ব্যাপক।
সকাল ৯টার মধ্যে কমলাপুর পৌঁছানো যায় আবার কাজ শেষে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ৫টা ৪০ মিনিটে তিতাস ট্রেন ধরে গন্তব্যে ফেরত আসা যায়। তাই নানা পেশাজীবী ও শিক্ষার্থীদের কাছে তিতাস আশীর্বাদস্বরূপ বলাই যায়।
তবে এই ইতিবাচক চাহিদা মুখ থুবড়ে পড়ছে এর টিকিট প্রাপ্তির ভোগান্তির কারণে। তিতাস ট্রেনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকা পর্যন্ত টিকিটের মূল্য ৬০ টাকা মাত্র। কিন্তু ট্রেনটিতে চলাচলকারীদের কাছে সেই টিকিটই যেন সোনার হরিণ!
আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, হাতেগোনা ২/৩ দিন মাত্র নির্ধারিত ৬০ টাকা দিয়ে সেই সোনার হরিণটা কাউন্টার থেকে নিতে পেরেছিলাম। অন্য দিনগুলোতে এই ৬০ টাকা মূল্যের টিকিটই আমাকে কিনতে হয়েছে ২০০-২৫০ টাকা দিয়ে। আর অতিরিক্ত টাকা দিয়ে টিকিট সংগ্রহ করতে হয়েছে স্টেশন কাউন্টারের পাশের মুদির দোকানদার বা সেখানে ঘুরঘুর করা টিকিট ব্ল্যাকারের কাছ থেকে।
এখন আমার প্রশ্ন হলো, এই ট্রেনে (ক-ঠ) পর্যন্ত বগি আছে অর্থাৎ ১২টি। প্রতিটি বগিতে সিট আছে ৬৯টি। এসএলআর নামে আরেকটা বগিতে সিট আছে প্রায় ২০টি। সবমিলিয়ে মোট সিটের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৮৫০টি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া কেবল একটা স্টেশন অর্থাৎ আখাউড়ার পরই অথচ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাউন্টারে টিকিট নেয়ার জন্য ভ্রমণের পূর্বের দিন দুপুর ১টা ৩০ থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত যাত্রীরা এসে দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের প্রত্যাশা থাকে নির্ধারিত দাম দিয়ে কাউন্টার থেকে টিকিট সংগ্রহ করা।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, ৪টার দিকে যখন কাউন্টারে সিট দেওয়া শুরু হয় তারা সর্বোচ্চ ৪টা ৩০ পর্যন্ত অর্থাৎ আধাঘণ্টা টিকিট বিক্রি করেন। অর্থাৎ প্রতি মিনিটে ১ জন করে হলেও ৩০টা টিকিট বিক্রি করা হয়।
৪টা ৩০ মিনিটের পর এসএলআর অর্থাৎ মালবহন করার যে বগি সেখানকার কয়েকটি সিট দেন নরসিংদী পর্যন্ত। ৫টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে কাউন্টার বন্ধ করে দেয়া হয়।
আমি টিকিটপ্রত্যাশী এক যাত্রীকে কাউন্টারে একথাও বলতে শুনেছি, তিনি ক্যান্সার আক্রান্ত বাবাকে নিয়ে ঢাকায় যাবেন। তার দুটি টিকিটি দরকার। ৫টার পর টিকিট বিক্রি করা হবে না বিধায় তাকে ফেরত দেয়া হয়!
কারণ যেটা বুঝলাম, ওই যাত্রীকে টিকেট দিলে কেবল নির্ধারিত ৬০ টাকা আসবে। যেহেতু তার ক্যানসারের রোগী তিনি ৩০০ দিয়ে হলেও টিকিটটা যেকোনো ভাবে টিকিট সংগ্রহ করবেন!
আমার প্রশ্ন হলো, যদি লাইনে দাঁড়ানো সকলকে টিকিট থাকার পরও দেয়া হবে না, তাহলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাদেরকে অপেক্ষায় রাখার কারণ কী? কেন নির্ধারিত ৩০/৩৫ টিকিটের জন্য লাইনের সামনে থাকা ৩০/৩৫ জনকে রেখে বাকিদের বলে দেয়া হবে না ‘আপনারা চলে যান কারণ টিকিট আপনারা পাবেন না।’
আর একটা জেলার জন্য কি একটা ট্রেনের একটা বগি নির্ধারিত থাকে? সেটি না হলে ৩০/৩৫ জন ছাড়া বাকিরা শূন্য হাতে ফিরে যাবেন কেন? আবার কাউন্টার থেকে না পেলেও কথিত ব্ল্যাকারদের কাছেই বা কিভাবে টিকিট পাওয়া যায়? আর সেই টিকিটই দ্বিগুণ-তিনগুণ দামে কিনতে হবে সাধারণ যাত্রীদের?
আমি জানি, আমার মতো অসংখ্য মানুষের মনে একই প্রশ্ন। কিন্তু উত্তর নেই কারো কাছেই। কারণ, এই টিকিট দুর্নীতির পেছনে এক বা দুইজন নয়, কাজ করছে একটা কালোবাজারি সিন্ডিকেট। তারা সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয়তা, দুর্বলতাকে পুঁজি করে দিনের পর দিন এই অসাধু টিকিট বাণিজ্য করে যাচ্ছে।
সবশেষ তিতাসে করে যাত্রার একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে যাত্রার পর অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন এক যাত্রী। এক পর্যায়ে বসে থাকা দুজনের একজনকে বললেন ‘ভাই, একটু চেপে বসবেন? সিটের সাইটে একটু বসব।’
বসে থাকা যাত্রী জানান, তার কোমরে সমস্যা তাই ৬০ টাকার টিকিট বাধ্য হয়ে ২০০ টাকা দিয়ে কিনেছেন। দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিও জানান, তার কাছে টিকিটের দাম ২৫০ টাকা চাওয়ায় তিনি আর টিকিটই নেননি!
আমার নির্ধারিত আসনে বসে ভাবছিলাম—তিতাস ট্রেন তুমি আসলে কার? সাধারণ যাত্রীর নাকি টিকিট কালোবাজারি সিন্ডিকেটের?
লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী
সংবাদটি শেয়ার করুন
মুক্তমত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
মুক্তমত এর সর্বশেষ

বঙ্গবন্ধু বাঙালির মানসপটে চির অমলিন

ব্যাংক তুমি যতই খেল তোমার আদায় ৩০০ গুনো

ভাই গিরিশচন্দ্র সেন বনাম মৌলবী নইমুদ্দীন: একটি ভুল প্রচারের ‘ভুল’ নিরসন

প্রজন্মকে বাঁচাতে চাই বৃক্ষরোপণ

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই সচেতনতা

জীবনবোধ থেকেই মনোবিজ্ঞান অধ্যয়ন জরুরি

বেকারত্ব কমাতে বয়সসীমা বাড়ানো হোক

জ্ঞান অর্জনে বই পড়ার বিকল্প নেই

আসুন মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করি
