ত্রিশালে মাসে ১০ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ টেনে নিচ্ছে ব্যাটারি রিকশা

ময়মনসিংহের ত্রিশালে একদিকে বিদ্যুতের ঘাটতি ও ঘন ঘন লোডশেডিং, অন্যদিকে রাতভর ইজিবাইক, অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত ভ্যানের ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জ দিতে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা চার্জিং পয়েন্ট ও গ্যারেজে অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ার পাশাপাশি সরকার রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগ, পৌরসভা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ত্রিশাল উপজেলায় কয়েক হাজার ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলাচল করছে। এসব যানবাহনের একটি বড় অংশ রাতের বেলায় বিভিন্ন গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্টে রাখা হয়। সেখানে কয়েক ঘণ্টা ধরে ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব পয়েন্টের উল্লেখযোগ্য অংশে বৈধ মিটারের পরিবর্তে অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করা হচ্ছে।
ত্রিশাল পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় তাদের প্রায় ৪৮ হাজার গ্রাহক রয়েছেন। তাঁদের মাসিক গড় বিদ্যুৎ ব্যবহার প্রায় দেড় কোটি ইউনিট। অন্যদিকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন এলাকায় প্রায় ৫৫ হাজার গ্রাহকের মাসিক বিদ্যুৎ ব্যবহার গড়ে ৮৫ লাখ ইউনিট।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, একটি ইজিবাইকে সাধারণত চার থেকে পাঁচটি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি থাকে। ব্যাটারি পুরোপুরি চার্জ দিতে প্রায় ছয় থেকে সাত ঘণ্টা সময় লাগে এবং এতে প্রায় আট থেকে নয় ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়। অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত ভ্যানের ক্ষেত্রে ব্যাটারি চার্জে প্রায় তিন ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়।
ত্রিশাল উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় প্রায় দুই হাজার ইজিবাইক এবং প্রায় সাত হাজার অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত ভ্যান রয়েছে। এই হিসাব ধরে প্রতিদিন এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সব ধরনের ব্যাটারিচালিত যানবাহন মিলিয়ে মাসে প্রায় ১০ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ এ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এই হিসাবের পুরোটা অবৈধ ব্যবহারের কারণে হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যাত্রী পরিবহনে তুলনামূলক কম ভাড়ার কারণে ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যানের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ত্রিশাল পৌর শহর ও বাজার এলাকায় এসব যানবাহনের চলাচল বেশি। চালকদের অনেকে বিভিন্ন গ্যারেজে রাতের জন্য গাড়ি রেখে ব্যাটারি চার্জ করান। এর বিনিময়ে গাড়িপ্রতি প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত গ্যারেজ মালিককে দিতে হয় বলে কয়েকজন চালক জানিয়েছেন।
ত্রিশাল পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, গত অর্থবছরে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ইজিবাইক, অটোরিকশা ও ভ্যানকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়ভাবে অবশ্য এর বাইরেও অনেক ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলাচল করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে বিভিন্ন চার্জিং পয়েন্ট ও গ্যারেজে দেখা যায়, অনেক জায়গায় একসঙ্গে একাধিক গাড়ির ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু গ্যারেজে মিটারের বাইরে সংযোগ নেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও মিটার কারসাজির মাধ্যমেও বিদ্যুৎ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
গ্যারেজ মালিকদের কয়েকজন জানান, ব্যাটারি চার্জ দিতে বৈধ সংযোগের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ বিল বেশি আসে। ফলে অনেকে খরচ কমাতে অবৈধ সংযোগের দিকে ঝুঁকছেন। তবে অবৈধ সংযোগ নেওয়ার অভিযোগের সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। এ অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ত্রিশাল পৌর শহরের কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, দিনে বিদ্যুৎ থাকলেও সন্ধ্যার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে লোডশেডিং হয়। অন্যদিকে রাতভর গ্যারেজগুলোতে একসঙ্গে অনেক ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হয়। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের বিষয় বলে তাঁরা মনে করেন।
ত্রিশাল উপজেলার বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোশারফ হোসেন বলেন, ‘চার্জিং পয়েন্টের জন্য আমাদের দেড় শতাধিক বৈধ সংযোগ রয়েছে। অবৈধ সংযোগের বিষয়ে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে।’
লোডশেডিং সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় আমরা কম বিদ্যুৎ পাচ্ছি। যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, চাহিদা অনুযায়ী সেটিই বিতরণ করা হয়। জ্বালানি ঘাটতির কারণেও লোডশেডিং হচ্ছে।’ বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুধু অভিযান পরিচালনা নয়, অবৈধ চার্জিং পয়েন্টগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত নজরদারি ও বৈধ সংযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এদিকে মহাসড়কে ইজিবাইক, অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত ভ্যান চলাচলে বিধিনিষেধ থাকলেও ত্রিশালের বিভিন্ন সড়কে এসব যানবাহনের চলাচল বন্ধ হয়নি। ফলে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
(ঢাকা টাইমস/২৪আগস্ট/এসএ)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন










































