করেছেন সনদ জালিয়াতি

একই চেয়ারে ১৭ বছর: পদোন্নতি-বদলি বাণিজ্য করে স্ত্রীসহ পরিবারের নামে করেছেন সম্পদের পাহাড়

এলজিইডির আবদুল মান্নানের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১৪:৫৮
অ- অ+

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান কার্যালয়ের প্রশাসন শাখার স্টেনোটাইপিস্ট কাম-কম্পিউটার অপারেটর মো. আবদুল মান্নানের বিরুদ্ধে সনদ জালিয়াতি, পদ-পদবি পরিবর্তন, বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্য এবং ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। একই কর্মস্থলে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে অবস্থান করে তিনি একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরেও প্রভাব কমেনি এই কর্মকর্তার।

আবদুল মান্নান ও তার স্ত্রী মর্জিনা খাতুনের নামে ঢাকার উত্তর আজমপুরে ছয়তলা ভবন, বিভিন্ন এলাকায় জমি, কারখানা, বাড়িসহ বিপুল সম্পদ থাকার অভিযোগ রয়েছে। তার স্ত্রী গৃহিণী হলেও তার নামে এসব সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে বলে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দেওয়া অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্প্রতি আবদুল মান্নানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে দুদকে লিখিত অভিযোগ করেন গোলাম মাওলা নামের এক ব্যক্তি। ওই অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নথিপত্র পর্যালোচনা করে এসব তথ্য জানা গেছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, আবদুল মান্নান দীর্ঘদিন এলজিইডির প্রশাসন শাখায় থাকার সুযোগ নিয়ে বদলি, পদোন্নতি ও পদায়নসংক্রান্ত কাজে প্রভাব বিস্তার করতেন। তার বিরুদ্ধে শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।

এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকাটাইমসকে বলেন, প্রশাসন শাখায় দীর্ঘদিন একই ব্যক্তি অবস্থান করলে তার হাতে স্বাভাবিকভাবেই বিপুল প্রভাব তৈরি হয়। আবদুল মান্নানের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ সময় একই জায়গায় থাকার কারণে বদলি-পদায়নসহ প্রশাসনিক বিভিন্ন কাজে তার প্রভাব তৈরি হয়েছে বলে তারা শুনেছেন।

১৭ বছর একই শাখায়

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন অবস্থান করার সুযোগ না থাকলেও আবদুল মান্নান প্রায় ১৭ বছর ধরে এলজিইডির সদর দপ্তরের প্রশাসন শাখায় রয়েছেন। তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ২১ জুলাই তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী মো. ওয়াহিদুর রহমানের সময়ে তিনি এলজিইডি সদর দপ্তরের প্রশাসন শাখায় পদায়ন পান। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি একই শাখায় দায়িত্ব পালন করছেন।

দুদকে অভিযোগকারীর দাবি, সদর দপ্তরে দীর্ঘদিন অবস্থানের সুযোগ নিয়ে তিনি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বদলি, পদোন্নতি ও পদায়নে প্রভাব বিস্তার করেন। তার চাহিদামতো অর্থ না দিলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের লিখিত নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট ফাইল আটকে রাখা বা নোট না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

সনদ জালিয়াতি করে পদ পরিবর্তনের অভিযোগ

দুদকে দেওয়া অভিযোগে আবদুল মান্নানের চাকরিতে যোগদান ও পদ পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর বান্দরবানের রুমা উপজেলায় ‘কার্য সহকারী’ পদে যোগ দেন আবদুল মান্নান। পরে শিক্ষা ও কম্পিউটার-সংক্রান্ত সনদ দাখিল করে জালিয়াতির মাধ্যমে ‘স্টেনোটাইপিস্ট কাম-কম্পিউটার অপারেটর’ পদে পরিবর্তিত হন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীর দাবি, স্টেনোটাইপিস্ট পদে নিয়োগের জন্য ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রি প্রয়োজন হলেও আবদুল মান্নানের জাতীয় পরিচয়পত্রে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) উল্লেখ রয়েছে। কার্য সহকারী পদ থেকে স্টেনোটাইপিস্ট পদে এ ধরনের পদ পরিবর্তনের আইনি সুযোগ ছিল কি না, সেটিও তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কথিত সনদ জালিয়াতির মাধ্যমে উচ্চতর বেতন স্কেল নেওয়ার কারণে গত ২৫ বছরে সরকারি তহবিল থেকে তিনি প্রায় ৩৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত নিয়েছেন।

বদলি-পদোন্নতিতে কোটি কোটি টাকা?

দুদকে দেওয়া অভিযোগে আবদুল মান্নানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদে বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট হারে টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, সম্প্রতি প্রায় ২২৫ জন নির্বাহী প্রকৌশলীর পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রত্যেকের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। ১৩৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে পদোন্নতি দিয়ে সহকারী প্রকৌশলী করার ক্ষেত্রে প্রত্যেকের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা, ২৯০ জন উপজেলা প্রকৌশলীর বদলি বা পদায়নে প্রত্যেকের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা এবং ১৯৫ জন উপসহকারী প্রকৌশলীর বদলিতে প্রত্যেকের কাছ থেকে এক লাখ টাকা করে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়, এসব হিসাবের ভিত্তিতে পদোন্নতি, বদলি ও পদায়ন ঘিরে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি ঢাকাটাইমস।

আজমপুরে ছয়তলা ভবন, জমি ও কারখানার অভিযোগ

আবদুল মান্নান ও তার স্ত্রী মর্জিনা খাতুনের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ থাকার অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকার দক্ষিণখান থানার উত্তর আজমপুরের দেওয়ানবাড়ী রোডের ৩৩ নম্বর হোল্ডিংয়ে ছয়তলা ভবন রয়েছে। ভবনটির মালিকানা ও অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলে তদন্তের দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, দেওয়ানবাড়ী রোডে পাঁচ কাঠার একটি খালি প্লট এবং সাভারের রাজাশনে আরও পাঁচ কাঠা জমি রয়েছে। সিরাজগঞ্জে তাঁর স্ত্রীর নামে ছয়তলা বাড়ি ও প্রায় ৪০ বিঘা জমি থাকার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া গাজীপুরের চান্দুরায় ২০ কাঠা জমির ওপর তার স্ত্রীর নামে একটি কারখানা এবং সাভারের আশুলিয়ায় ১০ কাঠা জমিসহ টিনশেড বাড়ি থাকার অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীর দাবি, এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস অনুসন্ধান করা হলে আরও সম্পদের তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

স্ত্রীর নামে সম্পদ, আয়কর নিয়েও প্রশ্ন

দুদকে দেওয়া অভিযোগে আবদুল মান্নানের স্ত্রী মর্জিনা খাতুনের সম্পদ ও আয়কর নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগে তাকে গৃহিণী হিসেবে উল্লেখ করে তার নামে বাড়ি, গাড়ি, প্লট, ফ্ল্যাট, জমি ও ব্যাংকে বিপুল অর্থ থাকার দাবি করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, মর্জিনা খাতুনের নামে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) রয়েছে এবং তিনি নিয়মিত আয়কর দিয়ে আসছেন। তার নিজের কোনো দৃশ্যমান আয় না থাকলেও এসব সম্পদ ও অর্থের উৎস কী তা খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।

ভাইয়ের মাধ্যমে টাকা লেনদেনের অভিযোগ

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আজমপুরের ছয়তলা ভবনের নিচে ঘুষ ও চাঁদাবাজির অর্থ লেনদেনের সুবিধার্থে আবদুল মান্নান তার এক ভাইকে একটি বিকাশের দোকান দিয়ে বসিয়েছেন। একই সঙ্গে নিজের ছোট ভাইকে সনদ জালিয়াতির মাধ্যমে আউটসোর্সিংয়ের অধীনে ‘ইলেকট্রিশিয়ান’ পদে চাকরি দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগেরও স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বিলাসী জীবনযাপন

আবদুল মান্নানের বিরুদ্ধে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ব্যয়বহুল জীবনযাপনের অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, তার ছেলে ও মেয়েকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি ও ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে (আইইউবি) পড়াশোনা করানো হয়েছে। ছেলের বিয়েতে উত্তরার একটি কমিউনিটি সেন্টারে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত গাড়ি ও দামি মুঠোফোন ব্যবহারের কথাও অভিযোগে বলা হয়েছে।

এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকাটাইমসকে বলেন, প্রশাসন শাখায় দীর্ঘদিন একই ব্যক্তি থাকলে বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতিসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে তার প্রভাব তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে। আবদুল মান্নান দীর্ঘদিন একই শাখায় থাকায় তার প্রভাব নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।

এক কর্মকর্তা বলেন, ‘একজন কর্মচারী বছরের পর বছর একই গুরুত্বপূর্ণ শাখায় থাকলে তাকে ঘিরে একটি বলয় তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অভিযোগগুলো সত্য কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করা উচিত।’

আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘বদলি ও পদোন্নতির মতো প্রশাসনিক কাজে কোনো কর্মচারীর ব্যক্তিগত প্রভাব থাকার কথা নয়। কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে কর্তৃপক্ষের উচিত নিরপেক্ষ তদন্ত করা।’

অভিযোগের বিষয়ে আবদুল মান্নানের বক্তব্য

আবদুল মান্নানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একাধিকবার তাকে ফোন করা হলে তিনি তা রিসিভ করেননি।

অভিযোগকারীরা আবদুল মান্নানের শিক্ষাগত ও কম্পিউটার সনদ যাচাই, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার বিষয়টি খতিয়ে দেখা, তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের উৎস অনুসন্ধান এবং বদলি-পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
সব মাদ্রাসায় ঈদে মিলাদুন্নবীর বিশেষ কর্মসূচির নির্দেশ
মৌলভীবাজারে অন্য ব্যক্তিকে ফাঁসাতে নিজের মেয়েকে হত্যা, বাবার মৃত্যুদণ্ড
হাম উপসর্গ নিয়ে ৫ শিশুর মৃত্যু
২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে ৩ জনের মৃত্যু
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা