জাপায় চতুর্থ দফায় ভাঙনের সুর

রওশনকে চেয়ারম্যান ঘোষণা এক পক্ষের; এখন পর্যন্ত তিনবার ভেঙেছে জাতীয় পার্টি

বোরহান উদ্দিন, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১০:৪৩
গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে রওশন এরশাদকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণা করে দলটির একটি অংশ।

সাবেক সেনাশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জীবদ্দশায় তিন দফা ভাঙনের মুখে পড়েছিল জাতীয় পার্টি। তার প্রয়াণের দুই মাস যেতে না যেতে দলের দুটি ধারার মধ্যে প্রকাশ্যে বিরোধে আরেক দফা ভাঙনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এক পক্ষে প্রয়াত স্বৈরশাসকের স্ত্রী বেগম রওশন এরশাদ, অন্যদিকে এরশাদের ভাই গোলাম মোহাম্মদ কাদের। দুজনই নিজেকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান দাবি করছেন।

এরশাদ ক্ষমতা দখল করার পর ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠার পর চার বছর ছিল রমরমা। তবে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে গণ আন্দোলনে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে দুর্বল হতে থাকে দল। আর এখন পর্যন্ত তিন দফা ভাঙন ধরেছে দলে।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকারে যোগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রথমবারের মতো ভাঙন ধরে জাতীয় পার্টিতে। ব্র্যাকেটবন্দী জাতীয় পার্টি গঠন হয় আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বে।

২০০১ সালে জাতীয় নির্বাচনের পর আরেক দফা ভাঙন দেখা দেয় এরশাদের দলে। দুই বছর আগে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোটসহ বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয় জাতীয় পার্টি। তবে ভোটের আগে এরশাদ জোট ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ার পর নাজিউর রহমান মঞ্জুর এবং এম এ মতিনের নেতৃত্বে আবার গঠন হয় আলাদা জাতীয় পার্টি। তারা বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে যায়।

২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে কাজী জাফর আহমদের নেতৃত্বে আরো একটি অংশ আলাদা হয়ে যায় এরশাদকে ছেড়ে। আলাদা জাতীয় পার্টি গঠন করে তারা যোগ দেন বিএনপি-জোটে। ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে দলের বিশেষ কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন জাতীয় পার্টির ঘোষণা দেন কাজী জাফর।

ভাঙনের কারণে ধীরে ধীরে ক্ষয়িষ্ণু হলেও ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জোটে যাওয়া, ২০১৪ সালে বিএনপির ভোট বর্জন এবং গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আবার আওয়ামী লীগের জোটে যাওয়ার সুবাদে সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসতে পারছে জাতীয় পার্টি।

তবে ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনের আগেই দলে দুটি ধারা দৃশ্যমান হয়। একটির নেতৃত্বে থাকেন রওশন, অন্যটির এরশাদ। এরশাদ তার জীবদ্দশায় দলের নেতৃত্ব নিজের পরিবারে রাখতে চেয়েছেন, এটা স্পষ্ট। পারিবারিক সম্পত্তির মতোই দলের নেতৃত্ব ছোট ভাই কাদেরের হাতে থাকবে-এটা লিখে গেছেন তিনি।

তবে এরশাদ মারা যাওয়ার পর রওশন অনুসারীরা এরশাদের সেই ‘উইল’ মানছেন না। আর দেবর-ভাবীর দ্বন্দ্ব এখর সরেস আলোচনার খোরাক তৈরি করেছে রাজনৈতিক অঙ্গণে।

রওশন প্রকাশ্যেই বলেছেন, তিনি ভাঙনের আলামত দেখছেন। আর কাদের যখন ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’ হিসেবে নিজের অবস্থান পোক্ত করার চেষ্টায়, তখন অপর পক্ষ রওশনকেও চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছে অন্য পক্ষ। আবার এই পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার ঘোষণা এসেছে কাদেরের পক্ষ থেকে।

রওশন নিজে বলেছেন, ‘দল নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন। দলে অতীতেও ভাঙন হয়েছে এবং এবারও ভাগ হচ্ছে নাকি?’

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এরশাদ জীবিত থাকাবস্থায় জাতীয় পার্টিতে যা হয়েছে তার মৃত্যুর পর পরিস্থিতি নড়বড়ে হয়ে যাবে এটা অনুমেয়ই ছিল। কারণ, দলের কোনো রাজনৈতিক দর্শন, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য কিছু ছিল না। ক্ষমতায় থেকে দলছুট নেতাদেরকে ভাগিয়ে এনে এরশাদ দল চালালেও ক্ষমতা হারানোর পর থেকে দলটি কেবল রংপুর অঞ্চলেই কিছুটা প্রভাব ধরে রাখতে সক্ষম হয়। তাও দিনে দিনে ক্ষয়িষ্ণু হয়েছে তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘এখানে কোনো গণতান্ত্রিক নিয়মনীতি নেই। তাই যে কোনো সময় দল ভেঙেও যেতে পারে, আবার মান অভিমান রেখেই সবাই থেকে যেতে পারে।’

‘সমস্যা হলো দলের একটি গ্রুপ পেছন থেকে নিজেদের অবস্থান হাজির করতে জিএম কাদের ও রওশন এরশাদকে ইন্ধন দিচ্ছেন। এরশাদ না থাকায় এই অবস্থা আরও জটিল হলে সামাল দেয়া কঠিন হবে। কারণ এখানে তো নিয়ন্ত্রণ করার কেউ নেই।’

গত ১৪ জুলাই এরশাদ মারা যাওয়ার আগে ছোট ভাই জিএম কাদেরকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন। যা নিয়ে মূলত দলের দুই গ্রুপের মধ্যে মনস্তাত্বিক লড়াই। এরপর এরশাদ মারা যাওয়ার পর এ নিয়ে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখালেও তার চল্লিশা শেষে মাঠে নেমেছেন কাদের ও রওশনপন্থী নেতারা।

গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে রওশনকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করে জাপার সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, ‘এরশাদের শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন থাকায় জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান ঘোষণার সময় সব জেনেও চুপ থেকেছি। আমরা কিছু বলিনি, চল্লিশার জন্য অপেক্ষায় ছিলাম। জিএম কাদের পার্টির চেয়ারম্যান নন। তিনি জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।’

অন্যদিকে চেয়ারম্যান হিসেবে মানলেও জিএম কাদেরকে বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে মানতে নারাজ রওশন। তাই কাদেরের চিঠি দেয়ার একদিন পর স্পিকারকে চিঠি দিয়েছেন রওশন। তাদের দাবি, রওশনই হবেন বিরোধীদলীয় নেতা।

জিএম কাদের তাদের যারা এটা করেছে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। আজ তিনি সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত বলবেন বলে জানিয়েছেন।

জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ এমন পরিস্থিতির জন্য দলের কিছু নেতার দিকে অভিযোগের ইঙ্গিত তুলেছেন। ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘ম্যাডামকে (রওশন) কিছু বিপদগামী লোক ভুল বোঝাচ্ছে। আমার বিশ্বাস এখন যাই বলুক পরিস্থিতি যাতে দলের অনুকূলে থাকে তিনি শেষে সেই সিদ্ধান্তই নেবেন। আমাদের কাছে রওশন এরশাদ শ্রদ্ধার পাত্র। তার দোয়া নিয়ে চলতে চাই।’

ভাঙন নিয়ে না ভাবলেও বর্তমান পরিস্থিতি দলের জন্য অসুন্দর দাবি করে ফিরোজ রশিদ বলেন, ‘যে যাই বলুক দলের সংসদ সদস্যদের বেশিরভাগই জিএম কাদেরের পক্ষে আছে।’

দলের এই পরিস্থিতিতে সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় এক নেতা হতাশা প্রকাশ করে ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘পরিস্থিতি এখন যা হচ্ছে তাতে আশার আলো নেই। আমরা সবাই দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছি। কার পক্ষে যাব বুঝতে পারছি না।’

ঢাকাটাইমস/৬সেপ্টেম্বর/বিইউ/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :