গল্প- ক্র্যাচ : মনি হায়দার

অনলাইন ডেস্ক
 | প্রকাশিত : ০১ জানুয়ারি ২০২০, ১২:১৭

তুই ফোঁস ফোঁস কইরা কানতে আচো ক্যা? মোরা অন্যায়ডা কী কইচি? তুই এলহা অইতি মোরা দ্যাকতাম। লগে একটা পোলা... একটানা বলে থামে ইয়াকুব, ইয়াসমীনের বড় ভাই। রাজিয়া খাতুনের ঘরের মধ্যে জটলা। জটলার মধ্যমণি ইয়াসমীন এবং কোলের দুই বছরের পুত্র চম্পক। জটলা না বলে একটা বিচারসভাও বলা যায়। ইয়াসমীন স্বামীবাড়ি থেকে চলে এসেছে। কিন্তু ভাই ইয়াকুব আর লিয়াকত, দুজনের স্ত্রী একত্র হয়ে ইয়াসমীনকে ফিরে যাবার জন্য প্রচণ্ড চাপ দিচ্ছে।

বৃদ্ধ মা রাজিয়া খাতুন মেয়ের পক্ষে থাকলেও তিনি এই মুহূর্তে নিরুপায়। ছেলেদের সংসারে থেকে জীবনযাপন করতে হচ্ছে। ছেলেদের সংসারে আরও দুই বধূ আসমা আর জোছনা। দুই বউয়ের মুখ এবং চোখ থাকে শাশুড়ির ওপর। চাইলেও তিনি পারছেন না একমাত্র মেয়ে ইয়াসমীনের পক্ষ নিতে।

বড় ছেলের বউ আসমা অনেকক্ষণ মুখ বন্ধ করে ছিল। বন্ধ মুখে কথা ফোটায় আসমা, চম্পকের বাপের চাইয়া ওর চাচা এনামুলের চেহারা-সুরতও ভালো। উজানগাঁওয়ের আটে দোকানও আছে একখান। এইডা তো নতুন কিছু না, স্বামী মইরা গেলে দেওরের লগে বিয়া অইচে কতো...

সঙ্গে সঙ্গে ছোট ভাই হুমায়ুনের বউ জোছনা উদাহরণ টানে, ক্যা ভাবী, আমাগো পাশের বাড়ির হেমায়েত কাকার বড় পোলা জহির মইরা গেলে জহিরের ছোট ভাই ইকবালে হ্যার ভাবীরে বিয়া হরে নাই? হেই বিয়া তো ৮-৯ বচ্চর অইচে। হেই সোংসারে দুইটা মাইয়াও অইচে। ভালো শান্তিতে আছে হেরা।

জোছনার উদাহরণ টানা শেষ হলে ইয়াসমীন আগের মতোই চম্পককে বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরে কাঁদতে থাকে। পুরো কক্ষটা শোকে থৈ থৈ ভাসছে। কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ সহ্য করার পর গর্জে ওঠে হুমায়ুন, তুই মরা কান্দোন থামা। মোরা কি তোরে গাঙ্গে ভাসাইয়া দিতাছি? তোর জামাই মুক্তিযুদ্ধে বীরত্ব দেহাইতে গিয়া মইরা গেছে। রাইখা গেছে পোলা একটা। তোরে হারাজীবন পালমু কিন্তু ওই পোলা পালমু ক্যা? পোলার দাদায় বাইচা আছে, এক কানি জমিও পাইবে না তোর পোলায়। বোজো কিছু? ভাগ্য ভালো, তোর দেবরে বিয়া করতে চাইতেছে, রাজি অইয়া যা...। ভালো থাকবি, পোলাডা মানুষ অইবে... থামে হুমায়ুন।

ঘরের মধ্যে নেমে আসে নীরবতা। কান্না থামাতে বাধ্য হয়েছে ইয়াসমীন। রাজিয়া খাতুনের চোখে পানি কিন্তু ভয় পাচ্ছে, ছেলেরা দেখলে আবার কটু কথা শোনাবে।

গলা নরম করে হুমায়ুন, হোন আমরা তোর মায়ের পেডের ভাই না? আমরা কী তোর খারাপ চাইতে পারি? তোর আর তোর পোলার ভালোর লাইগাই কইতেছি...। যা উজানগাঁও, এনামুল ভালো পোলা। তোরে আদরে যত্নে রাকবে। কোনো ঝামেলা হরলে আমরাতো আছিই, কি কন মিয়াভাই?

সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় দুলিয়ে ছোট ভাইকে সমর্থন করে বড় ভাই ইয়াকুব আলী, গত তিন দিন ধইরা হেই কতাইতো ইয়াসমীনরে বুঝাইয়া কইতেছি। অয় তো হোনে না...। একটা কিছু কইলে খালি কান্দে। আরে ভাই, দেশে এহন বিধবা মাইয়া মানুষে ভইরা গেছে। তোর ভাগ্য ভালো, তোর দেওর তোরে বিয়া করতে চায়, বড় ভাইয়ের পোলাসহ। এই সুযোগ কী হেলা করা যায়?

আম্মা! বড় ছেলের বউ আসমা তাকায় বিধ্বস্ত বিপন্ন শাশুড়ি রাজিয়া খাতুনের দিকে।

মুখ তুলে তাকায় রাজিয়া খাতুন, কী?

আপনে তব্দ অইয়া রইছেন ক্যা? মাইয়ারে বুঝাইয়া কইতে পারেন না? ঝামটা মারে আসমা।

চারদিন আগে স্বামীর বাড়ি থেকে বাপো বাড়ি আসার পর থেকেই মা ও মেয়ে তোপের মুখে। এমনটা ঘটবে জানতো ইয়াসমীন। একটা শেষ লড়াই করতে চেয়েছিলÑ যদি রক্ষা পায়। কিন্তু দুই ভাই, ভাইদের বউয়েরা একজোট হয়েছে ইয়াসমীনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে।

মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে আট মাস। উজানগাঁওয়ের যারা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল তিন ছাড়া এগারোজন ফিরে এসেছে। বাড়িতে বাড়িতে উৎসব। তিন বাড়িতে শোক আর শোক। তিন বাড়ির একটি বাড়ি চম্পকদের। চম্পকের বাবা কবিরুল আলম স্থানীয় স্কুলের ইংরেজির শিক্ষক। স্বাস্থ্যবান সুপুরুষ আলম। শৈশব থেকে সমাজ দেশ রাষ্ট্র সচেতন আলম বরিশালের ব্রজলাল কলেজ থেকে বি এ পাস করে বাড়ির পাশের হাই স্কুলে মাস্টারী নেয়। ছোট ভাই এনামুল পড়াশোনা না করে উজানগাঁও হাটে দোকান দিয়ে বসে। কবিরুলদের বাবা হেমায়েত আলী চেয়েছিল বড় ছেলের পথ ধরে ছোট ছেলেও লেখাপড়া করুক। অনেক চেষ্টাও করেছে কিন্তু এনামুল লেখাপড়ায় মনোযোগী না হয়ে গ্রামের একদল ছেলের সঙ্গে আড্ডা মেরে বেড়ায়। আর গ্রামের অনেক অপকর্মের সঙ্গে থেকে তাইরে নাইরে ঘুরে বেড়ায়।

দেশে নির্বাচন এলে দুই ভাইয়ের পথ দুদিকে চলে যায়। কবিরুল আলম আগে থেকেই ছিল শেখ মুজিব আর আওয়ামী লীগের পক্ষে। আওয়ামী লীগের হয়ে এলাকায় নির্বাচনে প্রচারণা চালায়। শিক্ষক হিসেবে আগে থেকেই ওর গ্রহণযোগ্যতা ছিল সকলের মাঝে। ভালো বক্তা হিসেবেও পরিচিত। উজানগাঁও হাটে মাইকে যখন দুই পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য তুলে ধরে বিচার করে বোঝাতো, জনগণ সহজেই বুঝতে পারতো। ছেলের গৌরবে হেমায়েত আলীও আত্মহারা। এলো নির্বাচন। নির্বাচনে জিতল আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধুর দল। কিন্তু ক্ষমতা না দিয়ে রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি হার্মাদ বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘুমন্ত বাঙালি নর-নারীর ওপর। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে কবিরুল আলম চলে যায় ভারতে প্রশিক্ষণ নিতে। রেখে যায় স্ত্রী ইয়াসমীন আর দেড় বছরের পুত্র চম্পককে।

কিন্তু এনামুল যোগ দেয় রাজাকারে।

হেমায়েত আলী কী করবে বুঝাতে পারে না। এনামুলের মা মাজেদা বেগম খুবই বিরক্ত ছোট ছেলের ওপর। সেই বিরক্তি প্রায় ঘৃণায় রূপান্তরিত হয়ে, যখন বড় ভাবির ওপর চোখ পড়ে। মাকে আগস্টের শেষের দিকে হাতে একটা রাইফেল নিয়ে বাড়ি আসে। যুদ্ধ চলছে চারদিকে। কয়েক দিন আগে রাজাকার আর পাকিস্তানি আর্মিরা একত্র হয়ে আক্রমণ করে পূর্ব পাড়ার হিন্দুদের বাড়ি। মানুষের মুখে শুনেছে মাজেদা বেগম, ছোট পুত্র রাজাকার এনামুল সেই রাজাকার বাহিনীতে ছিল। নিজের হাতে তিনজন হিন্দুকে গুলিও করে হত্যা করেছে। মাজেদা বেগম মুষড়ে পড়ে, আমার পুত্র হত্যাকারী?

রাতে বাড়িতে এলে এনামুলকে জিজ্ঞেস করে, তুই মানুষ গুলি করচো?

ভাত খাচ্ছিল এনামুল। বেড়ে দিয়েছিল চম্পকের মা ইয়াসমীন। মুখের ভেতরে ভাতের গ্রাস নিতে নিতে হা করে হাসে এনামুল, মা মানুষ মারি নাই। মারছি হিন্দু।

হিন্দুরা মানুষ না?

যারা আল্লা খোদায় বিশ^াস হরে না, হেরা মানুষ না। হেগো মারা জায়েজ আছে।

তুই নিজের আতে মানুষ মারচো, তুই আমার বাড়িতে আবি না। খাবি না।

হোনো মা, আমরা রাজাকাররা কি হরতে পারি, জানো না। ইসলামের বিরুদ্ধে তুমিও চইলা যাও, মাইরা হালামু এক গুল্লিতে...।

কও কী তুমি? নিজের মায়রে এমন কতা কয়? হালকা ধমক দেয় ইয়াসমীন।

খাওয়া শেষ করে দাঁড়ায় এনামুল। লুঙ্গি দিয়ে মুখ মুছে দাঁড়ায়, তুমি বেশি বাইরো না ভাবী। তোমারে লইয়া বিপদে আছি।

আমারে লইয়া কিয়ের বিপদ?

তোমারে রাজাকার কমান্ডার বেলায়েত মিয়া ভান্ডারিয়ার আর্মি ক্যাম্পে লইয়া যাইতে কয়। তোমার জামাই আমাগো বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতাছে ইন্ডিয়ায় যাইয়া। তোমারে রক্ষা করার একটাই পোথ আছে... মুখে ভিন্ন হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে এনামুল।

মাজেদা বেগম দাঁতে দাঁত পেষে, কী কইতে চাও?

তোমার বউরে বাঁচাইতে চাইলে আমার লগে বিয়া দাও। আমি রাজাকার কমান্ডারকে কমু, ভাবী এহন আমার বউ। নাইলে রক্ষা করতে পারবা না।

মাজেদা বেগম হাত তুলে এগিয়ে যায়, হারামজাদা, নেমক হারাম, বড় ভাইয়ের বউয়ের ওপর তোর চোউখ? তোর চৌউখ আমি উঠাইয়া হালামু।

এনামুল একটা ধাক্কা দিয়ে মাজেদা বেগমকে সরিয়ে রাইফেল হাতে নিয়ে দরজার কাছে যায়, মা তোমার বড় বউরে আমি বিয়া করমুই... আইজ করি আর কাইল করি। তুমি ঠেহাইতে পারবা না। দ্রুত বের হয়ে যায় এনামুল। পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকে মাজেদা বেগম। বুকের ওপর আছড়ে পড়ে ইয়াসমীন, আম্মাগো এহন আমার কী অইবে!

সেই থেকে কুকুরের লেলিহান জিহবা নিয়ে ইয়াসমীনের পিছনে লেগে ছিল এনামুল। কেবলমাত্র মাজেদা বেগমের জন্য ক্ষতি করতে পারেনি। ইয়াসমীনের শ্বশুর হেমায়েত আলী দুই জাঁতার মাঝখানে পিষে যাচ্ছিল। ভান্ডারিয়া, ইকড়ি, তেলিখালী, মাদার্শী আর উজানগাঁওয়ের রাজাকাররা জানে, বড় ছেলে মুক্তিযুদ্ধে। কিন্তু ছোট ছেলে এনামুল রাজাকার। মাসখানেকের মধ্যে এনামুল ইকড়ি ইউনিয়নের কমান্ডার হয়ে যায়। এখন ওর সঙ্গে পাহারাদার বা বডিগার্ড থাকে দুজন। বুঝতে পারছে না হেমায়েত আলী, যুদ্ধটা কোন দিকে যাবে? গ্রাম-গঞ্জের অবস্থা দেখলে মনে হয়, রাজাকার আর পাকিস্তানি আর্মিরাই সব। রাতে ভয়েস অব আমেরিকা, বিবিসি, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, কলকাতার আকাশবাণী শোনার পর মনে হয়, দেশটা মুক্তিযোদ্ধারা দখলে নিচ্ছে আর কী! এনামুলের রাজাকারগিরি খারাপ লাগে না। রাস্তায় বের হলে লোকজন সালাম দেয়। আদর করে বাড়িতে নিয়ে গাছের ডাব পেড়ে খাওয়ায়। পাকা কলা, মুড়ি এনে দেয়। হেমায়েত আলী পায়ের ওপর পা রেখে খায়। বোঝে রাজাকার ছেলের জন্য এই সম্মান পাচ্ছে। কিন্তু দেশটা স্বাধীন হলে? অসুবিধা নেই, নিজের মনেই ভাবে হেমায়েত আলী, বড় পোলাতো মুক্তিযোদ্ধা।

দুপুরে দুই বডিগার্ড নিয়ে বাড়িতে খেতে আসে। ইয়াসমীনের পরিবর্তে খেতে দেয় মাজেদা বেগম।

তুমি ভাত দাও ক্যা? তোমার বউ কই?

তুই ভাত খাইতে আইচো, ভাত খা, রাগের সঙ্গে বলে মাজেদা বেগম।

মা, তুমি আমার ক্ষেমতা জানো না। আমি চাইলে তোমার বউরে এহন লইয়া যাইতে পারি। কিন্তু নেই না ক্যা জানো? আমাগো বাড়ির একটা ইজ্জত আচে। অনেক কষ্ট কইরা ইজ্জতটা বাঁচাইয়া রাকতে চাই। যুদ্ধ শ্যাষ অইলে তোমার বড় পোলারে আমি নিজের হাতে গুল্লি করুম।

আমিও তোরে গুল্লি করমু...

মাজেদা বেগমের কথায় এনামুল দাঁতাল দাঁতে হাসে, তুমি আমারে গুল্লি করতে পারবা?

ক্রোধে জ্বলে ওঠে মাজেদা বেগম। উঠে চলে যায়। খাওয়া শেষ করে কুলি করতে করতে উঠোনে নামে এনামুল। অপেক্ষারত রাজাকার দুজন স্যালুট দেয়। এনামুল স্যালুট উপভোগ করে বাড়ির সামনে আসে। সঙ্গের রাজাকার দুজনকে দাঁড় করিয়ে বাড়ির মধ্যে ঢোকে। যায় ইয়াসমীনের ঘরে। ওকে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দেখেই ইয়াসমীন নিজের ঘরে যায়, দরজা দেয়ার চেষ্টা করে। দরজায় ধাক্কা দিলে ইয়াসমীন শক্তিতে না পেরে দরজা ছেড়ে দেয়। ভেতরে ঢোকে এনামুল, দুহাতে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করে ইয়াসমীনকে। নিজেকে রক্ষা করার জন্য পিছনে সরে যায়। যেতে যেতে খাটের সঙ্গে আটকে গেলে জড়িয়ে ধরে এনামুল, তোমারে যহন বড় ভাই বউ কইরা আনছে, তহনই তোমারে আমার পছন্দ অইচে। কিন্তু কিচ্চু কইতে পারি নাই। এহন আমি পেয়ারা পাকিস্তানের সৈনিক। তোমার স্বামী পাকিস্তানের শত্রু। তোমারে এহন আমি যা ইচ্ছা করতে পারি...। কও পারি না?

মুখ নামিয়ে আনে ইয়াসমীনের ঠোঁটের উপর। ইয়াসমীন দু হাতে ওর দানবীয় শরীর ঠেলে রাখতে রাখতে শরীর বাঁকা করে কান্নায় ভেঙে পড়ে, আম্মা গো...।

পিছন থেকে চুল ধরে তীব্রভাবে টান দেয় মাজেদা বেগম। অসহ্য যন্ত্রণায় ইয়াসমীনকে ছেড়ে দিয়ে সোজা দাঁড়িয়ে মাকে দেখে দাঁত কিড়মিড় করে গলা চেপে ধরতে গেলে ইয়াসমীন মায়ের সামনে দাঁড়ায়, না। তুমি আম্মার গায়ের আত তুলবা না।

দরজায় এসে দাঁড়ায় হেমায়েত আলী, বাড়ির মইধ্যে কী অইচে?

পিতাকে দেখে দ্রুত সরে যায় এনামুল। মাজেদা বেগমকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে ইয়াসমীন। হেমায়েত আলী দাঁড়িয়ে থাকে টুকরো টুকরো পাথরের মতো। চারদিকের কথাবার্তায় বুঝতে পারছে পাকিস্তানের দিন শেষ হয়ে আসছে। নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি। চারদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ের খবর আসছে। গত সপ্তাহে ভান্ডারিয়া থানা আক্রমণ করে মুক্তিযোদ্ধারা সব পাকিস্তানি আর্মিদের হত্যা করেছে। সব অস্ত্র লুট করে নিয়ে গেছে। রাজাকাররা বলছে, চীন আসতেছে...।

স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ করে ইয়াসমীনকে পাঠায় চম্পকের নানা বাড়ি। তিন-চার দিন পরে বাড়ি এসে ইয়াসমীনকে না পেয়ে মাজেদা বেগমের সঙ্গে যা তা ব্যবহার করেছে এনামুল। গলা চেপে ধরে মেরে ফেলতে চেয়েছিল, কিন্তু সঙ্গে আসা দুজন রাজাকারের একজন সরিয়ে নেয়। রাজাকার দরবার আলী পাশের বাড়ির মানুষ। প্রায় জোর করে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়।

ষোলোই ডিসেম্বর থেকে আর কোনো রাজাকারকে পাওয়া যায় না। যে যার মতো হারিয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধারা এসে বাড়ির সামনে গুলির পর গুলি ফুটিয়ে উৎসব করে। বাপের বাড়ি থেকে চলে এসেছে ইয়াসমীন, সঙ্গে চম্বক। সবাই আসে কিন্তু কবিরুল আলম আসে না। অপেক্ষার দিন পার করতে করতে তিন মাস...। বুঝে গেছে বেঁচে থাকলে এতোদিনে চলে আসতো । এদিকে গুছিয়ে নিয়ে পাশের থানার মামাবাড়ি আশ্রয় নেয়া রাজাকার এনামুল ফিরে এসেছে। যেহেতু বড় ভাই মুক্তিযুদ্ধে গেছে, সেই দুর্বলতা ব্যবহার করে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে একটা আপসে আসে এনামুল। সঙ্গে থাকে পিতা হেমায়েত আলী। হাত-পা ধরে ক্ষমা চেয়ে বাড়িতে আসে । বাড়িতে এসেই টোপ ফেলে, বড় ভাইতো মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ। এখন বিধবা স্ত্রী ও পুত্রের দায়িত্ব আমাকেই নিতে হবে। রাজাকার এনামুলের সঙ্গে যুক্ত হয় পিতা হেমায়েত আলী। কিন্তু প্রতিরোধ তৈরি করে মাজেদা বেগম আর ইয়াসমীন।

একটু একটু করে প্রতিরোধ ধসে যায় এনামুলের ক্রমাগত আঘাতে আঘাতে। ইয়াসমীনের শেষ ভরসা ছিল বাপের বাড়ি। বাপের বাড়ি না, বাপ মারা যাওয়ায় এখন ভাইদের বাড়ি। সেই ভাইয়েরা নিজেদের স্বার্থের পুকুরে ডুবে বোন ইয়াসমীনকে দিয়েছে বিসর্জন। ইয়াসমীনকে পরের দিন উজানগাঁও দিয়ে যায় ছোট ভাই হুমায়ুন। এনামুল আগেই দেখা করে হুমায়ুনের সঙ্গে। হুমায়ুনও দেখেছে, বিধবা বোন আর বোনের সঙ্গে চম্পককে রাখলে বাড়তি বিড়ম্বনা। অনেক ঝামেলা। এনামুল বিয়ে করতে চেয়েছে, চমৎকার সুযোগ। সুযোগের ব্যবহার করতে ছাড়ে না হুমায়ুন। বোনকে পৌঁছে দিয়ে বিশাল ঝামেলা থেকে মুক্তি পেয়েছে।

শ^শুর বাড়ি এসে ইয়াসমীন দিশেহারা। ঘরের মধ্যে যখন তখন ঢোকে এনামুল। পারে তো খেয়ে ফেলে...। বুভুক্ষু প্রজাপতির মতো পালিয়ে বেড়ায়। বিয়ের জন্য প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করে এনামুল। কারণ, মুক্তিযোদ্ধারা ওকে গ্রহণ করছে না। হাটে রাজাকারের দোকানে ক্রেতাও কম আসে। মাঝে মাঝে উটকো লোকজন এসে ঝামেলা পাকায়, রাজাকার গালাগাল করে। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বড় ভাইয়ের বিধবা সুন্দরী বউ বিয়ে করলে কিছুটা হলেও...। কিন্তু ইয়াসমীন কোনোভাবেই রাজি হচ্ছে না। সঙ্গে নিজের মা মাজেদা খাতুন। শেষ পর্যন্ত আট মাস পর বিয়ে হতে যাচ্ছে। যেহেতু এনামুলের প্রথম বিয়ে, আয়োজনের কমতি রাখে না। উজানগাঁওয়ের মুক্তিযোদ্ধা মাতব্বর সবাইকে দাওয়াত দিয়েছে হেমায়েত আলী। বিকেলে বিয়ে। লোকজনে বাড়ি ভরে গেছে। উঠোনে সামিয়ানা টাঙ্গিয়ে সবার বসার আয়োজন করা হয়েছে। মাথায় টোপর পরে বসেছে এনামুল। কাজী কলমা পড়বে, ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করে কবিরুল আলম, ক্র্যাচে ভর দিয়ে।

সবাই উঠে দাঁড়ায়। মুক্তিযোদ্ধারা জয় বাংলা সেøাগানে জড়িয়ে ধরে আলমকে। হেমায়েত আলী জড়িয়ে ধরে বড় পুত্রকে, তুই বাইচা আছোস বাজান?

পিতাকে বুকে নিয়ে উত্তর দেয়, বাজান আমি তো দিল্লির পিজি হাসপাতাল থেকে অনেক চিঠি লিখেছি। জানিয়েছি ডিসেম্বরের প্রথম দিকে যুদ্ধে আহত হয়েছিলাম। ডান পায়ে গুলি লেগেছিল কিন্তু গুলিটা বের করা যাচ্ছিল না। খুব কষ্ট পাচ্ছিলাম। কলকাতার ডাক্তাররা আমাকে দিল্লি পাঠায়...। দিল্লি থেকে আমি অনেক চিঠি লিখেছি। কোনো উত্তর না পেয়ে ভেবেছি, আমি মুক্তিযুদ্ধে গেছি সেই কারণে পাকিস্তানি আর্মিরা আপনাদের মেরে ফেলেছে। বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। আপনারা আমার চিঠি পাননি?

না, তোমার কোনো চিঠি পাই নাই... জানায় হেমায়েত আলী।

বলেন কী? অবাক কবিরুল আলম।

ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে আসে পিওন আক্কাস, চিঠি ক্যামনে পাইবা? পোস্ট অফিস দিয়া সব চিঠি লইয়া আসে তোমার ছোড ভাই এনামুল। যে এহন তোমার বউরে বিয়া হবরে?

বলেন কী আপনি? কবিরুল এগিয়ে যায় এনামুলের দিকে। এনামুল বুঝতে পারে কামনা বাসনা সব শেষ হতে যাচ্ছে। শরীরের মধ্যে রাজাকারের অশুভ শক্তি জেগে ওঠে। এগিয়ে আসে বড় ভাইয়ের দিকে, তুইতো মইরা গেছো... তুই বাড়ি আইলি ক্যা?

ডান হাতের ক্র্যাচ তুলে ধরে এনামুলের বুক বরাবর, লঞ্চ থেকে নেমে সবার কাছে শুনেছি, তুই রাজাকার হয়েছিস। আমি মুক্তিযোদ্ধা, দেশটাকে স্বাধীন করেছি। অস্ত্র জমা দিয়েছি আমরা, ট্রেনিং কিন্তু জমা দিইনি । বুকের উপর ঠেলে ধরে, এই ক্র্যাচ থ্রি নট থ্রি রাইফেলের চেয়েও ভয়ংকর...। মাংসে গেঁথে যাচ্ছে ক্র্যাচের সূচাগ্রে, ভয়ে ত্রাসে পিছু হটতে শুরু করে এনামুল। কবিরুল আলমের সঙ্গে উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধারা যুক্ত হলে এনামুল দৌড়ে বাড়ি ছেড়ে পালায়।

চম্পকের মা ইয়াসমীন বিয়ের শাড়ি ছেড়ে ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায়, কোলে চম্বক। পিছনে মাজেদা বেগম। তিনজনার মুখে বিজয়ের হাসি। মাজেদা খাতুন নাতিকে কোলে নিয়ে, ভিড়ের মধ্যে ঝাকড়া চুলের আলুথালু ক্র্যাচ হাতে মুক্তিযোদ্ধাকে দেখিয়ে বলে, তোমার বাবা।

আমার বাবা!

ইয়াসমীন ঘাড় নাড়ে, হ বাজান- তোমার বাবা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :