চোখের পাতায় প্রেমের আলো

শাহান সাহাবুদ্দিন
 | প্রকাশিত : ০৬ আগস্ট ২০২০, ২০:২০

৩১ মার্চ, ১৯২৫, আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়ার্সের তিলোত্তমা নন্দিনী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে রবীন্দ্রনাথ চিঠিতে লিখলেন-‘আমার মন চলে যায় সান ইসিদ্রোর সেই বারান্দাটিতে। ষ্পষ্ট এখনো মনে পড়ে সকাল বেলার আলো ভরা বিচিত্র লাল নীল ফুলের উৎসব। আর বিরাট সেই নদীর ওপর নিরন্তর রঙের খেলা, আমার নির্জন সেই অলিন্দ থেকে অক্লান্ত সেই চেয়ে দেখা।’

১৯২৪’এর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে ১৯২৫’এর জানুয়ারী, কালের হিসেবে দু’মাস সময়। কিন্তু ভূবন বিখ্যাত কবি, শশ্রু মন্ডল আর নিষ্পাপ ঋষিতুল্য মানুষ রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য এই সময়টুকু যিনি পেলেন তার কাছে নিশ্চয়ই এইটুকু খুব বেশি সময় হওয়ার কথা নয়। ইসিদ্রো থেকে রবীন্দ্রনাথের বিদায় লগ্নে ভিক্টোরিয়ার বুকের ভেতরে যা হয়ে গেল তা কেবল সমুদ্রে বড় রকম ঝড়ের কবলে পরা জাহাজের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, আর চোখের জলের তুলনা দেয়া যেতে পারে কানু বিরহিনী ব্রজবাসিনী শ্রী রাঁধিকার সঙ্গে। সে মূহুর্তে কি ভিক্টোরিয়ার মনে বারবার উঁকি দিয়ে যাচ্ছিলো এই মহত্তম অমোঘ গানের বাণীগুলো(?)-‘হায় অতিথী, এখনি কি হলো তোমার যাবার বেলা।।/দেখো আমার হৃদয়তলে সারা রাতের আসন মেলা।। এসেছিলে দ্বিধাভরে/কিছু বুঝি চাবার ছলে,/নীরব চোখে সন্ধ্যালোকে খেয়াল নিয়ে করলে খেলা।।’

কিন্তু হায়, এই অতিথীর সঙ্গে যে কারো সম্পর্কই দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার নয়। অন্য দশজন সৃষ্টিশীল পুরুষের মতোই এতো এতো হাতছানি এতো এতো শক্তিশালী মুখ চারদিকে থাকা সত্ত্বেও তিনি যে সারা জীবন ধরেই একাকী নির্বান্ধব। শেষ পর্যন্ত তাঁকে কেউ পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননা, এমনকি ভিক্টোরিয়ার মতো বিদুষী শ্রেষ্ঠ নারীও না। অথচ স্বাতি নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করতে থাকা ইতিহাসখ্যাত এই পুরুষটাকে বুঝে উঠবার জন্য,তাঁর ভালোবাসা পাবার জন্য অসম বয়সী যুবতী ভিক্টোরিয়ার কতোইনা প্রানান্ত চেষ্টা!

ভিক্টোরিয়া রবীন্দ্রনাথকে লিখছে,

`Dear dear Rabindranath…you will never lose my friendship,no matter what happens and the more my heart gives to you,the more if has to give.’

ইসিদ্রো থেকে ১২ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথকে ভিক্টোরিয়া নিয়ে এলেন প্লাতা নদীর অনদী দূরে শিল্প সুষমামন্ডিত নান্দনিক সৌকর্যে গড়া ছোট্র ‘মিরালরিও’বাড়িটিতে। এ বাড়িটি দেখেই উপলদ্ধি করা যেতে পারে রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে ভেতরে ভেতরে তৈরী হওয়া ভিক্টোরিয়ার একান্ত স্বপ্নটাকে । এ বাড়িটি যেন ভিক্টোরিয়ার ভেতর বাহিরের অপার সৌন্দর্য নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে। কবিও শূন্য হাতে ফেরালেননা ভিক্টোরিয়াকে। ভালোবাসার মোহন,মনোমোহন রাগিনী বাজিয়ে হৃদয় উজার করে কবির প্রশান্তির স্বরূপটি মেলে ধরলেন ‘বিদেশী ফুল’ শিরোনামের কবিতাটিতে; এবং তারপর ভিক্টোরিয়াকে ঘিরে রচিত হলো ‘আশংকা’ ‘আকন্দ’ ইত্যাদি কবিতা। এইসব কবিতার অনুরাগ-বিরাগের সুগভীর বাণী ভিক্টোরিয়াকে প্রভূত আনন্দ দিল এবং কাঁদালোও।

মিরালরিও হতে রবীন্দ্রনাথের গন্তব্য হলো চাপাদ মালালে। এই জায়গাটি তুলনামুলক ভাবে নির্জন ও চমৎকার নিসর্গ ঘেরা। এখানেই এক বিকেলে বাগান বাড়িতে চায়ের টেবিলে বসে রবীন্দ্রনাথকে ভিক্টোরিয়া বললেন,‘আচ্ছা তুমি স্প্যানিশটা ভালো করে শিখলেনা কেন বলোতো? আমি যে ইংরেজিতে আমার সব কথা গুছিয়ে বলতে পারিনা।’ রবীন্দ্রনাথ মুখে স্মিত হাসি ফুটিয়ে উত্তর করলেন,‘তোমার সব কথাইতো আমি বুঝতে পারি। এমনকি না বলা কথাগুলোও!’

প্রেম জিনিসটি তো ভালো, কিন্তু প্রেমান্ধতা, সে কি ভালো? প্রেমে অন্ধ হয়ে ভিক্টোরিয়ার মতো মহিয়সী যুবতীও যখন ঈর্ষান্বিত হয় তখন সেটি কেমন দেখায়? অন্য কোনো পুরুষ হলে না হয় আমরা আড় চোখে তাকাতাম, ছুঁড়ে দিতাম কটাক্ষের বিষ মাখা তীর। কিন্তু এ যে স্বয়ং গ্রেট রবীন্দ্রনাথ। ভারতবর্ষ তথা প্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্যের মাথা ঘুরিয়ে দেয়া পারস্যের মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমীর ঘরানার আধ্যাত্ব চেতনার ঋষিতুল্য কবি। যিনি একই সঙ্গে ইহ জাগতিকতার দেবতা, যে দেবতা ইহজাগতিকতার ভেতরে থেকেও তাঁর লেখনির আলো ফেলেন অদৃশ্যের পরপারে আলো আঁধারীর মায়াময় অথবা লৌকিকতার উর্দ্ধে অতি ভীতি সঞ্চারক অপার্থিব সময়ে।

তাঁর প্রেমে পড়ে কি করেই বা মাথা ঠিক রাখবেন ভিক্টোরিয়া? হলোও তাই। মানস দেবতা রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে বান্ধবী ফ্যানি ও অ্যালিসের এই যে এতো অপার আগ্রহ, প্রতিদিন একাধিক বার এসে মিরালিও’র বাড়িতে এসে রবীন্দ্রনাথকে দেখে যাওয়া, তদারকি করা। ভাষাগত দূরত্বের কারণে কখনো স্প্যানীশ কখনো ইংরেজীর বাইরে মূকাভিনয় কিংবা আকার ইঙ্গিতে কথা বলা। এসবে ভেতরে ভেতরে মহৎ আগুনে জ্বলে পুড়ে আঙ্গার হতে হতে এক বিকেলে ভিক্টোরিয়া রবীন্দ্রনাথকে বলেই বসলেন-‘আচ্ছা সেই অল্প বয়সে যখন তুমি বিলেতে পড়াশোনা করতে এসেছিলে, তখন তোমার চেহারার সৌন্দর্যের দ্যুতি নিশ্চয়ই ইংরেজ যুবতীদের মাথায় ঝিম ধরিয়ে দিয়েছিল, তাই না?’ ভিক্টোরিয়ার এরকম কথা শুনে নজরুল হলে নিশ্চয়ই উচ্চ স্বরে ধমক ধমক হাসিতে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে তুলতেন। কিন্তু ইনি যে রবীন্দ্রনাথ! গোঁফ ও শুভ্র দাড়ির আড়ালে নকল গাম্ভির্য ধরে রেখে উত্তর করলেন-‘হবে হয়তো!’ এবং তারপরই হো হো করে লম্বা সময় ধরে হেসে উঠলেন। সে হাসি মিরালিও’র ছোট্র একখন্ড গোলাপ বাগান ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়লো প্লাতা নদীর জল ও আনদ্রিজের সুউচ্চ পর্বত শিখরে।

হায় নিয়তি, ভিক্টোরয়িার গোপন মধুরতম শত্রু বুঝি শুধুই বান্ধবী ফ্যানি ও অ্যালিসই না। মধুরতম শত্রু পক্ষের শিবিরে যোগ দিলো পেরু সরকারও। তাঁকে ঘিরে স্নায়ু যুদ্ধ শুরু হলো পেরু ও আর্জেন্টিনা সরকারের মধ্যে। হৃদয়ের ক্ষত বাড়তে থাকলো ভিক্টোরিয়ার। এই বুঝি প্রাণের দেবতা রবীন্দ্রনাথ তাকে ছেড়ে আনদ্রিজ পর্বত মালার অনেক উঁচু পথ পেরিয়ে বেরিয়ে পড়বেন ফের পেরু সরকারের আমন্ত্রণে পেরুর পথে। কিন্তু বিপুল দর্শনার্থীদের চাপ ও দীর্ঘ ভ্রমণের জের ভিক্টোরিয়ার জন্য শাঁপে বর হলো, রবীন্দ্রনাথকে আরো বেশি করে কাছে পাবার পথ হলো সুপ্রশস্ত। ব্যাক্তিগত সহকারী ও চিকিৎসকদের পরামর্শে তিনি বিশ্রামে থেকে গেলেন চাপাল মালালের অপরুপ সুন্দর আর শান্ত নির্জন নিসর্গের ভেতরে স্বর্গীয়ে শান্তির আলয়ে। মানস দেবতা রবীন্দ্রনাথকে একান্ত নিবিড় করে পাওয়ার ও সেবা শশ্রুশার এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ সময় আর কিইবা হতে পারে? অফুরন্ত সোনা ঝরা সকাল-বিকেল মুঠি মুঠি স্বপ্ন নিয়ে ধরা দিলো ভিক্টোরিয়ার হৃদয় তন্ত্রিতে। দেবতা রবীন্দ্রনাথের মুখোমুখি বসে থাকাটা যেন ভিক্টোরিয়ার চোখে মহত্তম স্থীরচিত্র হয়ে ধরা পড়লো। তার মননে সীমার মাঝে অসীম হয়ে আপন সুরে বিমোহিত করতে থাকলো প্রেমিক রবীন্দ্রনাথ। এবং ভিক্টোরিয়ার মাঝে রবীন্দ্রনাথের প্রকাশ বিশ্ব সাগরের ঢেউয়ের দুলা ভিক্টোরিয়াকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে থাকলো সুন্দরতম সময়ের দিকে। কিন্তু হায়, মধুরতম সময়গুলো কতো দ্রুতইনা যাযাবরের মতো চোখের আড়াল হয়! হৃদিমন্দির দ্বারে সুমঙ্গল শঙ্খ বাজবার আগেই, মঙ্গল শিখা ‘মিরালরিও’ আলো করতে না করতেই মিরালরিওর বাগান বাড়ির পাইন গোলাপ ডেফোডিল চেরি আর ক্যামেলিয়ার নির্মল সুগন্ধকে গ্রহণ না করেই অসুস্থ্য শরীর নিয়ে ভিক্টোরিয়ার প্রাণের দেবতা ‘জুলিয়ো চেজার’ নামক জাহাজে চেপে বসলেন স্বদেশের উদ্দেশে । পিছনে পড়ে থাকলো মিরালিও, ইসিদ্রো ও চাপাদ মালালে ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে কাটানো শুভ্র সুন্দর প্রীতি-উজ্ঝল জীবননির্ঝর মূহুর্ত গুলো। প্লাতা নদী ভিক্টোরিয়া রবীন্দ্রনাথের গোপন অভিসারের সাক্ষী হয়ে প্রবাহিত হতে থাকলো কালের অসীম গন্তব্যের দিকে। ভিক্টোরিয়ার সান্নিধ্য রবীন্দ্রনাথকে দিল অন্য রকম মহিমা। সৃষ্টিশীল কর্মে যোগ হলো নতুন মাত্রা। ভিক্টোরিয়া মানস প্রিয়া হয়ে ‘বিজয়া’ নামে রবীন্দ্রনাথের সংবেদনশীল হৃদয়দ্বারে দিবানিশি কড়া নাড়তে থাকলো।

রবীন্দ্রনাথ লিখলেন-‘আজ দেখছি যখন ওখানে ছিলাম, আমার ডালা দিনে দিনে ভরে উঠেছিল ফুলে, মন্থর প্রহরের ছায়তলে জেগে ওঠা কবিতায়। তোমাকে বলতে দ্ধিধা নেই,বহু শ্রমে তৈরী হওয়া আমার লোকহিতের সৌধগুলো লোকে যখন ভুলে যাবে, তারও অনেক অনেক দিন পর এইসব কবিতা বেঁচে থাকবে তার সমস্ত সৌন্দর্য নিয়ে। কিন্তু অল্প সংখ্যক লোকেই কেবল জানবে এই অনবদ্য গীতি কবিতাগুলো উপহার হিসেবে পাওয়ার জন্য কাকে তাদের বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানানো উচিৎ।’ ওদিকে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবাহী মিরালিও যেন ভিক্টোরিয়াকে ক্রমশঃ বিরহের মাঝ দরিয়ায় ফেলে দিতে চাইলো। তাই তিনি চলে গেলেন ভিলা ওকাম্পোতে বাবা মায়ের কাছে। একেকটা রাত যেন ভিক্টোরিয়ার কাছে আটলান্টিকের সুদূরের ওপার থেকে আনদ্রিজ পর্বত মালা হয়ে উইলো আর পাইন গাছের ফাঁক গলিয়ে নিয়ে আসে দীর্ঘ বিরহের তপ্ত বাতাস। এক রাত্রিতে তাই মানস দেবতা রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করলেন মায়ের থেকে শেখা স্প্যানীশ লোক সঙ্গীতের সুরে গাঁথা এই অপূর্ব সুন্দর কথার গান গেয়ে-

‘ওগো আকাশের দেবতা/যে প্রেমের আলো তুমি ছড়িয়ে দিয়েছো বাতাসে বাতাসে,/চেয়ে দেখ, এখন তার সবটুকুই শুধু আমার করতলে,আমার চোখে মুখে।/ওগো আকাশের দেবতা।’

তারপরই ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর চোখ থেকে বাঁধ ভাঙ্গা জল উপচে পড়ে কালের ধূলোয় অপ্রকাশিত মহত্তম প্রেমের সাক্ষর রেখে যায়।

শাহান সাহাবুদ্দিন: কবি, লেখক ও সাংবাদিক

[email protected]

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :