বিএসএমএমইউয়ে পাঁচশতম রোগীর কক্লিয়ার স্থাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২১, ১৫:৫০ | প্রকাশিত : ০৪ এপ্রিল ২০২১, ১৫:৪৭

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ৫০০তম কক্লিয়ার স্থাপনকরা রোগী নাঈম। তার বয়স ৩ বছর ৭ মাস। অপারেশনের পর সে ভালো আছে। ৩ সপ্তাহ পর তার সাউন্ড প্রসেসর চালু করা হলে কানে শুনতে ও কথা বলতে পারবে। এজন্য তাকে আগামী দুই বছর ভাষা শিক্ষা প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।

কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট কী? কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট বা বায়োনিকইয়ার হলো শ্রবণ সহায়ক অত্যাধুনিক এমনএকটি ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস যা মারাত্মক বা সম্পূর্ণ বধির ব্যক্তিকে শব্দ শুনতে সহয়তা করে। ইমপ্লান্ট চালুর পর বধির ব্যক্তির কাছে তখন পৃথিবীটা শব্দময় হয়ে ওঠে। কক্লিয়ার ইমপ্লান্টের দুটি অংশ। একটি অংশ কানের বাইরে থাকে, যে অংশে থাকে মাইক্রোফোন, স্পিচপ্রসেসর ও ট্রান্সমিটার। আরেকটি অংশ কানের ভেতর থাকে। যে অংশে থাকে রিসিভার স্টিমুলেটর এবং ইলেকট্রোড।

অপারেশনের মাধ্যমে কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট অন্তঃকর্ণের কক্লিয়াতে স্থাপন করা হয়। মাইক্রোফোনের মাধ্যমে নেয়া শব্দ এনালগ ইলেকট্রিক সিগনালে পরিবর্তিত হয়। স্পিচ প্রসেসর সেই সিগনালকে প্রসেসিং করে কোডেড ডিজিটাল সিগনালে রুপান্তর করে। ট্রান্সমিটার কয়েলের মাধ্যমে কোডেড সিগনাল রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির মাধ্যমে ইন্টারনাল রিসিভার স্টিমুলেটরে পাঠানো হয়। রিসিভার স্টিমুলেটর সেই কোডেড সিগনালকে ইলেকট্রিক ইমপালসে পরিবর্তিত করে ইলেকট্রোড পাঠায়। ইলেকট্রোড ইলেকট্রিক ইমপালসকে অডিট রিনার্ভের মাধ্যমে মস্তিস্ক সেই ইমপালসকে শব্দ হিসেবে চিহ্নিত করে। ফলে শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যাক্তি শব্দ শুনতে পায়।

শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের মাঝে কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট স্থাপনে মাইলফলক ছুঁয়েছেন বিএসএমএমইউয়ের চিকিৎসকরা। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট কার্যক্রমের আওতায় আজ পর্যন্ত ৫০০ জন শ্রবণ প্রতিবন্ধীর কানে কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট স্থাপন করেছে।

কক্লিয়ার ইমপ্লান্টের পর এরা সবাই কানে শুনতে ও কথা বলতে পারেছে। কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট একটি উচ্চ প্রযুক্তির সার্জারির মাধ্যমে রোগীর কানে স্থাপন করা হয়। এখনও পৃথিবীর বহু দেশে এই অত্যাধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি সহজলভ্য হয়নি। বাংলাদেশেও এক সময় এই চিকিৎসার কথা চিন্তাই করা যেতো না। সেই অসাধ্যই সাধন করেছেন বিএসএমএমইউর নাককান ও গলা বিভাগের চিকিৎসকরা। শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে ২০১০ সালে বিএসএমএমইউয়ে “কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট কার্যক্রম-বিএসএমএমইউ”কর্মসূচী চালু হয়। এখানে ২০১১ সালে প্রথম রোগীর কানে সফলতার সঙ্গে কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট স্থাপন করা হয়। এরপর থেকে ধীরে ধীরে এই চিকিৎসকরা কথা ছড়িয়ে পড়ে দেশব্যাপী।

চলতি বছরের গত ৩১ মার্চ ৫০০তম রোগীর কানে কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট স্থাপনের মাইলফলক স্পর্শ করে বিএসএমএমইউ হাসপাতাল।

পাঁচশ কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট স্থাপনের প্রাক্কালে বিএসএমএমইউর নব নিযুক্ত উপাচার্য শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকার অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি ডিভাইস যার মূল্য একটি টয়োটা গাড়ির সমান, তা বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে শ্রবণ প্রতিবন্ধীদেরকে দিচ্ছে। এটি বাংলাদেশ সরকারের একটি অনন্য মানবিক কর্মসূচি। তিনি শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে বার বার এগিয়ে আসার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।

বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে এই কর্মসূচীটি পরিচালিত হচ্ছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট ডিভাইস দেয়াসহ অন্যান্য খরচ বহন করে থাকে। প্রতিটি রোগীর কানে কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট স্থাপনে শুধু ডিভাইসের জন্যই ব্যয় হয় ১০ লাখেরও বেশি টাকা। কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট চিকিৎসার পথিকৃত বিএসএমএমইউর নাক কান ও গলা বিভাগের অধ্যাপক আবুল হাসনাত জোয়ারদার জানান, ডিভাইসের উচ্চ মূল্য ও প্রযুক্তির অভাবে একটা সময়ে এদেশে কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট স্থাপনের কথা ভাবাই যেত না। সরকারি অর্থ সাহায্যের পর সেই অবস্থা এখন ধীরে ধীরে বদলেছে। শুধু বিএসএমএমইউয়ে ৫০০ জন রোগীর কানে সফলভাবে কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট স্থাপনের মাইলফলক ছোঁয়া সম্ভব হয়েছে। এখানে দক্ষ স্পিচ থেরাপিস্ট, অডিওলজিস্ট এবং সার্জনের সমন্বয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে জটিল এই চিকিৎসা সহজেই করা সম্ভব হচ্ছে। সব মিলিয়ে বিএসএমএমইউয়ে এই কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট কার্যক্রম দিনদিন একটি বৃহৎ কক্লিয়ার সেন্টারে পরিণত হয়েছে।

বিএসএমএমইউয়ে বর্তমানে অধ্যাপক আবুল হাসনাত জোয়ারদারের নেতৃত্বে এই কর্মসূচিতে সাতজনের একটি সার্জিক্যাল টিম নিয়মিত কাজ করছে। এই টিমের অন্যরা হলেন, অধ্যাপক এএইচএম জহুরুল হক, অধ্যাপক নাসিমা আখতার, অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন, সহযোগী অধ্যাপক কানু লাল সাহা, সহযোগী অধ্যাপক অসীম কুমার বিশ্বাস ও সহকারী অধ্যাপক হারুন অর রশীদ তালুকদার ইয়ামিন।

অডিওলজিস্ট রয়েছেন জিয়াসমিন আরা, শামীম সোলতানা ও দেলোয়ার হোসেন খান এবং স্পিচ থেরাপিস্ট রয়েছেন অনীতা রানী রায় ও মাসুদ রানা। বিএসএমএমইউর সফল কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট চিকিৎসায় স্বপ্ন দেখছে প্রতিবন্ধী শিশু-কিশোরেরা। দিন দিন এটি বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের ভরসাস্থল পরিণত হচ্ছে। যেমনটি জানা গেছে কক্লিয়ার সেন্টারে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে।

চিকিৎসকরা জানান, প্রতি রবিবার ও মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে বিএসএমএমইউর কক্লিয়ার ক্লিনিকে রোগী দেখা হয়। প্রতি সপ্তাহে ওই দুইদিনে কম করে হলেও ১৫ থেকে ২০ জন রোগী আসেন। এছাড়া প্রতিদিনই নাক কান ও গলা বিভাগে শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের দেখে থাকেন চিকিৎসকরা।

(ঢাকাটাইমস/৪এপ্রিল/এএ/কেআর)

সংবাদটি শেয়ার করুন

স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :