রানা প্লাজার দৈবক্রমে বেঁচে যাওয়া রেশমা এখন কোথায়?

কাজী রফিক, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ০৪ মে ২০২১, ১২:৩৫

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমনকি বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রাণহারি শিল্পদুর্ঘটনা বলা হয়ে থাকে একে। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ঢাকার সাভারে সংঘটিত এ দুর্ঘটনা ও দুর্ঘটনাস্থলের হাহাকার চিত্র কাঁদিয়েছে সারা বিশ্বকে। আবার সবাইকে বিস্মিত করেছে দুর্ঘটনার ১৭ দিন পর ধ্বংসস্তূপ থেকে এক তরুণীর জীবিত উদ্ধারের ঘটনা। বিশ্বের সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হওয়া সেই রেশমা বেগম এখন কেমন আছেন, কী করছেন?

রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের এক-চতুর্থাংশের ভাগ্যে জুটেছে মৃত্যু, কেউ বা হয়েছেন পঙ্গু। সেদিনের ভয়াল সেই স্মৃতি আর শারীরিক ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছেন অনেকে জীবন্মৃত হয়ে। সেদিক থেকে ভাগ্যবতী রেশমা। মৃত্যুকূপ থেকে বেঁচে ফেরার পর সুখময় স্বপ্নের মতো জীবন পাল্টে যায় দিনাজপুরের তরুণীর। কীভাবে পাল্টে যায়, সে কথাও আমরা অনেকে জানি। নতুন প্রজন্ম হয়তো সেভাবে জানে না।

সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মী আর শত শত মানুষের আল্লাহু আকবার ধ্বনির মধ্য দিয়ে রেশমাকে উদ্ধারের ঘটনার চিত্র এখনো চোখে ভাসে অনেকের। এরপর চিকিৎসার জন্য তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে নেওয়া হয় হাসপাতালে। কিছুদিনের চিকিৎসা শেষে সেরে ওঠেন রেশমা। সারা দেশ এমনকি বিশ্বব্যাপী ইতিমধ্যে পরিচিত হয়ে ওঠে রেশমা নামটি। তার দুয়ারে চাকরি নিয়ে হাজির হয় রাজধানীর পাঁচ তারকা হোটেল ওয়েস্টিন। রেশমাকি এখনো আছেন এই হোটেলে?

রেশমার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে ঢাকাটাইমস। তার দেখা পাওয়া যায়নি। টেলিফোনেও ধরা যায়নি তাকে। তবে রেশমা এখনো ওয়েস্টিনেই আছেন, ভালো আছেন- এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ওয়েস্টিনের জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা সেহরিনা ওয়াহিদ ঢাকা টাইমসকে বলেন, রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে দৈবক্রমে বেঁচে যাওয়া রেশমা গত আট বছর ধরে কাজ করছেন হোটেল ওয়েস্টিনে। তিনি এখন এই হোটেলের একজন দক্ষ কর্মী।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল পৌনে নয়টায় ধসে পড়ে নয়তলা রানা প্লাজা, যার বৈধ অনুমোদন ছিল পাঁচতলা। একটি ছাদের ওপর আরেকটি ছাদ ভেঙে পড়ে। এই ধরনের ধসকে বোঝাতে স্যান্ডউইচের উদাহরণ দেওয়া হয়। রানা প্লাজার এই ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে মারা যান ১ হাজার ১৩৮ জন শ্রমিক। অঙ্গহানি ঘটে শতাধিক। এ ছাড়া আরও প্রায় তিন হাজার শ্রমিক আহত হন।

দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা উদ্ধারকাজের সময় প্রায় প্রতিদিন লাশ মেলে ধ্বংসস্তূপে। কিন্তু জীবিত উদ্ধার ছিল না বেশ কিছু দিন আগে থেকে। ঘটনার ১৭ দিন পর যখন আর কেউ ওই ধ্বংসস্তূপের ভেতর জীবিত নেই বলে ধারণা করা হচ্ছিল, ঠিক তখনই ভেতরে প্রাণের অস্তিত্ব মেলে। নিচ তলার কিছু অংশে ছাদ আর ফ্লোরের মাঝে এক কোনায় ফাঁকা জায়গায় এক তরুণরি কণ্ঠ। সেখান থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয় রেশমাকে। আবেগ আপ্লুত হন উদ্ধারকর্মী, উপস্থিত লোকজন, গণমাধ্যম কর্মী এবং টিভিতে দেখা কোটি কোটি দর্শক।

এ ঘটনার মাস দুয়েক পর ২০১৩ সালের জুন মাসের শেষদিকে পাবলিক এরিয়া অ্যাম্বাসেডর পদে রেশমাকে নিয়োগ দেয় হোটেল ওয়াস্টিন কর্তৃপক্ষ। তার বেতন ধরা হয় ৩৫ হাজার টাকা। শুরুতেই তাকে ১০ মাসের বেতন অগ্রিম দেয়া হয়।

৬ মাসের প্রশিক্ষণ শেষে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে হোটেল কাজ শুরু করেন রেশমা। এখন ইংরেজিতে কথা বলা, দক্ষতার সঙ্গে কম্পিউটার চালানো- পাঁচ তারকা হোটেলের একজন চৌকস কর্মী হয়ে ওঠেন তিনি। তার চালাফেরা, কথাবার্তা, আচরণ সবকিছুই এখন এক ভিন্ন রেশমাকে উপস্থাপন করে। বেড়েছে মর্যাদাও। তার কাজে ওয়েস্টিন কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট বলে জানা গেছে।

রানা প্লাজায় চাকরি করার সময় রেশমা তার বড় বোনের সঙ্গে সাভারে থাকতেন। তার বোন এখনো সাভারের বাসিন্দা। সেখানে মাঝেমধ্যে যাতায়াত আছে রেশমার। আর রেশমা থাকেন গুলশানে একটি ভাড়া বাসায়।

ওয়েস্টিনে কাজ শুরুর কিছুদিনের মধ্যে ২০১৪ সালের শুরুর দিকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন রেশমা। তার স্বামী হানিফ সাভারে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তার বাড়ি ময়মনসিংহ জেলায়।

এর আগে রেশমা ২০০৯ সালে দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার আবদুর রাজ্জাকে নামের একজনের সঙ্গে বিয়ে করেছিলেন। প্রেমের সেই বিয়ে দুই বছরের মাথায় বিচ্ছেদে গড়ায়। জীবিকার তাগিদে বোনের সঙ্গে ঢাকায় আসেন রেশমা।

ঢাকার জীবনের শুরুতে রেশমা রাজধানীর এক ব্যাংক কর্মকর্তার বাসায় কাজ নেন। সেখান থেকে সাভারে গার্মেন্টে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। কাজ শুরুর কিছুদিনের মাথায় ঘটে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি।

দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলার কশিগাড়ীর রানীগঞ্জ গ্রামের রেমমারা তিন বোন ও দুই ভাই। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট রেশমা।

রেশমার বাবা আনছার আলী যখন মারা যান তখন রেশমার বয়স এক বছর। পরে রেশমার মা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। রানা প্লাজার ঘটনার পর সরকারের কাছ থেকে পাওয়া টাকা ও রেশমার দেয়া টাকায় বাড়িতে পাকা দালান তুলেছেন তারা।

(ঢাকাটাইমস/০৪মে/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :