‘ত্রিমোহিনী’ মহকালের এক অবিনাশি আখ্যান

ড.শারমিন সাথী
 | প্রকাশিত : ১৩ জুলাই ২০২১, ১৯:১১

কথাসাহিত্যিক কাজী রাফির ত্রিমোহিনী উপন্যাস নিয়ে কালি ও কলম সাহিত্য পত্রিকায় কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের একটি লেখা পড়ে অনেক আগেই বইটি পড়ার আগ্রহ জেগেছিল। অবশেষে, এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বইটি সংগ্রহ করলাম। পড়তে সময় লাগলো চৌদ্দ দিন। উপন্যাসের সম্মোহনী শক্তি এবং মর্মস্পর্শী ভাষা ও অনুভব আমাকে বার বার বইটি পড়ায় বুদ করে রেখেছিল।

পুণ্ড্র সভ্যতা-সময় থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক সভ্যতা-সময়ের প্রায় আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস শক্তিশালী কতগুলো চরিত্রের মধ্য দিয়ে কাহিনী ও কালের যে বিস্তার ঔপন্যাসিক তাঁর সুনিপুণ ভাষাশৈলী ও অনুভবশক্তির মাধ্যমে চিত্রায়ণ করেছেন তাতে যেকোনো বোদ্ধা পাঠকের মনে হবে তিনি মহাকালকে এঁকেছেন এক মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনায়।কাজী রাফি উপন্যাসটি যেভাবে শুরু করেছেন তাতে প্রথমেই বুঝতে পারি ত্রিমোহিনী একটি গ্রামের নাম। উপন্যাসের শুরুটা হলো এমন-

প্রায় ছায়াবিহীন সোনালি ধানক্ষেতের মাঝখান দিয়ে সাদামতো এক মেটোপথ পেরিয়ে করতোয়া নদীর পূর্বপ্রান্তে কয়েকটি বাড়ির বিস্মরণশীল গ্রাম ত্রিমোহিনী। এই গ্রামের আখন্দ বাড়ির প্রজ্ঞাময় পুরুষ নওফেল আখন্দ এক সোমবার মৃত্যুবরণ করলে কবরস্থানের দিকে তার লাশ বহনের সময় এগারো বছর বয়সী শুভ্রর চোখে এক দৃশ্য ভেসে উঠল- বাড়ির পেছনের বাগান এবং পুকুরের পাশে পশ্চিমের দিগন্তছোঁয়া মাঠের দিকে ঢালু খড়ের চালার নিচে বসে এক বিকেলে কালবৈশাখী ঝড়ের পূর্ব মুহূর্তে এবং পৃথিবীকে আঁধারে ঢেকে ফেলা ফণাতোলা গতিময় কালো মেঘের অস্তিত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তার দাদা নওফেল আখন্দ পূর্ণ মনোযোগে লাঙলের ফলার অংশটুকু ধারালো করতে ব্যস্ত। শুভ্রর মনে পড়ল সেই বিকেলের কথা, যে বিকেলে নদীর কিনারে নৌকা নোঙর করে একদল বেদে-বেদেনির দল ত্রিমোহিনীতে তাদের তাঁবু ফেললে গ্রামটির বাতাসে ভেসে থাকা 'নিঃসঙ্গতায়' চঞ্চলতাই শুধু ভর করল না, তার দাদা নওফেলের মতো মানুষ তাকে নিয়ে দ্রুত হেঁটে তাদেরই এক জাদুকরের জাদু দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল, যে জাদুকর এক শিশুর দ্বিখণ্ডিত মস্তক জোড়া দেয়ার পূর্বে সবাইকে জোর করতালি দিতে বলছেন।

উপন্যাসটি কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার পর পাই - ঐতিহাসিক চরিত্র নওয়াব সৈয়দ আলতাফ আলী এবং তাঁর পুত্র নওয়াব সৈয়দ মোহাম্মদ আলীকে। এই ঐতিহাসিক চরিত্র দুটির মধ্য দিয়ে ঔপন্যাসিক কাজী রাফি কিছু দর্শন ও অনুভূতির কথা বলেছেন যা পাঠক পড়া মাত্র বুঝতে পারবেন কাজী রাফি তার নিজের দর্শন ও অনুভবকে প্রতিফলিত করেছেন।

তবে, এ কথা সত্য যে ঐতিহাসিক চরিত্রগুলো খুব অল্প সময়ের জন্য পেয়েছি। কাল্পনিক চরিত্রগুলোর অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় প্রবলভাবে গল্প-প্রবাহের মধ্য দিয়ে এবং চরিত্রগুলোর মাধ্যমে গল্পের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কাজী রাফি অনুভূতির যে দ্রবণ তৈরি করেছেন তা কখনো কখনো পরাবাস্তবতার আবডালে নিয়ে গিয়ে আবার ফিরিয়ে এনেছে কঠিন বাস্তবতায়। এটা করতে গিয়ে তিনি একটুও মূল গল্প থেকে বিচ্যুত হননি, বরং, তা যেন গল্পকে আরও বেগবান ও হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছে।

নওফেল ও শুভ্র - এই কাল্পনিক চরিত্র দুটোর মধ্য দিয়ে উপন্যাসের শুরু হয় এবং শুভ্রের কিশোর বয়সেই তার দাদা নওফেল আখন্দ মারা যান। ঔপন্যাসিক নওফেলের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মৃত্যুকে মাথা ন্যাড়া করা এক নারীর সাথে তুলনা করেছেন। তিনি এভাবে বর্ননা করেছেন –

মৃত্যু এক মাথা ন্যাড়া করা নারী। ঐ যে ঘরের ছাদের কোণে আমাকে নিতে এসে সে চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে আর তার পেছনে যেন হাজার আয়নায় প্রতিসরিত তার বিভিন্ন বয়সের ছবি প্রতিফলিত হয়ে আছে কয়েকশ মাইল ধরে।

এ কথাগুলো দাদা নওফেল মৃত্যুর ঠিক আগের মূহুর্তে শুভ্রকে বলেছিলেন। কাজী রাফি মৃত্যুকে অবয়ব দিতে এবং এটি একটি চলমান-বহমান প্রক্রিয়া সেই সত্যপোলব্ধিটুকু পাঠককে বোঝাতে চেয়েছেন কতগুলো অভিনব ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে।

দাদা নওফেল মৃত্যুর পরেও শুভ্রর শুন্য হৃদয় পূর্ণ করতে কোন অলক্ষ্যে থেকে ফিসফিস করে বলেন,

ফুরিয়ে যাওয়া মানেই হারিয়ে যাওয়া নয়। বুড়িয়ে যাওয়া মানে নিমগ্নহীনতা অথবা ভালোবাসাহীনতা নয়। সব হারিয়ে যায় এবং ফুরিয়ে যায় আত্মবিস্মৃতিতে। আর কোনো কিছুতে মগ্ন হতে না পারলেই মানুষ আসলে বুড়িয়ে যায়, ফুরিয়ে যায়।(পৃষ্ঠা - ২৪)

নওয়াব মোহাম্মদ আলীর পালিত পুত্র ও কন্যা হিসেবে কাজী রাফি যে দুটো কাল্পনিক চরিত্র নির্মাণ করেছেন, তা হলো, নাগিব ও মাহজাবিন। মাহজাবিনের তেজদীপ্ত চোখ দেখে নওয়াব তাকে নাম দেন প্রিন্সেস মাহজাবিন। তাদের খাজাঞ্চি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় সুফিয়ানকে। খাজাঞ্চি সুফিয়ান ত্রিমোহিনী অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে প্রজা সম্মোধন করার মধ্যে যে চিরায়ত শোষক শ্রেণির পরিচয় পাওয়া যায় তার বিপরীতে নাগিবকে দিয়ে ঔপন্যাসিক বলিয়েছেন,

‘আমি কোনো রাজা নই যে, এই মানুষগুলোকে আপনার প্রজা ভাবতে হবে।’

এমনকি পিতৃতুল্য নওয়াব মোহাম্মদ আলীকেও একদিন অনেকটা ক্ষোভের সাথে নাগিব বলেছিলেন,

‘অন্যদের প্রজা সম্মোধন করতে হলে নিজেকে রাজা হতে হয়। আর শোষক এবং চরম ভন্ড ব্রিটিশদের সামান্য তাবেদার হয়ে নিজে নিজে রাজা উপাধির উত্তরীয় পরিধান করে স্বদেশী মানুষদের যারা প্রজা ভাবছে, তারা এদেশের ঐতিহ্য আর ইতিহাসের সাথে অদৃশ্য এক দূরত্ব তৈরি করছে।’(পৃষ্ঠা- ১৫৯)

রাজা ও প্রজার মধ্যে ব্যবধান বা দূরত্ব ঘোচাতে ঔপন্যাসিক কাহিনীর মধ্যে এই যে ব্যাখ্যা জুড়ে দিয়েছেন তা নিঃসন্দেহে তাঁর অসাম্প্রদায়িক মনোভাব, শ্রেণি বৈষম্যের প্রতি ঘৃণা এবং সকল মানুষকে সমান দৃষ্টিতে দেখার চেতনা ও বলিষ্ঠতা প্রকাশ করে।

ত্রিমোহিনী উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মূলত তিনটি যদিও এখানে এক ডজনের বেশি প্রয়োজনীয় কাল্পনিক ও ঐতিহাসিক চরিত্র রয়েছে। মাহজাবিন, গল্পবলিয়ে শুভ্র ও নির্ঝর - এ তিনটি প্রধান ও কাল্পনিক চরিত্র প্রথম থেকে শেষঅব্দি উপন্যাসের প্রাণ ও শরীরকে প্রজ্জ্বলিত অবয়বে দাঁড় করিয়ে রাখে। উপন্যাসের কাহিনী গাঁথায় কখনো কখনো ঔপন্যাসিককে ইউটোপিয়ান বলে মনে হলেও, পরাবাস্তবতা বা জাদুবাস্তবতার কিছুটা অনুভব জাগ্রত করলেও এটি শেষপর্যন্ত পাঠককে সেই অনুভবই দেবে যা তার জীবনে কোনো এক অতীতে ঘটেছিল, পাঠক নিজেকে চরিত্রগুলোর মধ্যে খুঁজে পাবেন এবং পাঠকের মনে হবে বাস্তবতা হয়তো এমনই সৌন্দর্য ও কদর্যে ভরা থাকে কালে কালে। পাঠক-হৃদয় উপন্যাসটি পড়তে পড়তে বার বারই কদর্যকে বাদ দিয়ে সৌন্দর্যমন্ডিত এক অন্তর্লোকের সন্ধান করবে।

নির্ঝর চরিত্রটি আধুনিক বা বর্তমান সময়কে ধারণ করে। নির্ঝর তার মায়ের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে বলে,

মা, তুমিই তো শিখিয়েছ, যে শিশু জন্মের পর পর মা-বাবা-দাদা-দাদির কাছে থেকে ছন্দের দোলায় দোলিত হয় না, সে শিশু বড় হয়ে পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়ন করতে পারে না। কারণ, ছন্দহীনতা তাকে গুছিয়ে কাজ করতে শেখায় না। লিওনার্দোর এক মোনালিসা আজ পুণ্ড্রের তুলনায় ইতিহাসহীন ইউরোপকে কীভাবে সমৃদ্ধ করছে। পুণ্ড্র আমলে আমাদের হয়তো লিওনার্দোর মতো প্রতিভা হারিয়ে গেছে। আমাদের অতীতকে আমাদের ভবিষ্যতের জন্যই স্পষ্ট করা প্রয়োজন

প্রিন্সেস মাহজাবিনের বিয়ে হয় ইতিহাসের অধ্যাপক তন্ময় চৌধুরীর সাথে। ঔপন্যাসিক কাজী রাফি ইতিহাসকে কত চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন কিংবা বলবো উন্মোচন করেছেন এই দম্পতির কথোপকথনের মধ্য দিয়ে। যেমন,

মাহজাবিন গালে হাত দিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে গেল-

হুমম! সম্রাট অশোকের পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধধর্ম গোটা উত্তর ভারতে এবং বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে। ভারতের বাইরে যে ভারতীয় সংস্কৃতি পড়েছিল তা বৌদ্ধ ধর্মের মাধ্যমেই। কিন্তু, ট্র্যাজেডি হলো সেই ভারতবর্ষ থেকেই বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতি সমূলে উৎপাটিত হয়েছে।

নির্ঝর করপোরেট জব করলেও তার মানসিকতায় সে জীবনের কোনো ছাপ নেই, বরং ইতিহাস- প্রেম, মানব-প্রেম খুঁজে পাই তার হৃদয়-অতলান্তে। প্রিন্সেস মাহজাবিনের খোঁজে হন্যে হওয়া নির্ঝর একদিন ভাগ্যক্রমে তারই মতো দেখতে নওরিনকে বাসে তার পাশের সিটে আবিষ্কার করল। ওই সময় নওরিনকে দেখে প্রিন্সেস মাহজাবিনের কথা মনে হলেও মেয়েটির পরিচয় জানা যায়নি। শুধু এটুকু জানতে পেরেছিল যে নওরিন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের ছাত্রী। নওরিনের বর্ণনা ঔপন্যাসিক যেভাবে দিয়েছেন -

নিরীহ চোখ দুটোতে কোথায় যেন বিদ্রোহ লুকানো। বাতাসে স্থির জল কেঁপে উঠলে জলের সাথে মৃদু ঢেউগুলো খেলতে গিয়ে যে মায়াবী বাঁকের গর্ত তৈরি করে, মেয়েটার গালে তেমনি একটা টোল আছে। তার উজ্জ্বল বাদামি বর্ণের ত্বকের ভেতরে একধরণের কোমলতা উঁকি দিয়ে আছে। নিখুঁত ভ্রু-যুগলের ভেতরে নির্জনতর এক পৃথিবী কেমন করে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে। বাংলাদেশের সমতল মাঠের বিস্তীর্ণ সবুজ যেন মিশে আছে মেয়েটার সরলতার অভিব্যক্তিতে।

উপন্যাসের প্রায় শেষের দিকে জানা যায় যে নওরিন আর কেউ নয় প্রিন্সেস মাহজাবিনের নাতনী।

উপন্যাসের এক পর্যায়ে মাহজাবিন ও তন্ময় চৌধুরীকে কুয়ো খোঁড়ার মতো করে ইতিহাস খুঁড়তে দেখা যায় এবং কাজী রাফি এই চরিত্র-দুটোর মধ্য দিয়ে এটাই প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে মুক্তিযুদ্ধ বা যেকোনো প্রতিবাদ-সংহতি, বোধ-চেতনা জাগরণে ভাষা-সংস্কৃতি-সভ্যতা কাল থেকে কালান্তরে মানুষকে প্রনোদিত করেছে, উজ্জীবিত করেছে।

মাহজাবিন যখন তার ভাতুষ্পুত্র তুষারকে একজন রাজনীতিবিদ বানানোর স্বপ্নে বিভোর হয়ে চালচুলোহীন এক কিশোর গল্পবলিয়ে শুভ্রর সাথে মিশতে বলে তখন তুষারের মা দিশাকে উদ্বিগ্ন হতে দেখি। দিশা ঠিক বুঝতে পারে না রাজনীতিবিদ হওয়ার সাথে গল্পবলিয়ে বা প্রকৃতির সাথে সময় কাটানোর কী আছে! মাহজাবিনকে তখন বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে দেখা যায়,

হ্যা, রাজনীতিবিদ হতে হলে তাকে প্রকৃতির ভাষা শিখতে হয়। সমাজের ঘটে যাওয়া ঘটনা প্রবাহ নয়, তাকে জানতে হয় জীবন প্রবাহের ভেতরে বহমান ঘটনার মানবিক আর্তি। তাকে পত্রিকার প্রবন্ধ নয়, হয়ে উঠতে হয় এক জীবনঘনিষ্ঠ উপন্যাস। সব শ্রেণির মানুষের সাথে না মিশলে, প্রান্তিক মানুষগুলোর বেদনা আর অনুভূতিগুলো উপলব্ধি করতে না পারলে, ত্রিমোহিনীর প্রান্তরে জেগে থাকা স্মৃতিগুলো তার ভেতরকে সমৃদ্ধ করতে না পারলে, আমার তুষার দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হবে কীভাবে?তুষারের মা দিশা মাহজাবিনের কথায় এক সময় উপলব্ধি করতে শেখে-

সবাই মানুষের অনুভূতিতে দোলা দিতে পারে না। যারা পারে তারা অন্যরকম। অনন্য। খোকা আমি যদি কখনো হারিয়ে যাই, তাহলে তোকে পথ দেখাবে তোর ফুপি আর সেই পথে আলো ফেলবে শুভ্র। স্রষ্টার বরপুত্র, গল্পবলিয়ে এই কিশোরই হোক তোর প্রিয় বন্ধু - এই-ই প্রার্থনা। (পৃষ্ঠা -২৮২)

ত্রিমোহিনীকে একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনা-জাগানিয়া উপন্যাস বললেও ভুল হবে না। মাহজাবিনের মানস-গঠনে নিখুঁতভাবে সেই চিত্রের প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে। যেমন, উপন্যাসের এক জায়গায় মাহজাবিন তার পিতা মোহাম্মদ আলীকে বলেন,

ভাষা শেখাটুকু যখন শুধুমাত্র ধর্মীয় কারণে হয় তখন মানুষগুলো নিজ সংস্কৃতি আর নিজেদের সমৃদ্ধ ইতিহাস থেকে দূরে সরে যায়। এমন পরিস্থিতিতে তারা শুধু ধর্মান্ধ হয়ে যায়। ধর্মের আচারি ধর্মান্ধ মানুষগুলো আসলে নিষ্ঠুর। ধর্ম-কর্ম করার কারণে এরা স্রষ্টার কাছে সকল জবাবদিহিতা সম্পন্ন করছে ধারণায় মানবিক আবেদনের প্রতি বিকারগস্ত। ধর্মান্ধ শ্রেণি একটা সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় অশনী সংকেত। (পৃষ্ঠা -২০৩)

সভ্যতা তৈরিতে, সমাজ তৈরিতে, মনন তৈরিতে শতাব্দীর পর শতাব্দী নারীরাকীভাবে ভূমিকা পালন করেছে তা গল্পবলিয়ে শুভ্র চরিত্রের মধ্য দিয়ে কাজী রাফি সাবলীলভাবে বর্ণনা করেছেন দুটো ঐতিহাসিক চরিত্র নর্তকী কমলা ও কাশ্মিরের রাজা জয়াপীড়ের ঘটনার বিশ্লেষণে। রূপবতী নর্তকী কমলা সুপুরুষ জয়াপীড়কে তার রূপে-গুণে, কথায়-কাজে মুগ্ধ-বিমোহিত করেছিল। জয়াপীড় কমলাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিলে জয়াপীড়কে প্রচণ্ড ভালবেসেও সে প্রস্তাব প্রত্যাখান করে জয়াপীড়কে বিয়ে করতে বলেছিল রাজা জয়ন্তর কন্যা কল্যাণদেবীকে। তবে, তাকে বিয়ে করার শর্তস্বরূপ ত্রিমোহিনীর বনের নরখাদক এক সিংহকে হত্যা করতে হবে।

জয়াপীড় কমলাকে বললেন,

সত্যিই তুমি মহিয়সী। মোহিনি তুমি! রূপের সাথে ছন্দময় শরীর জুড়ে যার এতো ভাষা, যে নারী আজ নয়, কাল নয়, অনাদিকাল পর্যন্ত দৃষ্টি মেলতে পারে সামনে আরো সামনে। মাতৃভূমি ; স্বদেশবাসীর জন্য যে নারী ত্যাগ করতে পারে তার ভালোবাসা এমনকি তার জীবন। শ্রদ্ধা তোমায় হে নারী! ধন্য আমি আর আমার এই জীবন, তোমার অনাবিল ভালোবাসা পেয়েছি বলে। তোমার জন্য তিন ভুবনের ইতিহাস তার ডানা মেলবে। মোহনীয় এই তোমাকে খুঁজবে একদিন ত্রিভুবনের বাসিন্দারা। একদিন তোমার জন্যই এ অঞ্চল নাম ধারণ করবে ত্রিমোহিনী'

ত্রিমোহিনীর একটা অন্যতম অংশ জুড়ে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। বগুড়ার ত্রিমোহিনী অঞ্চলের প্রিন্সেস মাহজাবিন, তন্ময় চৌধুরী, গল্পবলিয়ে শুভ্র, দীপন আহমেদ তুষার সমগ্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা, উত্তেজনা, পরিকল্পনা এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণকে রিপ্রেজেন্ট করেছে। ঔপন্যাসিক এখানে দেখিয়েছেন, শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণের পর থেকে মাহজাবিন ও তন্ময় চৌধুরী মুক্তিবাহিনী তৈরি করার জন্য কাগজ কলম নিয়ে বসে এক অভিনব সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে, তরুণদের রক্তে ঢোকাতে হবে এমন দৃশ্যকল্প যা শুধু অনুপ্রেরণা নয়, কাজ করবে তাদের সাহস এবং প্রাণরক্ষার কৌশল হিসেবে। সুতরাং শুভ্রকে দিয়ে মাহজাবিন ফাঁদ পাতা, শত্রুর ক্যাম্পে হানা দেওয়া এমনকি শত্রুর চোখ এড়িয়ে চলার কৌশল রপ্ত করাতে ভিন্ন ভিন্ন সব গল্প বানাতে বললো। মাহজাবিনের ধারণার চেয়ে আরো একধাপ ওপরে গিয়ে শুভ্র সম্রাট অশোকের এক কাল্পনিক সেনাবাহিনীর সাথে জার্মান সেনাবাহিনীর যুদ্ধপট তৈরি করলো যা তুষারসহ আরো যারা যুদ্ধব্রতী সবাইকে যোদ্ধা বানাতে দারুণ ভূমিকা পালন করেছিল। কাজী রাফি এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তে যে সংগ্রামের ইতিহাস আছে বা তাদেরকে উদ্দীপ্ত করতে গল্পবলিয়ের মুখ দিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতিস্বরূপ সম্রাট অশোকের যুদ্ধের এক দৃশ্যপট তৈরি করে গল্প বলালেন।

উপন্যাসের বেদনাময় মর্মস্পর্শী চরিত্র সুশীলা। ছোটবেলায় যে মা-বাবা ও ভাইকে হারিয়ে ফেলে। সুশীলাকে ঘটাকরে ধর্মান্তরিত করে নাম দেয়া হয় সিফাত। খাজান্চি সুফিয়ানের কাছে ছোটবেলা কাটলেও পরবর্তীতে মাহজাবিন তাকে আশ্রয় দেয়। যুদ্ধের সময় একদিন তন্ময় চৌধুরীকে নৃশংসভাবে হত্যা করে নিজ বাড়িতে এবং মাহজাবিন, মেহের নিগার, নাজ তিতির ও সিফাতকে ধরে নিয়ে যায় পাকসেনারা তাদের ক্যাম্পে। মাহজাবিনকে বেঁধে রেখে তার সামনে হায়েনারা দুই মাসের গর্ভবতী সিফাতকে একে একে ধর্ষণ করলে সিফাতের মিসক্যারেজ হয়ে যায়। এরপর সিফাত এবং এমন ভয়ংকর হৃদয়বিদারক ঘটনা সহ্য করতে না পেরে মাহজাবিন দুজনেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সিফাতকে নিপীড়ন-নির্যাতন এখানেই থেমে যায়নি। এরপরে সুফিয়ান ও নিরঞ্জন মিলে সিফাতের যে করুণ পরিণতি ঘটিয়েছিল তাতে একজন আবেগহীন মানুষও ডুঁকড়ে কেঁদে উঠবে।

তুষার আহমেদ দীপন যখন স্থানীয় সংসদ সদস্য তখন তার কন্যা দীপ্তির সাথে ফ্লার্ট করা শুরু করে নির্ঝর। নির্ঝরের এই ফ্লার্ট করার পেছনে কারণ হলো নিজের লেখা একটি উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করা। নির্ঝরের উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি উদ্ধারের হাতিয়ার হিসেবে দীপ্তিকে ব্যবহার করার ফলাফল খুব চমৎকারভাবে ঔপন্যাসিক এই উপন্যাসে তুলে ধরেছেন যা পাঠকের মর্মে, অনুভবে গিয়ে মিশে তাকে এক গভীর বেদনায় আচ্ছন্ন করে ফেলে। জীবন থেকেও যে দীপ্তি নির্ঝরকে কখনো পাবে না বলে নিশ্চিত হলো তখন গভীরভাবে নির্ঝরের হৃদয়ে চিরকালের তরে মিশে থাকার জন্য মৃত্যুকে নিজ হাতে আলিঙ্গন করল। ঔপন্যাসিকের ভাষায়,

দীপ্তির শরীরের প্রাণ মাতানো গন্ধে, চুলের বিস্রস্ততায়, লম্বা আঙুলের নখ-আলতায় ঠিকরে পড়া আলোর প্রতিবিম্বে এক মৃত্যু মোহনা মৃত্যুর মাঝে জীবনের গান গাইল।

একজনের হৃদয় আরেকজনের জন্য যখন খুব করে কাঁদে, তাকে কাছে পেতে চায়, সেই মানুষটিও কোনো না কোনোভাবে টের পেয়ে যায়। অর্থাৎ দুটো আত্মার সংযোগ ঘটে বলেই এমন হয়। অনেকে একে টেলিপ্যাথি বলে থাকেন। দীপ্তির আত্মা যখন নির্ঝরের জন্য দেহ ত্যাগ করতে থাকে ঠিক সেই মূহুর্তে নির্ঝরের মন কেমন করা অস্থিরতা দেখে সেটা টের পাই। কাজী রাফির ভাষায়, নির্ঝর দীপ্তির জন্য এই সকাল থেকে খারাপ লাগার কারণটুকু না জানলেও নির্ঝরের ভেতর বাস করতে আরম্ভ করা দীপ্তির আত্মা ফিসফিস স্বরে আবৃত্তি করছিল –

প্রকৃতির এত লীলা, গাছদের নেই খেলা

তুমি না থেকেও তুমিই কেন থাক সারাবেলা।

একজন নিমগ্ন কথাসাহিত্যিক হিসেবে বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে কাজী রাফির অবস্থান বলিষ্ঠ, স্বতন্ত্র ও ব্যক্তিত্বখচিত। জীবন, জগৎ, ইতিহাস, প্রকৃতি ও মানব-সম্পর্কের বিচিত্র বিষয়কে উপন্যাসে সাবলীলভাবে উপস্থাপন করেছেন তিনি। ত্রিমোহিনী একই সাথে ঐতিহাসিক, ট্র্যাজেডিক, প্রেম ও শোক গাঁথার এক মহাকাব্যিক উপন্যাস যা মহাকালকে ধারণ করে। তাঁর অনুভব, জীবনদর্শন, ইতিহাস ও শিল্পভাবনার এক অনন্যময় উন্মোচন ঘটিয়েছেন ত্রিমোহিনীতে। তাই আমি তাঁকে বলি অনুভবশক্তি ও জীবনদৃষ্টির অনন্য শিল্পী।

ত্রিমোহিনী উপন্যাসের শেষ দিকে আমি পাই দীপন আহমেদ তুষারকে লেখা গল্পবলিয়ে শুভ্রর একটি চিঠি।

চিঠির কিছু অংশ -

ভেবেছিলাম আমার বলা গল্পগুলো ত্রিমোহিনীর সীমা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়বে মাঠ প্রান্তর পেরিয়ে আরো অনেক অনেক গ্রাম আর শহরে। তারপর যুগ যুগ ধরে এই গল্পগুলো মানুষের মুখে মুখে বিবর্তিত হয়ে হবে পরিবর্ধিত। মুখ থেকে মুখে বদলে যাওয়া আমার গল্পগুলো অনেক অনেকদিন পর এক সামাজিক কাঠামো পাবে। তারপর একদিন হয়তো বাংলা সাহিত্যে কোনো এক শেক্সপিয়ার জন্মগ্রহণ করে মাঠে ঘাটে ছড়িয়ে থাকা আমার এই গল্পগুলো নিয়ে রচনা করবে মহান কোনো উপন্যাস অথবা নাটক। দুশো বছর পরের স্বপ্ন দেখেছিলাম আমি। হায়রে স্বপ্ন! বাস্তবতা হলো অতি মানুষের ভিড়ে ত্রিমোহিনীবাসী এখনই আমার গল্পগুলো ভুলে যেতে বসেছে। দৃশ্যকল্প দিয়ে নির্মিত অন্তর্লোকের জন্য দূরবর্তী অন্তর্লোক প্রয়োজন। কিন্তু কী আর করা! এটা ভয়ংকর এক যুগ। অতি মানুষের হাজার মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থার জ্যামে পড়ে মানুষের অন্তরের যোগাযোগে গোলযোগ তৈরি হয়েছে। কে কোন বার্তা গ্রহণ করবে; কোনটা রেখে কোন ফ্রিকোয়েন্সি মাথায় ধারণ করবে তারা তা নির্ধারণ করতে পারছে না। মানুষের অন্তর্লোকে এখন আর স্থিরতা নেই। এক ধরণের অস্থির মনস্তাত্ত্বিক আলোড়নে আমাদের সংস্কৃতি ভয়ে দুরু দুরু কাঁপছে। শিশুদের মনেও আর নিজ কল্পনার স্থিরতা নেই। মায়েরা তাদের গল্পবলিয়ের গল্প শোনালেও তাদের মনের বর্ণিল রঙচ্ছটায় তার আশ্রয় কোথায়? এই শিশুরা কীভাবে আমার গল্পগুলো পরিবর্ধন করবে?দাদার পাণ্ডুলিপিতে 'স্রষ্টার রহস্যের নিদর্শন' নামক অংশটুকু পড়লে তোমার গায়ের লোমগুলো শিউরে উঠবে। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, পৃথিবীতে মানব উন্মেষের আদি স্থানসমূহকে (যেমন, জাভা দ্বীপ এবং চীনের টংকিজ) মানচিত্রে স্থাপন করলে তা মানুষেরই কংকালস্থির আকৃতি ধারণ করে। কিন্তু, অবাক ব্যাপার হলো, এই কংকালস্থির ঠিক নাভিতে পুণ্ড্রনগর অবস্থিত। তোমাকে আরো বলি, এক শত উপনগরী এবং তার আশেপাশে গুচ্ছগ্রামের আদলে তৈরি পুণ্ড্রনগরীকে এই মূহুর্তে সেই সময়ের পৃথিবীর মূর্ত করলে বিস্ময়ে হতবাক হতো পৃথিবী। এটা ঠিক নারীর নাভীর মতোই যে নাভিদেশের নিম্নে প্রবাহিত করতোয়া নদী। এই বিষয়টা উপজীব্য করে তোমাকে তোমার, 'The Sin Of A Dream' চিত্রকর্মে কিছু নতুন সংযোজন আবশ্যক

তোমাকে চিঠি লেখার সবচেয়ে বড় কারণ তোমার মাধ্যমে সরকারকে একটি প্রস্তাব পাঠানো। কোথাকার কোন বগড়া খানের মিথ্যা ইতিহাস প্রতিষ্ঠা করে, তারই নামে এই শহরের নামকরণ করে সভ্যতার ধারক এই শহরকে 'বগুড়া' নামের কলংক থেকে বাঁচাতে এই নাম বদলে আমাদের শহরের নাম 'পুণ্ড্র নগরী' রাখা হোক।

মরে যাওয়ার আগে আমার সব স্বপ্ন পুরো হয়ে যাবে, যদি পুণ্ড্রের কোলে গড়ে ওঠা এই শহরকে 'পুণ্ড্র নগরী' নামে আখ্যা দেয়া হয়। একটা নাম তার জাতিসত্তার প্রভাব বিস্তার করবে অনন্তকাল...আমাদের অনন্তকালের স্বপ্নের সাথে।

আমাদের কৃষ্টি এবং মহান গর্বিত ঐতিহ্য, এর প্রাচীনত্বের রহস্যময়তা এবং বাঙালির কলঙ্ক এই ইতিহাস দিয়েই ঘোচাতে হবে। প্রয়োজন এখন একজন মহৎ, মহাপ্রাণ নেতৃত্ব। তারই অপেক্ষায় আছি... (পৃষ্ঠা -৪২১)।

আমাদের দেশের মানুষের মনস্তত্ব অপসংস্কৃতির বেড়াজালে জড়িয়ে কতোটা নাজুক হয়ে পড়েছে তা এই চিঠির মাধ্যমে কাজী রাফি তাঁর মর্মবেদনা, আক্ষেপ ও প্রত্যাশাকে বিম্বিত করেছেন।

এই উপন্যাসে আমরা‘মৃত্যু’কে একটা চরিত্র হিসেবে দেখতে পাই। একে একে সময়ের সাথে সাথে প্রায় প্রতিটি চরিত্রের মৃত্যু আমার হৃদয়কে ব্যাথাতুর করেছে এবং ভীষণভাবে কাঁদিয়েছে। ঔপন্যাসিক আবার তাঁর মমত্ববোধের ভাষা দিয়ে টেনে তোলেন, নিয়ে যান ভিন্ন ভিন্ন অনুভবের জগতে যেখানে মানুষের মনন তৈরিতে রয়েছে অফুরন্ত কাব্যছন্দময়তায় ঘেরা অনুভবমালা।

কাজী রাফি এখানে ত্রিমোহিনী গ্রামের মধ্য দিয়ে সমগ্র বাংলাদেশের রূপটিকে তুলে ধরেছেন। মানুষের অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি, কলা মানবদেহের কঙ্কালতন্ত্রের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, কঙ্কালতন্ত্র ছাড়া যেমন মানুষ দাঁড়াতে বা ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে না তেমনি ত্রিমোহিনীর ঔপন্যাসিক কাজী রাফি এগুলোর স্বরূপ কল্পনা-শক্তি ও অনুভব-শক্তির চূড়ান্ত ব্যবহার করে দেখিয়েছেন যে একটা সমাজ বা দেশ তার ইতিহাস-ঐতিহ্য, সাহিত্য-সংস্কৃতি ছাড়া অস্তিত্বহীন বা অন্তঃসারশূন্য।

ত্রিমোহিনী এমন একটি মহাকাব্যিক উপন্যাস যার চরিত্রগুলোকে নতুন করে আবিষ্কারের নেশায়, নতুন করে অনুভবের নেশায় আমি বার বার পড়তে চাই। পড়ব। প্রেমিক চলে যাবার পরও তার প্রেমের আবেশ যেমন মুগ্ধ করে রাখে প্রেমিকার তনু-মন তেমনি ত্রিমোহিনী অভিযাত্রার পর এক ঘোর নিস্তব্ধতার আবেগি-আবেশ অনুরনণ ছড়িয়ে রেখেছিল আমার চারপাশ!

(ঢাকাটাইমস/১৩জুলাই/এসকেএস)

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :