সেই ডিসির ‘লঘুদণ্ড’ মওকুফে হতাশ সাংবাদিক আরিফ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২১, ১৫:৫৯ | প্রকাশিত : ২৭ নভেম্বর ২০২১, ১৫:৫৭
সাবেক ডিসি সুলতানা পারভীন ও সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগান (ফাইল ছবি)

সাবেক জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনের ‘লঘুদণ্ড’ রাষ্ট্রপতি মওকুফ করায় হতাশা প্রকাশ করেছেন কুড়িগ্রামের নির্যাতিত সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগান। তার সঙ্গে যে অন্যায় করা হয়েছে সেটার বিচার তিনি কোথায় পাবেন তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ভুক্তভোগী নাগরিক হিসেবে এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে পাশে পাওয়ার আকুতি জানিয়েছেন তিনি।

শনিবার বিকালে মোবাইলফোনে ঢাকা টাইমসের সঙ্গে আলাপকালে আরিফুল ইসলাম এসব কথা বলেন।

সাংবাদিক আরিফ বলেন, ‘আমি যেহেতু থানায় মামলা করেছি, উচ্চ আদালতে রিট করেছি, আমি আদালতের প্রতি আস্থাশীল। আমি আশা করি, আদালত থেকে ন্যায়বিচার পাবো এবং এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র আমার প্রতিপক্ষ না হয়ে একজন ভুক্তভোগী নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রকে আমি পাশে পাবো।’

আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমার সঙ্গে অপরাধ হয়েছে। আমি বিনা অপরাধে শাস্তি পেয়েছি। যারা অপরাধ করেছে, তারা শাস্তি থেকে মুক্তি পেয়ে যায়। তদন্ত প্রতিবেদনে প্রমাণ হয়েছে, তারা দোষী। অথচ আমি শাস্তি পেলাম, আমার সঙ্গী যে অন্যায়টা হয়েছে, সেটার কিছু হয়নি। এটা আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’

রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করে এই সাংবাদিক বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি যেকোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। কিন্তু আমি হতাশ। অপরাধটা আমার সঙ্গে হয়েছে, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আমি। দণ্ড বাতিল করার অর্থ হচ্ছে, অপরাধটা আমার সঙ্গে হয়নি। এটা আমি মেনে নিতে পারছি না। তাহলে কী প্রতিকার পেলাম আমি?’

নির্যাতিত সাংবাদিক বলেন, ‘লঘু শাস্তি দেওয়ায় এমনিতেই আমি সংক্ষুব্ধ ছিলাম। সেই লঘু শাস্তিটাও যখন বাতিল হয়ে যায়, তখন আসলে আর কোনো আশার আলো দেখছি না। এটা সাংবাদিক সমাজের জন্য একটি বড় হতাশার বিষয়।’

সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) আইন ও এর বিধিমালা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এই গণমাধ্যমকর্মী বলেন, ‘সরকারি কর্মচারীরা লাগামহীনভাবে অপরাধ করবেন, আর শাস্তির বেলায় সে অপরাধ উপেক্ষা করা হবে- আমি মনে করি এ আইন ও বিধি সংবিধান পরিপন্থী। জনগণের টাকায় যাদের বেতন-ভাতা হয়, তারা আইনগত বিশেষ সুবিধা পেলে সেটা সংবিধান পরিপন্থী বলে আমি মনে করি।’

গত বছরের ১৩ মার্চ গভীর রাতে আরিফুল ইসলাম রিগ্যানকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে মাদক রাখার অভিযোগে এক বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। কুড়িগ্রামের ওই সময়ের ডিসি সুলতানা পারভীনের নির্দেশেই এই সাজা দেওয়া হয় বলে আরিফের পরিবারের অভিযোগ।

বিসিএস ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তা সুলতানা কুড়িগ্রাম শহরের একটি সরকারি পুকুর সংস্কারের পর নিজের নামানুসারে ওই পুকুরের নাম ‘সুলতানা সরোবর’ রাখতে চেয়েছিলেন। এমন তথ্যে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলা ট্রিবিউন। যার জেলা প্রতিনিধি আরিফুর রহমান রিগ্যান।

প্রতিবেদন প্রকাশের ১০ মাস পর জেলা প্রশাসন আরিফুলের বাড়িতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তাকে সাজা দেন। এ ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয় এবং বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। পরে আরিফকে জামিন দেন কুড়িগ্রামের একটি আদালত।

কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। সেখানে তিনি জানান, হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছির। এরপর তাকে বিবস্ত্র করে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। চোখ বেঁধে তার কাছ থেকে স্বাক্ষরও নেওয়া হয়েছিল বলে জানান এই সাংবাদিক।

তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর ডিসি সুলতানা পারভীন, আরডিসি নাজিম উদ্দিন, সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা ও এস এম রাহাতুল ইসলামকে কুড়িগ্রাম থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ২০২০ সালের ১৯ মার্চ ডিসি সুলতানা পারভীন, সাবেক তিনজন সহকারী কমিশনারসহ ৩৫ থেকে ৪০ জনের বিরুদ্ধে কুড়িগ্রাম সদর থানায় অভিযোগ দায়ের করেন সাংবাদিক আরিফুর রহমান।

উচ্চ আদালত ওই অভিযোগ মামলা হিসেবে রেকর্ডের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ভ্রাম্যামাণ আদালত পরিচালনা করে আরিফুল ইসলামকে যে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল তা স্থগিত করেন।

২৬ মার্চ সুলতানা পারভীনসহ তার কার্যালয়ের সাবেক তিনজন সহকারী কমিশনারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। বিভাগীয় মামলাটি তদন্তের জন্য তদন্ত বোর্ড গঠন করা হয়। ওই তদন্ত বোর্ডের আহ্বায়ক ছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আলী কদর। বোর্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়, সুলতানা পারভীনের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

গত ১০ আগস্ট এক আদেশে তার বেতন বৃদ্ধি দুই বছরের জন্য স্থগিত রাখার ‘লঘুদণ্ড’ দেওয়া হয়। সেই আদেশ বাতিল করে গত ২৩ নভেম্বর আরেকটি প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

জ্যেষ্ঠ সচিব কে এম আলী আজম স্বাক্ষরিত এই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘যেহেতু মোছা. সুলতানা পারভীন তার উপর অরোপিত উল্লিখিত লঘুদণ্ডাদেশ মুকুফের জন্য গত ৬ সেপ্টেম্বর মহামান্য রাষ্ট্রপতির সমীপে আপিল আবেদন পেশ করলে মাহামান্য রাষ্ট্রপতি সদয় হয়ে মোছা. সুলতানা পারভীনের আপিল আবেদন বিবেচনা করে পূর্বে প্রদত্ত দুই বছরের জন্য বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখা নামীয় দণ্ডদেশ বাতিল করে তাকে অভিযোগের দায় হতে অব্যাহতি প্রদান করেছেন।’

এতে আরও বলা হয়, ‘সেহেতু মোছা. সুলতানা পারভীন, প্রাক্তন জেলা প্রশাসক, কুড়িগ্রাম, বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (উপসচিব), জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়- এর বিরুদ্ধে রুজুকৃত বিভাগীয় মামলায় দুই বছররের জন্য বেতন বৃদ্ধি স্থাগিত রাখা নমনীয় লঘুদণ্ড প্রদান করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গত ১০ অগাস্টের প্রজ্ঞাপনটি বাতিলপূর্বক তাকে অভিযোগের দায় থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হলো।’

(ঢাকাটাইমস/২৭নভেম্বর/কারই/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

গণমাধ্যম বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :