ওয়াসা কর্মচারী সমিতির ১৭৬ কোটি টাকা উধাও, ধামাচাপার চেষ্টায় জড়িতরা

অভিজিত রায় কৌশিক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৩ মে ২০২২, ১৪:৫৯ | প্রকাশিত : ২৩ মে ২০২২, ১৩:০২

ঢাকা ওয়াসা কর্মচারী সমিতির ১৭৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে সমিতির শীর্ষ পদে বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালনকারীদের বিরুদ্ধে। এই অভিযোগে নাম জড়িয়েছে জনতা ব্যাংকের এক কর্মকর্তারও। কমিটির এসব মোটা অঙ্কের আত্মসাতকৃত টাকার হিসাব চাইলে উল্টো হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে সমিতির পক্ষ থেকে। তবে লাগামহীন এই অনিয়মে জড়িতরা বিষয়টি ধামাচাপা দিতে জোরালো ভূমিকা পালন করছেন বলে জানা গেছে।

এর আগে গত ১৭ মে মঙ্গলবার ঢাকা ওয়াসা কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতির সম্পদ ও অর্থ সমিতির নির্বাচিত কমিটিকে বুঝিয়ে দেওয়াসহ সাত দফা দাবিতে মানববন্ধন করে ঢাকা ওয়াসা কর্মচারী সমিতি।

সে সময় ‘ঢাকা ওয়াসা কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতির ২০০ কোটি টাকার সম্পদ ও অর্থ সমিতির নির্বাচিত কমিটিকে বুঝিয়ে দিতে হবে’- কর্মচারীদের এমন দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে চাকরি ছেড়ে যাওয়া আন্দোলনের অংশীদার ড্রেনেজ বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোজাম্মেল হক বলেন, ‘সমিতির বিষয়ে অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী ১৩২ কোটি টাকা লুট করা হয়েছে। এই পরিমাণ আরও বেশি হবে। যারা লুট করেছে তাদেরকে নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে।’

সম্প্রতি কর্মচারীদের এ অংশটি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এই অর্থ লোপাট নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানেও তারা একই দাবি তোলেন।

সমবায় অধিদপ্তরের এক বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। ঢাকা ওয়াসা কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতির ওপর এ নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করে ২০২১ সালের জুন মাসে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, সমবায় অধিদপ্তর ও ঢাকা ওয়াসাকে দেওয়া হয়। এতে আর্থিক অনিয়ম নিয়ে অধিকতর তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। যদিও ওয়াসা কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

সমবায় অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ঢাকা ওয়াসা কমিশন বাবদ প্রায় ১৩৪ কোটি টাকা সমিতির ব্যাংক হিসাবে জমা দিয়েছে। অথচ সমিতির নিরীক্ষা প্রতিবেদনে জমা দেখানো হয়েছে মাত্র এক কোটি ৭৯ লাখ টাকা। বাকি প্রায় ১৩২ কোটি টাকার কোনো হিসাব নিরীক্ষা দল পায়নি। সেই সঙ্গে ২০১৮ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২০ সালের ৩০ জুনের মধ্যে সমিতির ব্যাংক হিসাব থেকে ৪৪ কোটি ২১ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। এই টাকার হিসাব পাওয়া যায়নি। সবমিলিয়ে মোট ১৭৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে সমিতির শীর্ষ পদে বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালনকৃতদের বিরুদ্ধে।

জানা যায়, ওয়াসার পানির বিল আদায়ে নিয়োগকৃত ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে এই সমিতি। নিয়ম অনুসারে, ওয়াসার বিল উত্তোলনের বিনিময়ে শতকরা ১০ টাকা হারে কমিশন পেয়ে থাকে এই সমিতি। এই টাকা থেকে নিয়মিত লভ্যাংশ পাওয়ার কথা সদস্যদের। কিন্তু প্রতি বছর শতকোটি টাকা আয় করলেও নিয়মানুসারে সমিতির সদস্যরা কোনো লভ্যাংশ পাচ্ছেন না। এমনকি শতকরা ১০ টাকা হারে পাওয়া কমিশনের বিপুল পরিমাণ টাকার হদিসও মিলছে না এখন। অডিটেও মিলছে না হিসাব। এই টাকা উদ্ধারে চিঠি চালাচালি হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরেই। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

অভিযোগ উঠেছে, নতুন কমিটির কাছে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বুঝিয়ে দিতে সময়ক্ষেপণ করছে ব্যাংক ও ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। বিশাল অংকের টাকা তসরুফ ঠেকাতে উদ্যোগ নেওয়ার বদলে দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করার অভিযোগ রয়েছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।

ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, মূলত পানির বিল আদায়ের পরিমাণ বাড়াতেই ঠিকাদার নিয়োগ করেছিল ওয়াসা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পানি ও স্যুয়ারেজ বিল বাবদ ১৩০৬ কোটি টাকা আদায় হয়। সেই হিসেবে ঢাকা ওয়াসা থেকে ওই বছরে সমবায় সমিতি কমিশন পায় ১৩০ কোটি টাকা। প্রতি বছর গড়ে ১০০ কোটি টাকার কমিশন পেয়ে থাকে সমিতি। এই আয় থেকে সদস্যদের মধ্যে লভ্যাংশ হিসাবে বিতরণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে আট শতাংশ। এছাড়া সমিতির নিজস্ব জনবলসহ বিভিন্ন খাতে খরচ হয় দুই শতাংশ টাকা, যা মাত্র দুই কোটি টাকা। সমিতির ফান্ডে শত শত কোটি টাকা থাকলেও পাঁচ বছর ধরে লভ্যাংশ পাচ্ছেন না সদস্যরা। এ নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে সদস্যদের মধ্যে।

সমিতির অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে গত ৬ এপ্রিল ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর একটি চিঠি লিখেছেন সমিতির সম্পাদক মো. শাহাব উদ্দিন সরকার। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, গত দুই বছরের অডিট রিপোর্ট অনুসারে ১৩২ কোটি টাকার হিসাব নেই। তহবিল তসরুফ ছাড়াও বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে সমিতির গাড়ি। এসব বিষয়ে তদন্তের উদ্দেশ্যে সমিতির পক্ষ থেকে তথ্য চাওয়া হলেও ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ সাড়া দেয়নি। উল্টো সমিতির নয় জনকে বিভাগীয় মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ওই ১৩২ কোটি টাকা ছাড়াও সমিতির জনতা ব্যাংকের হিসাব থেকে উধাও হয়েছে ৪৪ কোটি টাকা। কে বা কারা এই টাকা তুলে নিয়েছে তারও হদিস মিলছে না।

অডিট কমিটির চাহিদার প্রেক্ষিতে ঢাকা ওয়াসার প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা লিখিতভাবে জানান, ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত পিপিআই প্রকল্পের ঠিকাদারি বিল বাবদ ঢাকা ওয়াসা কর্তৃক সমিতিকে দেওয়া হয় ১৩৩ কোটি ৮৩ লাখ ৭৬ হাজার ৯৬৩ টাকা। কিন্তু ওই সময়ে সমিতির ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে ৯২ কোটি ১২ লাখ ৯৬ হাজার ২১৩ টাকা। বাকি ৪১ কোটি ৭০ লাখ ৮০ হাজার ৭৫০ টাকা ব্যাংকে জমা হয়নি।

এ বিষয়ে মো. শাহাব উদ্দিন সরকার চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, এই বিপুল অর্থ অন্য কোনো ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে নাকি ঢাকা ওয়াসা থেকে ক্যাশ পে চেক দেওয়া হয়েছে কিংবা ঢাকা ওয়াসা থেকে বিল দেওয়া হয়নি তার কোনো তথ্যই মিলছে না। অদ্যাবধি এ বিষয়ে কোনো সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি।

এই বিপুল অর্থ আত্মসাতের জন্য জনতা ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা এবং ব্যাংক লেনদেনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়াসার কর্মচারী সমিতির অন্তর্বর্তীকালীন চেয়ারম্যান আক্তারুজ্জামান ও মিজানুর রহমানসহ তখনকার কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ঢাকা ওয়াসা কর্মচারী বহুমুখী সমিতির কমিটি নিয়েও রয়েছে আইনি জটিলতা।

ঢাকা ওয়াসা কর্মচারী বহুমুখী সমিতির বর্তমান সভাপতি মুহাম্মদ আতাউল করিম বলেন, ‘২০১৮ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত অনিয়ম হয়েছে। ওই সময়ে যারা দায়িত্ব পালন করেছেন তারাই এজন্য দায়ী। ওই সময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ উধাও হয়েছে। এই অর্থের কোনো হদিস নেই। এসব অনিয়ম থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কর্তৃপক্ষ ২০২০ সালের ২৬ ডিসেম্বর নির্বাচনের আয়োজন করে। যে নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা বিজয়ী হয়েছি। এখন অর্থ উদ্ধারের জন্য সমবায়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরের চিঠি দিয়েছি। সবার সহযোগিতা চাচ্ছি।’

এদিকে বেশ কয়েক বছর ধরে টানাপোড়েনের পর ২০২০ সালে ঢাকা ওয়াসা কর্মচারী সমিতির নির্বাচন হয়। নতুন কমিটি ওই বছর ২৯ ডিসেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করে। কিন্তু বিগত কমিটি নতুন কমিটিকে সমিতির আয়-ব্যয়ের হিসাব বুঝিয়ে দেয়নি। নতুন কমিটির সদস্যরা বলছেন, আগের কমিটির কাছ থেকে হিসাব বুঝে না পাওয়ায় তারা নিরীক্ষা দলকে হিসাব বিবরণী দিতে পারেননি।

উল্লেখ্য, সমিতির নতুন কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় দেড় বছর হতে চলেছে। আগের কমিটি এখনো আর্থিক ও সম্পদের হিসাব বুঝিয়ে দেয়নি।

সমবায় অধিদপ্তর জানিয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে সমিতির আগের নিরীক্ষা প্রতিবেদন, ব্যাংক হিসাব বিবরণী, সাংগঠনিক নথিপত্র ও সমবায় অধিদপ্তরের নথি পর্যালোচনা করে বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। ঢাকা ওয়াসা কর্মচারী সমিতির বর্তমান কমিটির সদস্যরা বলছেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না দিয়ে ঢাকা ওয়াসা সমিতির বর্তমান কমিটিকে চাপে রেখেছে। সমিতির নির্বাচনে করোনাভাইরাস সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যবিধি ভাঙার অভিযোগে শুধু নির্বাচিত ১০ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। ঢাকা ওয়াসা বিল আদায় কাজের চুক্তি নবায়ন না করলেও সমিতির ২৫টি গাড়ি ও ৬২ হাজার ৪৮১টি মিটার, জামানতসহ প্রায় ২০০ কোটি টাকার সম্পদ বুঝিয়ে দিচ্ছে না।

ঢাকা ওয়াসা কর্মচারী সমিতির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক শাহাব উদ্দিন সরকার বলেন, ‘ঢাকা ওয়াসার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে সমিতির টাকা সরানো হয়েছে। জড়িত ব্যক্তিরা ওয়াসা প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ বলেই কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।’

(ঢাকাটাইমস/২২মে/কেআর/এফএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :