খেজুর এনবিআরের বিলাসী পণ্য, শুল্ক প্রায় ১০০ শতাংশ

শাহনূর শাহীন, ঢাকা টাইমস
| আপডেট : ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৯:৫২ | প্রকাশিত : ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৯:৪৮

গত ৮ ফেব্রুয়ারি চারটি পণ্যের শুল্ক কমানোর ঘোষণা দেয় সরকার। এর মধ্যে ছিল রমজানের অপরিহার্য একটি পণ্য খেজুর। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড জানায়, খেজুরের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। রমজানের আগে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। কিন্তু আমদানি শুল্ক কমানোর পরও উল্টো বেড়েছে খেজুরের দাম। মানভেদে দাম বেড়েছে কেজিতে ৮০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত। বাজারে বর্তমানে কমদামি জাহিদি খেজুর বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকায় কেজি দরে।

এদিকে বাজারে চিনি, ভোজ্য তেলও বিক্রি হচ্ছে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কেজিতে ৫ থেকে ৭ টাকা বেশি দামে। পেঁয়াজের দাম বেড়ে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকা পর্যন্ত।

আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ কমলেও গত অর্থবছরের চেয়ে চলতি অর্থবছর খেজুরের দাম মানভেদে বেড়েছে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ। কমদামি জাহিদি খেজুর ছাড়াও অন্যান্য সব খেজুরেই দামের ঊর্ধ্বগতি। যেমন দাবাস ৪৫০, সুক্কারি, কালমি ও মরিয়ম বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা দরে।

রমজানে দাম বেড়ে যাওয়ার শঙ্কায় আগেভাগেই খেজুর কিনতে চেয়েছিলেন মালিবাগের শহিদুল ইসলাম শহিদ। বাজারে গিয়ে যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল তার। ঢাকা টাইমসকে তিনি বলেন, ‘শুল্ক কমলো কি কমলো না সেটা তো বুঝতে পারলাম না। গত বছর খেজুরের যেই দাম ছিল এ বছর তার দ্বিগুণ। এটা কোন ধরনের মশকারা ঠিক বুঝতে পারছি না। সরকার জনগণের সঙ্গে তামাশা করছে। মনে হচ্ছে, একটা পণ্যের দাম প্রথমে ১০০ টাকা বাড়িয়ে পরে ২ টাকা কমাচ্ছে। এগুলো কোনো নৈতিকতার মধ্যে পড়ে না। জনগণের ভোগান্তি কমাতে সরকারের সদিচ্ছা আছে বলে মনে হয় না।’

এদিকে শুল্ক কমানোর ঘোষণার পরও খেজুরের দামে কেন এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তা উঠে এসেছে এফবিসিসিআইয়ের এক মতবিনিময় সভায়। বুধবার নিত্যপণ্যের উৎপাদন, আমদানি, মজুত, সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই।

রাজধানীর মতিঝিলে এফবিসিসিআই আইকন ভবনে আয়োজিত এই সভায় বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুট ইম্পোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফআইএ) সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, গত ৩৫ বছর ধরে আমি খেজুর আমদানি করি, কিন্তু কখনো শুল্ক দিতে হয়নি। অথচ এবার আমাদের আমদানি করা ১১০ টাকা কেজি দরের খেজুরে ১৪০ টাকা শুল্ক দিয়ে বাজারে বিক্রি করতে হয়। অন্যদিকে ১২০ টাকা কেজি দরের খেজুরে শুল্ক দিতে হয় ২১০ টাকা। এজন্যই বাজারে খেজুরের দাম বেশি।

সিরাজুল ইসলাম বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই শুল্ক যুক্ত করা হয়েছে। অথচ গত বছর এক কেজি খেজুরে মাত্র ১০ টাকা শুল্ক দিয়েছি। আক্ষেপ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমি খেজুর আমদানি করলাম ৯০০ থেকে ১ হাজার ডলারে। চট্টগ্রামের কাস্টম কমিশনার সাধারণ কনটেইনার খেজুরের জন্য ২ হাজার ৫০০ ডলার এবং হিমায়িত কনটেইনারে খেজুরের জন্য ৪ হাজার ডলার শুল্ক নির্ধারণ করেছে। এতে করে খেজুরের দাম দুই থেকে তিনগুণ বেড়ে গেল। আমরা এনবিআর-এ কথা বলেছি, কিন্তু তারা কোনো যুক্তি দেখাতে পারল না, কেন এটার শুল্ক আড়াই হাজার থেকে ৪ হাজার করল। এই অ্যাসেসমেন্টে এক কার্টন খেজুর আমাকে বিক্রি করতে হবে সাড়ে চার হাজার টাকায়, কেজি পড়বে ৪৫০ টাকা।’

এছাড়া গত ১২ ফেব্রুয়ারি সংগঠনটি এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, আগে কেজি প্রতি খেজুরে ৫ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ২১ টাকা ৮৪ পয়সা শুল্ক দিতে হতো। অন্যদিকে এবার ১০ শতাংশ শুল্ক কমানোর ঘোষণার পরও প্রতি কেজিতে শুল্ক দিতে হচ্ছে ৫৪ টাকা থেকে ১৪৬ টাকা পর্যন্ত।

এবিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শুল্ক ও ভ্যাট প্রশাসন বিভাগের দ্বিতীয় সচিব পদমর্যাদার এক কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে অপরাগতা প্রকাশ করেন। অ্যাডমিনে কাজ করেন বলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। এছাড়া শুল্ক নীতি ও বাজেট বিভাগের এক কর্মকর্তাও দায়িত্বে নেই বলে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাননি। এনবিআরের আরও একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে আমরা কথা বলি কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর সভাপতি গোলাম রহমান এর সঙ্গে। খেজুরসহ যেসব পণ্য রোজায় বেশি ব্যবহার হয় সেগুলোর দাম নিয়ন্ত্রণে এখনই সরকারের নজর দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

ঢাকা টাইমসকে ক্যাব সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘খেজুর বিলাসী পণ্য হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। গরীব মানুষের তো সামর্থ নেই। চাল-ডাল কিনতেই তাদের নাভিশ্বাস। বাংলাদেশে এক কোটি লোক আছে (যারা দারিদ্রসীমার নিচে) যাদের জন্য কোনো পণ্যই বিলাসী না। আবার ৩ কোটি লোক আছে তাদের কাছে অনেক পণ্যই বিলাসী। সুতরাং কোনটা বিলাসী পণ্য কোনটা না, তা বলা কঠিন।

‘রোজার পণ্যের দাম সহনীয় রাখতে সরকারের পদক্ষেপ যথাযথ কি না, এনবিআরের শুল্ক প্রত্যাহারের ঘোষণা কি আইওয়াশ’’ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আপনারা সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জিজ্ঞেস করতে পারে; সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে যা বলা হচ্ছে বাস্তবতায় তা মিলছে না কেন। আমি মনে করি, কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি মিথ্যা বলতে পারে না। সরকারের যারা উচ্চ পর্যায়ে আছেন তারা নিশ্চয়ই দায়িত্বশীল। তারা দায়িত্ব নিয়েই কথা বলেন। খেজুরে নতুন করে শুল্ক ধরা হয়েছে কি না, কিংবা প্রত্যাহার করা হয়েছে কি না সেটা আমি বলতে পারবো না। সুতরাং এটা আইওয়াশ নাকি সেটা আমি বলতে পারবো না। তবে আমি মনে করি, রোজায় ব্যবহৃত পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিশেষ নজর দেওয়া উচিত।

(ঢাকাটাইমস/২৯ফেব্রুয়ারি/এসআইএস)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :